ঢাকা, শুক্রবার 15 December 2017, ১ পৌষ ১৪২৪, ২৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হিমেল ঋতুর বার্তা নিয়ে ‘পউষ’ এসেছে

সাদেকুর রহমান : “মওসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। উপ-মহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ বিহার ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের নদী অববাহিকা ও তৎসংলগ্ন এলাকায় মাঝারী থেকে ঘন কুয়াশা এবং অন্যত্র হালকা থেকে মাঝারী ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে। সারাদেশে রাতের তাপমাত্রা (১-২) ডিগ্রী সে. হ্রাস পেতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। ”
গতকাল বৃহস্পতিবার অগ্রহায়ণ মাসের শেষ দিন সন্ধ্যা ছয়টায় এভাবেই পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টার পূর্বাভাস জানায় আবহাওয়া অধিদফতর। এদিন সারা দেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় রাজারহাটে ১২ দশমিক ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস। একই দিন ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৮ দশমিক ৪ ডিগ্রী। এদিন ঢাকার আকাশ ছিল বড়ই গুমোট। সকালে কুয়াশা পড়লেও রাত ও দিনে সামান্য গরম অনুভব করছেন নাগরিকরা। এমনিতরো এক আবহে পঞ্জিকার ধারবাহিকতায় বাংলা প্রকৃতিতে এসেছে ‘পউষ পাগল বুড়ি’।
আজ শুক্রবার পয়লা পৌষ। প্রবচন সাক্ষ্য দেয় ‘তেরোই ভাদ্র শীতের জন্ম’। কিন্তু বাংলা ঋতুক্রমে পৌষেই শুরু হয় শীতকাল। বাংলা বর্ষপঞ্জিকা অনুসারে, এ হিমেল ঋতুর দৈর্ঘ্য পৌষ ও মাঘ (মধ্য ডিসেম্বর থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি) এই দুই মাস। এ সময় সূর্য দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থান করে বলে বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে সূর্যের রশ্মি পড়ে তীর্যকভাবে। সূর্য মকরক্রান্তি বরাবর অবস্থান নেয়ায় দিন ক্রমেই ছোট হয়ে আসে। বাংলাদেশের উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা। সেখান থেকে বরফশীতল বায়ু বাংলাদেশের ওপর কমাতে থাকে তাপমাত্রা, অনুভূত হয় শীত। বাড়ে রাতের দৈর্ঘ্য, কমে দিনের।
‘বাঘ কাঁপানো শীতের’ আরেক মাস মাঘের অগ্রজ হলো পৌষ। কবি-সাহিত্যিকরা মমতা দিয়ে ডাকে ‘পউষ মাস’। পল্লীকবি জসীম উদদীন বলেছেন, ‘পউষ পাগল বুড়ি’। বঙ্গাব্দে অন্যসব মাসের মতোই পৌষ মাসের নামটি রাখা হয়েছে ‘পুষ্যা’ তারার নামানুসারে।
পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই চারটি ঋতু। শীত ঋতু আছে বিশ্বজুড়েই। পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের শীতের সঙ্গে বাংলাদেশের শীতের পার্থক্য বিস্তর। কোনো কোনো দেশে তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রীতে নেমে আসে। খুব কাছের দেশ চীনেও তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নয়-দশ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়! মেরু অঞ্চল বা এন্টার্কটিকার কথা তো বলাই বাহুল্য। অথচ বাংলাদেশে তাপমাত্রা ছয় থেকে পাঁচ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে খুব একটা নামে না। সেদিক থেকে বাংলাদেশের শীত অনেকখানি উপভোগ্য। ‘কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ’- শুভাশুভ দুই বার্তায় নিয়ে ঋতুচক্রে বাংলার প্রকৃতিতে ফিরে আসে পৌষ মাস। অগ্রহায়ণ গ্রামবাংলায় যে নবান্ন উৎসব এনে দেয় তা অব্যাহত রাখে পার্বনের মাস রসালো পৌষ। পৌষ পার্বণ মানে নতুন চালে পিঠা-পুলির উৎসব। কৃষকের গোলায় নতুন ধান। পৌষের প্রধান ঐশ্বর্য খেজুরের রস। খেঁজুরের গাছে গাছে রসের টিলা। পৌষের শীতে বাড়িতে বাড়িতে চলে পিঠাপুলির আয়োজন। পিঠার গন্ধে ম’ ম’ করে সারা গ্রাম। বাংলার পিঠাপুলির যেমন রয়েছে নাম-প্রকারের বৈচিত্র্য, তেমন বৈচিত্র্যময় এর স্বাদ। মুখে মুখে ফিরে খেজুর রস, মালপোয়া, পুলিপিঠা, আন্দেশা, এলোকেশী, জামাইমুখ, পদ্মদিঘি, চন্দ্রপুলি, কন্যামুক, ময়ূর পেখম, পাটিসাপটা, মুগপাকন, ভাঁপাপিঠা আর ছিটপিঠার নাম। এ সময় গৃহস্থবাড়ির আঙ্গিনা থেকে কাঁচাবাজার পর্যন্ত লালশাক, পালংশাক, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, শিম, লাউ, শালগম, লেটুস আরও কত টাটকা শাক-সবজির সমাহার থাকে। সূর্যরশ্মির স্পর্শে আসা শিশির কণার মতো এসব পসরার ডালিও দারুণ মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে দেয়।
 শৈত্যপ্রবাহের পূর্বাভাস থাকায় মানুষের প্রস্তুতিতে এসেছে নানামাত্রিকতা। গ্রামবাংলায় দিনের তুলনায় রাতে বেশ শীত করে। দুস্থ, গরীবরা যেমন-তেমন, সামর্থ্যবানরা ‘উম’ খুঁজছে লেপ- তোষক আর কম্বলের মধ্যে। এ সময়টা ধুনকারদের পোয়াবারো। শীতকে পুঁজি করে নগরেও গরম বস্ত্র ও পিঠা বিক্রির ধুম পড়ে গেছে। রাজধানী ঢাকার শীতবস্ত্র ও পিঠার দোকানগুলোতে ভিড় বেড়ে গেছে।
পৌষ তথা শীতকাল রুক্ষতা-শুষ্কতার প্রতীক হলেও বাংলার প্রতিটি জনপদ লৌকিক উৎসবে মুখর থাকে। যাত্রাপালা, পুঁথিপাঠ ও পিঠামেলা অনুষ্ঠিত হয় অনেক জায়গায়। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) কর্তৃক  বৈশাখ ১৩৯০ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের মেলা’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, পৌষ মাসে সারা দেশে ৭০টি মেলা ও পার্বণ হয়ে থাকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ