ঢাকা, শুক্রবার 1 December 2017, ১৭অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে  নিরাপত্তার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি : প্রধানমন্ত্রী

 

ঈশ্বরদী, পাবনা, থেকে বাসস : দেশের পরমাণু শক্তি প্রকল্পকে অত্যন্ত স্বচ্ছ আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর সরকার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে পারমাণবিক এবং রেডিওলজিক্যাল নিরাপত্তার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছে।

অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে পারমাণবিক নিরাপত্তার উপর আমরা সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা’র (আইএইএ) গাইডলাইন অক্ষরে-অক্ষরে অনুসরণ করছি।’

প্রধানমন্ত্রী গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বহুল প্রতীক্ষিত দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে একথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী আইএইএ-র সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রতিটি স্তরে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করছে। যে কোন দুর্যোগে আমাদের এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কোন প্রকার দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেটি খেয়াল রেখে এই প্লান্টের ডিজাইন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘পারমাণবিক শক্তির নিরাপদ এবং সুরক্ষিত প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং দেশের সর্বপ্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে দেশের জাতীয় পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো শক্তিশালী করার জন্য আমরা বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ প্রণয়ন করেছি।’

এছাড়া, ‘বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ নামে একটি স্বাধীন পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। এই সংস্থা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ইতোমধ্যে আইএইএ এবং রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে’, - বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে আমরা আমাদের পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নিচ্ছি। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ সংক্রান্ত সকল ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং প্রটোকলে অনুস্বাক্ষর করেছে।

এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরির জন্য প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য কার্যকর উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ ও মানুষের যাতে ক্ষতি না হয় তার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

যে কোন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ তার ব্যবহৃত জ্বালানি বা বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থাপনা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘রুশ ফেডারেশন এসব বর্জ্য তাদের দেশে ফেরত নিয়ে যাবে। এ ব্যাপারে রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের চুক্তি হয়েছে।’

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরিফ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ডা. আফম রুহুল হক, রাশিয়ার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লেখাচভ এবং আইএইএ-র পরিচালক দোহি হ্যান অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা প্রদান করেন এবং প্রকল্প পরিচালক ড. মো. শওকত আকবর প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র ২০২৪ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের যোগান দেবে। রোসাটামের মাধ্যমে রাশিয়ার আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন ও জেএসসি অ্যাটমস্ট্রোস্পোর্ট-এর মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ চুক্তিতে আণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান মো. মনিরুল আলম ও অ্যাটমস্ট্রোস্পোার্ট-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির এন সাভুসকিন স্বাক্ষর করেন।

রোসাটাম নিযুক্ত রাশিয়ার অ্যাটমস্ট্রোস্পোর্ট-এর ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে এই প্রকল্প নির্মাণ করবে।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ রাশিয়ার সঙ্গে দেশের এই সর্ববৃহৎ প্রকল্পের বিনিয়োগ ব্যয় চূড়ান্ত করে। এর আগে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে দু’দেশের মধ্যে প্রকল্পের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন, সাইট ডেভেলপমেন্ট ও পার্সোনাল ট্রেনিংয়ের জন্য ৫শ’ মিলিয়ন ডলারের রাশিয়ার ঋণ চুক্তি এবং ২০১১ সালে রোসাটাম-এর সঙ্গে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপনে রাশিয়া সব ধরনের সহায়তা দেবে এবং জ্বালানি সরবরাহ করবে ও ব্যবহৃত জ্বালানি ফেরত নেবে।

২৬২ একর জমির উপর নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের দুই ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা হচ্ছে ২ হাজার ৪শ’ মেগাওয়াট। ২০১৩ সালের ২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেন।

যে কোন উন্নয়ন করতে গেলে বিদ্যুৎ অপরিহার্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ছাড়া দেশকে আমরা কখনই উন্নত-সমৃদ্ধ করতে পারবো না।

এজন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিতে তার সরকার বহুমুখী প্রকল্প গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তেল, গ্যাস, কয়লা, সৌর, জলবিদ্যুৎ, বায়ু যতরকম ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, তারপর ভারতের থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় করা- সব রকম কাজ কিন্তু আমরা করে যাচ্ছি।’

এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ খরচ বেশি হলেও একবার নির্মাণ হয়ে গেলে অল্প খরচেই বিদ্যুতের চাহিদা মিটবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে যে বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে তার অন্তত ১০ ভাগ এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র পূরণ করতে সক্ষম হবে।

সবকিছুর মূলে রয়েছে ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেজন্যই তাঁর সরকার একের পর এক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে সবধরনের নিরাপত্তার ব্যবস্থাই কিন্তু করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, এটার নিরাপত্তার জন্য ইতোমধ্যে আমাদের সেনাবাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখছে। আমাদের পুলিশবাহিনী, আনসার-ভিডিপিসহ আমাদের আইন-শৃঙ্খলা সংস্থাকে আমরা সম্পৃক্ত করেছি এবং তাদেরকেও আমরা বিশেষ প্রশিক্ষণ দেব বিশেষ করে এই পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য ‘নিরাপত্তা বলয়’ ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা যেমন থাকবে তেমনি ধাপে ধাপে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হবে। নিরাপত্তায় নিযুক্ত সকলেই প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হবেন এবং সকলের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও আমরা করবো। 

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই স্বপ্নের শুরু হয়েছিল তদানীন্তন পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে। পাকিস্তানীরা আমাদের দেশের টাকা নিয়ে নিজেদের পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যেত, আর আমাদের উন্নয়ন করবে বলে কেবল ‘মুলা’ ঝুলিয়ে রাখতো। তেমনই ছিল এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জমি অধিগ্রহণসহ বেশ কিছু কাজ তখন সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান সরকার হঠাৎ করে কাজ বন্ধ করে দিয়ে প্রকল্পটি পশ্চিম পাকিস্তানে সরিয়ে নিয়ে যায়।

স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ  কেন্দ্র নির্মাণের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে সময় দেশের বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী এবং তাঁর প্রয়াত স্বামী ড. ওয়াজেদ ও এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকেরা জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করার পর সে কাজ আর এগোয়নি।

প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ২০২৩ সাল নাগাদ রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে ১২০০ মেগাওয়াট এবং পরের বছর আরও ১২০০ মেগাওয়াট মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে।

এ উপলক্ষে এরআগে প্রধানমন্ত্রী একটি স্মারক ডাকটিকেট ও একটি উদ্বোধনীর খাম অবমুক্ত করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ