ঢাকা, শুক্রবার 1 December 2017, ১৭অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

স্টাফ রিপোর্টার : জিয়া এতিমখানা ও দাতব্য দুর্নীতি মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে হাজির না হওয়ায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ফের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। এদিকে এই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির প্রতিবাদে সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি।

ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান গতকাল বৃহস্পতিবার পরোয়ানা জারির এই আদেশ দিয়ে খালেদার আত্মপক্ষ সমর্থনে শুনানি এখানেই শেষ করেন এবং বিচারিক কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপে যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য ৫, ৬ ও ৭ ডিসেম্বর দিন ঠিক করে দেন বলে বিএনপি নেত্রীর অন্যতম আইনজীবী নুরুজ্জামান তপন জানান।

খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী এডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, আদালত সরকারের নির্দেশে এই নজিরবিহীন গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। এ রকম হলে কীভাবে সুবিচার পাওয়া যাবে।

এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুদক। তদন্ত শেষে ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র দেন। তার পাঁচ বছর পর ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ অভিযোগ গঠন করে খালেদা জিয়াসহ ছয় আসামীর বিচার শুরু করেন।

আর জিয়া দাতব্য ট্রাস্টের নামে আসা তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় অন্য মামলাটি হয়। তদন্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি খালেদা জিয়াসহ চার জনকে আসামী করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। পরের বছরের ১৯ মার্চ শুরু হয় বিচার।

চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার পর খালেদা জিয়া নির্ধারিত তারিখে আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে হাজির না হওয়ায় বিচারক ১২ অক্টোবর দুই মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

এরপর দেশে ফিরে বিএনপি চেয়ারপারসন গত ১৯ অক্টোবর আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিচারক তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। ১৯ অক্টোবর খালেদা জিয়া আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য দিতে শুরু করেন এবং গত ছয় সপ্তাহ ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার সেই শুনানি চলছিল।

খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা স্থায়ী জামিনের আবেদন করলেও তা মঞ্জুর না করে বিচারক পরবর্তী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জামিন দিয়ে আসছিলেন। এর মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়াকে হয়রানি করা হচ্ছে অভিযোগ করে বিএনপি নেতারা বুধবার মানবন্ধনও করেন। 

গতকাল বৃহস্পতিবার জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনে সপ্তম দিনের মত বক্তব্য দেওয়া কথা ছিল খালেদা জিয়ার। কিন্তু তিনি নিজে না গিয়ে হরতালে নিরপত্তার কারণ দেখিয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে সময়ের আবেদন পাঠান। 

সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের ডাকে হরতাল হচ্ছে। সেজন্য নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আদালতের কাছে সময়ের আবেদন করে জানান, ওই কর্মসূচির মধ্যে আদালতে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আদালত বিষয়টি আমলে না নিয়ে সরকারের নির্দেশে এই আদেশ দিয়েছে বলে আমরা মনে করি।

এই আইনজীবী দাবি করেন, হরতাল শেষে দুপুরের পর খালেদা জিয়ার আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু আদালত পরোয়ানা জারি করায় তা আর সম্ভব হচ্ছে না। মামলার পরবর্তী তারিখে বিএনপি চেয়ারপারসন আদালতে যাবেন বলে জানান তার আইনজীবী।

দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, হরতাল চলছে বলে খালেদা জিয়া আদালতে আসেননি। আমি বলেছি, হরতাল সেভাবে হচ্ছে না। আর হরতাল তো ২টা পর্যন্ত। তিনি চাইলেই আসতে পারতেন।

এতিমখানা দুর্নীতি মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রথম দিন ১৯ অক্টোবর খালেদা জিয়া দাবি করেন, এতিমদের জন্য আসা একটি টাকাও তছরুপ বা অপচয় করা হয়নি, তা ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে। ২৬ অক্টোবর তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে এ মামলা ‘ভুয়া, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

২ নবেম্বর আত্মপক্ষ সমর্থন করে তৃতীয় দিনে খালেদা জিয়া বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে তাকে ‘সরাতে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার নীলনকশা’ বাস্তবায়ন করছে ক্ষমতাসীনরা। আর ১১ নভেম্বর বলেন, বাংলাদেশে বিচারকরা স্বাধীনভাবে আইন মেনে বিচার করতে পারেন কি না, তার এ মামলার রায়েই তার প্রমাণ আসবে।

দেশে বিচার ব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতিতে ন্যায়বিচার পাবেন কি না- তা নিয়ে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন ১৬ নবেম্বর। সর্বশেষ ২৩ নবেম্বর তিনি এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশীদের দুদকে নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

ওইদিনই জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট মামলায় খালেদার আত্মপক্ষ সমর্থন শুরু হয়। প্রথম দিনের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি নিজেকে ‘সম্পূর্ণ নির্দোষ’ দাবি করেন।

আত্মপক্ষ সমর্থন অসমাপ্ত রেখেই আদালত যুক্তিতর্কের দিন ঠিক করে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

এদিকে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির প্রতিবাদে রোববার সারাদেশে বিক্ষোভের কর্মসূচি দিয়েছে বিএনপি। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে এক সাংবাদিক সম্মেলনে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জরুরি সাংবাদিক সম্মেলনে রিজভী অবিলম্বে এই পরোয়ানা প্রত্যাহারের দাবি জানান।

 সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিব উন নবী খান সোহেল, কেন্দ্রীয় নেতা শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, মীর সরফত আলী সপু, আফরোজা আব্বাস, আবদুস সালাম আজাদ, কাজী আবুল বাশার, মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ, মুনির হোসেন, সুলতানা আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, আজকে সরকারের নীলনকশার অংশ হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। সরকারের বণ্য আক্রোশের কারসাজিতে এই গ্রেফতারি আদেশ জারি হয়েছে বলে আমরা মনে করি। আমরা এই আদেশ জারির নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এর প্রতিবাদে আগামী রোববার ৩ ডিসেম্বর সারাদেশে ঢাকা মহানগরসহ সারাদেশে জেলা সদরের থানায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হবে।

তিনি বলেন, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে বাম দলগুলোর হরতাল থাকায় নিরাপত্তাজনিত কারণে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া হাজির হতে পারবেন না, এজন্য সকালেই বিশিষ্ট আইনজীবী আদালতে গিয়ে যথারীতি আবেদন করেছেন। দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধান কি করে সেই হরতাল ডিঙিয়ে আদালতে যাবেন? আইনজীবীরা এটার যথাযথ যুক্তি উপস্থাপন করেছেন আদালতে।

এমনকি হরতাল শেষ হওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়া আদালতে আসতে চান বলে আইনজীবীরা আবেদন করেছেন। কিন্তু আদালত তা নাকচ করে দিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। এই আদেশ ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। আমরা মনে করি, এই ঘটনা সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে হয়েছে। বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে সরকারের পাশবিক জিঘাংসার প্রতিফলন এটি।

এদিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতার পরোয়ানা জারির প্রতিবাদে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল শনিবার মহানগর ও জেলা সদরে, রোববার থানা ও পৌরসভায় এবং যুবদল শুক্রবার, ছাত্রদল শনিবার সারাদেশে বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ