ঢাকা, সোমবার 4 December 2017, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিয়ে রেজিস্ট্রি না হওয়ায় হিন্দু মহিলারা আইনী সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে

রফিকুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : যৌতুক না দিতে পারার কারণে অনেক মেয়েকে প্রতিনিয়ত শ্বশুর বাড়িতে নানান ধরনের শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়। স্বামী ও শ্বশুরালয়ের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে বধূরা তার বাপের বাসায় ফিরে আসে। কিন্তু এরপরও তার স্বামী চিঠি দিয়ে যৌতুকের জন্য চাপ দিতে থাকে। এক পর্যায়ে নিরূপায় হয়ে মেয়েরা বিয়ের বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে আদালতের দ্বারস্থ হন। কিন্তু নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস আমাদের দেশের হিন্দু আইনানুযায়ী আদালতে এর কোন সুফল পায় না। এদেশে হিন্দু বিবাহে নানা আচার অনুষ্ঠান আছে। বর্ণ এবং স্থান ভেদে এগুলোর পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। অবশ্য এসব আচার অনুষ্ঠানের পুরোটাই ধর্মীয়। তবে যখন অসুখী বিবাহিত জীবন থেকে হিন্দু মেয়েরা বিরিয়ে আসতে চায়, তখনই সমস্যার সৃষ্টি হয়। কারণ, বাংলাদেশে হিন্দু সমাজে বিয়ে রেজিস্ট্রির কোন বিধান নেই। অনেক হিন্দু মেয়ে প্রেমে পড়ে স্থানীয় কালি মন্দিরে যেয়ে ধর্মমতে সাতপাক, মালা বদল ও সিঁথিতে সিঁদুর পরে বিয়ে করেন। এরপর অনেকে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি পায় না। ফলে, ছেলে পক্ষ অনেক সময় এধরনের বিয়েকে অস্বীকার করে বসে। তখন মেয়েরা অসহায় হয়ে পড়ে। তাদের কাছে বিয়ের বৈধ কোন কাগজ না থাকায় এবং বিয়ে রেজিস্ট্রি না হওয়ায় আইনের আশ্রয় নিতে পারে না।
হিন্দুদের বিয়েতে মধ্যযুগীয় লোকাচার ও রীতিনীতির প্রভাব খুব বেশি। আর বিষয়টি আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, হিন্দু বিবাহ সংক্রান্ত কোন আইন বা হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রার এদেশে নেই। এজন্য কোন হিন্দু মহিলা যদি এক্ষেত্রে নির্যাতিত হন, তার আইনী সহায়তা পাবার কোন সুযোগ নেই। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের চিত্রটা পুরোপুটি ভিন্ন। সেখানে হিন্দু আইনে বিভিন্ন সময় এমন পরিবর্তন করা হয়েছে যা হিন্দু ধর্মে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। যেমন রাজা রাম মোহন রায়ের প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে সতীদাহ প্রথা বন্ধ করে আইন পাস এবং ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে হিন্দু বিধবা আইন জাতিগত অসামর্থ দূরীকরণ আইন ১৮৫০ শিশু বিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯ (সংশোধিত ১৯৩৮), বিদ্যার সাহায্যে অর্জিত সম্পত্তি বিষয়ক আইন ১৯৩০, উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫, সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার সংক্রান্ত আইন ১৯৩৭ প্রভৃতি। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর ভারতে হিন্দু আইনে আরও প্রগতিশীল সংস্কার সাধিত হয়েছে যা নারী অধিকারের ক্ষেত্রে মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যেমন ১৯৫৫ সালে হিন্দু বিবাহ আইন নাবালকের সম্পত্তি বিষয়ক আইন ১৯৫৬, হিন্দু দত্তক গ্রহণ ও ভরণ পোষণ আইন ১৯৫৬, হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ১৯৫৬, বিশেষ বিবাহ আইন ১৯৬০ পাস হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ১৯৪৭ সালের পর হিন্দু আইনের ক্ষেত্রে কোন নতুন সংস্কার করা হয়নি।
বাংলাদেশে হিন্দু আইনে বিশেষত: নারী অধিকার প্রশ্নে আজো রক্ষণশীল প্রাচীন ধ্যানধারণা প্রতিষ্ঠিত। আসলে আমাদের দেশে হিন্দু মেয়ের অধিকার সংরক্ষিত হয় এমন কোন আইন নেই। শুধু ১৯৪৭ সালের বিবাহিত নারীর পৃথক বাসস্থান ও ভরণ পোষণ আইনের অধীনে আদালত দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য মামলা করতে পারেন। এব্যাপারে অভিজ্ঞমহলের মতামত এই যে, হিন্দু মেয়েদের বিবাহের ক্ষেত্রে আইনী বৈধতা থাকা উচিত।
সেই সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের বিষয়টিও চলে আসে। অনেক সময় বাধ্য হয়ে মেয়েরা স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে আসে, সেক্ষেত্রে অবৈধভাবে থাকার চেয়ে ডিভোর্সের মাধ্যমে প্রয়োজনে পুনরায় কেউ যদি জীবন সঙ্গী বেছে নেয় তাতে কোন অসুবিধা নেই। তবে মহিলাদের সমস্যাগুলো মহিলা সংগঠনগুলোদের তুলে ধরতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, বিয়েটা কোনভাবেই টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না তখন শুধু আইন না থাকার কারণে সম্পর্কটা বয়ে বেড়াতে হয়। এ সমস্ত কারণে অনেক সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। সেক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদের আলাদা আইন থাকা দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ