ঢাকা, বৃহস্পতিবার 14 December 2017, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অনুতপ্ত হলে সাধুবাদ জানাবো

জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি প্রদানের পর ক্ষোভে ফুঁসছে সমগ্র ফিলিস্তিন। গত শুক্রবার ‘ক্রোধের দিবস’ পালন করেছে ফিলিস্তিনী জনগণ। জুমা নামাযের পর সংক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনীরা ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এ সময় ইসরাইলী নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কয়েক জায়গায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আটক করা হয়েছে অনেককে। গাজায় সংঘর্ষের সময় দুই ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছেন।
গত বুধবার জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন সমর্থন ঘোষণা করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এ পদক্ষেপের নিন্দা জানায় ফিলিস্তিন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিকাংশ দেশ, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র দেশও। এমন অবস্থায় উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ৮ ডিসেম্বর জরুরি বৈঠকে বসে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। ট্রাম্পের অন্যায় ঘোষণার পরদিন বৃহস্পতিবার নতুন করে ইন্তিফাদার (গণঅভ্যুত্থান) ডাক দিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। শুক্রবার পবিত্র আল-আকসা মসজিদে জুমা নামায আদায়ের পর মুসল্লিরা বিক্ষোভ প্রদর্শনের চেষ্টা করলে বাধা দেয় ইসরাইলী সৈন্যরা। পশ্চিম তীরের নাবলুস, হেবরন ও বেথেলহেমে এবং গাজায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ইসরাইলী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণার বিরুদ্ধে গত শুক্রবার বিক্ষোভ হয়েছে তুরস্কের ইস্তাম্বুল, মায়েশিয়ার কুয়ালামপুর, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা, পাকিস্তানের লাহোর, লেবাননের বৈরুত, ভারতের কাশ্মীর, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বিভিন্ন দেশের শহরে শহরে। বিক্ষোভ সমাবেশে পোড়ানো হয় ট্রাম্পের কুশপুত্তলিকাও।
এ মাসের শেষের দিকে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের। সেখানে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে। কিন্তু ওই সফরে পেন্সকে স্বাগত জানানো হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেছেন, তেলআবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস সম্ভবত আগামী দুই বছরের মধ্যে জেরুসালেমে স্থানান্তর করা হবে না। প্যারিসে ৮ ডিসেম্বর ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-ইভ লুদরিয়ঁর সঙ্গে বৈঠকের সময় তিনি একথা বলেন। প্রশ্ন জাগে, তেলআবিব থেকে জেরুসালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে কেন? আর জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ট্রাম্প স্বীকৃতি দিতে গেলেন কেন? বিশ্ববাসী জানে যে, মুসলমানদের প্রথম কেবলা বায়তুল মুকাদ্দাস পবিত্র নগরী জেরুসালেমে অবস্থিত। এই নগরীর সাথে জড়িত রয়েছে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতি এবং দীর্ঘদিনের আবেগ-উচ্ছ্বাস। মুসলমানদের এমন একটি পবিত্র নগরীকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে গেল কোন কান্ডজ্ঞানে? প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে আসছেন। আর এবার নতুন এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি যেন আবার ওই অঞ্চলে নতুন করে অশান্তির আগুন জ্বাললেন। প্রশ্ন জাগে, মার্কিন শাসকদের কাজ কি পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করা এবং মুসলমানদের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া? মার্কিন শাসকদের কাছে এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই।
তাই আমরা মনে করি, জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেয়া হবে একটি সঙ্গত কাজ। কারণ এটাই সময়ের দাবি।
ট্রাম্প প্রশাসন সঙ্গত কাজ করবে কিনা সেটা তাদের বিষয়, কিন্তু মজলুম মুসলিম উম্মাহ কি সময়ের নিরিখে সঙ্গত দায়িত্ব পালন করছে? মুসলিম হতে হলে তো জীবনযাপনের বিচিত্র সম্পর্ক সূত্রে ¯্রষ্টার নির্দেশকে মানতে হয় এবং এই মানার কাজে অনুসরণ করতে হয় বিশ্বনবীর মানহাজ বা কর্মপদ্ধতি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আলোকিত এই পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণেই পথভ্রষ্ট মুসলিম উম্মাহ আজ অধপতিত এবং নির্যাতিত-নিপীড়িত পবিত্র কুরআনের সূরা আলাকে মহান আল্লাহ আমাদের কালাম এবং কলমের চর্চা করতে বলেছেন। অর্থাৎ একই সাথে আমাদের মহাগ্রন্থ আল কুরআন এবং মহাবিশ্বকে অধ্যয়ন করতে হবে। জ্ঞানের সমন্বয় সাধনের এই দায়িত্ব পালনে মুসলিম উম্মাহ ব্যর্থ হওয়ায় তারা সংকটে পড়েছে। বর্তমান সভ্যতাও চলছে ভ্রান্তপথে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভুল কাজের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ফলে ব্যক্তি ট্রাম্পের সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্রও এখন পড়েছে ইমেজ সংকটে। পবিত্র জেরুসালেম নগরীকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন স্বীকৃতির ঘটনায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে তোপের মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি দেশটির মিত্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সও ট্রাম্প প্রশাসনের ওই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। কার্যত নিরাপত্তা পরিষদের পুরো বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র কোণঠাসা হয়ে পড়ে। খবরটি পরিবেশন করেছে বিবিসি, মিডল ইস্ট মনিটর, ইন্ডিপেনডেন্ট।
উল্লেখ্য যে, নিরাপত্তা পরিষদের অর্ধেকের বেশি সদস্য দেশের আহ্বানে ওই জরুরি বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। ৮ ডিসেম্বর শুক্রবার নিউইয়র্ক জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিষয়টির মীমাংসায় ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেয় যুক্তরাজ্য। আর যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা থাকায় এ নিয়ে ভোটাভুটির জন্য কোন প্রস্তাব তোলা হয়নি। বৈঠকে জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের স্থায়ী প্রতিনিধি ম্যাথিউ রায়ক্রফট বলেন, বৃটিশ দূতাবাস তেলআবিব থেকে রেুজসালেমে স্থানান্তরের কোন পরিকল্পনা লন্ডনের নেই। যুক্তরাজ্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে। এদিকে ফ্রান্সের প্রতিনিধি ফ্রাঁসোয়া ডেলাত্রে বলেন, ট্রাম্পের ঘোষণায় প্যারিস উদ্বিগ্ন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের এমন অবস্থান পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই আরও ভয়ানক পরিণতি নিয়ে আসছে। আর জাতিসংঘে নিযুক্ত রুশ প্রতিনিধি ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া বলেন, ট্রাম্পের ঘোষণায় মস্কো মারাত্মকভাবে উদ্বিগ্ন। রাশিয়া মনে করে এই ঘোষণার ফলে মধ্যপ্রাচ্য সংকট আরও জটিল আকার ধারণ করবে।
নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে বড় বড় দেশগুলোর প্রতিনিধিরা যেসব বক্তব্য রেখেছেন তাতে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে যে, জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন একটি মন্দ কাজ করেছে এবং এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ডেকে আনবে আরও ভয়ানক পরিণতি। এসব কথা ভাল কথা, ঠিক কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিষয়টি এতো স্পষ্ট হওয়ার পরও বর্তমান সভ্যতার কর্ণধাররা ভয়ানক পরিণতি ঠেকানোর জন্য কার্যকর কোন ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসবেন কী? নাকি সবই শুধু অভিনয় কিংবা চাতুর্য? ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে অনেকেই এক সময় ইসরাইলের প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছেন এবং ওদের আগ্রাসনে সাহায্য করেছেন। সবাই মিলেমিশেই তো ভূমিপুত্র ফিলিস্তিনীদের উদ্বাস্তু করেছেন। তবে অতীত অপকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে এখন যদি কেউ মজলুমের পক্ষে দাঁড়াতে চান তাহলে আমরা তাদের সাধুবাদ জানাবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ