ঢাকা, শনিবার 16 December 2017, ২ পৌষ ১৪২৪, ২৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশ ও বিশ্বজুড়ে শিশু হত্যা ও নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি

এডভোকেট আব্দুস সালাম প্রধান : [চার]
বাংলাদেশে বিচিত্র ধরনের শিশু নির্যাতন : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে বিচিত্র রকমের শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে। ১৯৯০ সালের পর শিশু শ্রম বন্ধের ব্যাপারে একটা গণ সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। বর্তমানে সে ধরনের কোন প্রচারণা অনেকটাই স্তিমীত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে মায়ের দুধ খাওয়া শিশু থেকে ১৪/১৫ বৎসর বয়সী কিশোররা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। উঠতি বয়সের কিছু যুবক মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য অনেক বিত্ববান ঘরের স্কুলগামী ছোট ছোট বাচ্চাকে অপহরণ করে আটকে রেখে মোটা অংকের মুক্তিপণ দাবী করছে। এ ধরনের ঘটনায় অপহৃত বাচ্চারা যে কি ধরনের মানসিক নির্যাতনের শিকার হন তা বলার কোন ভাষা আমার জানা নাই। একটি ছোট শিশু যখন বাবা মা ভাইবোন, দাদা-দাদীর আদর সোহাগে বড় হতে থাকে। বাচ্চাটি অবুঝ মন সব সময় ভীত শঙ্কিত থাকে। সেই বয়সে বাচ্চাটি যখন অপহৃত হয় তখন তার মনের অবস্থাটা কি রকম হতে পারে। এ যেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সেই কবিতার লাইনের মত
“ভয় তরাসে ছিল যে সবচেয়ে
সেই খুলেছে আঁধার ঘরের চাবী”।
মুক্তিপণের দাবীতে অপহৃত অনেক শিশু মুক্তিপণের টাকা না পাওয়ার কারণে অপহরণকারী নরপশুদের হাতে নিহত হয়েছে। তাদের অনেকে অভিভাবকদের দ্বারা টাকা না পেয়ে বা অভিভাবকদের পুলিশকে খবর দেয়ার অপরাধে অকালে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। হয়ত বাচ্চাটির লাশ নদী, খাল-বিল, ড্রেনে খুঁজে পাওয়া গেছে। অনেক সময় মাটি খুঁড়ে শুধুমাত্র তার হাড়গোড় উদ্ধার করা গেছে।  আমার নিজ ইউনিয়নে ভাগজোয়ার গ্রামে একটি ৫ বছরের বাচ্চাকে ২ জন বখাটে পাট ক্ষেতে নিয়ে গিয়ে বলাৎকার করে স্থানীয় লোকজনের হাতে ধরা পড়ে। বর্তমানে ঐ নরপশু ২ টির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ঘটনাটি এতই করুণ যে যা তুলে ধরার ভাষা আমার জানা নাই।
কর্মস্থল/অন্যের বাসাবাড়ীতে কাজ করা শিশুদের নির্যাতন : আধুনিকতার জোয়ারে অনেকটা গা ভাসিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। তথাকথিত জীবন মানের উন্নয়নের সয়লাবে এখন রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে লক্ষ কোটি বহুতল ইমারত নির্মিত হয়েছে। এসব আধুিনক ইমারতে আধুনিক বিত্তশালীরা অনেক বিত্তশালী বৈভবের সংষ্পর্শে এসে মানুষ হিসাবে তার যে আচরণ হওয়ার কথা ছিল তা হারিয়ে ফেলেছে। আধুনিক পরিবারের অনেক বাসায় বয়স্ক, বয়স্কা মহিলা থেকে শুরু করে ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ বছর বয়সের শিশুরা কাজ করছে। এসব পরিবারের অনেকের মন মানসিকতা খুবই প্রসংশনীয়। তবে মাঝে মধ্যে পত্র পত্রিকায় এবং ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় প্রকাশিত কোন কোন গৃহকর্তা  বা গৃহকর্তী কর্তৃক কাজের শিশুদের উপর নিষ্ঠুর নির্যাতনের খবরে আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই। গত ২৫ বছর পর্যন্ত সময়ে শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বাসাবাড়ীতে অসংখ্য শিশু নির্যাতিত হবার খবর প্রকাশিত  হয়েছে। এসব বাসাবাড়ীর মালিকরা কাজের বাচ্চাদের কিচেন রুমের মেঝেতে বা কিচেন রুমের কোনায় অত্যন্ত নি¤œমানের বিছানায় শোয়ার ব্যবস্থা করেছেন। বাসার মুল সদস্যগণ যে মানের খাবার গ্রহন করেন। কাজের বাচ্চাদের তার চেয়ে অনেক নি¤œ মানের বা পচাবাসি খাবার দিয়ে থাকেন।  কাজের বাচ্চাদের কোন দিনই তারা উন্নত মানের থালাবাসনে বা খাওয়ার টেবিলে বসে খেতে দেয় নাই।  এসব বাচ্চাদের পোশাক পরিচ্ছদ ও খুব নি¤œমানের দেয়া হয়ে থাকে। এসব অপরিণত বয়সের বাচ্চারা বাড়ীর থালা বাসন মাজা, ঘরের মেঝে মোছা, কাপড় ধোয়া, ঘরের দেয়াল পরিষ্কার করা থেকে সব ধরনের কাজ করে থাকে। এসব বাচ্চাদের ঐসব বাসা বাড়ীতে তালা দিয়ে রাখা হয়।  আত্মীয়স্বজন অভিভাবকরা দেখতে এলেও অনেক সময় তাদের সাথে দেখা পর্যন্ত করতে দেয়া হয় না। এসব বাচ্চাদের বেশির ভাগই  বাংলাদেশের প্রত্যন্ত পল্লীগ্রামে জন্ম নেয়া শিশু। পল্লী বাংলার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করে বড় হতে থাকাবস্থায় নদীর ভাঙ্গন, পিতা কর্তৃক মাতাকে তালাক দেয়া বা পিতা কতৃক অন্যত্র বিবাহ করে চলে যাওয়া, মারাত্মক  অসুখে পড়ে সর্বস্ব খোয়ানো মায়েরা জীবন জীবিকার তাগিদে ঢাকায় পাড়ী জমানো মায়েদের সাথে এরা ঢাকা শহরে পৌছে। রবীন্দ্রনাথের ছুটি গল্পে শিশু চরিত্র ফটিককে যেভাবে শহরে যেতে হয়েছিল সেভাবে এরা আধুনিক মহানগরে চলে আসে। এক সময় মা বাচ্চাগুলিকে দুবেলা খাবার যোগাড় করে দেওয়ার জন্য বা লজ্জা নিবারনের একটু পোশাক দেওয়ার প্রয়োজনে বিভিন্ন বাসা বাড়ীতে কাজে নিযুক্ত করে। ফলে মা ও শিশু এক সময় পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শিশু মনে এই বিচ্ছিন্নতার যে কি প্রভাব পড়ে তার বর্ণনা মানুষ দিতে পারবে না। শুধু কিছুটা অনুভব করতে পারি। এসব বাচ্চাদের অনেকেই দেখা গেছে কোন এক সময় চুরির অপরাধে গৃহকর্ত্রী বা গৃহকর্তা কর্তৃক নির্মমভাবে মার ডাং এর শিকার হয়েছে। তাদের অনেকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ভাজা করার জন্য ব্যবহৃত লোহা পিতল বা এ্যালমোনিয়ামের খুন্তি  গরম করে ছেঁকা দেওয়া হয়েছে। নির্যাতিত শিশুটির সারা শরীরের পুড়ে যাওয়া স্থানে পচন ধরেছে। তার চিকিৎসা পর্যন্ত করা হয় নাই। হয়ত বাচ্চাটির ইলিশ মাছের একটা চাকা খাওয়ার সাধ জেগেছিল। কিন্তু তাকে খাবার দেয়া হয়েছে লেজ বা মাথার  দুপাশের কাটা। গভীর রাতে সুযোগ পেয়ে হয়ত শিশুটি এক টুকরা মাছ খেতে গিয়ে ধরা পড়ে এ ধরনের শাস্তির শিকার হয়। ৩/৪ বৎসর পূর্বে ঢাকার একটি অভিজাত পরিবারের  বাসা থেকে এ ধরনের শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছিল। বাচ্চাটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত স্থানে পচন ধরেছিল। ২/৩ মাস পূর্বে ইউটিউবে একটি ছোট বাচ্চাকে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। তাতে দেখা গেছে বাচ্চাটি কর্মস্থল থেকে কাজ ছেড়ে দিয়েছিল পরে তাকে কয়েকজন নরপশু নির্মমভাবে পিটিয়ে এক পর্যায়ে তাকে মাথার উপর তুলে একাধিকবার আছাড় মেরে শাস্তি দিচ্ছে। চুরির দায়ে সম্প্রতি সিলেটে ১৩ বছর বয়সী সোহেল নামের একটি শিশুকে মারাত্মকভাবে মারপিট করে মাদকদ্রব্য মামলার আসামী হিসাবে থানায় সোপর্দ করার একটি খবর ছবিসহ নভেম্বর/১৭ মাসের দৈনিক সংগ্রামের ছাপা হয়েছে। তারও কয়েকদিন আগে দৈনিক সংগ্রামে ৪ বছরের একটি শিশু বাচ্চাকে চুরির দায়ে চটের বস্তায় মুখ বেঁধে শাস্তি দেওয়ার খবর প্রকাশ হয়েছে। রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ভাগজোয়ার গ্রামের হাসান নামে মাতৃহারা একটি পাঁচ বছরের শিশুকে দুইজন বখাটে যুবক একটি পাটক্ষেতে নিয়ে গিয়ে বলাৎকার করে তাদের বলাৎকারে শিশুটি প্রায় মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌছেছিল। ঘটনাটি এতই করুণ যার তুলে ধরার ভাষা আমার জানা নাই। ঘটনাটি নিয়ে পীরগঞ্জ থানায় একটি মামলা হয়েছে। একজন আসামী জেল হাজতে আছে। এলাকার প্রভাবশালীরা শিশুটির দাদীর উপর মামলাটি উঠায়ে নেওয়ার জন্য মারাত্মকভাবে চাপ প্রয়োগ করে চলছে বলে জানা গেছে। এসব ঘটনা অনেক সময় থানায় মামলা হচ্ছে। কিন্তু নির্যাতন না থেমে মহামারীর আকার ধারন করছে।
বখাটে যুবক দ্বারা স্কুলগামী কন্যা শিশুদের উত্ত্যক্তকরণ বা নির্যাতন : বাংলাদেশের শহর গ্রাম গঞ্জের আনাচে কানাচে একদল উঠতি বয়সের যুবকের উত্থান ঘটেছে। এরা ৩/৪ জন বা ৫/৬ জন বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে এক সঙ্গে আড্ডা দেয়। এদের মাথার চুল পিছনের দিকে পাখির পালকের মতো হয়ে থাকে। পোশাক পরিচ্ছদ কিম্ভুত কিমাকার। এদেরকে বর্তমান সময়ে ঐ এলাকার মুরুব্বী বা তাদের শিক্ষকরা পর্যন্ত  ভয় করে চলে। এদের অনেকেই সব সময় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পরিচয় বহন করে। তাদের সামনে দিয়ে শিশু কিশোরী মেয়েরা স্কুল যাওয়ার পথে বা ফেরার পথে এরা নানাভাবে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করে বা কু প্রস্তাব দেয়। এলাকার মানুষ ভয়ে এদের প্রতিবাদ করতে পারে না। নিরীহ মানুষরা কোন ঝুঁকি ছাড়াই জীবন কাটাতে চায়। বেশ কয়েক বৎসর আগে জেলা শহর গাইবান্ধায় এ ধরনের  একটি ঘটনা ঘটে।
স্কুলগামী ফুটফুটে সুন্দরী একটি মেয়েকে ৪ জন বখাটে যুবক অপহরণের জন্য ধাওয়া করেছিল। মেয়েটি দৌড়ায়ে ইজ্জত বাঁচাতে গিয়ে এক সময় একটি পুকুরে ঝাঁপ দেয়। সাঁতার না জানায় মেয়েটি পানিতে ডুবে মারা যায়। ঘটনাটি ঐ সময় দেশব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল। ঘটনাটির বিষয়ে মোকদ্দমা হয়। বখাটে নরপশুগুলোর প্রাথমিক বিচারে ফাঁসির আদেশ হয়। মামলাটির পরবর্তী অবস্থা কি হয়েছিল তা জানতে পারিনি। ২০১১ সালে আমার নিজ গ্রামের একজন নিরীহ যুবক ফেরদৌস প্রধানের ৩য় শ্রেণীতে পড়–য়া অত্যন্ত সুন্দর একটি মেয়ের জীবন প্রদীপ নিভে গিয়েছিল। ১০ বছর বয়সী মেয়েটিকে স্কুল যাওয়ার পথে চকলেট খাওয়ানোর লোভ দেখায়ে ভাড়া বাসায় ডেকে নিয়ে গিয়েছিল ৪০/৪৫ বছর বয়সের এক নরপশু। মেয়েটিকে তার খালি বাসায় ডেকে নিয়ে গিয়ে পশুটি ধর্ষণের চেষ্টা করে। মেয়েটি ভয়ে চিৎকার দিতে থাকলে তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে। কয়েকদিন পর একটি ধান ক্ষেত থেকে  বাচ্চাটির লাশ খুজে পাওয়া যায়। ঐ বিষয়ে রংপুর নারী শিশু আইনে একটি মামলা হয়েছে যাহার নম্বর ২৩৮/১১। মুল আসামী ধৃত হয়। আসামী আদালতে ঘটনাটির বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেয়। এক পর্যায়ে আসামী হাইকোর্ট থেকে জামিন লাভ করে। মামলাটি এখনও বিচারাধীন আছে।
অতিআবেগী এক শ্রেণীর হজ্জযাত্রী পিতা মাতার দ্বারা শিশু মৃত্যুর কারণ হওয়া : আমি মহান রাব্বুল আলামীনের অশেষ দয়ায় ২০১৪ সালে পবিত্র হজব্রত পালনের  সুযোগ পাই। হজে গিয়ে দেখেছি বর্তমান সময়ে  যে মাসগুলোতে হজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে তা অত্যন্ত গরমকালে। বর্তমান সময়ে মক্কা মদিনার তাপমাত্রা হজর মৌসুমে প্রায় ৪৫-৫৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটে উঠানামা করে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের কিছু আবেগপ্রবন মুসলিম দম্পতি ২-১২ বৎসরের এক দুই, তিন, চার জন এই শিশুকে নিয়ে হজ পালনে যান। এই শিশুদের উপর হজ, রোজা নামাজ কিছুই ফরজ হয় নাই। তথাপীও মক্কা মদিনার তীব্র গরমে বাবা মায়েরা অনেক ছোট বাচ্চাকে পায়ে হেটে নিয়ে মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীতে যেতে দেখেছি। মসজিদুল হারাম এবং মসজিদে নববীতে প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর মুয়াজ্জিন সাহেবকে ঘোষনা দিতে শুনেছি আস সালাতু আলাল আমওয়াতে ওয়াল আতফাল। অর্থ্যাৎ কয়েকজন  মৃত্যব্যক্তি ও কয়েকটি মৃত শিশুর জানাজা পড়ানো হচ্ছে। হজ মৌসুমে অতি আবেগী মা বাবারা কম  তাপমাত্রার আবহাওয়া সম্পন্ন দেশ থেকে যেসব শিশুকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন। ঐ শিশুরা মক্কা মদিনায় অত্যন্ত খড় তাপদাহ সহ্য করতে পারে না। ফলে মারাত্মক গরম তাপমাত্রার কারনে অনেক বাচ্চার  মৃত্যুর কারন হয়। এসব বাচ্চার মৃত্যুর জন্য জাহেলী যুগের সন্তান হত্যাকারী পিতা দের মত এসব হাজী সাহেব যে দায়ী হবেন না তা কি করে বলা যায়। আমি অনেক আগে হজ পালনকারী হাজী সাহেবদের মুখে শুনেছি আমাদের দেশের শীতকালীন সময়ে যখন হজব্রত পালন হত তখন মক্কা মদিনায় তাপমাত্রা অনেক ঠান্ডা থাকত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ