ঢাকা, বুধবার 29 November 2017, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পূর্ণতার দিকে পাইলটবিহীন বিমান ও চালকবিহীন গাড়ি

জাফর ইকবাল: প্রযুক্তির দুনিয়ায় পরিবর্তনটা সময়ের সঙ্গেই হয় কিন্তু কখনওবা সময়ের থেকে আগেও হয়। বর্তমান সময়ে এসে প্রযুক্তির জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে মানুষবিহীন যন্ত্রাংশ। এ নিয়ে গবেষণা হচ্ছে বিস্তর। কখনও সেই গবেষণা থেকে বেরিয়ে পড়ে ভবিষ্যতের কল্পকাহিনীর গল্পের বিভিন্ন বস্তু। এবারের সংখ্যায় থাকছে পাইলটবিহীন বিমান ও চালকবিহীন গাড়ি নিয়ে বিস্তারিত।
চালকবিহীন বিমান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে উপগ্রহ তা পাঠিয়ে দেয়া ভূমিতে অবস্থিত রিসিভারে। রিসিভার থেকে তা যায় গ্রাউন্ড কন্ট্রোল সিস্টেমে। এই গ্রাউন্ড কন্ট্রোলে থাকেন পাইলট। কম্পিউটারের সাহায্যে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্দেশ দেন যা মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যায় বিমানে এবং বিমান পাইলটের নির্দেশ পালন করে। পুরো ঘটনাতে সময় লাগে মাত্র ২ সেকেন্ড। আরকিউ-৭ শ্যাডো চালকবিহীন বিমান সিস্টেমে থাকে, চারটে চালকবিহীন বিমান, দুটো গ্রাউন্ড কন্ট্রোল সিস্টেম, একটি ভ্রাম্যমাণ গ্রাউন্ড কন্ট্রোল সিস্টেম, একটি লঞ্চার, একটি গ্রাউন্ড ডাটা টার্মিনাল, যা উপগ্রহ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে, একটি দূর নিয়ন্ত্রিত ভিডিও টার্মিনাল যেখানে বসে পাইলট সবকিছু দেখতে পান এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বিমানবাহিনীতে আধুনিকতম সংযোজন হলো পাইলটবিহীন যুদ্ধবিমান। এই বিমানে নেই কোন পাইলট বা ক্রু।
১৯৫৯ সালে আমেরিকান বিমানবাহিনী প্রথম এই মনুষ্যবিহীন বিমান তৈরির কাজে হাত দেয়। ১৯৬৪ সালের ভিয়েতনাম যুদ্ধে টনকিন উপসাগরে প্রথম ব্যবহার হয় এই পাইলটবিহীন যুদ্ধবিমান। এরপর ১৯৭৩ সালে আমেরিকান সেনাবাহিনী প্রথম স্বীকার করে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মানুষবিহীন বিমান ব্যবহারের কথা। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে সিরিয়ার মিসাইল ব্যাটারি যখন একের পর এক ইসরাইলী বিমানকে ধারে কাছে ভিড়তে দিচ্ছে না তখন এই ইসরাইলী Unmanned air vehicle সিরিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে ইসরাইলকে রক্ষা করেছিল। ১৯৮২ সালের লেবানন যুদ্ধে ইসরাইল ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে এই পাইলটবিহীন বিমান। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে আমেরিকান সেনাবাহিনী আরও অধিক মাত্রায় ব্যবহার করে এই পাইলটবিহীন বিমান। আফগানিস্তান যুদ্ধে ‘ড্রোন’ বিমান হামলা পর্বতসঙ্কুল দুর্গম গিরিপথে তালেবান যোদ্ধাদের ওপর নিখুঁত নিশানায় হামলা চালিয়ে নাস্তানাবুদ করেছে তালেবানদের। যতই দিন যাচ্ছে বিমানবাহিনীতে পাইলটবিহীন বিমান বেশি করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিভিন্ন নাম দেয়া হয়েছে এই বিমানের- Unmanned air vehicle, Unmanned aircraft system, Remotely piloted aircraft ইত্যাদি। যুদ্ধক্ষেত্রে আক্রমণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে যে চালকবিহীন বিমান তা হলো unmanned combat air vehicle ev combat drone. প্রচলিত বিমান যুদ্ধে পাইলটের জীবনহানি বা শত্রুর হাতে বন্দী হওয়ার যে আশঙ্কা থাকে তা এড়াতেই এই পাইলটবিহীন যুদ্ধবিমান। ড্রোন শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো গুঞ্জন। এর চলার শব্দের সঙ্গে মৌমাছির গুনগুনের মিল থাকার কারণেই এই নাম।
পাইলটবিহীন বিমান সেবা চালু করা হলে বিশ্বের এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলোর বছরে ৩৫ বিলিয়নেরও বেশি ডলার সাশ্রয় হবে বলে ইউবিএস নামক একটি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে যাত্রী ইস্যু। কারণ, চালকবিহীন বিমানে চড়ার আগ্রহ আছে এমন যাত্রীর সংখ্যা খুবই সামান্য।
ইউবিএসের একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চালকবিহীন বিমানে চড়ার আগ্রহ দেখিয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ যাত্রী। ইউবিএস জানিয়েছে, রিমোট কন্ট্রোল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত চালকবিহীন বিমানসমূহ তৈরিতে যে প্রযুক্তি দরকার তা হাতে আসতে ২০২৫ সাল পর্যন্ত লাগতে পারে। আর বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য বিমান ও হেলিকপ্টার তৈরি করতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। বিমান নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বোয়িং কর্পোরেশন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৭-২০৩৬ সালের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠান ৪১ হাজারেরও বেশি বিমান ক্রয় করবে যা পরিচালনার জন্য ৬ লাখ ৩৭ হাজারেরও বেশি পাইলট প্রয়োজন হবে। নতুন এসব পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেয়াসহ বেতন-ভাতা প্রদানে বিশাল পরিমাণে অর্থ খরচ হবে। তবে পাইলটবিহীন বিমান ব্যবহার করলে এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে ৩৫ বিলিয়নেরও বেশি ডলার সাশ্রয় করতে সক্ষম হবে।
পাইলট বিহীন বিমানের সুবিধা হচ্ছে, চালকের আসনে একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাইলটের দরকার পড়ে না। মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর পরিবেশে চালকবিহীন বিমান কাজ করতে পারে। ৩০ ঘণ্টা পর্যন্ত আকাশে থেকে, দিনরাত, এমনকি অন্ধকারের মধ্যেও তা কাজ করতে পারে। কুয়াশা বা মেঘের মধ্যেও সঠিকভাবে দ্রুততর সময়ে বারবার স্ক্যান করতে পারে। কোন এলাকার, মোবাইল ফোন, রেডিও বা টেলিভিশন সঙ্কেতকেও পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
চালকবিহীন বিমান বেশি ব্যবহৃত হয় সামরিক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা- নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রণ, আকাশ পথে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে, বিমান চলাচল এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে।
যুদ্ধক্ষেত্রে সার্বিক ব্যবস্থাপনায়, রাসায়নিক, জীবাণু অস্ত্র, বিকিরণ বা পারমাণবিক ঝুঁকির মধ্যে ব্যবহার, টেলিকমিউনিকেশন, গ্রাউন্ড কন্ট্রোল সিস্টেমের সঙ্গে যোগাযোগ হারালেও চালকবিহীন বিমান স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিশন শেষ করতে সক্ষম। এছাড়া পাহাড় পর্বত, মরুভূমি বা যে কোন পরিবেশে উদ্ধার ও অনুসন্ধান। উদ্ধার সামগ্রী সরবরাহে। উদ্ধার এলাকা চিহ্নিত করতে।
পাইলটবিহীন অনায়াশেই আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল, এন্টি ট্যাঙ্ক মিসাইল, আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল, নিয়ন্ত্রণযোগ্য গোলা বহনে সক্ষম। ক্রুজ মিসাইল এবং চালকবিহীন বিমান এই দুই অস্ত্রই নিক্ষেপের পর তা তাদের ইচ্ছেমতো গতিপথ পরিবর্তন করতে এবং সুবিধামতো আঘাত হানতে পারে পার্থক্য হলো মিসাইল নিজেই একটা অস্ত্র এবং আঘাত হানার পর তা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় কিন্তু চালকবিহীন বিমান আঘাত হেনে ফিরে আসে এবং তা বারংবার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেহেতু চালক থাকে না সেহেতু চালকের জন্য যে সমস্ত সুবিধা থাকা দরকার যেমন ককপিট, অক্সিজেন সিলিন্ডার, প্যারাসুট ইত্যাদিরও দরকার পড়ে না। ফলে চালকবিহীন বিমান বেশি পরিমাণ গোলাবারুদ, মিসাইল ইত্যাদি অস্ত্রশস্ত্র বহন করতে পারে। আকার এবং আকৃতিতে মনুষ্যবিহীন এই বিমান বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। সবচেয়ে ছোটগুলো মাত্র কয়েক পাউন্ড ওজনের খেলনা বিমানের সমান আবার বড়গুলো বোয়িং বিমানের সমান আকারের এবং ৪০,০০০ পাউন্ড ওজনের হয়ে থাকে। মানুষবিহীন এই বিমানকে আবার উচ্চতা, গতিবেগ এবং রেঞ্জ অনুযায়ী বিভিন্নভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। আমেরিকাতে প্রায় ৫০টা কোম্পানি এখন চালকবিহীন বিমান তৈরি করছে। প্রায় ১৫১টি মডেল রয়েছে চালকবিহীন বিমানের। অবিশ্বাস্য গতিতে বাড়ছে চালকবিহীন বিমানের উৎপাদন ব্যবহার এবং সুযোগ সুবিধা।
এদিকে গত কয়েক বছর ধরেই ক্যালিফোর্নিয়ার পাহাড়ী অঞ্চলে নিজেদের প্রধান কার্যালয়ের কাছে চালকবিহীন গাড়ির পরীক্ষা চালাচ্ছে গুগল। তাদের দাবি ২০২০ সালের মধ্যেই এই প্রযুক্তি মূল ধারায় চলে আসবে। প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা এ্যাপলও চালকবিহীন গাড়ি নির্মাণে যুক্ত হচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। চালকবিহীন গাড়ি নিয়ে এখন সারা বিশ্বে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছে। স্বয়ংচালিত গাড়ির সুবিধা হলো, সাধারণ পরিস্থিতিতে তার জুড়ি নেই। কিন্তু পরিস্থিতি হঠাৎ বিগড়োলে সামাল দিতে পারবে তো এই গাড়ি। গাড়ির মাথায় ঘুরছে তার চোখ। বিজ্ঞানীরা গাড়িটার নাম রেখেছেন ‘মেড ইন জার্মানি। এই গাড়িটিকে কিছু ‘মানবিক’ বৈশিষ্ট্য দেবার জন্য, সেই সংক্রান্ত গবেষণা ও গাড়ি তৈরিতে পনেরো লাখ ইউরোর বেশি খরচ হয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল গাড়ি তার অব্যবহিত পারিপার্শ্বিককে চিনবে কী করে। আইটি-বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডক্টর রাউল রখাসের কথায়, ‘স্বয়ংক্রিয় গাড়ি চালনার সবচেয়ে মুশকিল ব্যাপার রাস্তা চেনা বা নেভিগেশন নয়, সে তো আজকালকার সাধারণ গাড়িগুলোও পারে। মুশকিল হলো ট্রাফিক লাইট, ট্রাফিক সাইন আর পথচারীদের চেনা, বিশেষ করে রাস্তায় মানুষজন কোথায় দাঁড়িয়ে, গাড়িকে সেটা জানতে হবে, তার খেয়াল রাখতে হবে।’ ইউরোপের সবচেয়ে বড় ড্রাইভিং সিমিউলেটর এই জার্মানিতেই।
যুক্তরাজ্যের চারটি এলাকায় চালু হলো চালকবিহীন গাড়ি। দেশটির পরিবহন চলাচলের আইনে একটি প্রস্তাবের কারণেই জনগণ এই পরীক্ষামূলক চালকবিহীন গাড়ির যাত্রী হতে পারবেন। লন্ডনের গ্রিনিচে যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীরা উপস্থিত থেকে পরীক্ষামূলক চালকবিহীন গাড়ি চলাচলের উদ্বোধন করার কথা। একই সঙ্গে চালকবিহীন গাড়ি চালু হবে বাকিংহ্যামশায়ার, মিল্টন কেইনেস ও কভেন্ট্রিতে। এর আগে যুক্তরাজ্যে চালকবিহীন গাড়ি চলার এলাকাগুলোর বাস্তব অবস্থা ধারণের ব্যবস্থা নেয়া হয়। ২২টি ক্যামেরা ও সেন্সর ব্যবহার করে এলাকাগুলোর রাস্তা ও চারপাশের ছবি তোলা হয়। যুক্তরাজ্যের যোগাযোগমন্ত্রী ক্লেয়ার পেরি বলেন, যানবাহন ব্যবস্থার ভবিষ্যত হলো চালকবিহীন গাড়ি।
নতুন প্রযুক্তির উন্নয়নে তিনি যুক্তরাজ্যকে এগিয়ে রাখতে চান। এতে অর্থ বিনিয়োগেরও একটি নতুন খাতের সৃষ্টি হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, চালকবিহীন গাড়ি পূর্ণতা পেতে সময় নেবে, তবে আজকের পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ। আশা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যেই চালকবিহীন গাড়ি প্রযুক্তি পূর্ণতা লাভ করবে। দেড় দশকের মধ্যেই এই প্রযুক্তি নিরাপত্তাও বাড়বে। তখন ইন্টারনেট-ভিত্তিক এসব চালকবিহীন গাড়ি যাত্রীদের নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেয়ার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে কথা বলা ও বিনোদন প্রদানেও সক্ষম হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ