ঢাকা, বৃহস্পতিবার 7 December 2017, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অস্তিত্ব সংকটে পোল্ট্রি শিল্প

মাত্র কয়েক বছর আগেও যে শিল্প একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছিল সে পোল্ট্রি শিল্পই সম্প্রতি অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। লাভজনক হওয়ার প্রশ্ন ওঠে না, শত শত পোল্ট্রি খামার বরং বন্ধ হয়ে গেছে। বহু খামারে হাজার হাজার মুরগির খাঁচি খালি পড়ে রয়েছে। যে সামান্যসংখ্যক খামার এখনো কোনোভাবে টিকে রয়েছে সেগুলোও যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। গতকাল দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, পোল্ট্রি শিল্পের সমস্যার কারণ দু’চারটি মাত্র নয় বরং অসংখ্য এবং নানামুখী। সরকার মুরগির খাদ্য ও ওষুধসহ প্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের ওপর কর ও আবগারি শুল্ক বাড়িয়েছে, পোল্ট্রি খামারীদের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করেছে। অনেক কষ্ট ও দৌড়ঝাঁপ করে ঋণ পেলেও দেশীয় খামারীদের যেখানে ১৮ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে হয় সেখানে বিদেশী কোম্পানিগুলোর জন্য ঋণের বিপরীতে সুদের হার মাত্র দুই থেকে তিন শতাংশ। বেশি দামে খাবার, ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী কেনার পাশাপাশি অনেক বেশি হারে সুদের অর্থ গুনতে হয় বলে দেশি খামারীদের উৎপাদন ব্যয়ও অনেক বেড়ে যায়। অন্যদিকে বিদেশিদের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা করার কারণে মুরগি ও ডিমের দাম না কমিয়ে উপায় থাকে না।
পোল্ট্রি শিল্প মালিকদের কেন্দ্রীয় সংগঠন বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলÑবিপিআইসিসি’র সর্বশেষ পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে, কর ও সুদসহ সকল ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় একটি ডিমের জন্য উৎপাদন ব্যয়ের পরিমাণ এখন ছয় টাকা। অন্যদিকে বিদেশিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে একই ডিম পাইকারি বাজারে বিক্রি করতে হয় পাঁচ টাকায়। ফলে প্রতিটি ডিমে লোকসান হয় এক টাকা। অথচ একটি মুরগিকে ডিম দেয়ার মতো অবস্থায় আনতে খরচ পড়ে যায় ১৫০-১৬০ টাকারও বেশি। কেন এমন হচ্ছে তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে খামারীরা জানিয়েছেন, এক দিনের একটি ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা তাদের গড়ে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়। এই বাচ্চাকে বিক্রিযোগ্য করতে সময় লাগে ৩৫ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত। মুরগির খাদ্য ও ওষুধসহ খরচ পড়ে যায় ৬০ থেকে ৭০ টাকা। এভাবে এক কেজি ওজনের একটি মুরগির জন্য ব্যয় হয় ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। কিন্তু বিক্রির সময় ১২০-১৩০ টাকার বেশি তারা পান না। ফলে প্রতিটি মুরগিতে তাদের লোকসান হয় ২০ থেকে ৩০ টাকা। অনেক সময় লোকসান গুনতে হয় এর চাইতেও বেশি।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল জানিয়েছে, এমন অবস্থার একটি প্রধান কারণ বিদেশি তথা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। দেশীয় খামারীদের স্বার্থের কথা চিন্তা না করে সরকার অন্তত সাতটি বিদেশি কোম্পানিকে বাংলাদেশে পোল্ট্রি খামার প্রতিষ্ঠা এবং ব্যবসা করার অনুমতি দিয়েছে। কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রাধান্যে রয়েছে ভারতের গোদরেজ, টাটা ও অমৃত গ্রুপ। এসব কোম্পানি বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করায় গড়ে তাদের ক্রয়মূল্য অনেক কম পড়ে। মুরগি ও ডিমের উৎপাদন ব্যয়ের দিক থেকেও তারা দেশীয় খামারীদের তুলনায় লাভজনক অবস্থায় থাকে। সময়ে সময়ে তারা এমনকি কম লাভেও ডিম ও মুরগি বিক্রি করে দেয়, যাতে দেশীয় খামারীরা লোকসান গুনতে বাধ্য হয়। দৈনিক সংগ্রামের ওই রিপোর্টে জানানো হয়েছে, দেশের ৪০ শতাংশের বেশি পোল্ট্রি খামার এরই মধ্যে বিদেশিদের দখলে চলে গেছে এবং এভাবে চলতে থাকলে পোল্ট্রি শিল্পের সম্পূর্ণটুকুই তারা দখল করে নেবে।
বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও  ও দেশীয় খামারীদের বিপদ বাড়িয়ে চলেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও দেশীয় ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ঘুষ ছাড়া এবং সহজে ঋণ পাওয়া যায় না বলে দেশীয় খামারীরা ঋণের জন্য এনজিওদের কাছে যেতে বাধ্য হন। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এনজিওগুলোও যথেচ্ছ হারে সুদের বোঝা চাপিয়ে দেয়। ওদিকে ডিম ও মুরগি বিক্রির কোনো ক্ষেত্রেই যেহেতু লাভ হয় না বরং লোকসান গুনতে হয় সেহেতু অধিকাংশ খামারীই যথাসময়ে সুদসহ ঋণ পরিশোধ করতে পারেন না। ফলে সুদের পরিমাণ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকে। পরিণতিতে খামারীরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। সে কারণে এরই মধ্যে শত শত খামারী তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। তা সত্ত্বেও এনজিওদের ঋণ ও সুদের কবল থেকে মুক্তি পাননি তারা। এভাবে সব মিলিয়েই দেশীয় খামারীদের জন্য পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে পড়েছে এবং অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে দেশের পোল্ট্রি শিল্প।
বলার অপেক্ষা রাখে না, পোল্ট্রি তথা ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের ব্যবসায় দেশীয় খামারীদের বিপদ আসলেও ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বিদেশি তথা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তারা যে দাবি জানিয়েছেন, আমরা সে দাবিকে সঠিক ও অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত মনে করি। কারণ, দেশীয় খামারীরা যেখানে কয়েক হাজার টাকার পুঁজি বিনিয়োগ করতে গিয়েও এনজিওদের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সেখানে কয়েক কোটি টাকাও সহজেই বিনিয়োগ করে। একই কারণে তাদের পক্ষে যে কোনো দামে ডিম ও মুরগি বিক্রি করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে দেশীয় খামারীদের নাভিশ্বাস ওঠে। তার ওপর রয়েছে এনজিওদের সুদের ব্যবসা, যার পেছনেও প্রকারান্তরে বিদেশিরাই প্রধান ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছে।
আমরা মনে করি, এমন অবস্থায় সরকারের উচিত দেশীয় খামারীদের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেয়া। সরকারকে এমন কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো উদ্দেশ্যমূলকভাবে যথেচ্ছ দামে ডিম ও মুরগি বিক্রি করতে না পারে। এজন্য প্রথমে ডিম ও মুরগির উৎপাদন ব্যয় হিসাব করে তার ভিত্তিতে বিক্রির ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করে দিতে হবে। ঘুষ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার শিকার না হয়ে দেশীয় ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে খামারীরা যাতে সহজ শর্তে ঋণ পেতে পারেন সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। এনজিওদের ব্যাপারেও সরকারের দায়িত্ব কঠোর হওয়া। কারণ, এনজিওগুলো অতি উচ্চ হারে সুদ আদায় করে বলেও খামারিদের লোকসানের মুখে পড়তে হয়। সব মিলিয়ে আমরা এমন আয়োজন নিশ্চিত করার দাবি জানাই, দেশীয় খামারীরা যাতে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য না হন এবং তারা যাতে কম পরিমাণে হলেও লাভে থাকতে পারেন। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত নি¤œ মানের ব্যবসা হিসেবে দেখার পরিবর্তে পোল্ট্রি তথা ব্রয়লার মুরগি ও  ডিমের ব্যবসাকেও দেশীয় একটি শিল্প খাত হিসেবে বিবেচনায় নেয়া এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতার পাশাপাশি প্রোটেকশন তথা নিরাপত্তা দেয়ার পদক্ষেপ নেয়া।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ