ঢাকা, সোমবার 27 November 2017, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভেঙ্গে যাচ্ছে সামাজিক বন্ধন ও পারিবারিক ব্যবস্থা

মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান : দেশে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পরেছে পরকীয়া। সাজানো গোছানো সংসার ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। এর কারণে ভাঙছে পরিবার, সংঘটিত হচ্ছে একের পর এক নিষ্ঠুর হত্যাকান্ড। মানবীয় সমাজে এমন সব কাজ সংঘটিত হচ্ছে যা পশু সমাজেও ঘটে না। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব- সামাজিক প্রাণী। পশুরাও দলবদ্ধভাবে বসবাস করে তাদেরকে সামাজিক জীব বলা হয় না। মহাবিশ্বের অন্য কোথাও মানুষের মতো অন্য কোনো প্রাণী বাস করে কি না, তা আমাদের জ্ঞানের অগম্য। অসীম এ মহাবিশ্বের এক ক্ষুদ্র গ্রহে অসংখ্য সৃষ্টিরাজির মধ্যে একমাত্র মানুষই সামজিক প্রাণী। যাকে স্রষ্টা বুদ্ধি দিয়েছেন, জ্ঞান দিয়েছেন, দিয়েছেন বিবেকবোধ ও বিচার বিশ্লেষণের ক্ষমতা। জন্মগতভাবে মানুষ দুটি সত্ত্বার সমম্বয়ে গঠিত। একটি পাশবিক সত্ত্বা অপরটি মানবিক সত্ত্বা। পাশবিক সত্ত্বাকে নিয়ন্ত্রণ করে মানবীয় সত্ত্বার বিকাশ ঘটিয়ে মানুষ তার মানবীয় মূল্যবোধের পরিচয়  দেবে এটাই মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য। মানুষের মানবীয় সত্ত্বার পাশাপাশি ¯্রষ্টা তাকে আরো কিছু গুণাবলী দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তা হচ্ছে : প্রেম, ভালোবাসা, মায়া, মমতা, মহব্বত, উদারতা, বদান্যতা, সন্তান বাৎসল্য, ¯েœহ, প্রেম-প্রীতি, ভক্তি- শ্রদ্ধা ইত্যাদি। পৃথিবীর আদি হতে আজ পর্যন্ত মানব বংশের গতিধারা রক্ষার জন্য অনন্য যে পদ্ধতি মানব সমাজে চালু আছে তা হচ্ছে পরিবার। পরিবার টিকে আছে, ¯েœহ, ভালোবাসা, প্রেম, মহব্বত, সন্তান বাৎসল্য এ সবের কারণেই। আমরা মানব ইতিহাসের এমন হাজারো বর্ণনা পাই যে, স্বামীর জন্য স্ত্রীর আত্মত্যাগ, সন্তানের জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করা, সন্তান বাৎসল্যে নিজের আরাম-আয়েশ, সুখ-সুবিধা বিসর্জন দেয়ার ঘটনা। আর এ সব কারণেই পরিবার ও পারিবারিক জীবনের মাধ্যমে সমাজ সভ্যতা টিকে আছে। কিন্তু বহমান এ সময়ে এমন কিছু রক্ত হিম করা ঘটনা আমাদের বিবেকবোধ এবং চিন্তা শক্তিকে বিকল করে দেয় যা মানব সমাজে ঘটার কথা নয়। মানুষ যেনো পশু সমাজকেও হার মানিয়ে ফেলেছে, পাশবিকতা ও লাম্পট্যের এমন সব ঘটনা আমাদের সমাজে এখন অহরহ ঘটছে যা সত্যিই আমাদের বিবেক ও বুদ্ধিকে ভোতা করে দিচ্ছে। মা কর্তৃক নিজ সন্তানকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা, পিতা কর্তৃক নিজ সন্তানকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা, স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে হত্যা, স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে হত্যার মতো ঘটনা ঘটেই চলেছে। আর এ সবের পেছনে লজ্জাজনক পরকীয়া বা অবৈধ প্রেম ঘটিত কারণগুলোই মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। এ মাসের প্রথম সপ্তাহে একই দিনে রাজধানীতে আট ঘন্টার ব্যবধানে দুটি নারকীয় ও বীভৎস হত্যার ঘটনা ঘটেছে। যার বর্ণনা  শুনলে গা শিউরে ওঠে। গত ২ নবেম্বর রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় নিষ্ঠুরভাবে খুন হন জামিল শেখ নামে এক গাড়ি চালক ও তার কন্য সন্তান নুসরাত জাহান। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ ৪ মাস আগে জামিল  শেখ হঠাৎ বাসা পরিবর্তন করে ওঠেন বাড্ডার  ময়নারবাগের পাঠান ভিলার তৃতীয় তলায়। তার স্ত্রী আরজিনার সাথে অবৈধ প্রেম চলছিলো অন্য শাহীন নামে বিবাহিত এক যুবকের সাথে। আরজিনা  কৌশলে  প্রেমিক শাহীনকে একটি কক্ষ সাবলেট ভাড়া দেয়। চলতে থাকে আরজিনা-শাহিনের উন্মত্ত  প্রেম। পক্ষান্তরে, স্বামী জামিলের সঙ্গে আরজিনার ঝগড়া-বিবাদ বাড়তে থাকে। পরকীয়া প্রকাশ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পেয়ে বসে আরজিনা-শাহিনকে। এরপরই জামিল  শেখকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে আরজিনা-শাহিন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই  ২ নভেম্বর বৃস্পতিবার গভীর রাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জামিল শেখকে হত্যা করে শাহীন। তাকে ঘরে প্রবেশ করা থেকে সব ধরনের সহায়তা দেয় আরজিনা। এক পর্যায়ে মেয়ে নুসরাত ঘটনাটি দেখে ফেলায় তাকেও বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।’ বাবা ও  মেয়ের জোড়া খুনের ঘটনায়  গ্রেপ্তারকৃত নিহত জামিলের স্ত্রী আরজিনা  বেগম পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে লোমহর্ষক এমন তথ্য জানিয়েছে। এ ঘটনায় খুলনায় অভিযান চালিয়ে আরজিনার পরকীয়া  প্রেমিক শাহীন মল্লিক ও তার স্ত্রী মাসুমাকে  গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি ভ্রাম্যমাণ টিম।
একই দিনে আর একটি ঘটনা ঘটে রাজধানীর কাকরাইলে। মা- ছেলেকে গলা কেটে ও কুপিয়ে হত্যা করে নিহতের স্বামী আবদুল করিম ও তার তৃতীয় স্ত্রী শারমীন মুক্তা। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ আবদুল করিম সবজি বিক্রেতা  থেকে পিঁয়াজের আড়তের মালিক হন। আড়ৎ থেকে বিত্তশালী হন আবদুল করিম। এরপর শুরু করেন চলচ্চিত্র ব্যবসা। ছবি প্রযোজনা করতে গিয়ে নায়িকাদের সাথে পরিচয় হবার সুবাদে একে একে করেন চার বিয়ে। এর মধ্যে ২০১৩ সালে গোপালগঞ্জের মকসুদপুরের পুলিশ কনস্টেবলের মেয়ে শারমিন জাহান মুক্তা নায়িকা হতে গিয়ে প্রেমে পড়ে যান পঞ্চাশ বছর বয়সী করিমের। ২০১৫ সালে  গোপনে বিয়ে করেন তারা। তা ছিলো করিমের তৃতীয় বিয়ে। বিষয়টি জানার পর প্রথম স্ত্রী শামসুন্নাহারের সঙ্গে নতুন করে কলহ শুরু হয়। এরপর স্ত্রীর নামে থাকা  দোকানসহ  বেশকিছু সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দিতে চাপ দিলে প্রথম স্ত্রী শামসুন্নাহারের সঙ্গে তার প্রায়ই কলহ হতো। সম্পত্তিসহ নতুন নতুন নায়িকাদের সাথে পরিচয় এবং বিয়ে নিয়ে পারিবারিক কলহ শেষ পর্যন্ত খুনের ঘটনায় গড়ায়। শামসুন্নাহারের ভাই মুফতি আশরাফ আলী জানান, ‘ছবি প্রযোজনা, পরিচালনা ও অভিনয় করতেন আবদুল করিম। নায়িকাদের নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন দেশে-বিদেশে। এতে বাধা দিতেন শামসুন্নাহার। এ নিয়েই কলহ হতো। করিম ও মুক্তা দু’জনে মিলেই পরিকল্পিতভাবে আমার বোনকে হত্যা করেছে। বোনকে বাঁচাতে গিয়ে জীবন দিতে হয়েছে ভাগ্নে শাওনকে’।
এ ধরনের ঘটনা যে একটিই মাত্র ঘটছে তা নয়, প্রায়ই পত্রিকার পাতায় এ সব সংবাদ হাইলাইট হচ্ছে। ২০১৬ সালের মে মাসে পরকীয়ার কারণে  কেশবপুরের মির্জানগর গ্রামে  এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরকীয়া  প্রেমিকার স্বামী বিল্লাল  হোসেন বাড়িতে ডেকে নিয়ে স্ত্রীর প্রেমিককে হত্যা করে। একই মাসে আর একটি ঘটনা ঘটে মাদারীপুরে। পরকীয়ার কারণে স্বামীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে স্ত্রী ও তার সহযোগীরা। নিহত কাজী মিরাজ (৩০) মাদারীপুর শহরের সৈদারবালী এলাকার কাজী  মোজাফফরের  ছেলে।
এভাবে একের পর এক নারকীয় এবং পৈশাচিক ঘটনা ঘটেই চলছে। এ সব ঘটনার পেছনে ভঙ্গুর পারিবারিক ব্যবস্থা এবং পরকীয়াই যে প্রধান কারণ তা প্রতিটি ঘটনায়ই হন্তারকরা স্বীকার করেছে। মানবীয় মূল্যবোধ এবং নৈতিক মূল্যবোধ যখন শেষ হয়ে যায় তখন মানুষ আর মানুষ থাকে না, সে পশুর চেয়েও নীচে নেমে যায়। মানুষের মানবীয় সত্ত্বা যখন বিলুপ্ত হয় তখন পশুত্ব বিজয়ী হয়। আজ দিকে দিকে পশুত্বের জয়ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। মা কর্তৃক তার নিজ সন্তানকে হত্যা করা, স্ত্রী কর্তৃক নিজ স্বামীকে হত্যা করা, পিতা কর্তৃক নিজ সন্তানকে হত্যা করা এতো আদিম বর্বরতা এবং জাহিলিয়াতকেও হার মানাচ্ছে। জাহেলিয়াত যুগে কোনো কোনো পুরুষ নিজ কন্যা সন্তানকে হত্যা করতো- সামাজিকতা, মুখ লজ্জা, কুসংষ্কার এবং ধর্মহীনতা ও অজ্ঞতার কারণে। আমরা সে সমাজকে বলি অন্ধকার যুগের সমাজ। আজ আধুনিক সভ্যতার যুগে এ সব কি ঘটছে? মূলত আমরা আধুনিক হয়েছি তবে সভ্যতা আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে।  মৌলিক মানবীয় মূল্যবোধ আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে। আধুনিক জাহেলিয়াত আমাদের বিবেকবোধ, চেতনাবোধ, প্রেম, ভালোবাসা সব কেড়ে নিচ্ছে। আধুনিক জাহেলিয়াত আমাদের যে ভালোবাসা এবং প্রেম শেখাতে চায় তাতো নষ্টামী এবং ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আধুনিকতা নামক লাগামহীন পাগলা ঘোড়ার সওয়ারী বানিয়ে সবাইকে অগ্নিকুন্ডের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে চরম ক্ষয়িষ্ণু এ সভ্যতা। পরকীয়া নামক ক্যান্সার আমাদের সমাজের অভ্যন্তরে বেশ ভালোভাবেই বাসা বেঁধেছে। পরকীয়া মানে একটি গোপন বিষয়, একটি অন্যায়, একটি অনাচার, একটি অপরাধ। এ অপরাধ কেউই প্রকাশ্যে করে না। অত্যন্ত গোপনে সমাজের  ভেতরে তার ভীত তৈরী করছে। এ ক্যান্সার আমাদের সমাজ সভ্যতার ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দিচ্ছে। পরকীয়ায় শুধুমাত্র একটি পরিবার ধ্বংস হচ্ছে না। আমরা সাধারণত ভাবি দুজন নারী পুরুষের মাঝে কোনো গোপন অভিসার শুধুমাত্র তাদের অভ্যন্তরীণ পারিবারিক বিষয়, কিন্তু বিষয়টি মোটেও তা নয়। দুজন বিবাহিত নারী পুরুষের মাঝে নিজ পরিবার এবং রক্তের বন্ধনকে ছিন্ন করে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে সম্পর্ক স্থাপন মানে এর সাথে আরো কমপক্ষে দশ-বারোটি পরিবার জড়িত। আপনি যদি একটি সহজ হিসেব করেন, তাতে দেখবেন যে সম্পর্ক স্থাপনকারী দুটি পরিবার, তাদের পিতা-মাতা শ্বশুর - শাশুড়ির পরিবার, এদের সন্তান। অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনকারীদের যদি দুজন করে ভাইবোন থাকে তাদের সাথে সম্পর্কিত আরো চারটি করে পরিবার। এ হচ্ছে একটি পরিবারের ক্ষুদ্র হিসেব। পাশ্চাত্য সভ্যতার ধারক বাহকরা আমাদের বোঝাতে চায়- সেচ্ছায় কোনো নারী পুরুষ একাকী কোথাও মিলিত হলে তাতে সমাজের কি ক্ষতি হয় ? পাশ্চাত্য দুনিয়া শুধুমাত্র জোরপূর্বক ধর্ষণকেই অন্যায় হিসেবে গণ্য করে। এ ছাড়া স্বেচ্ছায় কেউ বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক স্থাপন করলে তাকে তারা অন্যায় এবং অপরাধ বলতে রাজী নয়। পাশ্চাত্যের সমাজ বিধ্বংসী এই চিন্তা আমাদের সমাজেও এখন ভীত গাড়তে শুরু করেছে। ২০০৯ সালে দৈনিক মানব জমিন পত্রিকায় একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এতে ঐ অনুসন্ধানী সাংবাদিক আমাদের সমাজের যে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন- তা সত্যিই আঁৎকে ওঠার মতো। সে রিপোর্টে বলা হয়, ঢাকা শহরে প্রবাসী পুরুষ এবং অতি ব্যস্ত ব্যবসায়ী এবং চাকরিজীবীদের ৪০% স্ত্রী পরকীয়ায় জড়িত। এ সংক্রামক ব্যধি উচ্চ শিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত সব শ্রেণির মানুষের মধ্যেই ছড়িয়ে পরেছে। একইভাবে উচ্চবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্ম মধ্যবিত্ত এবং নিম্মবিত্ত শ্রেণির মাঝে বিস্তার লাভ করেছে। নিম্মবিত্ত এবং কম শিক্ষিত পরিবারের মাঝে এর ভয়াবহ রূপ আমাদের মাঝে প্রকাশিত হয়। তাদের পরিবারে, হত্যা, বিচ্ছেদসহ নানান ধরনের ঘটনা গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। অথচ এ ভয়ঙ্কর বিষয়টি উচ্চবিত্ত শ্রেণির মাঝেই বেশী বলে বেশ কয়েকটি গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে। তবে উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত এবং উচ্চশিক্ষিত পরিবারে পরকীয়া নামক সংক্রামক ব্যধি বিস্তার লাভ করলেও তারা সামাজিক অবস্থা, অবস্থান, পরিবারের ঐহিত্য, সন্তানের ভবিষ্যৎ ইত্যাদির দিকে তাকিয়ে অনেক সময় এগুলোকে কোনো কেনো ক্ষেত্রে মেনে নেয়, কোনো ক্ষেত্রে আপোষ-রফার চেষ্টা করে আবার অত্যন্ত সংগোপনে বিয়ে বিচ্ছেদের মাধ্যমে এ ঘটনার সমাপ্তি ঘটায়। এ ধরনের  একটি ঘটনা ঘটার সাথে সাথে একই সময়ে কমপক্ষে দশ-বারোটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের সন্তান এবং আত্মীয়রা একটি অপরাধবোধ নিয়ে, এক ধরনের মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে সমাজের মধ্যে কালাতিপাত করে। এ ক্যান্সার আস্তে আস্তে সমাজে অভ্যন্তরের সুকৃতির ভিত্তিগুলোকে ঘুণে পোকার মতো খেয়ে ফেলছে। আমরা যদি পরকীয়ার কারণে সংসার ভেঙ্গে যাওয়া অথবা খুনের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভাবি তবে বড়ো ধরনের ভুল করবো। পরকীয়ার কারণে চিরায়ত পারিবারিক প্রথা ভেঙ্গে পড়ছে। পরিবার হচ্ছে একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রথম ইউনিট। এ ইউনিট যখন ভেঙ্গে পড়ে তখন সমাজ এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য অর্গানগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে। এর মূল সমস্যায় আঘাত হানতে না পারলে এবং কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে একদিন হয়তো পাশ্চাত্য দুনিয়ার মতো আমাদের প্রজন্ম পরিবার হারিয়ে পিতার পরিবর্তে মায়ের পরিচয়ে পরিচিত হবে। অনেক ক্ষেত্রে পিতা-মাতা কারোরই পরিচয় থাকবে না। তাই সমস্যার মূলে কুঠারাঘাত করতে হবে। তা না করে ওপর হতে প্রলেপ দিলে সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না। আমাদেরকে এ জন্য যে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে তা হচ্ছে : কেন পরকীয়ার সৃষ্টি হচ্ছে ? এর উৎস কী কী ? বন্ধ করার উপায় কী ? এর সুদূুর প্রসারী ক্ষতি কী কী?
সভ্যতাগর্বী পাশ্চাত্য দুনিয়া আমাদের কাঁধে তাদের আধুনিকতা নামক নগ্ন ও অশ্লীল সংস্কৃতির জোয়াল চড়িয়ে দিয়ে আমাদেরকে তাদের সংস্কৃতির গোলাম বানাতে চায়। আবহমানকাল ধরে আমরা  যে সংস্কৃতিকে লালন করছি তা থেকে আমাদরকে দূরে সরিয়ে নিয়ে নতুন এক সংস্কৃতির সাথে পরিচিত করাচ্ছে, যে সংস্কৃতির সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই, সে সংস্কৃতিকে আমাদের সমাজের এক শ্রেণির মানুষ নিজেদের জীবন ও পরিবারের সাথে একাকার করে ফেলেছে। পাশ্চাত্যের ভোগবাদী দর্শন এবং তাদের নোংড়া, অশ্লীল জীবনধারা আমাদেরকে ভোগবাদী হওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। ভোগবাদী দর্শন মানুষকে তার মানবীয় পরিচয় বাদ দিয়ে পাশবিক দিকটি মুখ্য হিসেবে তুলে ধরতে তাদের সকল প্রকার কলা-কৌশলকে ব্যবহার করছে। প্রযুক্তির নিত্যনতুন উন্নয়ন এবং একে সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রচার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য দুনিয়া অগ্রগামী। তারা তাদের দেউলিয়া সংষ্কৃতি, বন্ধনহীন পারিবারিক ব্যবস্থা এবং শ্লীলতাহীন জীবনাচারকে আমাদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর শিকার হচ্ছে সব শ্রেণি  ও পেশার মানুষ। পাশ্চাত্যের অনুসরণ ও অনুকরকে অনেকে আধুনিকতা ভাবছে, কেউ কেউ তো এ নিয়ে গর্বও করে। লাম্পট্যে ভরা তাদের গোটা জীবনাচার, তাদের সাহিত্য, উপন্যাস, নাটক, গল্প, সিনেমা সবই যৌনাচারে ভরপুর। তারা জীবনেক শুধুমাত্র  যৌন সম্পর্কের দিক দিয়ে বিচার করে। তাদের সাধারণ জীবনাচারে নৈতিকতার মানদন্ড বলতে কি বোঝায়, তা তারা নিরূপণ করতে বার বার ব্যর্থ হয়েছে। একবার নারীকে তারা শুধুমাত্র ভোগের সামগ্রী মনে করে, আর একবার সকল পাপের আধার হিসেবে ঘোষণা করে, কখনো  নারীকে সৌন্দর্যের রানী মনে করে আবার কখনো সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করে। কিন্তু তারা আসল জায়গায় শুরু থেকেই ভুল করে আসতে আসতে এখন এমন এক প্রান্তসীমায় এসে দাঁড়িয়েছে যে যেখানে কোনো নীতি নৈতিকতারর বালাই নেই। এখানে এখন পুরুষ নারীকে ভোগের সামগ্রী মনে করে অপর দিকে নারী পুরুষকে তাদের আনন্দের অংশীদার মনে করে। এতে করে তাদের নৈতিক চরিত্র ও সামাজিকতার বন্ধন এতো শিথীল হয়ে পড়েছে যে, নগ্নতা, অশ্লীলতা, উলঙ্গপনা, বেহায়াপনা, নির্লজ্জতা এবং অবাধ যৌনাচার তাদের জীবন ও সমাজের অন্যতম অনুসঙ্গে পরিণত হয়েছে। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন রক্ষা করার মতো তাদের কাছে এখন কোনো হাতিয়ার নেই। নীতি, নৈতিকতা আদর্শকে লালন করতে পারতো কেবলমাত্র ধর্ম; কিন্তু তারা ধর্মকে নিজেদের ইচ্ছেমতো ব্যবহরা করার কারণে বিশেষ করে পশ্চিমা দুনিয়ায় যে দু’টি ধর্ম প্রধান ধর্ম হিসেবে পরিচিত খৃষ্ট ধর্ম ও ইয়াহুদী ধর্ম তারা সকল দিক থেকে মানুষের উপর কর্তৃত্ব করার নৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। এর বাইরে পশ্চিমা দুনিয়ায় জরদস্ত, বৌদ্ধ, বাহাইসহ যে সকল ধর্মের ক্ষীণ ধারা চালু আছে তারাও নিজেদের আদর্শিক ও নৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। যার ফলে গোটা পশ্চিমা দুনিয়ায় ঘৃণ্য পতিতাবৃত্তি একটি লাভজনক পেশার নাম। বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক নামক লাম্পট্যের নাম দেয়া হয়েছে ভালোবাসা, বিয়ের পূর্বেই তরুণ-তরুণীর একত্রে বসবাসের মতো চরম পশুবৃত্তির নাম দেয়া হয়েছে লিভ টুগেদার। স্বামী সন্তান থাকার পরেও পর পুরুষ এবং অন্য নারীর সাথে পশুর মতো মেলামেশার নাম এনজয়িং লাইফ- এই পরকীয়ার পক্ষের সাফাই গাওয়া ইবলীশী কর্মের সমর্থকরা ইদানীং একটি শ্লোগান আবিষ্কার করেছে পরকীয়া নয় স্বকীয়া। অশ্লীলতা এবং নোংরামীর এই ভয়াবহ সয়লাব পশ্চিমা দুনিয়া ছাপিয়ে এখন আমাদের ঘরে ঘরে। তাদের নগ্নতার সয়লাবে ভেসে যাচ্ছে আমাদের চিরায়ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। নর্তকীর নাচকে এক সময় যে সমাজে ঘৃণ্য কাজ মনে করা হতো এখন তার নাম আর্ট। নর্তকীরা এক সময় যে সমাজে ঘৃণার পাত্র ছিলো আজ তারাই শিল্পী হিসেবে সমাদর পাচ্ছে। অশ্লীলতা ও বেলেল্লাপনার প্রচারকরা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বরণীয় হচ্ছে। এরই সুযোগে আমাদের পার্শবর্তী দেশের কয়েকটি চ্যানেলের ধারাবাহিক নাটক সিনেমা আমাদের সাংষ্কৃতিক পরিমন্ডলকে গ্রাস করে ফেলেছে। কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, এমনকি বিবাহিত পুরুষ নারীদের মধ্যে এ অপসংস্কৃতির ক্যান্সার ছড়িয়ে  পরেছে ভয়ালভাবে। এ অপংস্কৃতি রোধে ইয়াহুদী ধর্ম এক সময় এগিয়ে এসেছিলো কিন্তু অতি অল্প সময়ের মধ্যে তারা চরম বর্থতায় পর্যবসিত হয়ে এখন অশ্লীলতার সবচেয়ে বড়ো প্রচারক বনে গেছে। এক সময় খৃষ্ট ধর্ম এগিয়ে এসেছিলো সকল অন্যায়, পাপাচার এবং অশ্লীলতার মূলোৎপাটন করতে কিন্তু গোটা খৃষ্ট সমাজ যেভাবে ভোগবাদীতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে তাতে ধর্ম তার নৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। ধর্ম ও রাষ্ট্রের এ সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তারা ধর্মকে গীর্জার মধ্যে আবদ্ধ করে এবং সর্বশেষ ভ্যাটিকানে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে সেখানে ধর্মীয় শাসন কায়েম করে গোটা দুনিয়ার খৃষ্টান সমাজকে ধর্মীয় বন্ধন মুক্ত করে দেয়।   বৌদ্ধ ধর্মের কাছে সমাজ সংস্কৃতি রক্ষার মতো কোনো আদর্শ কোনো কালেই ছিলো না। আমাদের পূর্ব দিকে বৌদ্ধ ধর্মের লোকসংখ্যা সবচেয়ে বেশী, বৌদ্ধ ধর্মে সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে কোনো বক্তব্যই নেই, তাদের ধর্মের মধ্যেই অনেক অনাচার এবং অশ্লীলতাকে তারা স্থান দিয়েছে, যার নাম দিয়েছে ধর্মীয় উপাসনা। আমাদের কাছাকাছি আরেকটি ধর্মের মানুষের বসবাস, যারা হিন্দু নামে পরিচিত হলেও মূলত তাদের ধর্মকে বলা হয় সনাতন ধর্ম। সনাতন ধর্মও এ অনৈতিকতা এবং অশ্লীলতা প্রতিরোধের মতো কার্যকর কোনো আদর্শ তারা তুলে ধরতে সক্ষম নয়। বাংলাদেশ নামক এ জনপদের শতকরা নব্বই ভাগ মানুষ নিজেদেরকে ইসলামের অনুসারী বলে দাবি করে। এ দাবির সাথে সত্যতরা মিল থাকলে আমাদের সমাজে এতো অনাচার, অপসংস্কৃতি, কুসংষ্কার, অন্যায়, অপরাধ, অশ্লীলতা, নোংরামী এবং বেলেল্লাপনা ভীত গাড়তে পারতো না। প্রতিটি মানুষের জীবনে ভালো এবং মন্দ দুটি মানদন্ড থাকে। এ দুটি মানদন্ড দিয়েই মহান রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। মানুষ দুনিয়াতে আগমন করে অত্যন্ত অসহায়ভাবে। সে তার চতুষ্পার্শের পরিবেশ, সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে জীবনের মানদন্ড নির্ধারণ করে। যে ভালোকে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে জীবনের লক্ষ নির্ধারণ করে তার জন্য কল্যাণ এবং সুকৃতির পথে চলা সহজ হয়ে যায়। বিপরীত পক্ষে যে ব্যক্তি জীবনের মানদন্ড নির্ধারণ করতে পারে না, অন্যায়, অপরাধ, অশ্লীলতার প্রবল বাত্যাপ্রবাহে সে অনৈতিকার মহাসগারে হারিয়ে যায়। আমাদের সমাজ সংস্কৃতিতে আজ ভোগবাদ এবং পুঁজিবাদ আমাদের চিন্তা- চেতনাকে অসৎ করে দিয়েছে। ভোগবাদ এবং পুঁজিবাদের গর্ভেই জন্ম নিয়েছে নগ্নতা, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নির্লজ্জতা, বন্ধনহীন যৌনতা। এ প্রবল বাত্যাপ্রবাহ এবং সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির সর্বপ্লাবী আগ্রাসানে ইসলামের অনুসারী দাবিদাররা তাদের মর্যাদা, স্বকীয়তা, কৃষ্টি, কালচার, পরম পবিত্র পারিবারিক বন্ধন শতভাগ ধরে রাখতে পারেনি। ক্ষয়িষ্ণু এ সমাজে এখনো যে সভ্যতা, ভদ্রতা, লজ্জাশীলতা, পবিত্রতা এবং সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন টিকে আছে এর একমাত্র কারণ এ জনপদে ইসলামের অনুসারী মানুষের সংখ্যা বেশী। ইসলাম মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে একমাত্র মনোনীত জীবন বিধান। যে জীবন বিধানের অনুসরণের মাধ্যমেই এ সকল অন্যায়, অনাচার, পাপাচার, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা দূর করা সম্ভব। মানুষের চিন্তা, চেতনা, ধ্যানধারণা ও কর্মে ইসলাম এমন এক সুকৃতির বৃক্ষ রোপণ করে যাতে সততা, সত্যবাদিতা, শৃংখলা, পূতপবিত্রতা এবং নৈতিকতা ডালপালা মেলে চারিদিকের পরিবেশকে সুশোভিত করে তোলে। কিন্তু আজ  পশ্চিমা সভ্যতার ঘুমপাড়ানি গাণ আমাদের সমাজের এক শ্রেণির মানুষকে অচেতনভাবে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। এক শ্রেণির মানুষ এটা দেখেও না দেখার ভান করে দায়িত্ব এড়িয়ে চলতে চাচ্ছে। কিন্তু তাদের আগুণের লেলিহান শিখা আমাদের অনেকের ঘর পুড়ে ছাই করে দিয়েছে। এ শিখা প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করার জন্য অগ্রসর হচ্ছে। এ থেকে বাঁচার জন্য শিক্ষা, সংস্কৃতির সকল স্তরে ভোগবাদিতা এবং অশ্লীলতার যে বীজ রোপিত হয়েছে তার মূলোৎপাটনে চিন্তাশীল  বিবেকবান মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে। ইসলামী সংস্কৃতির বুনিয়াদ সমাজ, সংস্কৃতি ও ব্যক্তির জীবনে গ্রোথিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ইসলামী সংস্কৃতির মূল বুনিয়াদ হচ্ছে তাওহীদ। আল্লাহর একত্ববাদে বিশ^াসী মানুষের মনে তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে চেতনা জাগিয়ে তুলতে হবে। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে একটি মহৎ উদ্দেশ্যে। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তাকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তার প্রথম কাজই হলো এক ও একক স্রষ্টায় বিশ্বাস স্থাপন করে গোটা জীবন তার আদেশের অনুবর্তী করে দেয়া। যে মানুষ এক ও একক আল্লাহর অধীনে নিজের জীবন সপে দিয়ে তারই আলোকে জীবন, সংসার, সমাজ, সংস্কৃতি গঠনে ব্রতী হবে তার দ্বারা পৃথিবীর কোনো অন্যায় এবং পাপ কাজ ঘটার কোনোই সম্ভাবনা নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ