ঢাকা, বুধবার 6 December 2017, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ব্যাংক ছেড়ে সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছে মানুষ

আমানতকারী বা সাধারণ মানুষ এখন আর ব্যাংকে টাকা জমা রাখছে না, জমা রাখার ভরসাও পাচ্ছে না। তাদের অধিকাংশ বরং সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে। তারা এমনকি বিভিন্ন ব্যাংকে জমা রাখা টাকা উঠিয়ে আরো বেশি পরিমাণে সঞ্চয়পত্র কিনছে। অর্থনীতিবিদ ও তথ্যাভিজ্ঞদের ব্যাখ্যা ও বিভিন্ন তথ্য-পরিসংখ্যানের উল্লেখ করে গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, দেশে দেশে ব্যাংকে টাকা জমানোর প্রচলিত স্বাভাবিক নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণ দু’-চারটি মাত্র নয়। একটি প্রধান কারণ, বর্তমান সরকারের আমলে নানা অজুহাতে ব্যাংকগুলোর সুদের হার কমতে কমতে গড়ে মাত্র ৫ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে। দ্বিতীয়ত, সুদের হার কমলেও দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার বেড়ে হয়েছে ৬ শতাংশেরও বেশি। ফলে লাভ বা মুনাফার পরিবর্তে আমানাতকারীরা বাস্তবে লোকসানের কবলে পড়ছে। নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য টাকা জমা রেখে বা এফডিআর করেও মানুষকে ঠকতে হচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো ব্যাংকে তিন মাসের জন্য এক লাখ টাকার এফডিআর করলে উৎস কর ও আবগারি শুল্ক কেটে রাখার পর আমানাতকারীকে ফেরৎ দেয়া হচ্ছে ৯৯ হাজার ৯৫৬ টাকা। অর্থাৎ কোনো লাভ বা মুনাফা দেয়ার পরিবর্তে ওই আমানাতকারীর কাছ থেকে উল্টো ৪৪ টাকা কেটে রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংকের সুদের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে অনেক বেশি। যেমন পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ, পেনশন সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ মুনাফা দেয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি তিন বছর মেয়াদি মুনাফা ভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।
এ ধরনের আরো কয়েকটি কারণ থাকলেও দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেশের ব্যাংকগুলোর দুরবস্থা এবং সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতের চরম অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। লক্ষ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ এবং লাভজনক বিনিয়োগে অক্ষমতার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত চারটিসহ ৫৭টি ব্যাংকই বর্তমানে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। ফারমার্স ব্যাংকের মতো কোনো কোনো ব্যাংকের এমনকি অস্তিত্ব নিয়েও টানাটানি শুরু হয়েছে। উল্লেখ্য, ব্যাংকিং খাতের এই বিপর্যয়ের পেছনে রয়েছে সরকারের ভ্রান্ত ও ক্ষতিকর নীতি ও কর্মকান্ড। প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, অত্যন্ত সীমিত অর্থনীতির দেশ বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালে এক সমীক্ষায় বেসরকারি খাতে নতুন কোনো ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি না দেয়ার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু সরকার সে পরামর্শ গ্রহণ করেনি বরং সম্পূর্ণ দলীয় ও রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০১২ সালেই নয়টি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়েছিল। এর ফলে দেশে ব্যাংকের সংখ্যা হয়েছিল ৫৭টি। পাশাপাশি ছিল ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত, দুটি বিশেষায়িত এবং নয়টি বিদেশি ব্যাংকসহ আরো কয়েকটি ব্যাংক এবং ৩২টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানও। অথচ বাংলাদেশের মতো ক্ষুদে অর্থনীতির একটি দেশে এত বেশি সংখ্যক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাভজনক হওয়া এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সে কারণে এবং ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ী নামের আওয়ামী লোকজনকে শত ও হাজার কোটি টাকার অংকে ঋণ দেয়ায় এবং ঋণের টাকা ফেরৎ না আসায় নতুন ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি দেশের সম্পূর্ণ ব্যাংকিং খাতই ধ্বংসের মুখে এসে গেছে।
অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের হস্তক্ষেপে সব ব্যাংকই তাদের সুদের হার এমন পরিমাণে কমিয়ে দিয়েছে যখন আর মানুষের মধ্যে ব্যাংকে টাকা জমা রাখার আগ্রহ অবশিষ্ট থাকেনি। ওদিকে বাসাবাড়িতে টাকা রাখা যেহেতু নিরাপদ নয় সেহেতু মানুষকে বিকল্প পন্থা বা উপায় খুঁজতে হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন, ব্যাংকের বাইরে টাকা জমা রাখার এবং লাভের জন্য টাকা খাটানোর একটি প্রধান ক্ষেত্র ছিল শেয়ার মার্কেট বা পুঁজি বাজার। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পুঁজি বাজারে ভয়াবহ লুণ্ঠনের ঘটনা ঘটেছে। লাখ লাখ ক্ষুদে বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, যার ফলে বিনিয়োগকারীরা তাদের খোয়ানো টাকা ফেরৎ পাবে এবং আবারও পুঁজি বাজারে বিনিয়োগ করতে উৎসাহী হয়ে উঠবে। এমন এক অবস্থার মধ্যেই সঞ্চয়পত্র এসেছে আকর্ষণীয় একটি প্রধান অবলম্বন হিসেবে। ব্যাংকের তুলনায় মুনাফার হার ও পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ায় এবং টাকা খোয়া যাওয়ার আশংকা না থাকায় চাকরিজীবী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও গৃহিণীসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষই সঞ্চয়পত্র কেনার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। যেমন চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে যেখানে তিন হাজার ৬৬৫ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল সেখানে অক্টোবরে বিক্রি হয়েছে চার হাজার ৬২০ কোটি টাকার। নভেম্বরেও সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বেড়েছে। এই বেড়ে যাওয়া সরকারের জন্য কিন্তু উদ্বেগের বিষয়। কারণ, সঞ্চয়পত্রের বিক্রি যতো বাড়বে সরকারকে ততো বেশি পরিমাণে সুদের অর্থ গুনতে হবে। এর চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে বার্ষিক বাজেটের ওপর। তখন ঘাটতি কেবল বাড়বে। বাস্তবে এরই মধ্যে বিপুল ঘাটতির মুখে পড়েছে সরকার। এই ঘাটতি পূরণের উদ্দেশ্যে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হলে আমানতকারীরাও বিকল্প চিন্তা করতে বাধ্য হবে। তখন একদিকে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি অনেক কমে যাবে, অন্যদিকে টাকা খাটানোর ক্ষেত্র যেহেতু নেই বললেই চলে সেহেতু মানুষকেও নতুন পর্যায়ে বিপদের মধ্যে পড়তে হবে।
বলা দরকার, এমন অবস্থার কথা কল্পনা করা যায় না যেখানে টাকা জমানোর সবচেয়ে নিরাপদ মাধ্যম ব্যাংকের দিক থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং সঞ্চয়পত্রের মতো বিকল্প উপায় বেছে নিতে বাধ্য হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, ব্যাংকগুলোর দুর্নীতি ও জালিয়াতিই আমানতকারীদের সঞ্চয়পত্রের দিকে ঠেলে দিয়েছে। একই কারণে পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে হলে সরকারকে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। কেবলই রাজনৈতিক বিবেচনায় নিত্যনতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যাংকগুলোকে লোকসান এবং দুর্নীতির কবল থেকে উদ্ধার করার উদ্যোগ নেয়া দরকার। এ উদ্দেশ্যে সকল ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অর্থ আদায় করার পাশাপাশি এমন আয়োজনও নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ব্যবসায়ী নামের টাউট লোকজন ঋণের আড়ালে লক্ষ হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠন করার সুযোগ না পায়, ব্যাংকগুলো যাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের সাহায্য করতে পারে এবং আমানতকারীরা যাতে তাদের হারানো আস্থা ফিরে পায়। এজন্য সব ব্যাংককেই মুনাফার হার বাড়াতে হবে এবং কমাতে হবে ঋণের বিপরীতে সুদের হার। পরিচালনা পরিষদসহ ব্যাংক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সরকারকে দলবাজির নীতি পরিত্যাগ করতে হবে। এভাবে সব মিলিয়েই এমন অবস্থা নিশ্চিত করা দরকার, যাতে ব্যাংকগুলো জাতীয় অর্থনীতিতে সুফলপ্রসূ অবদান রাখতে সক্ষম হয়। আমরা চাই না, সরকারের ভ্রান্ত ও ক্ষতিকর নীতির কারণে ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিও বিপর্যয়ের কবলে পড়ুক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ