ঢাকা, মঙ্গলবার 12 December 2017, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির হাতেই

* এস কে সিনহা চেয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণ
নাজমুল আহসান রাজু : বহুল আলোচিত নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ বিধিমালার গেজেট প্রকাশ হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের দেয়া সময়ের মধ্যে এই গেজেট প্রকাশ হলো। এখন গেজেট প্রকাশের পর বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা আগে যে অবস্থা ছিল এখনো সে অবস্থায় রয়েছে অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির হাতেই থাকছে। গেজেট প্রকাশে সরকার গত দুই বছরে দফায় দফায় সময় নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট থেকে। সর্বশেষ গত রোববার সরকারকে তিনদিনের সময় দেন আপিল বিভাগ।
জানা গেছে, প্রকাশিত বিধিমালায় নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির হাতেই রয়েছে। সরকার চেয়েছিল নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতেই থাকুক। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে এ ক্ষমতা এখন রাষ্ট্রপতির হাতে। তবে সুপ্রিম কোর্ট এ ক্ষমতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছিল।
সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা বিধিমালায় সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণ চেয়ে আসছিলেন। এই নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিচার বিভাগের টানাপড়েন চলছিল। পদত্যাগের আগে বিচারপতি এস কে সিনহার সঙ্গে টানাপড়েন চরম পর্যায়ে পৌঁছে।
গতকাল সোমবার বিকালে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন প্রমোটিং ইকোয়ালিটি, জাস্টিস এন্ড হিউম্যান রাইটস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে আসার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গেজেট প্রকাশের এ তথ্য জানান আইনমন্ত্রী। আনিসুল হক বলেন, শৃঙ্খলা বিধির গেজেটে হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ আগে প্রকাশ শুরু হয়ে গেছে।
আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক গণমাধ্যমকে জানান, বিজি প্রেস  থেকে বিধিমালা আসার পর তা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।
পদত্যাগ করা প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ বিধিমালায় সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিলেন। কিন্তু সরকারের আইন মন্ত্রনালয় রাষ্ট্রপতির হাতে নিয়ন্ত্রণ রেখে গেজেট প্রকাশ করতে চেয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের অভিপ্রায় অনুযায়ী বিধিমালার খসড়া না করায় সর্বোচ্চ আদালত আইন মন্ত্রনালয়ের দুই বিভাগের সচিব গত বছর ৮ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের তলব হজির হয়েছিলেন। তখন বঙ্গভবন থেকে বলা হয়েছিল নি¤œ আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ বিধিমালার গেজেটের প্রয়োজন নেই। এই নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয় তখন। সংশ্লিদের মতে এই বিরোধও বিচারপতি এস কে সিনহার পদত্যাগের অন্যতম কারণ। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভিযোগ করেছিলেন, ‘রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায় তারা ভাগ বসাতে চায়।’ এই বিরোধের জের থেকে সরকার বিচারপতি এস কে সিনহার ওপর নাখোশ হয়েছিলেন।
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আপিল বিভাগে অবৈধ ঘোষণার রায় বহালের পর এস কে সিনহা গত ১১ নবেম্বর প্রধান বিচারপতি পদ ছাড়লেও তার বিদায়ের নেপথ্যের এই বিধিমালার বিষয়টিও রয়েছে। গেজেট প্রকাশের পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বক্তব্যেও এস কে সিনহার ওপর ক্ষোভ প্রকাশে বিষয়টি আরো প্রকাশ এলো।
ষোড়শ সংশোধনীর অবৈধ ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায়ে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাসহ আপিল বিভাগের তিন বিচারপতি বলেছিলেন, নিম্ন আদালতের বিচারকদের কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরিসহ শৃঙ্খলা বিধান নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী।
তবে ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে মামলায় ১১৬ অনুচ্ছেদ বিচার্য বিষয় না হওয়ায় ওই অভিমতের সঙ্গে একমত হননি অন্য চার বিচারপতি।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ১৯৭২ সালের আদি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, অধস্তন আদালতের বিচারকদের কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরিসহ শৃঙ্খলা বিধান নিয়ন্ত্রণ করবেন সুপ্রিম কোর্ট। চতুর্থ সংশোধনীতে ‘সুুপ্রিম কোর্ট’-এর জায়গায় ‘প্রেসিডেন্ট’ শব্দ সন্নিবেশন করা হয়েছে, যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অধস্তন আদালতকেও স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের জায়গায় প্রেসিডেন্ট শব্দ সন্নিবেশনের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের স্বাধীনতা পুরোটাই খর্ব করা হয়েছে।
আনিসুল হক বলেন, মাননীয় সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ কিন্তু অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হচ্ছে। তাদের সাথে একটা ঐকমত্যে পৌঁছে এই শৃঙ্খলা বিধির গেজেট প্রকাশ করা হচ্ছে। বিচারপতি এস কে সিনহা এই বিধিমালা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছিলেন বলে অভিযোগ করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই শৃঙ্খলা বিধি নিয়ে অনেক নাটক হয়েছিল। আমি আজ আপনাদের বলব, বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। একজন ব্যক্তি এটাকে রাজনীতিকরণ করার চেষ্টার কারণে এটা বিলম্বিত হয়েছিল। সেটা যখনই রিমুভড হয়ে গেছে, আমরা কিন্তু বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগের ঐকমত্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মতিতে আজকে গেজেট করতে পেরেছি।
তার পদত্যাগের পর গত ১৬ নবেম্বর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা ও আপিল বিভাগের আরো চার বিচারপতির সঙ্গে বৈঠক করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। ওই বৈঠকে চূড়ান্ত হয় বিধিমালার।
১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার চূড়ান্ত রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদাকরণের রায় দেন। রায়ে আপিল বিভাগ বিসিএস (বিচার) ক্যাডারকে সংবিধান পরিপন্থি ও বাতিল ঘোষণা করে। একইসঙ্গে জুডিশিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র সার্ভিস ঘোষণা করা হয়। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার জন্য সরকারকে ১২ দফা নির্দেশনা দেন সর্বোচ্চ আদালত। নির্দেশনার মধ্যে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশনাও ছিল।
রায়ের পর দুইটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও তারা বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার পদক্ষেপ নেয়নি। জরুরি অবস্থার সরকার ক্ষমতায় এলে ২০০৭ সালের ১ নবেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা হয় বিচার বিভাগ। তখন থেকে শুরু হয় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসির কার্যক্রম। এরমধ্যে বিচারক নিয়োগে আলাদা জুডিশিয়াল সার্ভিসের যাত্রা শুরু হয়। বিচাকদের জন্য আলাদা বেতন স্কেলও রয়েছে।
মাসদার হোসেন মামলার রায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০১৫ সালের ৭ মে আইন মন্ত্রণালয় নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ বিধিমালার একটি খসড়া প্রস্তত করে সুপ্রিম কোর্টে পাঠায়। সরকারের খসড়াটি ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার অনুরূপ হওয়ায় তা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থী বলে গত বছর ২৮ আগস্ট শুনানিতে অভিমত দেন আপিল বিভাগ। এরপর ওই খসড়া সংশোধন করে সুপ্রিম কোর্ট আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। একইসঙ্গে তা চূড়ান্ত করে গেজেট আকারে আদালতে উপস্থাপন করতে বলা হয় আইন মন্ত্রণালয়কে। এরপর দফায় দফায় সময় দেয়া হলেও সরকারের গড়িমসিতে বিধিমালার গেজেট প্রকাশের বিলম্বিত হতে থাকে।
আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ শৃঙ্খলা বিধিমালার যে খসড়া সুপ্রিম কোর্টে জমা দেয়া হয়েছিল, গত ৩০ জুলাই তা গ্রহণ না করে মন্ত্রণালয়ের শব্দচয়ন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ