ঢাকা, সোমবার 27 November 2017, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

৫৭ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন হত্যাকান্ডের মামলার ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড কার্যকরে অনুমতির আবেদন) ও আপিলের রায় পড়া শুরু হয়েছে। আজ সোমবার চূড়ান্ত রায়ে সাজার ঘোষণা হবে। হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়ের পর দন্ডিতদের আপিলের সুযোগ থাকবে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ৫৭ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন, নৃশংস এবং বর্বরোচিত ঘটনা। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও শান্তি বিনষ্টের যড়যন্ত্র করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিলে সেনাবাহিনির চেইন অব কমান্ড ধ্বংস করা। বিডিআর ও সেনাবাহিনিকে সাংঘর্ষিক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া। এত অল্প সময়ে ৫৭ জন সেনা হত্যার ঘটনা পৃথিবীর আর কোথাও ঘটেনি। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মারা গিয়েছিলেন ৫৫ জন সেনাকর্মকর্তা। ১৯৬৭ সালে ইন্দোনেশিয়ায় ৭ দিনের বিদ্রোহে মারা গিয়েছিলেন ১০০ জন, আফ্রিকায় মারা যান ১৭ জন।
আদালত বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন ইপিআর পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সীমান্তরক্ষায় নিয়োজিত এই বাহিনী দেশে-বিদেশে সম্মানের সঙ্গে কাজ করেছে। কিন্তু ২০০৯ সালে পিলখানায় তৎকালীন বিডিআরের কিছু সদস্য আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছেন। এই কলঙ্কচিহ্ন তাদের অনেক দিন বয়ে বেড়াতে হবে।
আদালত বলেন, এটা ছিল মাস কিলিং (গণহত্যা)। আমরা হারিয়েছি আমাদের সূর্য সন্তানদের। এটি আমাদের দেশের ফৌজদারী অপরাধের একটি ঐতিহাসিক মামলা। এই হত্যাকান্ডের শুধু বিচার করলেই হবে না, প্রতীয়মান হতে হবে ন্যায়বিচার হয়েছে।
গতকাল রোববার সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের নেতৃত্বে তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ বেঞ্চে রায় পড়া শুরু করেন। শুরুতে বিচারপতি মো. শওকত হোসেন রায়ের পটভূমি ইংরেজিতে পাঠ করেন এবং পরে অপর জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বাংলায় রায় পড়েন। বিকেল চারটার দিকে প্রথম দিনের মতো রায় পড়া শেষ হয়। পরে বিচারপতি মো. শওকত হোসেন বলেন, পর্যবেক্ষণে মতের ভিন্নতা থাকলেও চূড়ান্ত রায়ের ক্ষেত্রে আমরা একমত হয়েছি। কাল (আজ সোমবার) পূর্ণাঙ্গ রায় পড়া শেষ হবে। এক্ষেত্রে রায় পুরো পড়া হবে না জানিয়ে ‘সামারিলি জাজমেন্ট’ (সংক্ষিপ্ত রায়) পড়া হবে। দশ হাজার পৃষ্ঠার রায়ে প্রায় এক হাজার পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণ রয়েছে।
সরকারের ডেপুটি এটর্নি জেনারেল জাহিদ সরওয়ার কাজল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ১২৪ কার্যদিবসে মামলায় পেপারবুক উপস্থাপন করা হয়। ৩৭০ কার্যদিবসে মামলার শুনানি হয়।
গত ১৩ এপ্রিল এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষে যেকোনো দিন রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন হাইকোর্ট। গত ৯ নবেম্বর রায় ঘোষণার জন্য ২৬ নবেম্বর দিন নির্ধারণ করা হয়।
এর আগে ২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি পিলখানা হত্যাকান্ড মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদন্ডাদেশ পাওয়া আসামীদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হেেয়ছিল।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিডিআরের সদর দফতরে পিলখানা ট্র্যাজেডিতে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত জন। ওই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়। পরে মামলা দুটি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তরিত হয়।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দীর্ঘ তদন্ত শেষে হত্যা মামলায় ২৩ বেসামরিক ব্যক্তিসহ প্রথমে ৮২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে সম্পূরক অভিযোগপত্রে আরো ২৬ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করায় আসামি দাঁড়ায় ৮৫০ জনে।
এ ছাড়া বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় ৮০৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। পরে আরো ২৬ জনকে অভিযুক্ত করে মোট ৮৩৪ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র ওদয়া হয়। বিচার চলার সময়ে বিডিআরের ডিএডি রহিমসহ চার আসামীর মৃত্যু হয়।
রায়ে বিডিআরের সাবেক ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়। এ ছাড়া বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য মরহুমদ নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ২৭৭ জনকে খালাস দেয়া হয়। কারাগারে থাকা অবস্থায় বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ১৪ জন পলাতক রয়েছেন, বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে কারাগারে আটক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন ৪ জন, এছাড়া সব মিলিয়ে পলাতক রয়েছেন ২৩ আসামী। বিশ্বের ইতিহাসে একটি মামলায় সবচেয়ে বেশি আসামীর ফাঁসির আদেশের রেকর্ড হয়েছে এ রায়ে। অপরদিকে কোন মামলায় একসাথে ৫৭৫ জনকে শাস্তি প্রদান করাও ইতিহাসে প্রথম। একইসঙ্গে একটি ঘটনায় সর্বমোট ৫৯টি মামলার ঘটনাও ইতিহাসে বিরল।
রায়ের পর ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। অন্যদিকে দন্ডাদেশ পাওয়া আসামীরা তাদের সাজা বাতিল চেয়ে জেল আপিল ও আপিল করেন। আর ৬৯ জনকে খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করে সরকার।আপিল শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ ব্যবস্থায় সর্বমোট ৩৭ হাজার পৃষ্ঠার পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়। এ জন্য মোট ১২ লাখ ৯৫ হাজার পৃষ্ঠার ৩৫ কপি ও অতিরিক্ত দুই কপি পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ উদ্যোগ নেন। বিশেষ ব্যবস্থায় এই মামলার পেপারবুক তৈরি করা হয়।
বিচার হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসংলগ্ন আলিয়া মাদরাসা মাঠসংলগ্ন অস্থায়ী এজলাসে। বিচার শেষে ঢাকা মহানগর তৃতীয় বিশেষ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান ২০১৩ সালের ৫ নবেম্বর রায় ঘোষণা করেন।
রক্তাক্ত ওই বিদ্রোহের পর বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী এ বাহিনীর নাম পুনর্গঠন করা হয়। নামবদলের পর এ বাহিনী এখন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) হিসেবে পরিচিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ