ঢাকা, সোমবার 4 December 2017, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জামালপুরের নকশীকাঁথা ও বাহারী পোশাক সারা দেশে প্রশংসিত

আবহমানকাল থেকেই বাংলার বধূরা স্বভাবগতভাবেই  বাংলার ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দৃশ্যগুলোকে মনের মাধূরী মিশিয়ে সূই-সূতার মাধ্যমে কাপড়ের উপর তৈরী করত অপূর্ব চিত্র। গ্রামের বৌ-ঝিরা সাংসারিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে সৌখিনতাবশত: নকশীকাঁথা তৈরী করত। মেয়ে বড় হওয়ার সাথে সাথে মা, নানী-দাদীরা মেয়েকে শ্বশুরবাড়ী পাঠানোর সময় বাহারী রঙ এর নকশীখাঁথা সঙ্গে দিত। যারা গরীব তারাও মেয়েকে ২/৩টি কাঁথা বালিশ দিতে ভুলত না।
নতুন কাপড়ের মধ্যে বাহারী নকশীকাঁথা দেয়াটা ছিল খুবই স্বাভাবিক বিষয়। বাড়ীতে মেহমান আসলেই নানা রঙ্গের হাতের কাজের বিছানার চাদর, বালিশ, বালিশের কভার দস্তরখানা ইত্যাদি ব্যবহার করতে দেয়া হত। এজন্যে গ্রামের বৌ- ঝিরা প্রতিটি বাড়ীতেই পরিধেয় পুরোনো শাড়ী লুঙ্গি একত্র করে অথবা কেটে কেটে কিংবা পাইড় থেকে সূতা ছাড়িয়ে তা একত্রিত করে নিজস্ব স্বকীয়তায় মনের মাধূরী দিয়ে তৈরী করত নানাবিধ পোশাক পরিচ্ছদ। জামালপুরের নকশীকাঁথা ও হাতের কাজের বাহারী পোশাক পরিচ্ছদ সারাদেশে বহু পূর্ব থেকেই প্রশংসিত ছিল। বর্তমানে তা আরো উন্নত হয়ে দেশে ও দেশের বাইরে সমাদৃত হচ্ছে। জামালপুরের বকশীগঞ্জ, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ এবং সদর উপজেলাতেই নকশী কাঁথা শিল্পের কম বেশী উৎপাদন হয়। তবে জামালপুর সদর উপজেলাতেই নকশী  কাঁথা শিল্পের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে জামালপুর শহরে এর আধিক্য সবচেয়ে বেশী লক্ষণীয়। এখানকার পোশাক পরিচ্ছেদের গুনগতমান উন্নত হওয়ায় এবং দাম তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় দেশ ও দেশের বাইরে এর চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা যদি পিছনের দিকে ফিরে তাকাই তবে দেখবো এ ঐতিহ্যবাহী মনোমুগ্ধকর সূচি শিল্পটি একসময় হারিয়ে যেতে বসেছিল। ৭০ দশকের শেষভাগে এ শিল্প বিলুপ্ত হতে থাকে। অবশেষে ৮০র’ দশকের শুরুতেই আবার হারাতে বসা নকশী শিল্পটি পুনরুদ্ধার করে বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় গতিযোগ করে ব্র্যাক নামীয় বেসরকারী প্রতিষ্ঠানটি। ব্র্যাক জামালপুরের বিভিন্ন গ্রামের সূচী শিল্পীদের খুঁজে বের করে নকশী কাঁথা শিল্পের নতুন আগমন ঘটায়। ১৯৮৭ সালে বেসরকারী সংস্থা উন্নয়ন সংঘ এক হাজার গ্রামীন মহিলাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নকশী কাঁথার কার্যক্রম শুরু করে। উন্নয়ন সংঘ থেকে অনেক প্রশিক্ষিত কর্মী বের হয়ে আসার পর তারা নিজেরাই প্রতিষ্ঠা করেন নকশীকাঁথা শিল্প। এ সময় গড়ে উঠে রং ধনু হস্ত শিল্প, সৃজন মহিলা সংস্থা, সুপ্তি, ক্যাম্প, কারু নিলয়, জোসনা হস্ত শিল্প, প্রত্যয় ক্রাফট, শতদল ইত্যাদি। পরবর্তী সময়ে এ ক্ষুদ্র শিল্পটি আরো প্রসার লাভ করে।
বর্তমানে জামালপুরে সবগ্রলো উপজেলাতেই এ শিল্পের কাজ হচ্ছে এবং শিল্প, কারু পল্লী, কারু নীল, দোলন চাঁপা, ঝিনুক সূচিকা, তরঙ্গ কুটির, বুণন, অণিকা, মিম, মামিম, ইত্যাদি। এ শিল্পের প্রতিকূলতার কারণে শিল্পটির তেমন প্রসার ঘটেনি। বর্তমানে এ শিল্পের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা আর্থিক অনটনে থাকায় ব্যবসা প্রসারের ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।
নকশীকাঁথা পণ্যে নাম ও দামসমূহ: নকশীকাঁথা শিল্পের জিনিষ পত্রাদির মধ্যে রয়েছে নকশীকাঁথা, বেড কভার, থ্রীপিছ, ওয়ালমেট, কুশন কভার, শাড়ী , পাঞ্জাবী, টি শার্ট, ফতুয়া, স্কার্ট, লেডিস পাঞ্জাবী, ইয়ক, পার্স, বালিশের কভার, টিভি কভার, শাড়ীর পাইড়, ওড়না, ফ্লোর কুশন, মাথার ব্যান্ড, মানি ব্যাগ, কলমদানী, মোবাইল ব্যাগ, ছিকা, শাল চদর ইত্যাদি। নকশীকাঁথা পণ্যের মূল্য ২৫০০ থেকে ১০০০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ