ঢাকা, মঙ্গলবার 19 December 2017, ৫ পৌষ ১৪২৪, ২৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এবার প্রথম শ্রেণির প্রশ্নফাঁস ১০২টি স্কুলের পরীক্ষা স্থগিত

স্টাফ রিপোর্টার : প্রশ্ন ফাঁস করা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর হুশিয়ারী দেয়ার পর দিনই নাটোরে প্রথম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাস হলো। এর আগের দিন বরগুনায় ফাস হয় দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রশ্ন। এর মধ্য দিয়ে প্রশ্ন ফাঁসের ভয়াবহ চিত্র আরো স্পষ্ট হলো। পিএসসি, জেএসসি, জেডিসি, এসএসসি, এইচএসসি, চাকরি বা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা, এমন কোনো পরীক্ষা নেই, যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটছে না।
গতকাল সোমবার বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে নাটোর সদর উপজেলার ১০২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ম ও ৪র্থ শ্রেণির গণিত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আলী আশরাফ জানান, প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে ১ম ও ৪র্থ শ্রেণির গণিত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে।
 জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন জানান, সদর উপজেলার ছাতনি ইউনিয়নের আগবিঘা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রশ্নফাঁস হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। পরে সত্যতা পাওয়ায় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি দুটি শ্রেণির প্রশ্নফাঁস হওয়ার খবর পান। সবার হাতে হাতে প্রশ্ন, এমন বিষয়টিও কানে আসে। তিনি জানান, তদন্ত করে খবরের সত্যতা প্রমাণিত হলে ১০২ স্কুলে গণিতের পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এর আগের দিন বরগুনায় দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্নপত্র ফাঁস বরগুনার স্কুলগুলোয় চলমান বার্ষিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণির গণিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর বেতাগী উপজেলার ১৪০টি বিদ্যালয়ের পরীক্ষা স্থগিত করেছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুল মজিদ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গত ৯ ডিসেম্বর বরগুনা সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণিতের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর বরগুনা সদর উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম ও চতুর্থ শ্রেণির তিন বিষয়ের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। প্রশ্ন ফাঁসের সত্যতা পেয়ে সদর উপজেলার ২৪৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষা স্থগিত করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।
 জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুল মজিদ জানান, শনিবার (১৬ ডিসেম্বর) রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নজরে আসে। তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস  রোববার অনুষ্ঠিতব্য দ্বিতীয় শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করার ঘোষণা দেন। গণিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায়  রোববারের পরীক্ষা স্থগিত করে আগামী ২১ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার নতুন প্রশ্নে এই পরীক্ষা নেওয়া হবে।
প্রায় সব পাবলিক পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা এমনকি চাকরিতে নিয়োগ পরীক্ষারও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। গত রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে এক বৈঠকে দুর্নীতি দমন কমিশন বলছে, প্রশ্ন ফাঁসের সাথে অসাধু কর্মকর্তা ও শিক্ষকরাই জড়িত। বৈঠকে প্রশ্ন ফাঁসের জন্য শিক্ষকদের দায়ী করেছেন শিক্ষামন্ত্রীও। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ দুর্নীতি বন্ধে দুদক ও মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করারও ঘোষণা দেন।
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা টিআইবি এর নির্বাহী পরিচালক ড.ইফতেখারুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এ গবেষণা থেকে তাদের কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে প্রশ্নফাঁসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কোচিং বাণিজ্য। তবে একটি কোচিং সেন্টরের কর্মকর্তা বলেন এর জন্য কোচিং সেন্টারগুলোকে ঢালাওভাবে দায়ী করা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, ছাপানো এবং বিতরণ - এই তিনটি পর্বের মধ্যে প্রায় ৪০টি ধাপ আছে। প্রতিটা ধাপেই ফাঁস হবার ঝুঁকি আছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য ২০১২ সালে একটা নীতিমালা হয়েছিল। এতে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করার সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। কিন্তু এটা লংঘন করে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের একাংশ এর সাথে জড়িত আছে। প্রশ্ন ফাঁস করার শান্তি আগে ছিল ১০ বছরের কারাদন্ড, কিন্তু ১৯৯২ সালে এটা কমিয়ে ৪ বছর করা হয়। এতে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন হলো যে অপরাধটা তত গুরুতর নয়। তাও আবার কখনো কারো শাস্তি হয় নি।
সরকার কেন এ নিয়ে কিছু করতে পারছে না? এর জবাবে তিনি বলেন, সরকার এটা স্বীকার করতে চায় না। মন্ত্রীরা পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছেন যে প্রশ্ন ফাঁসের কথা অস্বীকার করেছেন এমনও হয়েছে।
কোচিং সেন্টার একটি লাভজনক ব্যবসা। এ ব্যবসায় শুধু শিক্ষকরা এককভাবে জড়িত তা নয়। প্রশ্নপত্র তৈরি, ছাপা বিতরণ - এ কাজ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা করেন। তাই পুরো ব্যাপারটার একটা প্রতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটে গেছে। এর প্রভাবে ছাত্রছাত্রী শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরাও এর সাথে জড়িয়ে যাচ্ছেন। যদি তার প্রতিবেশির সন্তান ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পেয়ে যায়, তাহলে তারা পাবেন না কেন - এ প্রতিযোগিতায় তারা জড়িত হয়ে পড়ছেন, তাদের কোন উপায় নেই।
ঢাকার একটি কোচিং সেন্টারের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, কিছু কোচিং সেন্টার বা এর সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক যে এটা করছে না তা আমি বলবো না - কিন্তু সবার ব্যাপারে ঢালাওভাবে একথা বলাটা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র তৈরি, ছাপানো ও বিতরণের পুরো পদ্ধতিতে যে ছিদ্রগুলো আছে তা বন্ধ করতে হবে, দোষীদের শাস্তি হতে হবে। শুধু কোচিং সেন্টার বন্ধ করা এর সমাধান নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ