ঢাকা, মঙ্গলবার 5 December 2017, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভারতীয় সিনেমার বর্ষীয়ান অভিনেতা শশী কাপুর আর নেই

স্টাফ রিপোর্টার : ভারতীয় চলচ্চিত্রের নক্ষত্র, বর্ষীয়ান অভিনেতা শশী কাপুর আর নেই। গতকাল  সোমবার বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুম্বাইয়ের কোকিলাবেন হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন তিনি। কিডনির সমস্যা ছিল অভিনেতার। বারবার ডায়ালিসিস করতে হত তাকে। মৃত্যুকালে মেয়ে সাঞ্জনা কাপুর ও দুই ছেলে কুনাল ও করণ কাপুরকে রেখে গেছেন তিনি।
২০১১-এ পদ্মভূষণ, ২০১৫-এ দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পাওয়া প্রখ্যাত এ অভিনেতার মৃত্যুতে শিল্পীমহলসহ পুরো ভারতজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে এ খবর আসতে না আসতেই সুনামীর মতো শোক বার্তা আছড়ে পড়তে থাকে।  ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শোক জানিয়ে টুইট করেছেন। টুইট করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। আর তার শোকবিহ্বল ভক্তদের এখন একটাই কথা, ‘আজ হামারে পাস সব কুছ হ্যায়, বস আপ নেহি হ্যায়’। এদিকে  শশী কাপুরের শেষ কৃত্য নিয়ে প্রাথমিকভাবে কিছু জানা যায়নি।
১৯৩৮ সালের ১৮ মার্চ কাপুর পরিবারের জন্ম তার। পৃথ্বীরাজ কপূরের তৃতীয় সন্তানের নাম ছিল বলবীর রাজ কপূর। চলচ্চিত্রে এসে নাম বদলে যায়। পারিবারিক ঐতিহ্যের সূত্রেই অভিনয় জগতে আসা। তবে নিজের অভিনয়ের জোরেই চলচ্চিত্র মহলে নিজের সম্মান আদায় করেছেন শশী। অমিতাভ বচ্চনের মতো অভিনেতার পাশে দাঁড়িয়েই নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন। তৈরি করেছেন নিজস্ব ম্যানারিজম যা আজও অনেক অভিনেতার কাছে আদর্শ। সিনেমায় অভিনয়ের পাশাপাশিই চালিয়ে গিয়েছেন থিয়েটার। পারিবারিক পৃথ্বী থিয়েটারকে জীবন্ত রাখতে তার অবদান অনস্বীকার্য। বানিয়েছেন সিনেমাও। হিন্দীর পাশাপাশি রাশিয়ান সিনেমাও পরিচালনা করেছেন শশী।
কাপুর পরিবারের ঘরানাতেই তৈরি হয়েছিলেন শশী। থিয়েটার ছিল রক্তে। আলো-ক্যামেরার দুনিয়ার সঙ্গে পরিচিতি সেই ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু যত দিন গিয়েছে, তত নিজেকে অন্য মাত্রায় তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন শশী। প্রথাগত বাণিজ্যিক ছবির বাইরেও সিনেমার যে সমান্তরাল ধারা, সেখানেও তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। শ্যাম বেনেগাল থেকে অপর্ণা সেনের মতো পরিচালক তাকেই বেছে নিয়েছেন চরিত্র অভিনেতা হিসেবে। আবার দিওয়ার-এর মতো একেবারে মূলধারার বাণিজ্যিক ছবিতেও তিনি অভিনয় করেছেন। শুধু অভিনয়ই করেননি, অমিতাভ বচ্চনের দুরন্ত নায়কোচিত দাপটের মধ্যেও আলাদা জায়গা করে নিতে পেরেছেন। থিয়েটারের ঘরানা ধারণ করেই ভারতীয় সিনেমার দুনিয়াকে নয়া গতি দিয়েছিলেন। তার অভিনয় তাই পরবর্তীকালে স্বতন্ত্র এক ঘরানা হয়ে ওঠে। আধুনিক প্রজন্মের কাছে তিনি নিজেই এক প্রতিষ্ঠান।
১৯৬১-এ ‘ধর্মপুত্র’ ছবির মাধ্যমে তার বলিউডে অভিষেক হয়। প্রথম ছবিতেই নায়কের চরিত্র। তবে ১৯৪৮ সালে ‘আগ’ সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেব বলিউডে কাজ করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ কেরিয়ারে দেড়শোর বেশি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। অভিনয় ছাড়াও পরিচালকের ভূমিকাতেও তাকে দেখেছেন দর্শক। বাবা পৃথ্বীরাজ কাপুর ছিলেন নির্বাক যুগের ভারতীয় ছবির অন্যতম প্রধান অভিনেতা। শশী কাপুরের ভাই রাজ কাপুর ও শাম্মী কাপুরও ছিলেন ষাট ও সত্তরের দশকের জনপ্রিয় বলিউড অভিনেতা।
বাণিজ্যিক ছবির পাশাপাশি ভারতীয় সিনেমায় একটা ধারা সবসময়ই প্রবাহিত হয়। যা বিনোদনের বাইরেও তুলে আনে সামাজিক বিভিন্ন সমস্যাকে। তুলে আনে কঠোর বাস্তবকে। একেবারে বিনোদনের বাড়ির ছেলে হলেও, শশী কাপুরের লক্ষ্য ছিল ভাল সিনেমা তৈরি করা। নিজে তো অভিনয় করেছেন বিভিন্ন ধারার ছবিতে। উৎসাহ দিয়েছেন এই তরুণ পরিচালকদেরও। ব্যক্তিগত জীবনেও ইন্ডাস্ট্রির মনের মানুষ ছিলেন শশী। বড় তারকা, কাপুর পরিবারের সন্তান। কিন্তু বিতর্কে তেমন জড়াতে দেখা যায়নি তাকে। রিল লাইফে যেন হাস্যোজ্জ্বল মুহূর্তে তাকে দেখা যেত, রিয়েল লাইফেও তিনি অনেকটা ছিলেন সেরকমই। শশীর স্থান ভারতীয় দর্শকের হৃদয়ে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, গতকাল বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শশী কাপুর নিশ্চিত করেছেন মুম্বাইয়ের কোকিলাবেন আম্বানি হাসপাতালের চিকিৎসক রাম নারায়ণ। ২০১৪ সালে বাইপাস সার্জারির পর থেকেই বক্ষ সংক্রমণজনিত রোগে ভুগছিলেন তিনি। এ রোগের কারণেই মৃত্যু হয়েছে এ খ্যাতিমান অভিনেতার, বলে নিশ্চিত করেছেন তার ভাতুষ্পুত্র রনধীর কাপুর।
জীবদ্দশায় ‘ধর্মপুত্র’, ‘বেনজির’, ‘ওয়াক্ত’, ‘প্যায়ার কা মওসুম’, ‘হাসিনা মান জায়েগি’, ‘হীরা অউর পাত্থর’, ‘সিলসিলা’ সহ প্রায় ১১৬টির মতো সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। গত দুই দশক ধরেই প্রচারের আড়ালে ছিলেন তিনি। ১৯৭৮ সালে স্ত্রী জেনিফার কেন্ডালের সঙ্গে ‘পৃথ্বী থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠা করেন শশী কাপুর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ