ঢাকা, মঙ্গলবার 19 December 2017, ৫ পৌষ ১৪২৪, ২৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ছাত্ররাজনীতি যেনো নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে!

জিবলু রহমান : [চার]
ডাকসুর সাবেক জিএস ও ছাত্রদল নেতা খায়রুল কবির বলেছেন, ইতিবাচক রাজনীতি না থাকায় ছাত্ররাজনীতিতে কেবল লেজুড়বৃত্তিটুকুই রয়ে গেছে। তিনি বলেন, সেই ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত এ দেশ গড়তে ছাত্রদের অসামান্য ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এখন ছাত্রনেতাদের কাজে দেশের মানুষ তাঁদের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়েছে। এ জন্য জাতীয় নেতাদের ঐকমত্যে আসতে হবে। সাবেক ওই ছাত্রনেতা বলেন, এখন অন্য দলের ছেলেরা হলে থাকতে পারে না। সমস্ত অপকর্মে সরকারি ছাত্রসংগঠনের ছেলেরা যুক্ত হচ্ছে। ছাত্ররাজনীতিতে আসলেই পচন ধরেছে; যার কারণে বারবার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে, ভর্তি-বাণিজ্যসহ নানা রকম বাণিজ্য হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেছেন, ‘তদন্তে দুর্বলতা, তদন্তে অর্থপ্রতিপত্তির প্রভাব, ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদনে অসংগতি এবং ছাত্ররাজনীতি কলুষিত হওয়ার বিষয়গুলো কারও অজানা নয়। যদিও রায়ে এসব বিষয় সচরাচর আসে না। তবে এবার আসাতে আমি অবাক হইনি।’ তাঁর মতে, এসব বিষয়ের সংস্কার হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু নিকট-ভবিষ্যতে এর কোনো সম্ভাবনা দেখা যায় না। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ২ নভেম্বর ২০১৭)
রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য, উপাচার্য, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, এমনকি ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলোসহ সবাই চায়-তারপরও ২৭ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন হচ্ছে না। কিন্তু কেন? ডাকসু নির্বাচন দিতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের তাগিদকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ চলতি বছরের সমাবর্তনে (৫০তম) বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন ইজ আ মাস্ট (হতেই হবে)। নির্বাচন না হলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে শূন্যতার সৃষ্টি হবে।’
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও ডাকসুর পক্ষে তার অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘আমাদের অভিজ্ঞতা হল, সরকার চায় না বলেই ডাকসু নির্বাচন হয় না। সরকার ভাবে, ডাকসু হলে ছাত্রদের মতামত তাদের পক্ষে নাও যেতে পারে। আরেকটা সমস্যা হল, এ নির্বাচনটাকে অনেক বেশি ফোকাস করা হয়। এটাকে সরকারের জনপ্রিয়তার অংশ হিসেবে নেয়া হয়। ফলে সরকার চায় না, তাদের জনপ্রিয়তার ভাটা প্রকাশ্যে আসুক। ফলে তারা নির্বাচন দেয় না। আর নির্বাচন কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিয়ে সেভাবে ভাবে না। যখন বিষয়টি আলোচনায় আসে তখন শুধু এটি নিয়ে কথা হয়।’(সূত্র : দৈনিক যুগান্তর ১২ আগষ্ট ২০১৭)
সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ, বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র ফ্রন্টসহ ক্যাম্পাসে সক্রিয় সব ছাত্র সংগঠনই ডাকসুর দাবি জানাচ্ছে। ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ছাত্রদের মতামত প্রদানের যে অধিকার দিয়েছে-রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত ক্ষমতাকে ভয় পেয়ে যুগ যুগ ধরে তা রুদ্ধ করে রেখেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৪ সালে। ১৯২৪-২৫ সালে প্রথম ডাকসুর ভিপি মনোনীত করা হয়। ডাকসুর প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালে। এর আগে ভিপি মনোনীত ছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ডাকসু গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়।
ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালে। সে বছর ৬ জুন ডাকসু ও ১৮ টি আবাসিক হল সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর দীর্ঘ ২৭ বছরে ডাকসু নির্বাচন দেয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠনসহ সব সংগঠনের নিয়মিত নির্বাচন হলেও ছাত্রদের প্রতিনিধি নির্বাচনে ডাকসু নির্বাচন দেয়া হয়নি।
ডাকসু নির্বাচন না দেয়ার প্রধান কারণ হল শাসক দলের ভয়। তারা মুখে মুখে ডাকসুর কথা বললেও অন্তরে ডাকসুকে মেনে নিতে পারে না। ক্ষমতার মসনদ আরও পাকাপোক্ত করার নষ্ট প্রয়াস থেকেই তারা ডাকসু নির্বাচন দিতে আগ্রহ দেখায় না। আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও চায় না, ডাকসু নির্বাচন দিয়ে ছাত্র প্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে। এতে করে তারা নিজেদের মতো করে প্রশাসন পরিচালনার সুযোগ পায়।
ডাকসু থাকলে ছাত্রদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার প্রশ্নকে ভিত্তি করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে ছাত্ররা সোচ্চার হবে। আর শাসকগোষ্ঠীর বড় ভয়ের জায়গা এটি। এছাড়া ছাত্র সংগঠনগুলো যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করে, সে ক্ষেত্রে নিজ দলের ছাত্র সংগঠন ডাকসু নির্বাচনে জয়ী হতে না পারলে ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় তো আছেই।
১৯৯০ সালের ৬ জুন সর্বশেষ নির্বাচনের এক বছর পর ১৯৯১ সালের ১২ জুন তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। তখন ছাত্রনেতারা ছাত্রত্ব ঠিক রেখে প্রার্থী হওয়ার জন্য বিশেষ ভর্তির দাবি করেন। এ নিয়ে সৃষ্ট সহিংসতায় নির্বাচন ভেস্তে যায়।
১৯৯৪ সালের এপ্রিলে সে সময়ের ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ডাকসুর তফসিল ঘোষণা করেন। কিন্তু নির্বাচনের পরিবেশ না থাকার দোহাইয়ে ছাত্রলীগের বাধার মুখে নির্বাচন স্থগিত হয়। ১৯৯৫ সালেও ডাকসুর তফসিল ঘোষণা করা হয়। কিন্তুসেবারও একইভাবে নির্বাচন আর অনুষ্ঠিত হয়নি।
১৯৯৬ সালে অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী ভিসির দায়িত্ব নেয়ার পর একাধিকবার ডাকসু নির্বাচনের সময়সীমার কথা জানান। কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় ব্যর্থ হন। ১৯৯৭ সালে বঙ্গবন্ধু হলে অভ্যন্তরীণ দ্ব›েদ্ধ ছাত্রদল নেতা আরিফ হোসেন তাজ খুন হন।
ওই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি ১৯৯৮ সালের ২৩ মে রিপোর্ট দেয়। রিপোর্টে তখনকার মেয়াদোত্তীর্ণ ডাকসু ভেঙে দেয়া এবং পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুপারিশ করা হয়। সে অনুযায়ী ২৭ মে সিন্ডিকেট সভায় ডাকসু ভেঙে দেয়া হয়।
এরপরও অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী দু’বার নির্বাচনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু তাও আলোর মুখ দেখেনি। তৎকালীন উপাচার্যের দাবি, সেই সময়কার বিরোধী ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের অসহযোগিতার কারণেই ডাকসু নির্বাচন দেয়া সম্ভব হয়নি।
সে সময় ডাকসুর জন্য গঠিত নতুন (সংশোধিত) গঠনতন্ত্রে ডাকসু ভাঙার ৪ মাসের মধ্যে পুনরায় নির্বাচনের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত ডাকসুর তফসিল ঘোষণা হয়নি। ফলে নেতৃত্ব তৈরির ‘কারখানা’ হিসেবে পরিচিত ডাকসু আর কার্যকর হয়ে উঠেনি।
২০০৫ সালের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার ভিসি অধ্যাপক এসএমএ ফায়েজ ওই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের ঘোষণা দেন। ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে একাধিকবার মিছিল, সমাবেশ ও ভিসির কাছে স্মারকলিপিও দেয়। তবে শেষ পর্যন্ত আর সে দাবি আলোর মুখ দেখেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পরও ডাকসু নির্বাচনের জোর দাবি ওঠে। দাবি গড়ায় আদালত পর্যন্ত। শিক্ষার্থীরা পৃথক মঞ্চ করে আন্দোলন গড়ে তোলেন। এরপর বিভিন্ন সময় দফায় দফায় ডাকসু নির্বাচনের দাবি ওঠে।
সর্বশেষ ২৯ জুলাই ২০১৭ ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়া উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তারপর থেকেই ডাকসুর দাবিতে টানা আন্দোলন করে আসছে শিক্ষার্থীরা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাচনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।
প্রশাসনে অতি রাজনৈতিকীকরণ এবং প্রশাসনের একধরনের অসহায়তা ক্রমেই বাংলাদেশের প্রশাসনব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা এসব ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণেই প্রতীয়মান। দলীয়করণের প্রভাবে এখন মেধাভিত্তিক নয়, পরিচয়ভিত্তিক পদায়ন ও পদোন্নতি, এমনকি নতুন নিয়োগও প্রভাবিত হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের প্রশাসন তো স্বাধীনভাবে কোনো কাজই করতে পারছে না। কারণ, সর্বক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব। [সমাপ্ত]
jiblu78.rahman@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ