ঢাকা, বুধবার 6 December 2017, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আমার দেখা ভূ-স্বর্গ

এডভোকেট সৈয়দ এহতেশামুল হক : ॥ পূর্ব প্রকাশিতের পর ॥
এদিকে এই দুর্গম রাস্তায় ও ট্রাফিক জ্যাম দেখা দিল। খুব ধীরে ধীরে সতর্কতা উল্লেখ করার মত। ঐ রাতে খাওয়া দাওয়ার জন্য বাবুর্চিদের রন্ধন কর্ম করার কোন সুযোগ হলো না। তাই কলা ও বন দিয়ে ক্ষিধা নিবারণ করা হলো। পরের দিন দিনের বেলায় মাঝ পথ থেকে সবজি ক্রয় করে রন্ধন কর্ম সম্পন্ন করে মধ্যাহ্নভোজের পর চোখ ঢলে পড়ছিল ঘুমের নেশায় তথাপিও এ্যাডভেঞ্জার ও ভয়ের কারণে না ঘুমানোর চেষ্টাই করছিলাম। কিন্তু তন্দ্রাভাব কাটছিল না। যে ডাললেক ও নাগিন লেককে বাদশাহ জাহাঙ্গীর ও সম্রাট শাহজাহান “মেহবুবা” বলে ডাকতেন, নুরজাহান যার নাম দিয়েছিলেন “খোদা কি তোহফা” আর সম্রাট আওরঙ্গজেব (আলমগীর) তার ক্লান্ত জীবনের বহু রজনী এর পাড়ে বিনিদ্র কাটিয়েছেন।
১৬১৯ খ্রীষ্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশে মোঘল শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন শালিমারবাগ তৈরি হয় তার প্রিয়তমা পত্নী মেহেরুন্নেছা ওরফে নুরজাহান এর জন্য। এই শালিমারবাগ (প্রেম কানন) যখন সম্রাট জাহাঙ্গীরের মনকে আনন্দে ভরিয়ে দিতে পারছিল না তখন আসফ খানের (নুর জাহানের ভাই) প্রচেষ্টায় ১১০৮ ফুট লম্বা ও ১৭৪৫ ফুট চওড়া উদ্যানে রাশি চক্রের সাথে মিলিয়ে ১২টি ঝর্ণা স্থাপন করে এর প্রবাহকে শালিমারবাগ এর চেয়ে চমৎকার ও মনোহরী করার জন্য পারস্য থেকে আনেন গোলাপ ও চিনার, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে নানা রঙের পাথ ও কংকর, সকল প্রকৌশলী ও স্থাপতিদের স্বযত্ন প্রচেষ্টায় শালিমারবাগ এর পাশেই একদিন বেলি বনে গোলাপের মত হেসে উঠে নিশাতবাগ। পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর এই বাগানের নাম দিয়েছিলেন “তোহফাই ইশক”। মৃত্যু শয্যায় শায়িত জাহাঙ্গীর বার বার হাত তোলে ফরিয়াদ করছিলেন “হে খোদা”। যদি মাত্র একটা নির্দেশ অমান্য করার জন্য আদমকে তুমি জান্নাত থেকে দুনিয়ার নির্বাসনে পাঠালে, তখন আমায় সারা জীবনের শত অপরাধের শান্তি স্বরূপ তুমি কি আমায় একবারের জন্য নিশারাতে পাঠাতে পার না? সম্রাটের এই কাতর অনুনয়ে বাধ্য হয়ে মুমুর্ষ সম্রাটকে নিয়ে নুরজাহান কাশ্মিরের পথে দিল্লী ত্যাগ করেন। পথিমধ্যে পাঠানকোটের নিকট সম্রাট জাহাঙ্গীর ইন্তেকাল করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আর দিল্লীতে ফেরা হলো না। তার না ফিরার ঠিকানায় চলে যাওয়ার বিরহ-বেদনা নুরজাহানকে এতই কাতর করে ছিল যে, সম্রাট শাহজাহানের অনুরোধেও তিনি দিল্লী ফিরে যান নাই। এর পর ১৬৪২ খ্রিস্টাব্দে বসন্তে সম্রাট শাহজাহানের নির্দেশে তৎকালীন কাশ্মিরের গভর্নর মর্যানখান শ্রীনগরের জেবওয়ান পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়ানো চেশমাশাহী’র (বাগান) নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। এই চেশমাশাহীর পানি শীতল স্বচ্ছ অদ্ভুত রকমের সুস্বাদু মিষ্টি ও স্বাস্থ্যকর যা আজও পূর্ববৎ আছে।
অনেকে রোগ মুক্তির জন্য মান্নত করে এই পানি পান করেন। ২ মাইল লম্বা জহরলালনেহেরু ট্যানেল (সুড়ঙ্গ) পার হলেই সেই ইতিহাস ঐতিহ্য মন্ডিত বেদনা মধুর স্মৃতির পৃথিবীর ভূ-স্বর্গ শ্রী নগরের গুলমার্গ, সোনা মার্গসহ বহু নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখার বিলম্ব যেন সইতে পারছিলাম না। এমন সময় খোকন দা স্ব-শব্দে চিৎকার করে জানিয়ে দিল আমরা পেহেলগাঁও প্রবেশ করলাম। আমি সম্ভিত ফিরে পেলাম। এমন আনন্দ বেদনা, প্রেম-বিরহ, মান-অভিমান নৈতিকতার মধুর স্মৃতির অতলে নিমজ্জিত মহান আল্লাহ তায়ালার নগন্য গোলামের তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব সম্পূর্ণ বিদায় নিলো।
তখন ১২/০৫/২০১৫ ইংরেজি তারিখ দিবাগত রাত অনুমান ৩ টা পেহেলগাঁও থেকে ভোর ৫টার দিকে (১৩/০৫/২০১৫) হযরত বাল মসজিদের অদুরে পুরাতন শহরস্থ হোটেল বাহার এর ওখানেই আমরা দু’টি কটেজ এ উঠলাম। সেখানে গরম পানির হিটারও আছে। একেবারে অজু গোসল সেরে ফজরের নামাজ আদায় করি। অতঃপর খাওয়া-দাওয়া সেরে কিছুক্ষণ বিশ্রামে যাওয়ার সময় খোকন দা বললেন যারা শ্রী নগর দেখতে চান তাদের জন্য একটি গাড়ির ব্যবস্থা হয়েছে। অদ্য ১৩/০৫/২০১৫ ইংরেজি তারিখ সকাল ৯.৩০ মি. সফর শুরু করতে হবে। যথাসময়ে গাড়ি এসেই হাজির ২৫ জন এক সাথে শ্রীনগরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানসমূহে সফরে বের হলাম। বাহার হোটেল এর সামনে থেকে শুরু করে পুরাতন শহর, হযরত বাল মসজিদ, ঝিলাম নদী, প্রেম পুরা, কাশ্মির ক্যান্টেনমেন্ট হয়ে ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯০০০ ফিট উপরে পৃথিবীর ভূস্বর্গ কাশ্মিরের অন্যতম দর্শনীয় পর্যটন গুলমার্গ পাহাড়ের চুড়ায় হীম শীতল আবহাওয়া হিমালয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় কিন্তু অনন্য বৈশিষ্ট্যের এই গুলমার্গে মেঘের দেশে বরফের উপর ঘোড়ায় চড়ে সফরের অনুভুতিই আলাদা। এই গুলমার্গের উপরে প্লে-কার্ডে লিখা “দি ক্রিয়েশান অব সুলতান ইউছুপ শাহ এন্ড হাব্বা খাতুন। একদম উপরের পাহাড়ের চূড়ার উচ্চতা ২৪৬৬০ ফুট এর পাশেই ঘুমিয়ে আছেন শায়খ পায়াম উদ্দিন যাকে হিন্দুরা ঋষি বাবা বলে শ্রদ্ধা জানায়।
ঐখানে তাহের সাহেবের সোয়েটার ও জুতা মৌজায় শীত নিবারন না হওয়ায় শপিং মল থেকে ক্যাপ, হ্যান্ড গ্লাবস খরিদ করি। এতেও বেশ ঠাণ্ডা অনুভুত হয় কিন্তু সর্দি, কাশি ছিল না। বিকাল বেলায় গুলমার্গ থেকে নামার সময় আঙ্গুর বাগান, আপেল বাগান দেখার উদ্দেশ্যে আপেল বাগানের মেশকেআম্বর এ একটি অতি উপকারী ফ্রুটস প্রতিকেজি ১০০০/- রুপি খরিদ করি। সেখানে মাগরিবের নামাজ আদায় করি। অতঃপর দোকান মালিক কর্তৃপক্ষ আমাদের চা দিয়ে আপ্যায়ন করেন। এশার সময় আমাদের অবস্থান স্থলে ফিরে আসি। কটেজের মালিক জনাব ইউসুফ সাহেবের সাথে আলাপ হয়। উনার ২ ছেলে ১ কন্যা। বড় ছেলে একটি গ্যারেজে কাজ করে। মেয়েটি বিবাহ দিয়েছেন কিছুদিন পূর্বে। ছোট ছেলে আমীর ইউসুফ ইঞ্জিনিয়ারিং ৮ম সেমিস্টারের ছাত্র। বছরে ৬ (ছয়) মাস শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। এই ৬ (ছয়) মাস আয় রোজগারহীন অবস্থায় কাটাতে হয় প্রাকৃতিক কারণে। তারপরেও আলহামদুলিল্লাহ। ভালই জানালেন মিসেস ইউছুপ এর মাতৃসুলভ আচরণে আমি মুগ্ধ। রাত ৯টার দিকে নিচে নামলাম খাওয়ার জন্য বাবুর্চীর রন্ধন কর্ম সমাপ্ত হয়েছে। অন্যদের অগ্রাধিকার দিয়ে আমরা ৭-৮ জন অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় দেখি একটি ৫-৬ বছরের ফুটফুটে শিশু গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে ‘আসসালামু আলাইকুম” বলে গেইটের পিলারের পাশে লুকিয়ে যায়। আবারো সালাম দিয়ে লুকিয়ে যায়, এই ভাবে ৪ বার সালাম দেয়ার পর বুঝতে পারলাম যে, সে আমাকে উদ্দেশ্য করে সালাম দিচ্ছে। ওয়ালাইকুমস সালাম ওয়া রাহমতুল্লাহ বলেই সালামের জবাব দিয়ে তাকাতে শিশুটি মুখ লুকানোর চেষ্টা করে হেসে দেয়। তৎক্ষণাৎ আমার মনে পড়ে গেল সুদুর বাংলাদেশে আমার রেখে আসা যমজ কন্যা তাসমিয়া ও তাযকিয়ার কথা। যারা সব সময় আমার পাশে পাশে ঘুর ঘুর করতঃ অন্তর হাহাকার করে উঠল ইচ্ছে হলো শিশুটিকে জড়িয়ে ধরে কলিজার সাথে লাগিয়ে রাখি।
শিশুটির সাথে ১৫/১৬ বছরের একটি ছেলে আছে। আমি শিশুটির পাশে গিয়েই তার মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করি, আম্মি আপকা নাম কেয়া? সে জবাব দিল আয়েশা, আয়েশা আমাকে জিজ্ঞেস করল আমার দেশ কোথায়, তার মতো মেয়ে আছে কিনা? ইত্যাদি আমি জবাব দিলাম। অতঃপর সে নিজেই বলতে লাগল তার বড় দুটো বোন ও ১টি ভাই আছে। সে সবার ছোট। আর গেইটেপর সামনের কটেজটি তাদের। তারা ‘দু’তলায় থাকে। কথা বলার সময় আয়েশাকে এতো আদর লাগছিল যে, আমার কন্যা দ্বয়ের উপস্থিতি অনুভব করতে লাগলাম। হে মহান রাব্বুল আলামীন তুমিতো তোমার বান্দাকে তার মায়ের চাইতে সত্তরগুণ বেশি ভালবাস। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ