ঢাকা, মঙ্গলবার 19 December 2017, ৫ পৌষ ১৪২৪, ২৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশ ও বিশ্বজুড়ে শিশু হত্যা ও নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি

এডভোকেট আব্দুস সালাম প্রধান : [ছয়]
আবু তালিব আকিলকে রেখে জাফর ও আলীকে পোষ্য হিসাবে নেওয়ার জন্য সম্মতি দেন। আব্বাস (রা:) জাফরকে তার সংসারে নেন। দশ বৎসরের শিশু আলী (রা:) কে রসুলুল্লাহ (দ:) তার পোষ্য হিসাবে নেন। হযরত আলী (রা:) রসুলুল্লাহ (দ:) এর পোষ্য হিসাবে বড় হন। আব্বাস (রা:) এর পুত্র ফজল, আব্দুল্লাহ, রাসুলুল্লাহর সাহচর্য্যে বড় হন। রাসুলুল্লাহ ইন্তেকালের সময় আব্দুল্লাহ (রা:) এর বয়স ছিল দশ বৎসর। তবুও রাসুলুল্লাহ (দ:) এর সাথে তার গভীর সম্পর্ক ছিল। বিদায় হজের দিনে ফজল (রা:) রসুলুল্লাহর সঙ্গে উঠে সাওয়ারী ছিলেন। প্রিয় নবী তার নাতী হাসান হোসেনকেও অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি ঘোড়া সেজে তাদেরকে পিঠে নিতেন। একদিন  মসজিদ নববীতে রসুলুল্লাহ (দ:) খোতবা দেয়া অবস্থায় হাসান হোসেন নানা নানা বলতে বলতে মসজিদে নববীতে ঢুকছিল এবং মাঝে মধ্যে পড়ে যাচ্ছিল । এটি ছিল তাদের ভালোভাবে হাটতে পারার আগের ঘটনা । রসুলুল্লাহ (দ:) খোতবা থামায়ে দিয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে  দু নাতিকে কোলে করে এনে সামনের কাতারে বসান এবং কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধুত করেন। “নিশ্চয়ই তোমাদের সম্পদ ও সন্তানাদি  তোমাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ”। রসুলুল্লাহ (দ:) হাসান, হোসেন, এবং এক কন্যার একটি কন্যা সন্তানকে কাধে নিয়ে নামায পড়েছেন। রসুলুল্লাহ (দ:) শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি শিশুদের বন্ধু ছিলেন। তিনি যে রাস্তায় চলতেন শিশুরা তার প্রতিক্ষায় থাকতো। তিনি শিশুদের আগে  সালাম দিতেন। হযরত আনাস (রা:) এর ছোট ভাই শিশু মুগাইর একটি পাখির বাচ্চা পালতো। পাখিটির নাম রেখেছিল নুগাইর। একদিন  ঐ পাখির  বাচ্চাটি মারা গেল। বাচ্চা  পাখিটির জন্য মুগাইর শোকাহত ছিল। রসুলুল্লাহ (দ:) খবর শুনে  মুগাইরের  কাছে  যান। তাকে নিয়ে একটি ছড়া কাটেন। ইয়া মুগাইর, আইনানুগাইর ।  অর্থ্যাৎ হে মুগাইর কোথায় তোমার নুগাইর। ছড়া শুনে  মুগাইর  হেসে দেয়। মদিনার জীবনে মুসলমানদের কোন সন্তান  জন্ম হলে নবী (দ:) সন্তানটিকে দেখতে যেতেন। একটি খেজুর চিবিয়ে কিছু অংশ বাচ্চাটির মুখে দিতেন।  একবার একটি বাচ্চাকে কোলে নিলে বাচ্চাটি রসুলুল্লাহর কোলে প্রস্রাব করে দেয়। তাতে তিনি মোটেও বিরক্ত হন নাই। বরং একটু পানি আনায়ে প্রস্রাব যে স্থানে লেগেছিল তা ধুয়ে নেন। একবার রসুলুল্লাহ (দ:) ঈদের মাঠে নামায পড়ার জন্য যাচ্ছিলেন।  হঠাৎ দেখলেন রাস্তার পাশে একটি শিশু কাদছে। রসুলুল্লাহ যাত্রা থামিয়ে বাচ্চাটির কাছে গিয়ে কান্নার কারন জিজ্ঞাসা করলে বাচ্চাটি জবাব দেয় যে তার বাবা ইসলাম এর জন্য জিহাদ করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। মাও মারা গেছেন।
ঈদের দিনে সে  নুতন পোষাক পায় নাই এবং কিছু খেতেও পারে নাই। শিশুটিকে  নিয়ে রসুলুল্লাহ ঘরে ফিরলেন। আয়েশা (রা:) কে বললেন ছেলেটিকে গোসল করে সাজায়ে দিতে। আয়েশা তাকে গোসল করে সাজিয়ে দিয়ে খেজুর খাওয়ায়ে রসুলুল্লাহ (দ:) এর সামনে এনে দেন। রাসুলুল্লাহ (দ:) ছেলেটিকে বলেন আজ থেকে আয়েশা (রা:) তোমার মা আর আমি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (দ:) তোমার  বাবা তুমি কি খুশি। ছেলেটি আনন্দিত হয়ে দুঃখ ভুলে যায় এবং রাসুলুল্লাহ (দ:) এর সাথে ঈদের মাঠে নামায পড়তে যায়। রসুলুল্লাহ ফুফাতে ভাই আবু সালমা উহুদ যুদ্ধে শহীদ হন। তার স্ত্রী উম্মে সালমাকে অনেকগুলি সন্তানসহ রসুলুল্লাহ (দ:) বিবাহ করেন। তিনি উম্মে সালমার সকল সন্তানকে পিতৃ øেহে লালন পালন করেন। ইসলামে শিশুদের জন্য বিশেষ অধিকার সংরক্ষণ করা আছে। হাদীস শরীফে এসেছে পিতৃহীন এতিম শিশুকে মাথায় স্নেহ ভরে হাত বুলায়ে আদর করলে মাথার চুলের সংখ্যা পরিমাণ ছওয়াব পাওয়া যায়। শিশুরা শিশুই। তারা মুসলমানের সন্তান হউক বা অমুসলিম এর হউক। রাসুলুল্লাহ (দ:) খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে কোন জিহাদে সৈন্য প্রেরণের সময় নির্দেশনা দেয়া হত যে যাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালিত হবে তাদের শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা, ধর্মগুরু, ধর্মস্থান যেন আক্রান্ত  না হয়। একবার ঈদের দিনে নবী (দ:) হযরত আয়েশা (রা:) এর ঘরে খাটে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলেন। মেঝেতে বসে  দফ বাজিয়ে  দুটি ছোট বালিকা গান গাইতে ছিল। সে সময় আবু বকর (রা:) কন্যার ঘরে বেড়াতে যান এবং  বাচ্চা দুটিকে ধমক দেন। হযরত আবু বক্কর (রা:) বালিকা দুটিকে ধমকাতে নিষেধ করেন এবং বলেন আজ ঈদ, ওরা একটু খুশি উদযাপন করছে করতে দিন। এটাই হল রাসুলুল্লাহ (দ:) এর আদর্শ। আমাদের দেশের শ্রদ্ধেয় আলেম সমাজ, হাফেজে কোরআন, মাদ্রাসার শিক্ষক, ইমাম, মুয়াজ্জিন ভাইয়েরা রাসুলুল্লাহ (দ:) এর মতো শিশুদের  প্রতিøেহ ভালোবাসার নমুনা  পেশ করতে পেরেছেন কি ? নিজেদেরকেই প্রশ্ন করতে অনুরোধ করছি।  ইসলাম যে কোন মানব শিশুকে এক নিস্পাপ স্বত্বা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (দ:) বলেছেন প্রত্যেক শিশু ফিতরাত অর্থাৎ সঠিক মানব স¦ভাব নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। জন্মের পর শিশুদের মা বাবারা তাকে এহুদি,খ্রিষ্টান প্রভৃতি আদর্শে আদর্শিত করে। আমাদের দেশের মানুষ ইসলামী আদর্শ যাদের কাছে শিখেছেন তারা ছোট বাচ্চাদেরকে আগে সালাম দিয়েছেন এ দৃশ্য বিরল। আমাদেরকে শেখানো হয়েছে বাচ্চারাই বড়দেরকে আগে সালাম দেবে। শিক্ষকদের খেদমত করবে। দরকার হলে  গা টিপে দেবে পা টিপে দেবে। কাপড় ধুয়ে দেবে, খাওয়ার আগে ও পরে হাত ধুয়ে দেবে। ছাত্রজীবনে খান মুহাম্মদ মইনুদ্দিনের একটা কবিতা পড়েছিলাম। কবিতাটির শিরোনাম ছিল শিক্ষকের মর্যাদা। কবিতার পঙক্তিগুলো ভুলে গেছি। তবে  মর্মটা ছিল এমন একদিন  বাদশা আলমগীর দেখলেন যে, তার এক শাহজাদা তার  ওস্তাদ অজু করাকালে তার হাতে পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছে। হঠাৎ বাদশাহকে দেখে শিক্ষক ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু বাদশা ঐ ওস্তাদের  এই মর্মে ভুল ধরেন যে, তিনি কেন তার পুত্রের  হাত দ্বারা তার হাত পা ধুয়ে নিচ্ছেন না।
কিন্তু প্রিয়নবী (দ:) এর আচরণ ছিল এর থেকে ভিন্ন। তিনি জীবনে কোন শিশুকে মারপিট করেন নাই। তাদের দ্বারা গা টিপে, মাথা টিপে নেন নাই।  আজকাল ও শিশুদের জীবনের শুরুতে শিক্ষকদের অনেকেই শিশুদের কাছে এক মুর্তিমান আতঙ্কে পরিণত হন। বেত নিয়ে ক্লাসে যান। কান ধরে দাঁড় করায়ে রেখে শাস্তি দেন। টেবিলের নিচে মাথা ঢুকায়ে রাখেন। এক্ষেত্রে বাবা মায়েরাও অনেক সময় শিক্ষকদেরকে উৎসাহ যোগান। ছেলে মেয়েদেরকে শাসনে রাখার দাবী রাখেন। কিন্তু একটি কচি শিশুর মন জয় করে আদর ¯েœহ দিয়ে পাঠ  বুঝায়ে দিলে যে বাচ্চাটির মনে  পাঠের মর্ম বেশি করে গেথে যায়, তা অনেক শিক্ষক বোঝেন না। শিশু মনে ভীতি আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে যে শিক্ষা দেয়া হয়, তাতে শিশু মনের বিকাশ রুদ্ধ হতে বাধ্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ