ঢাকা, সোমবার 18 December 2017, ৪ পৌষ ১৪২৪, ২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চলন্ত গাড়িই যেন মৃত্যুর ফাঁদ

কামাল উদ্দিন সুমন : হঠাৎ বিস্ফোরণ। কাভার্ড ভ্যানটির চারদিকে শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া। এরই মধ্যে চিৎকার, করুণ আর্তনাদ লোকজন ছুটে এসে টেনে বের করলো দুই ব্যক্তিকে। শরীরের অনেকাংশই পুড়ে গেছে তাদের।  বাঁচার আকুতিকে তাড়াহুড়া করে তাদের নেয়া হলো হাসপাতালে।  এদের একজন চালক সোহেল রানা অপরজন হেলপার সেলিম হোসেন। নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের লামাপাড়ার সম্প্রতি ঘটনা এটি। চলন্ত কাভার্ডভ্যানের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে এমন ঘটনা ঘটেছে।
সোহেল রানা বলেন, কভার্ডভ্যানটি একটি  কুরিয়ার সার্ভিসের। গাজীপুরের বিভিন্ন কারাখানা থেকে তৈরি পোশাক নিয়ে নারায়ণগঞ্জ আসার পথে লিংক রোডের লামাপাড়া ইকোপার্কের সামনে আসার পরপরই গ্যাস সিলিন্ডার বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যায়। এতে ভ্যানের সামনের ২ চাকা এবং ভ্যানের বাম পাশের পুরো অংশ ও ভ্যানে থাকা তৈরি পোশাক পুড়ে যায়। আগুনে দগ্ধ হন তিনি ও হেলপার সেলিম হোসেন।
মানিকগঞ্জের যাত্রীবাহী বাসে বিস্ফোরণ ঘটে দগ্ধ হয় ১৬জন । লক্ষীপুরে একইভাবে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে পুড়ে যায় গ্যারেজের ১৬টি সিএনজি। এভাবে প্রায়ই  যানবাহনের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে  নিহত হচ্ছে মানুষ। যারা বেঁচে আছে যন্ত্রণায় ধুঁকে ধুঁকে পার করে বাকীটা সময়।
 খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রিটেস্টের মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়েছে। গত তিন বছরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ১৪৩টি  সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গাড়িতে মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় সোয়া দুই লাখ সিএনজিচালিত যানবাহন চলাচল করছে। এর মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি বয়সী সিলিন্ডারের সংখ্যা দেড় লাখেরও বেশি। এগুলোর ৮০ ভাগই পুনঃপরীক্ষা করা হয়নি। সিএনজি নিরাপত্তার আন্তর্জাতিক মান নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডার পাঁচ বছর পরপর রিটেস্টের বিধান রয়েছে। কিন্তু সচেতনতার অভাবে দেশে সিএনজিচালিত গাড়িগুলোর ৮০ শতাংশ সিলিন্ডার রিটেস্ট করা হয়নি। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডার নিয়েই হাজার হাজার যানবাহন রাস্তায় চলাচল করছে। তারই ফলশ্রুতিতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে।
তবে সংস্থাটি গত বছরের ২০ অক্টোবর জনসচেতনতার জন্য একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করে। সেখানে বলা হয়, যান ও মালের নিরাপত্তার স্বার্থে গাড়িতে সংযোজিত সিলিন্ডার এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনের ক্যাসকেড সিলিন্ডার প্রতি ৫ বছর অন্তর পুনঃপরীক্ষা করুন। আরপিজিসিএল এর এই সচেতনতা বিজ্ঞাপনে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং বেড়েই চলেছে দুর্ঘটনা।
সূত্র জানায়, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ৩ হাজার পাউন্ড চাপে যখন গ্যাস ভরা হয় তখন রাস্তায় চলাচলকারী এক একটি গাড়ি যেন চলমান বোমা হয়ে ওঠে। গ্যাস ভরার সময় সিলিন্ডার এমনকি গ্যাসও উত্তপ্ত অবস্থায় থাকে। সিলিন্ডার যথাযথ না হলে বড় রকমের অঘটন ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। দুর্ঘটনাগুলো তারই প্রমাণ।
জানা গেছে, বড় বাস-ট্রাকের বিস্ফোরণের ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ, বাস- ট্রাকগুলোতে ছয় থেকে আটটি সিলিন্ডার সংযোজন করা থাকে।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বলছে, সারা দেশে জানুয়ারি পর্যন্ত  নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ২৪ লাখ ৯১হাজার ২১৯টি। । এরমধ্যে রয়েছে, এম্বুলেন্স ৪ হাজার ২৯২টি। বাস , ৩৬ হাজার ২৬৮, কার্গোভ্যান ৬০১৭টি। কভার্ডভ্যান ১৭ হাজার ১২৯টি। হিউম্যান হোলার ১০ হাজার ৪৬৯টি, প্রাইভেট কার ৪৩ হাজার ১৫৫টি, মাইক্রোবাস ৮৬ হাজার ৪১টি, মিনিবাস ২৬ হাজার ৯২৫টি, প্রাইভেট প্রেসেঞ্জার কার ২৯ হাজার ১৬৪টি,অটো রিকশা ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৯২টি,ট্যাক্সীক্যাব ৪৫ হাজার ১৪১টি, ট্রাক ১লাখ ১৪ হাজার ৪১৪ । তবে এর মধ্যে বৃহৎ একটা অংশ সিএনজি চালিত।
বিআরটিএ’র একজন প্রকৌশলী জানান,  গ্যাস সিলিন্ডারগুলো ঝুঁকিপূর্ণ কিনা তা পরীক্ষা করা হয় প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে। তবে সারা দেশে ৫৮৭টি সিএনজি স্টেশনের মধ্যে ১০-১২টি প্রতিষ্ঠানে রিটেস্ট করার ইউনিট রয়েছে। গাড়িগুলোর ফিটনেস নেওয়ার সময় বিআরটিএতে তা পরীক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।
জানা যায়, প্রায় ৩ হাজার পিএসআই (প্রেসার পার স্কয়ার ইঞ্চি) চাপে যখন গ্যাস ভরা হয় তখন সিলিন্ডারের ওপর প্রচন্ড চাপ পড়ে। তাই গ্যাস সিলিন্ডার বেশ পুরু ইস্পাত দিয়ে তৈরি না হলে বিস্ফোরণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ জন্য প্রতি পাঁচ বছর পরপর সিলিল্ডার রিটেস্ট করা বাধ্যতামূলক। প্রতি ৫ বছর অন্তর সিএনজিচালিত যানবাহনের গ্যাস সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক হলেও নিয়ম মানে না কেউ।
নাভানা সিএনজির এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, সিএনজি রিটেস্ট করাতে আসা গাড়ির সংখ্যা এখনো অনেক কম। সিলিন্ডার ব্যবহারকারীদের আরও সচেতন হওয়া দরকার। সিএনজিচালিত গাড়ির মালিকদের জানমালের স্বার্থেই সিলিন্ডার রিটেস্ট করা উচিত। তিনি বলেন, আমরা বাস-ট্রাক নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। কারণ, এগুলোর প্রতিটিতে ৬ থেকে ৮টি করে সিলিন্ডার সংযোজিত। তারা রিটেস্ট না করালে ঝুঁকি বেশি।
বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ এসোসিয়েশন সূত্র জানায়, রিটেস্টের মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া প্রায় দেড় লাখের বেশি গাড়ি এখন বিপজ্জনকভাবে রাস্তায় চলছে। যদি বিআরটিএর ফিটনেস নেওয়ার সময় সিলিন্ডার রিটেস্ট করানো বাধ্যতামূলক করা যায় তাহলে রিটেস্টে আগ্রহ বাড়বে।
 নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি সাধারণ সম্পাদক আশীদ কুমার দে জানান,  রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) শর্ত অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর যানবাহনের গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ গত ১৫ বছরে বাস, মিনিবাস, প্রাইভেট কার ও অটোরিক্সা মিলিয়ে মাত্র ১৫ শতাংশ যানবাহনের গ্যাস সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা করা হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহারের কারণে এসব যানবাহন প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় বিস্ফোরণ ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারবাহী যানবাহন মালিকদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে সংক্ষিপ্ত সময়সীমা বেঁধে দেয়ার  দাবি তার।
মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় গত সোমবার একটি যাত্রীবাহী বাসের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ১৬ জন যাত্রী দগ্ধ হয়েছেন। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ঘিওরের তরা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। দগ্ধ ব্যক্তিদের মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতাল এবং স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চরচামিতা বাজারে মমিন উল্যাহর গ্যারেজে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পুড়ে গেছে ১৫টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। মঙ্গলবার ভোররাতে এ ঘটনাটি ঘটেছে। 
গত ১৭ অক্টেবার ২০১৫ রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা গোলচত্বর এলাকায় গ্লোরী পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যায়। আগুনে বাসটি ভস্মীভূত হয়ে গেছে।
গত ২৯ অক্টোবর ২০১৫ ঢাকার অদূরে সাভারে যাত্রীবাহী একটি বাসের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আহত  হয়েছে অন্তত ১৫ জন।
এছাড়া ২০১৪ সালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির নাজিরহাট-কাজিরহাট সড়কে মাইক্রোবাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে তিন নারীসহ চারজন নিহত ও আটজন আহত হন। ২০১৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শ্যামপুরে একটি দোকানে গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে চার শ্রমিক আহত হন। একই বছর  ২৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর পলোগ্রাউন্ড এলাকায় বেলুনে গ্যাস দেওয়ার সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে রফিকুল আলম (৩৫) নামে একজনের মৃত্যু ঘটে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ