ঢাকা, সোমবার 18 December 2017, ৪ পৌষ ১৪২৪, ২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের নিয়ে ভোটারদের উৎসুক্যের শেষ নেই

বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ): সাম্ভ্যব্য প্রার্থী-অধ্যক্ষ আলী আলম, আব্দুল মজিদ ম-ল, আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, মেজর (অব.) মামুন, গোলাম মওলা বাবলু খান, আমিরুল ইসলাম খান আলীম, মীর মোশারফ হোসেন, শফিকুল ইসলাম, রকিবুল করিম খান পাপ্পু

আব্দুস ছামাদ খান, বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ): তাঁতশিল্প সমৃদ্ধ উপজেলা বেলকুচি-চৌহালী। চৌহালী উপজেলার এনায়েতপুর থানা তাঁতশিল্পের জন্য বিখ্যাত। এনায়েতপুর বাদে চৌহালীর অবশিষ্ট অঞ্চল যমুনা নদী বেষ্টিত কৃষি প্রধান এলাকা। জাতীয় নির্বাচনের জন্য এই আসনের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন সরগরম।
সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসনে বেলকুচি উপজেলার একটি পৌরসভা ও ছয়টি ইউনিয়ন এবং চৌহালী উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৭৯ হাজার ৯২৬ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৯০ হাজার ৪২৬ এবং মহিলা ভোটার এক লাখ ৮৯ হাজার ৫০০ জন।
জামায়াত: জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যক্ষ আলী আলম এই আসনে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। ২০ দলীয় জোটের নির্বাচন হলে তিনি জোটের মনোনয়ন চাইবেন। অন্যথায় তিনি কেন্দ্রীয় জামায়াতের কৌশল ও নির্দেশনা মোতাবেক এই আসনে ভোটযুদ্ধে নামবেন বলে জানা গেছে। এই আসনে জামায়াতের বড় ভোট ব্যাংক রয়েছে। আলী আলম ১৯৯১, ১৯৯৬ সালে এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। ২০০৮ সালে  আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আব্দুল লতিফ বিশ্বাস যখন বেলকুচি আসনের এমপি এবং কেবিনেট মন্ত্রী তখনকার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বেলকুচি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক সরকারকে পরাজিত করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আলী আলম। একই সরকারের আমলে বেলকুচির দৌলতপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েিেছলেন জামায়াতের রফিকুল্লাহ হাজী। বর্তমানে বেলকুচি উপজেলা জামায়াতের একজন নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান এবং এই আসনের ৫নং ধুকুরিয়াবেড়া ইউনিয়নে নির্বাচিত একজন চেয়ারম্যান এবং তিনজন মেম্বর রয়েছেন। আলী আলম বেলকুচির বিশ্বাসবাড়ী দাখিল মাদরাসা ও জিনিয়াস ল্যারেটরী স্কুল প্রতিষ্ঠাতা করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নানাভাবে বেলকুচির গণমানষের জন্য কাজ করছেন। অমায়িক বাচনভঙ্গি ও ন¤্র-ভদ্র ব্যবহারের জন্য তিনি এলাকার মানুষের কাছে সমাদৃত। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি জোটের মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিলেন কিন্তু জোটের স্বার্থ রক্ষায় সর্বসম্মত অনুরোধে জোটের প্রধান বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন বলে জানিয়েছে জামায়াত। বিগত দিনে এই আসনে জামায়াতের ওপর অত্যাচার নির্যাতন হয়েছে বেশি। যার দরুন তাদের জনসমর্থন আরো বেড়েছে বলে দাবি জামায়াত নেতা-কর্মীদের। এ কারনে এই আসনে জামায়াতের আলী আলম নির্বাচন করার সুযোগ পেলে বিজয়ের ব্যাপরে শতভাগ আশাবাদী তারা। ইতোমধ্যে আলী আলম বিভিন্ন ভাবে সভা-সমাবেশ, ইসলামী জলসা ও মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে গণসংযোগ করছেন। বেলকুচি-চৌহালী আসনে ২০ দলীয় জোটের শতভাগ সমর্থন তার পক্ষে রয়েছে বলে এ প্রতিবেদককে জানান আলী আলম।
আওয়ামী লীগ: সিরাজগঞ্জ ৫ (বেলকুচি ও চৌহালী) আসনে আওয়ামীলীগের পুরনোদের পাশাপাশি নবীনদের উত্থান দেখা যাচ্ছে।  বর্তমান এমপি বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী আব্দুল মজিদ ম-ল ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের মধ্যে দ¦ন্দে¦র কারণে দু’ভাগে বিভক্ত এ অঞ্চলের আওয়ামী লীগের রাজনীতি। দলীয়   কর্মকা- ও  বিভিন্ন অফিসিয়াল কাজে এ দুই গ্রুপের মধ্যে নানা বিষয়ের টানাপড়েন ও নিজেদের মধ্যে ক্ষমতাতার লড়াই প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। যদিও ‘নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ¦ নেই’ বললেও তাদের দ্বন্দে¦র জেরে উপজেলা চেয়ারম্যানের অফিস ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। সাবেক মন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের পরিবারের সাথে বেলকুচি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী আকন্দের পরিবারের দ্বন্দ¦ এ আসনের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দলের এমন অন্তর্দ্বন্দে¦র কারণে আগামী নির্বাচনের ফল কতটা শুভকর হবে তা নিয়েও সংসয় রয়েছে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে।
সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের বর্তমান এমপি বিশিষ্ট শিল্পপতি আব্দুল মজিদ মন্ডল নির্বাচিত হয়ে এলাকার রাস্তাঘাট,ব্রিজ কালভার্ট ও স্কুল কলেজ মাদরাসার উন্নয়ন করেছেন। বড় মাপের ব্যবসায়ী হওয়ার কারনে তিনি এলাকায় বেশি সময় দিতে পারেন না। তবে সাধারণ মানুষ কোনো কাজ নিয়ে গেলে তিনি তা করে দেন। তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী।
এই আসনের প্রভাবশালী মনোনয়ন প্রত্যাশী বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মৎস ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস। বর্তমানে তিনি সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। আব্দুল লতিফ বিশ্বাস আওয়ামীলীগের একজন তৃণমূল নেতা।  তিনি প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং দুইবার এমপি নির্বাচিত হয়ে কেবিনেট মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে তিনি বেলকুচি-চৌহালী আসনে দ্বিতীয়বারে এমপি নির্বাচিত হয়ে মৎস ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পান। মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে তিনি বেলকুচিতে ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন।
বিএনপি: এই আসনে বিএনপি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে প্রবীনদের সাথে কয়েকজন তরুন প্রার্থী মনোনয়ন চাইবেন। প্রবীনদের মধ্যে  মেজর (অব:) মঞ্জুর কাদের ২০০১ সালে তৎকালীন সিরাজগঞ্জ-৬ (চৌহালী-শাহজাদপুরের অংশ) আসনের এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এমপি থাকাকালে  তার সাথে ওই এলাকার দলীয় নেতা-কর্মীদের সাথে সম্পর্ক ভাল ছিলনা। 
কিন্তু ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিন সরকারের আমলে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পূনঃনির্ধারণ করে চৌহালীকে বেলকুচির সাথে যুক্ত করে সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসন করার পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে নবগঠিত বেলকুচি-চৌহালী আসনে মেজর (অব:) মঞ্জুর কাদের বিএনপির টিকিট নিয়ে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগের আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের কাছে মাত্র ২৫২ ভোটে হেরে যান। এরপরে মেজর (অব:) মঞ্জুর কাদের নির্বাচনী এলাকায় পা রাখেননি।  তবে আগামী নির্বাচনে তিনি এই আসনে পুনরায় মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।
এই আসনে বিএনপি থেকে আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গোলাম মওলা খান বাবলু। তিনি দুইবারের বিএনপির এই আসনের এমপি মরহুম শহীদুল্লাহ খানের ভাতিজা।
২০০৮ সালে নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি থেকে গেলাম মওলা খান বাবলু এবং মেজর (অব:) মঞ্জুর কাদের যৌথভাবে মনোনয়ন পান। দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গোলাম মওলা খান বাবলু মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিলে মঞ্জুর কাদের নির্বাচন করেন। গোলাম মওলা খানের পিতা তৎকালীন বেলকুচি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু কোরাইশ খান  একজন শিক্ষানুরাগী ছিলেন।
বেলকুচি ডিগ্রি কলেজসহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। এ কারনে বেলকুচিতে গোলাম মওলা খানের জনসমর্থন রয়েছে। তিনি এলাকায় পোস্টার প্যানা টাঙিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে অনেক আগে থেকেই জানান দিয়েছেন। এলাকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এবং ঈদসহ বিভিন্ন পর্বনে এলাকার মানুষের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছেন। মনোনযনের জন্য বিএনপির হাইকমান্ডেও তার পক্ষে চলছে জোর লবিং। মনোনয়নের পাওয়ার ব্যাপারে তিনি শতভাগ আশাবাদী।
বিএনপি নেতা ও চৌহালী উপজেলা চেয়ারম্যান মেজর (অব:) আব্দুল্লাহ আল মামুন আগামী নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রার্থী। বর্তমান সরকারের আমলে গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। মেজর (অব:) মামুনের পিতা আনছার আলী সিদ্দিকী ১৯৯১ সালে তৎকালীন সিরাজগঞ্জ-৬ (চৌহালী-শাহজাদপুরের ৪ ইউনিয়ন) আসনে বিএনপির মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হয়ে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। যার কারনে চৌহালীতে মেজর (অব:) মামুনের পরিবারের সুনাম ও প্রভাব আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ