ঢাকা, সোমবার 27 November 2017, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সংখ্যালঘু নির্যাতনের রহস্য উদঘাটন জরুরি

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : বিশ্বব্যাপী ইসলামের উপর আঘাত সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে শুরু হয়ে অদ্যাবধি বিদ্যমান। আর চলবে বোধ হয় কিয়ামত পর্যন্ত। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ইসলামের উপর আঘাত আনার পেছনে দুটি বিষয় কাজ করছে। প্রথমত ইসলামের চিহ্নিত শত্রুদের পক্ষ থেকে, দ্বিতীয়ত একশ্রেণীর নামধারী মুসলমানদের পক্ষ থেকে। এই দুই শত্রুর মোকাবেলা করে ইসলামের কান্ডারিরা আল্লাহতায়ালার মনোনীত দ্বীনের দাওয়াত সৃষ্টির সেরা আশরাফুল মাখলুকাতের নিকট পেশ করছেন শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। কালেমার দাওয়াত পেশ করার কারণে ইসলামের অনুসারীদের উপর জুলুম অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়নের স্টিম রোলার আবহমান কাল থেকে চলছে। অপরদিকে ইসলামের নামধারী কিছু মুনাফিকেরা ষড়যন্ত্রের ফাঁদে ধর্মীয় মূল্যবোধকে জাতির সামনে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। মূলত এদের দ্বারাই ইসলাম ও মুসলিম মিল্লাত ক্ষতির শিকার হয়েছে। ইসলামের উপর এই দ্বিমুখী হামলা আজও বিশ্বব্যাপী চলছে, তা থেকে বাদ যায়নি বাংলাদেশ। যাক সারা বিশ্বের নির্যাতিত নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ইতিহাস এই নিবন্ধে লিখা আমার বিবেচ্য বিষয় নয়! এবার নিবন্ধের শিরোনামের দিকে আসা যাক। বাংলা একাডেমির অভিধানে সংখ্যালঘু শব্দের অর্থ করা হয়েছে- যা সংখ্যায় কম (সংখ্যালুঘু সম্প্রদায়) বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা যেমন সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচিত। তেমনি ভারতের মুসলমানেরাও সেদেশে সংখ্যালঘু। সংখ্যালঘু নির্যাতন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এটি শুধু বাংলাদেশে হচ্ছে তা কিন্তু নয়! এই সমস্যা নিরসনের জন্য সত্য ঘটনা উদঘাটন করা জরুরী। একটি রাষ্ট্রের রাজনীতিবীদ, ক্ষমতাসীনদল, প্রজাতন্ত্রের কর্মকতারা যখন তদন্ত হওয়ার আগেই উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার কৌশল নীতি গ্রহণ করেন তখন সেখানে সত্যের মৃত্যু অবধারিত হয়ে যায়। আর এই সুযোগে প্রকৃত অপরাধীরা চলে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে । অন্ধ হলে প্রলয় যেমন বন্ধ থাকে না, তেমনি আগুন ধরলে, নগর পুড়লে দেবালয়ও রক্ষা করা যায় না। এই বিষয়টি সরকার, রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনযন্ত্রের সবারই অনুধাবন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের মানুষ শান্তিপ্রিয় মুসলমান । এই শান্তিপ্রিয় মুসলমানদেরকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার বানানোর জন্য তৃতীয় কোন পক্ষ অন্য কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে কিনা তা খতিয়ে দেখা উচিত।
হযরত মুহাম্মদ (সা.) শুধু মুসলমানদের নবী নন। তিনি রাহমাতুল্লিল আলামিন। সমগ্র সৃষ্টিজাহানের রহমত। তাই তিনি গোটা মানবজাতির কাছে অত্যন্ত সম্মানের পাত্র। রাসূল (সা.) নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপ যে-ই করুক না কেন তা সহ্য করা কঠিন। কারণ মুসলমানের কাছে হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও পবিত্র কাবা শরীফ প্রাণের চেয়েও প্রিয়। এটি সব ভাষাভাষী মানুষেরই অনুধাবন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের মানুষ পৃথিবীর যে কোন দেশের তুলনায় অধিক ধর্মপ্রাণ এটা কারো অজানা অধ্যায় নয়। মুসলমানরা অন্য কোন ধর্মীয় সমাজের মানুষের ওপর, কোন বর্ণের মানুষের ওপর, কোনো ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর ওপর কিংবা কোনো অঞ্চলের মানুষের ওপর পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করলেও বিশ্বব্যাপী সমস্ত সন্ত্রাসী ঘটনার দায় শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের উপর লেপন করা হচ্ছে। ভারতের মতো দেশে প্রশাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠার পেছনে মুসলমানদের অবদান রয়েছে। সাতশত বছরের ও কিছু বেশি সময় তারা দায়িত্ব পালন করেছে। মুসলমান জাতি ছাড়া ভারতে আর কোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এই উন্নতির উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেনি। যদি শক্তিশালী ইংরেজদেরকে তুলনার জন্য টেনে আনা হয় তাহলেও দেখা যাবে ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত তারা শাসন চালাতে পেরেছে, অর্থাৎ ২০০ বছরেরও কম সময়। ইসলাম ও মুসলমান সম্বন্ধে কুৎসা রটনার শেষ নেই। অথচ লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, সুদীর্ঘকাল মুসলমানেরা ভারত শাসন করলেও ভারতে হিন্দু ধর্ম ও হিন্দু জাতি ধ্বংস হয়নি। সুতরাং ইতিহাসের এ ঘটনাকে সামনে রেখে আমরা বলতে পারি মুসলমানদের হাতে সকল ধর্মের মানুষ নিরাপদ।
গত ৫ নভেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার হরবালি ঠাকুরপাড়ায় গ্রামের টিটু রায় নামক এক যুবক তার ফেসবুকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) নিয়ে কটূক্তিকর পোস্ট দেয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মুসলমানদের হৃদয়ে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। তারপর ১০ নভেম্বরে রংপুরে গঙ্গাচড়ায় ফেসবুকে কটূক্তিকারী টিটু রায়ের শাস্তির প্রতিবাদে মুসল্লিদের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে হাবিব মিয়া নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। নিহত হাবিবুর রহমান হাবিবের ছয় ও আড়াই বছরের দুটি মেয়ে আছে। এ ঘটনায় তার অবুঝ দুই শিশু,স্ত্রী,দুই ভাই,মা ও বাবা শোকে স্তব্ধ। আশপাশের মানুষ এ ঘটনায় শোকাহত। পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ লোকজন বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন কে বা করা অগ্নিসংযোগ করেছে তা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের মুখোশ জাতির সামনে উন্মোচিত করা দরকার। রংপুরের এই সহিংস ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। তবে যাহারা প্রকৃতপক্ষে দায়ী তাহাদের অবশ্যই খুঁজে  বের করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত কাম্য। কিন্তু কোনো নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে অযথা হয়রানি কিংবা গ্রেফতার করা উচিত নয়। তবে পত্রিকা মারফত জানতে পেরেছি ২ হাজার জনকে আসামী করে পুলিশ মামলা করেছে। নিকট অতীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ২০১২ সালে কক্সবাজার জেলার রামুতে একই অভিযোগে হামলা করা হয়েছিল। অথচ ওই দুটি হামলার ঘটনার সাথে সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পত্রিকার পাতায় ওই সময় মুদ্রিত হয়েছে যে, নাসিরনগরের জেলেপল্লীতে হামলার ঘটনা ঘটে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের কোন্দলের জের ধরে। পরে বিএনপির এক নেতাকে ফাঁসাতে গিয়ে মামালাটি গতি হারিয়েছে। যদিও মূল অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান আতিকুর রহমান জেলে আছেন। আমরা চাই হামলাকারীরা ধরা পড়ুক, শাস্তি পাক। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে ধরলে,কাউকে ছাড় দিলে পুরো মামলাটিই অজানা গন্তব্যে হারিয়ে যাবে।
বাংলাদেশে যে কয়টি রাজনৈতিক দল আছে সব দলেরই মৌলিক কিছু এজেন্ডা বা ইস্যু আছে। নিজ দলের আদর্শের দিকে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বিভিন্ন সময়ে ইস্যুগুলোকে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এই নোংরা সংস্কৃতির রাজনীতি যতদিন দেশে চলমান থাকবে ততদিন সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না। আর একটি বিষয় রাজনৈতিক দলগুলোর মনে রাখা প্রয়োজন যে সাম্প্রদায়িকতা ও গণতন্ত্রহীনতা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো। সাম্প্রদায়িকতাকে বহাল রেখে কোন দেশ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, এটা যেমন অপ্রিয় হলেও সত্য, তেমনি গণতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সাম্প্রদায়িকতা বন্ধ করা যাবে না এটাও সত্য। একটি সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতন্ত্র থাকলে ধর্মীয় মূল্যবোধ থাকলে আইনের শাসন তথা সকল নাগরিকের সমান অধিকার থাকলে দেশে বারবার নাসিরনগর,রামু,রংপুর কিংবা গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের বিভীষিকার সুর শোনা যেত না।
বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা নতুন নয়। বলা চলে অনেক পুরানো। অনেক মানুষ আক্রান্ত না হলে নির্যাতনের ঘটনা সাধারণত কাউকে আলোড়িত করে না। ইতিহাসের পেছনের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে সাম্প্রদায়িক হামলার পেছনে রাজনৈতিক ফায়দা লুফে নেওয়ার একটা বিষয় রয়েছে। ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতার স্বার্থে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাগুলোকে নির্মোহ দৃষ্টিতে তদন্ত কিংবা বিচারের ব্যবস্থা না করে উল্টো ডিপ ফ্রিজে বিষয়টি জিইয়ে রেখে দেয়। চারদলীয় জোট সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য আওয়ামী লীগ তখন সংখ্যালঘু মিশন হাতে নিয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের দলীয় অফিসে লঙ্গরখানা খুলে সারা দেশের সংখ্যালঘুদের এখানে এসে আশ্রয় নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিল দলটি। তাদের এই লঙ্গরখানায় যারা আশ্রয় নিয়েছিল তারা কেউ নির্যাতিত ছিল না। বস্তির বাসিন্দা,ফুটপাত ও পার্কে অবস্থানকারীরা খাওয়ার জন্য তাদের এই কথিত লঙ্গরখানায় আশ্রয় নিয়েছিল। তবে এই লঙ্গরখানায় অবস্থানকারীর অর্ধেকই ছিল মুসলমান ভিক্ষুক। সংখ্যালঘু নির্যাতনের কল্পিত কাহিনীর মূল  হোতা ছিল ঘাদানিক নেতা শাহরিয়া কবির। ২০০১ সালের ২৪ নভেম্বরে সন্ধ্যায় বিমানবন্দরে আপত্তিকর ক্যাসেটসহ শাহরিয়ার কবিরকে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে জব্ধ করা ক্যাসেটের দৃশ্য দেখে সেদিন গোয়েন্দারাও হতবাক হয়ে গিয়েছিল।
সাম্প্রদায়িক হামলার পেছনে বেশিরভাগই ক্ষমতাধরদের প্রত্যক্ষ যুক্ত থাকার বিষয়টি গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। অথচ হিন্দুদের বাড়ি-ঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার সাথে জামায়াত এবং শিবিরকে জড়িয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার অপকৌশল ইতিপূর্বেও লক্ষ করা গেছে। পক্ষপাতহীন ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদেরকে দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করা হয় না। কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে মিথ্যা মামলা দিয়ে কাউকে হয়রানি করাটা যে অন্যায় এই বোধটুকু সংশ্লিষ্ট মহলের বিবেককে জাগ্রত করুক। আমরা আশা করব সরকার দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার প্রয়াসে সংখ্যালঘু নির্যাতনের রহস্যের জট জাতির সামনে উন্মোচন করে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ