ঢাকা, সোমবার 18 December 2017, ৪ পৌষ ১৪২৪, ২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে মন্ত্রণালয় দুদকের সাথে মিলে লড়াই করবে -শিক্ষামন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার : প্রশ্ন ফাঁস বন্ধের সব উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার প্রেক্ষাপটে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ আবারও বললেন, কিছু শিক্ষকের কারণেই প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে আমাদের কাছে বহু পরামর্শ আসছে। এর মধ্যে পরীক্ষার আধা ঘণ্টা আগে শিক্ষার্থীরা হলে প্রবেশ করার পর প্রশ্নপত্র পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনা হচ্ছে। তবে শিক্ষকই যখন প্রশ্ন ফাঁসকারী, তখন আধা ঘণ্টা আগে প্রশ্ন পাঠিয়ে কী লাভ? তিনি বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দুদকের সাথে মিলে লড়াই করবে। 
গতকাল রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে সচিবালয়ে দুদকের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে  বৈঠকের পর মন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। বৈঠকে দুদক কমিশনার ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দীন আহমেদ বলেন, সারাদেশে যত জায়গায় প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারি লোকজন জড়িত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব সার্কুলার দিয়েই সারাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব।
এসময় ড. নাসিরউদ্দীন আহমেদ শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে গঠিত ‘শিক্ষা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানিক টিম’ এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের নিকট পেশ করেন। কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আলমগীর, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মহিউদ্দিন খান ও চৌধুরী মুফাদ আহমেদ, কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার ও এ কে এম জাকির হোসন ভূঞা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর নারায়ন চন্দ্র সাহা এবং শিক্ষা প্রকোশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালাসহ শিক্ষা মন্ত্রণায়ের অধীনস্ত দপ্তর ও সংস্থার প্রধানগণ সভায় উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিজি প্রেস থেকে প্রশ্ন ফাঁস রোধের বিভিন্ন উদ্যোগ সরকার নিয়েছে। এই অবস্থায় শিক্ষকের হাতে প্রশ্ন তুলে দিয়ে রাতে ‘নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যাওয়া উচিত’। কিন্তু সেটা হচ্ছে না, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। কিছু শিক্ষক প্রশ্ন ফাঁস করে দিচ্ছেন।
মন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের এই প্রতিবেদন সময়োপযোগী, এর অধিকাংশ সুপারিশই আমাদের নজরে রয়েছে। এই সমস্যাগুলো আমরা দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাথে নিয়ে যৌথভাবে দূর করবো।  তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষার মূল লক্ষ্য হচ্ছে নতুন প্রজন্মকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা যারা সততা, নিষ্ঠা, ন্যায় এবং দেশপ্রেমে উজ্জীবিত থাকবে। মন্ত্রী বলেন, আমাদের সমাজে রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনৈতিকতা রয়েছে, পিতা যখন সন্তানের জন্য ফাঁস হওয়া প্রশ্ন সন্ধানে উদ্যোগী হন তা আমাদের অবশ্যই বিচলিত করে।
শিক্ষার মান নিয়ে মন্ত্রী বলেন, শিক্ষিত জাতি গঠন করতে হলে প্রথমত সকল শিশুদের বিদ্যালয়ে আনাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, আমরা সেই চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছি। এখন দেশের প্রায় ৯৯.৪৭ ভাগ শিশু বিদ্যালয়ে নাম লেখাচ্ছে। তাছাড়া প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, কোচিং বাণিজ্য বন্ধ, এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগসহ শিক্ষার মানোন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে মন্ত্রণালয়।
দুদক কমিশনার বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন এর আইন অনুসারে দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে কাজ করছে। তিনি বলেন, দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে তা রাষ্ট্রপতি কিংবা মন্ত্রণালয়ে পাঠনো কমিশনের আইনী ম্যান্ডেট। তিনি বলেন,  দুর্নীতিমুক্ত ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের জন্যই কমিশন শিক্ষা ক্ষেত্রে   দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে  ‘শিক্ষা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানিক টিম’  গঠন করে । এই টিমের সদস্যরা নিরলস অনুসন্ধান করে এই প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছে। এই প্রতিবেদনে  প্রশ্নপত্র ফাঁস, নোট/গাইড, কোচিং বাণিজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ, এমপিওভুক্তি, নিয়োগ ও  বদলিসহ দুর্নীতির বিভিন্ন উৎস এবং তা বন্ধের জন্য ৩৯ টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের খবর সংবাদ মাধ্যমে এলেও এবার এর ব্যাপকতা পৌঁছেছে প্রাথমিক স্তরে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নানা উদ্যোগের পরও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জেএসসি এবং পঞ্চমের পিইসিতে অনেক বিষয়ের প্রশ্ন পরীক্ষা শুরুর আগেই চলে এসেছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে।
প্রাথমিক সমাপনীর শেষ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নও পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেয়ার প্রলোভন দেখানো হয়েছে একটি ফেইসবুক পেইজে।
বৈঠকের পর শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষকদের লোভ দেখায়, যে কোনোভাবে প্রশ্ন ফাঁস করে তাদের শিক্ষার্থীদের ভালো ফল করাতে পাড়লে কোচিং ব্যবসা ভালো হবে। টাকা আয়ের পরিমাণটাও বাড়বে। এসব লোভের কারণে শিক্ষকরাই কোচিংয়ের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে।
মন্ত্রী বলেন, কিছু শিক্ষক ক্লাসে না পড়িয়ে বাড়িতে বা কোচিংয়ে পড়ান। যত নামি শিক্ষক, ক্লাসে ‘তত কম’ পড়ান, কারণ ক্লাসে ভালো পড়ালে তার ‘ব্যবসা নষ্ট হয়ে যাবে’। আইন না থাকায় সরকার এখন কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। শিক্ষা আইন পাস হলে কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ