ঢাকা, রোববার 10 December 2017, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এক কিমি রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ৪৮ কোটি টাকা!

কামাল উদ্দিন সুমন : রেলপথ নির্মাণে বড় ধরনের হরিলুট চলছে। এক কিমি রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৪৮ কোটি টাকা। বিশাল এই ব্যয় নিয়ে সম্প্রতি সংসদীয় কমিটিতে তোলপাড় শুরু হয়। কমিটির সদস্যরা পরবর্তী বৈঠকে প্রতিবেশী দেশগুলোর রেলপথ নির্মাণের তথ্যসহ প্রতিবেদন দিতে মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করেছেন।
সূত্র জানায়, চলমান চার প্রকল্পের আওতায় মোট ৩৫৪ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। বাস্তবায়নাধীন এসব প্রকল্পে কিলোমিটার প্রতি রেলপথ নির্মাণ ব্যয়ে রয়েছে বড় ব্যবধান। এক কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে কোথাও ব্যয় হচ্ছে ১৪ কোটি, আবার কোথাও ৪৮ কোটি টাকা। সম্প্রতি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে উপস্থাপিত রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে নির্মাণ ব্যয়ে বড় তারতম্যের এ চিত্র উঠে এসেছে।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কাছে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর রেলপথ নির্মাণ ব্যয়ের তুলনামূলক প্রতিবেদন চেয়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রেলপথ মন্ত্রণালয় রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগের অধীনে একটি সমাপ্ত ও চারটি চলমান প্রকল্পের ব্যয়ের চিত্র উপস্থাপন করে। প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও চীনের রেলপথ নির্মাণ ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কমিটির বৈঠকে জানানো হয়।
এ বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী বলেন, প্রতি কিলোমিটার নির্মাণ ব্যয় বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বেশি ও রেলসংক্রান্ত যন্ত্রাংশ আমদানি নির্ভর। ফলে আমদানি শুল্ক পরিশোধ করার ফলে নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যায়। এসবের প্রভাবে প্রতি কিলোমিটার নির্মাণ ব্যয় বেশি হয়ে থাকে বলে সংসদীয় কমিটিতে রেলপথ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
তিনি  বলেন, প্রতি কিলোমিটারের নির্মাণ ব্যয় ও পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে তুলনামূলক একটি চিত্র দিতে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়েছিল। তার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টরা তাদের প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয়ের তথ্য জানালেও পার্শ্ববর্তী দেশের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে জানিয়েছে। কমিটির পক্ষ থেকে পরবর্তী বৈঠকে সেসব তথ্যসহ প্রতিবেদন দিতে সুপারিশ করা হয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ হবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চলমান ঈশ্বরদী-পাবনা-ঢালারচর নতুন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে ৮৮ দশমিক ৬০ কিলোমিটারের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩৪৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার রেলপথের নির্মাণ ব্যয় ১৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা। কিন্তু খুলনা থেকে মংলা বন্দর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের আরেকটি প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ৪৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, খুলনা থেকে মংলা বন্দর পর্যন্ত ৮৫ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণের ব্যয় ২ হাজার ৫১৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এ রেলপথে ৫ দশমিক ১৩ কিলোমিটার ব্রিজ ও ভায়াডাক্ট রয়েছে। প্রতি কিলোমিটার রেলপথের নির্মাণ ব্যয় ২৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে অনুমোদিত বাস্তবায়ন ব্যয় ৩ হাজার ৮০১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এর সঙ্গে ৭৫১ দশমিক ৮৮ একর ভূমি অধিগ্রহণ ও রিসেটলমেন্ট ব্যয় হিসেবে যোগ হবে ১ হাজার ৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর ফলে কিলোমিটারপ্রতি রেলপথ নির্মাণ ব্যয় উঠে দাঁড়াবে ৪৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগের অধীনে সম্পন্ন হওয়া টঙ্গী-ভৈরববাজার পর্যন্ত ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ছিল ১ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা। এ হিসাবে ৮৬ কিলোমিটার ট্র্যাকের এ রেলপথ নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ২১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
 রেলপথ মন্ত্রণালয় যে চারটি চলমান প্রকল্পের তুলনামূলক  ব্যয়ের তথ্য উপস্থাপন করেছে, তার মধ্যে রয়েছে কালুখালী-ভাটিয়াপাড়া সেকশন পুনর্বাসন এবং কাশিয়ানী- গোপালগঞ্জ-টুঙ্গিপাড়া নতুন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প (দ্বিতীয় সংশোধিত)। এ প্রকল্পে কাশিয়ানী থেকে গোপালগঞ্জ হয়ে গোবরা (টুঙ্গিপাড়া) পর্যন্ত ৫১ দশমিক ৬৮২ কিলোমিটার নতুন লাইন নির্মাণে ব্যয় হবে ১ হাজার ২২৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হবে ২৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
এছাড়া দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে গুনদুম পর্যন্ত ডুয়াল গেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। প্রকল্পটির আওতায় ১২৮ কিলোমিটার (ট্র্যাক কিমি) রেলপথ নির্মাণ করা হবে। প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
জানা গেছে, রেল সরঞ্জাম নির্মাণ ও উৎ্পাদনের নিজস্ব কারখানা নেই দেশে। ফলে এসব সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। এ পর্যায়ে উচ্চহারে আমদানি শুল্ক ও পরিশোধ করতে হয়। এছাড়া ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় তুলনামূলক বেশি। আবার নির্মাণসামগ্রীর দাম ওঠানামার অজুহাতে প্রকল্প ব্যয়ও সংশোধন করা হয়। সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া প্রকল্প গ্রহণ করার ফলেও ব্যয় অত্যধিক হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ