ঢাকা, শুক্রবার 1 December 2017, ১৭অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ডায়াবেটিস-কেবলই রোগ নয়, একটি সামাজিক সমস্যাও বটে

ডা. মো. ছায়েদুল হক : ডায়াবেটিস এখন আর কোনো অপরিচিত রোগের নাম নয়। রক্তের শর্করা বা সুগারের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, ঘন ঘন প্রপ্রাব হচ্ছে, ওজন কমে যাচ্ছে। আর যদি পরিবারের কারো ডায়াবেটিসের রোগ থেকে থাকে তবে যে কেউ বলবে এটা ডায়াবেটিসের লক্ষণ।

পৃথিবীতে ৮০% ডায়াবেটিস রোগীর বসবাস দরিদ্র এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। ২০১১ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যায় পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ডায়াবেটিস রোগীর (৯ কোটি; ৯%) বসবাস করে চীনে, তারপর ভারত (৬ কোটি ১৩ রাখ; ৮%) এবং বাংলাদেশ ৮৪ লাখ; ১০%)। অনেকেই ডায়াবেটিসের প্রাদুর্ভাব ও এর জটিলতা সম্পর্কে সচেতন নন। ডায়াবেটিসের দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল হতে পারে পঙ্গুত্ব, আয় সংকোচন অথবা মৃত্যু। বাংলাদেশে ডায়ারবেটিসের চিকৎিসার ব্যায়নির্বাহের জন্য ১২% পরিবার ধার দেনা করতে অথবা বসতবাড়ী বা অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হন। ডায়াবেটিসের করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পেতে সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ দরকার।

ডায়াবেটিস কি? ইনসুলিন হল এক ধরনের হরমোন যা অগ্নাশয় বা পেনক্রিয়াজ নামক গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়। খাওয়ার পর খাদ্যনালী থেকে আত্মীকরণের মাধ্যমে গ্লুকোজ রক্তে প্রবেশ করে এবং দেহের কোণায় কোণায় পৌঁছে দেহের বিভিন্ন কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকে। রো ইনসুলিনের সাহায্য ব্যতিরেকে কোষের ভিতর প্রবেশ করতে পারে না। ইনসুলিন যখন সুগারকে কোষের অভ্যন্তরে পৌঁছে দেয় তখন সুগার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং প্রয়োজনীয় শক্তি বা ক্যালরি সরবরাহ করে থাকে। কোন কারণে যদি অগ্নাশয় প্রয়োজনীয় পরিমাণে ইনসুলিন নিঃসৃত করতে ব্যর্থ হয় অথবা নিঃসৃত ইনসুলিন যদি ত্রুটিপূর্ণ হয় অথবা নিঃসৃত ইনসুলিনের তুলনায় শরীরের ওজন বেশি অর্থাৎ ইনসুলিনের আপেক্ষিক ঘাটতি দেখা দেয় তবে রক্তের সুগার কোষে প্রবেশে বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে রক্তে সুগারের পরিমাণ বেড়ে যায়। একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রান্ত হলেসুগার প্রশ্রাবের সাথে বেরিয়ে যায় ফলে প্রশ্রাবেও সুগারের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। এই অবস্থাটিকে বলা হয় ডায়াবেটিস।

ডায়াবেটিস নিয়ে সামাজিকভাবে ভাবতে হবেÑ সব ধরনের ডায়াবেটিসেই দীর্ঘমেয়াদে দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা দেখা দিতে পারে। এই জটিলতাগুলো সাধারণ ১০-১২ বছর পর দেখা দিয়ে থাকে। ডায়াবেটিসের প্রাথমিক জটিলতাগুলো দেখা দেয় সূক্ষ্ম রক্তনালী নষ্ট হওয়ার কারণে। চোখ, কিডনি, হার্ট এবং মস্তিষ্ক ও ¯œায়ুতে সূক্ষ্মনালী বেশি থাকাতে এই অঙ্গগুলো বেশি আক্রান্ত হয়। চোখ আক্রান্ত হলে এটিকে বলা হয় রেটিনোপ্যাথি যার পরিণতি হলো অন্ধুত্ব। কিডনি আক্রান্ত হওয়াকে বলা হয় নেফ্রোপ্যাথি। এতে প্রশ্রাবের সাথে শরীর থেকে প্রোটিন বের হয়ে যায়। শেষ পরিণতি কিডনী নিষ্ক্রীয় হয়ে মৃত্যু। ¯œায়ু আক্রান্ত হওয়াকে বলা হয় নিউরোপ্যাথি। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী সহজেই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক এবং হার্ট এ্যাটাকের ফলে মৃত্যু বা পেরালাইসিসের মতো কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হয়ে থাকেন।

ডায়াবেটিস অনেক রোগ থেকেই একটু আলাদা। কারণ এটি কর্মক্ষম লোকের মধ্যে বেশি পরিলক্ষিত হয়। ফলে দুইভাবে একজন ডায়াবেটিস রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন। প্রথমত রোগী একটি স্থায়ী ব্যয়নির্বাহের জাঁতাকলে পড়ে যান। শুরুতে কেবল কিছু ওষুধ বা ট্যাবলেট দিয়ে চিকিৎসা শুরু হয় যা স্বল্প খরচেই হয়ে যায়। এরপর হয়তো শুরু হবে ইনসুলিনের খরচ। পরবর্তীতে যখন রেটিনোপ্যাথি, নেফ্রোপ্যাথি, নিউরোপ্যাথি বা হার্টের সমস্যা দেখা দেবে তখন শুরু হবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং এইসব জটিলতার চিকিৎসার ব্যয়নির্বাহের যন্ত্রণা। ডায়াবেটিস যেমন একবার দেখা দিলে সাড়া জীবন রয়ে যায়; তেমনি এর জটিলতা দেখা দিলেও তা আর দেহ ছেড়ে যেতে চায় না। অর্থাৎ একবার ডায়াবেটিস মানে সারা জীবনের খরচ। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দ্বিতীয় পন্থাটি হলো ডায়াবেটিসের জটিলতা ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা হ্রাস করে ফেলে এবং একটা ধাপে এসে সম্পূর্ণভাবে অক্ষম করে ফেলে। ফলে ব্যক্তি এবং তার পরিবারের রোজগার কমে যায়। এভাবে একদিন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবং অন্যদিকে রোজগার কমে যাওয়ায় ব্যক্তি এবং তার পরিবারটি নিশ্চিত দারিদ্র্যতার দিকে ধাবিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে এভাবেই প্রায় এক কোটি লোক সামাজিক কর্মযজ্ঞ থেকে প্রতিমুহূর্তে ঝরে যাওয়ার মিছিলে যুক্ত হচ্ছে। ধরে নেয়া যায় ডায়াবেটিস এক ভয়াবহ অভিমাপের নাম। এখানে ব্যক্তি আক্রান্ত হলেও বেলা শেষে পরিবার ও সমাজ সবাই এর ভুক্তভোগী। তাই এর প্রতিকার ও প্রতিরোধেও সামাজিক ভূমিকা থাকাটা বাঞ্ছনীয়।

অনেকেই বলে থাকেন ইদানীং ডায়াবেটিস প্রাদুর্ভাব অনেক বেড়ে গেছে। আগেতো এমনটি দেখা যায়নি। কথাটা একদম মিথ্যা নয়। এর কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন টেকনোলজির যুগে মানুষের কায়িক পরিশ্রম কমে গেছে।  এখন মানুষ আগের মতো পরিশ্রম করে না। কায়িক পরিশ্রমের একটি সুবিধা হলো এতে শরীরে ইনসুলিনের সাহায্য ব্যতিরেকেই বা কম পরিমাণ ইনসুলিনের সাহায্যে অধিকতর সুগার ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে যায়। আরও একটি বড় কারণ হতে পারে মানসিক চাপ। আমাদের দেহ একটি হরমোন নির্ভর সিস্টেমে চলে। আর এই হরমোনের উপর ব্যাপক ব্যাপক প্রভাব ফেলতে সক্ষম এই মানসিক চাপ। এছাড়া খাদ্যে ভেজাল, ক্যান্সারেরমতো রোগ ও তার প্রতিকারে ক্যামোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি বেড়ে যাওয়াও একটি অন্যতম কারণ। যেভাবেই হোক আমাদের সামনে বাস্তব ছবিটা হলোএক বিশাল জনগোষ্ঠী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এর উত্তরণ দরকার।

যেভাবে ভালো থাকার চেষ্টা করতে হবেÑ

এর মধ্যে ভালো থাকার উপায় বের করতে হবে এবং ভালো থাকার চেষ্টা করতে হবে। নি¤েœাক্ত কয়েকটি কাজ নিয়মিত করতে হবে। যেমন ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। নিয়মিত হাঁটা বা কায়িক পরিশ্রম করা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য খুবই উপকারী। খাদ্যাভাস নিয়ন্ত্রণ করা খুবই জরুরি। বিশেষ করে শস্যদানা ও ফাইবারযুক্ত খাবার, শাকসবজি বেশি এবং চর্বি জাতীয় খাবার, মাছ মাংস ইত্যাদি পরিমাণ মতো। সুগার জাতীয় খাবার যেমন ভাত, আলু মিষ্টি জাতীয় খাবার একদম সীমিত পরিমাণে খেতে হবে। কোমল পানীয় বা ফ্রুট ড্রিঙ্কসে প্রচুর পরিমাণ সুগার থাকে এবং এই সুগার দ্রুত রক্তে চলে আসে বিধায় এটি পরিতাজ্য। ফলমূলের বেলায় খেয়াল রাখতে হবে এর সুগার এর মাত্রা কি রকম। যেমন আঙ্গুরে প্রচুর সুগার থাকে বিধায় এটি পরিহার করা উচিত। ধূমপান পরিহার করে চলতে হবে। রক্তচাপ বেশি থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীর জন্য সবচেয়ে সাধনার কাজ হলো ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা। আর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভাসের বিশাল ভূমিকা। তাই খাদ্যাভাসের বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। কোন খাবারটি গ্রহণকরা যাবে আর কতটুকু পরিমাণ মানানসই হবে এই পরিমিতিবোধটুকু সব সময়ের জন্য মেনে চলতে হবে। এক্সারসাইজ করার আগে পরে প্রচুর পানি খেতে হবে। দিনশেষে একবারের জন্য হলেও মিলিয়ে দেখাত হবে সারাদিনের খাবারে কোন ব্যত্যয় ঘটেছিল কিনা। ব্যত্যয় ঘটে থাকলে সংকল্প করতে হবে পরেরদিনের খাবারে এর সংশোধনী আনা। মাঝে মাঝে রক্তে সুগার দেখে মিলিয়ে নিতে হবে খাওয়া-দাওয়ার পরিমাণ ঠিকমতো যাচ্ছে কিনা।

মনে রাখতে হবে ডায়াবেটিসে ভালো থাকতে হলে অবশ্যই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে হলে খাদ্যাভাস নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

ডায়াবেটিসের সাথে সারা জীবনের একটি ব্যয়ভার জড়িয়ে থাকে এবং অনেকের পক্ষেই এই ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন। অন্তত ইনসুলিন যাতে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায় তার জন্যসরকার কোনো ভর্তুকির ব্যবস্থা করলে সমাজ লাভবান হবে।

লেখক : চক্ষু বিশেষযজ্ঞ  ও সার্জন এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ