ঢাকা, শুক্রবার 1 December 2017, ১৭অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সবজির বাজার ও কৃষকের লোকসান

শীতের পাশাপাশি বাজারে নানা ধরনের সবজির আমদানিও বেড়ে চলেছে। উঠছে তাজা সব সবজি। কিন্তু এই সবজি বিক্রি করে কৃষকদের যেমন লাভ হচ্ছে না তেমনি ক্রেতা তথা সাধারণ মানুষও উপকৃত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। লাভের মুখ দেখার পরিবর্তে একদিকে কৃষকরা লোকসান গুনতে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে ক্রেতাদের কিনতে হচ্ছে তিন-চার গুণ বেশি দাম দিয়ে। কারণ, পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানের সবজি বাজারে বিপুল পরিমাণ সবজির আমদানি হলেও ফড়িয়া ও পাইকার নামের মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকদের অনেক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য করছে। ফলে লোকসানই কেবল গুনতে হচ্ছে না, অনেক সবজির এমনকি উৎপাদন খরচও ওঠাতে পারছে না কৃষকরা। কিন্তু বাজারে যেহেতু একই সবজি বেশি পরিমাণে আসছে এবং চাষিদের মধ্যেও যেহেতু বিক্রির জন্য স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা থাকে সে কারণে পাইকাররা নিজেদের ইচ্ছামতো দাম বলে বিদায় করছে কৃষকদের। পাছে বিক্রি না হয় এই ভয়ে কৃষকরাও ফড়িয়া ও পাইকারদের হাঁকানো দামে সবজি বিক্রি না করে পারছে না। 

খবরে জানানো হয়েছে, বগুড়ার মহাস্থান হাটে কৃষকরা ছোট আকারের যে ফুলকপি চার টাকা দরে বিক্রি করেছে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সে ফুলকপিরই দাম নেয়া হচ্ছে ১৫ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত। ১০ টাকার একটি বাঁধা কপি মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকায়। একইভাবে ১৭ টাকার বেগুন রাজধানীবাসীকে ৪০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ১৫ টাকার এক কেজি বরবটি বিক্রি করা হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে। পাঁচ টাকা কেজি দরে কেনা মূলা বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা দরে আর ১৫ টাকা দরের শসা ক্রেতাদের কিনতে হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা দরে। শিম, জলপাই ও ধনে পাতাসহ অন্য সব সবজির দরও আকাশচুম্বি। 

এ শুধু কারওয়ান বাজারের বাজার দর নয়, রাজধানীর অন্য সব বাজারেও একই রকম উচ্চ হারে সবজি বিক্রি করা হচ্ছে। একই অবস্থা চলছে দেশের সকল জেলা শহরের বাজারগুলোতেও। কোথাও কোনো বাজারেই শীতের সবজি কম দামে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ সবজির আমদানি হচ্ছে যথেষ্ট পরিমাণে। জানা গেছে, এবার সারাদেশেই সবজির চাষাবাদ অনেক ভালো হয়েছে এবং সে কারণে সবজির দামও কমে যাওয়ার কথা। এমন অবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদসহ বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মূল কারণ আসলে ফড়িয়া ও পাইকার এবং ব্যবসায়ী নামের মধ্যস্বত্বভোগীরা। যেসব এলাকায় সবজির বড় বড় বাজার রয়েছে সেসবের প্রতিটিতেই মধ্যস্বত্বভোগীদের দালাল বা এজেন্টরা আগে থেকে তৎপর থাকে। সবজির আমদানি দেখেই তারা পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা করতে পারে। এরপর আসে দামাদামি করার পালা। এমন দামই তারা হাঁকিয়ে থাকে কৃষকদের জন্য যা মোটেও লাভজনক নয়। কিন্তু যেহেতু নিজের সব সবজি বাজারে এনে ফেলেছে সেহেতু কৃষকরা দরকষাকষি করার সাহস পায় না। অন্য কৃষকরাও এক্ষেত্রে পরোক্ষ ভূমিকা পালন করে থাকে। একজন না দিতে চাইলে অন্য কয়েকজন এগিয়ে আসে এবং ফড়িয়া ও পাইকার তথা দালালদের হাঁকানো দামেই বিক্রি করতে রাজি হয়ে যায়। শুনতে খারাপ লাগলেও এজন্য আবার ওই সব কৃষককে দোষ দেয়া যায় না। কারণ, অতীতে অনেক উপলক্ষেই দেখা গেছে, বেশি দরকষাকষি করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত অনেকেরই সবজি অবিক্রীত থেকেছে। ফড়িয়া ও পাইকাররা তাদের চাহিদা অনুযায়ী সবজি কিনে নিয়েছে কারো না কারো কাছ থেকে। ফলে বিক্রি করতে অসম্মত কৃষকরা তাদের সবজি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। 

বিষয়টি কিন্তু সহজ নয় বরং যথেষ্ট ব্যয়সাপেক্ষ। কারণ, সবজির পরিমাণ বেশি বলে প্রায় কারো পক্ষেই মাথায় করে নেয়া সম্ভব হয় না। তখন আসে পরিবহন ব্যয়ের প্রশ্ন। সব মিলিয়ে কৃষকদের লোকসানের পরিমাণও বেড়ে যায়। এজন্যই কৃষকরা লোকসান দিয়ে হলেও পাইকার তথা মধ্যস্বত্বভোগীদের হাঁকানো দামে সবজি বিক্রি করতে বাধ্য হয়। অন্য একটি কারণও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কৃষকরা যখন সবজি নিয়ে বাজারে আসে তখন তাদের স্ত্রী-পুত্র কন্যা ও পরিবার সদস্যরা অনেক আশায় অপেক্ষা করে। কারণ, সবজি বিক্রি মানেই টাকা পাওয়া আর টাকা পাওয়া মানেই সংসারের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস কেনার সাধ্য আসা। প্রত্যেকেরই চাল ডাল তেল মরিচ থেকে লবণ ও সাবান পর্যন্ত অসংখ্য জিনিসের স্বাভাবিক চাহিদা থাকে। সে কারণে খালি হাতে ফিরে যাওয়ার চাইতে যে দাম পাওয়া যায় তা নিয়েই কৃষকরা বাড়িতে যায়। 

এভাবে শুধু কৃষককে নয়, ক্রেতা তথা সাধারণ মানুষকেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও পাইকার ও ফড়িয়াসহ মধ্যস্বত্বভোগীদের দোষারোপ করার সুযোগ নেই। কারণ, তারা আবার পরিবহন ব্যয় এবং পথে পথে চাঁদা দেয়ার কথা শুনিয়ে থাকে। এই চাঁদা শুধু গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের নয়, পুলিশকেও দিতে হয় বলে তারা দাবি করে। বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের এই অভিযোগ আবার অস্বীকারও করা যায় না। কারণ, আসলেও সারাদেশে চাঁদাবাজি চলছে বাধাহীনভাবে। সে কারণেই মধ্যস্বত্বভোগীরা চাঁদার জন্য দেয়া অর্থ হিসাবে ধরেই কোনো পণ্যের জন্য মোট বিনিয়োগের পরিমাণ নির্ধারণ করে। দামও তারা ওই হিসাবের ভিত্তিতেই আদায় করে থাকে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এমন অবস্থায় অবশ্যই পরিবর্তন ঘটানো দরকার। সবজির ভরা মওসুমেও সাধারণ মানুষকে মূল বাজারের তুলনায় তিন-চারগুণ বেশি টাকা দিয়ে কিনতে হবেÑ এমন অবস্থা চলতে পারে না। সরকারের উচিত প্রথমত মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, তারা যাতে কৃষকদের লাভজনক মূল্য দেয় এবং বাজারে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এত বেশি পরিমাণ দাম আদায় না করে। চাঁদবাজিসহ যেসব কারণ মধ্যস্বত্বভোগীরা যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে সে ব্যাপারেও সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থাৎ পথে পথে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। আমাদের ধারণা, এভাবে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া গেলে সবজির বাজারে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ