ঢাকা, মঙ্গলবার 12 December 2017, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ সার্ভিস-এ কল করলেই পৌঁছে যাবে পুলিশ অ্যাম্বুলেন্স ফায়ার সার্ভিস

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাস্তায় একা একা হাঁটছেন, সন্দেহভাজন কিছু লোক আপনার পিছু নিয়েছে। এখুনি পুলিশের সহযোগিতা পেলে ভালো হত। কিন্তু আপনার কাছে নিকটস্থ থানার কারো নম্বর নেই। পুলিশের অ্যান্ড্রয়েট অ্যাপস থেকে যে নম্বরটা বের করবেন তার উপায় নেই কারণ আপনার কাছে সাধারণ ফোন! ডায়াল করুন ৯৯৯ এ। শুধু আপনার অবস্থান বলে সহযোগিতা চান, বাকি কাজটা তারাই করবে। দেখতে দেখতে পুলিশ এসে হাজির হয়ে যাবে।
কিংবা, মধ্যরাত। পরিবারের একজন হুট করে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। জরুরি অ্যাম্বুলেন্স লাগবে। পরিচিত কেউ ফোন ধরছে না। খুব বিপদ! নিশ্চিন্তে ডায়াল করুন ৯৯৯ এ। অ্যাম্বুলেন্স বাসার গেট এ হাজির হয়ে যাবে।
অথবা, পাশের বাসায় আগুন লেগেছে? ফায়ার সার্ভিস এর ফোন নম্বর নাই? দ্রুত আগুন নেভানো দরকার। কি করবেন বুঝতে পারছেন না? নম্বর একটা জুটল কিন্তু মোবাইলে ব্যাল্যান্স শেষ! ডায়াল করুন টোল ফ্রি ৯৯৯ এ। পৌঁছে যাবে ফায়ার সার্ভিস এর দল।
বিষয়টাকে ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বের গল্প মনে করে ভুল করবেন না। এটা এখন বাংলাদেশের বাস্তবতা। আমরা প্রবেশ করতে যাচ্ছি নতুন এক বাংলাদেশে। যেখানে আপনার জরুরি প্রয়োজনে দিন রাত কান পেতে রয়েছে ন্যাশনাল হেল্প ডেস্কের স্বেচ্ছাসেবকরা। বিপদে ডায়াল করুন ৯৯৯।
বাংলাদেশ পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্লাস ওয়ানের সেবাসমূহের সমন্বয়ে এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে। জনগণের চাহিদা মোতাবেক এই সেবার সঙ্গে আরো নানা উদ্ভাবন যুক্ত করে ভয়েস সার্ভিসসহ তা পূর্ণোদ্যমে চালু হচ্ছে।
গত বছরের ১০ নবেম্বর বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো নাগরিকদের জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সহায়তা দিতে জাতীয় ন্যাশনাল হেল্পডেস্ক (৯৯৯) সেবা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে সরকার। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ পরিচালিত একটি পাইলট কর্মসূচির আওতায় জরুরি প্রয়োজনে সার্ভিসটি চালু হয়েছে।
সেটি এখন দেশব্যাপী সম্প্রসারিত হচ্ছে। দেশের মানুষের দোরগোড়ায় জরুরি ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশী সেবা পৌঁছে দিতেই এ সিদ্ধান্ত।
ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি পুলিশি সেবা ‘৯৯৯’ নম্বরের সম্প্রসারিত ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হচ্ছে আজ মঙ্গলবার। সকাল ১১টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে কল সেন্টারটি সার্বক্ষণিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ইতোমধ্যে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের ৬৪ জেলায় ৯৯৯-এর ব্যবহার, প্রচার ও কমিউনিটি সেফটি এওয়ারনেস কর্মশালা সম্পন্ন করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি সহেলী ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেন, দেশের যেকোন প্রান্ত থেকে যে কেউ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ৯৯৯ নম্বরে সম্পূর্ণ ‘টোল ফ্রি’ কল করে জরুরি পুলিশী সেবা, ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিতে পারবেন। তিনি বলেন, ৯৯৯ নম্বরে আগে জরুরি প্রয়োজনে শুধু পুলিশী সেবা পাওয়া যেতো। এখন এই সেবাটি সম্প্রসারণ করে ফায়ার সার্ভিস ও এম্বুলেন্সে যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া এ সার্ভিসটি বিশ্বমানের করা হচ্ছে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, কেউ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহায়তা চাইলে সার্ভিসের প্রশিক্ষিত এজেন্টরা জরুরি মুহূর্তে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ বা অ্যাম্বুলেন্স সেবা প্রদানকারীর সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। সাধারণ জনগণকে সেবা প্রদান প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজতর করতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সহায়তায় ৯৯৯ সেবা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সহেলী ফেরদৌস বলেন, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হকের তত্বাবধানে পুলিশ সদর দফতরের আইসিটি ডেস্কের মাধ্যমে ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্টের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এই সেবার কারিগরি ও প্রযুক্তিগত কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত-৯১১, যুক্তরাজ্যে ব্যবহৃত-৯৯৯ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ব্যবহৃত-১১২’র আদলে তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে কল সেন্টারটি সার্বক্ষণিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এখন যে কোন ব্যক্তি জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিতে পারবেন। ইতোমধ্যে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের ৬৪ জেলায় ৯৯৯ এর ব্যবহার, প্রচার ও কমিউনিটি সেফটি এওয়ারনেস কর্মশালা সম্পন্ন করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ প্রথম ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সার্ভিস-৯৯৯ এর কাঠামো তৈরির কাজ শুরু করে। ৯৯৯ নম্বরের মাধ্যমে জনগণকে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য জরুরি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত এই সার্ভিসটির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সর্বস্তরের জনগণের জন্য টেলিফোন ও মোবাইল ফোন ভিত্তিক অভিন্ন হেল্প ডেস্ক চালু করা। কারণ আগে ব্যবহৃত ৯৯৯ নম্বরে শুধুমাত্র টিএন্ডটি নম্বর দিয়ে ফোন করা যেতো। এর ফলে রাস্তাঘাটে বিভিন্ন স্থানে অপরাধ বা দুর্ঘটনা সংঘটিত হলে মানুষ পুলিশকে তৎক্ষণাৎ জানাতে পারতো না। বর্তমানে মোবাইল ফোনে তথ্যের আদান-প্রদান সুবিধাজনক হওয়ায় সংঘটিত অপরাধ বা দুর্ঘটনা দেখা মাত্রই যে কেউ ঘটনাস্থল থেকে ৯৯৯ নম্বরে জানাতে পারবেন।
৯৯৯ জরুরি সেবাকে পূর্ণাঙ্গভাবে পরিচালনার জন্য তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। পরবর্তীতে এই জরুরি সেবা কার্যক্রম বাংলাদেশ পুলিশের মাধ্যমে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
পুলিশের অধীনে পরিচালিত জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ প্রদান পদ্ধতিতে এই প্রথমবারের মতো সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
ব্যবহার বিধি
জরুরি সেবা নিতে যেমন পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ইত্যাদি যে কোন মোবাইল থেকে ৯৯৯ ডায়াল করুন। এটাতে ফোন করলে ব্যালেন্স কাটবে না। এই নম্বরটি টোল ফ্রি। বিনামূল্যে এই সেবা পাবেন। ল্যান্ডফোন থেকে কল করা যাবে না। শুধুমাত্র মোবাইল থেকে। দিন রাত যে কোন সময় কল করা যাবে।
অ্যাম্বুলেন্স এর টাকা দিতে হবে। দেশের কোন সংস্থা বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেয়না। তাই এখানে কল করলে যে অ্যাম্বুলেন্স আসবে তাকে তার নির্ধারিত ফি দিতে হবে। এটা সারা দেশের জন্য একটি সার্ভিস। কেউ ভুল তথ্য দিলে তার রেকর্ড থাকবে। যে ফোন থেকে কল আসবে সেটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
যে কোন প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়া যাবে। রাস্তার পাশে জুয়ার আসর বসেছে? বস্তিতে আগুন লেগেছে? রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটেছে? এমন অনেক জনহিতকর ঘটনার যেকোনো তথ্য জানাতে পারবেন।
সাবধানতা
ভুলেও অপ্রয়োজনে কল দিবেন না। আপনার যাবতীয় তথ্য থাকবে ডাটাবেজে। একবার "প্রাংক কলার" হিসেবে এনলিস্টেড হলে আসল বিপদে আর সাহায্য পাবেন না! তুচ্ছ তথ্যের জন্য ফোন দিয়ে লাইনে ব্যস্ত না রাখাই ভালো। কে জানে আপনার চেয়ে বিপদাপন্ন একজন হয়ত ওয়েটিং এ আছেন।  শিশুরা যাতে ভুলে কল না করতে পারে এই জন্য ফোন লক করে রাখুন।  কল সেন্টারের কর্মী কে প্রয়োজনীয় তথ্য চাহিদা মাফিক প্রদান করুন। আপনার সকল তথ্য খুবই ‘কনফিডেনসিয়াল’ হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে। মনে রাখবেন, সে আপনাকে সাহায্য করার জন্যই কাজ করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ