ঢাকা, মঙ্গলবার 19 December 2017, ৫ পৌষ ১৪২৪, ২৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পরাধীনতার জিঞ্জিরে আজ আবদ্ধ কেন বাংলাদেশ?

মুনিবা বিনতে হাবীব : বাংলাদেশ একটি  স্বাধীন দেশ। অপরূপ প্রাকৃতিক সম্ভারের দেশ বাংলাদেশ৷ স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু দেশের পূর্ববর্তী  দীর্ঘ পথ পরিক্রমা বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট যে, যে উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছিল তা অর্জন সিংহভাগই বাকি রয়ে গেছে, আর প্রকৃত অর্থে মুক্তি যা তা জনসাধারণের নাগালের বাইরে। আমরা যে একটি পরাধীন জাতি হিসেবেই রয়ে গেছি তা বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসটা সামনে রাখলে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হবে।
অনেক জীবনের বিনিময়, ত্যাগ-তিতিক্ষা আর নয়মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়েই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। এটা এমন একটা ঐতিহাসিক ব্যাপার যা অন্য কোন জাতির ক্ষেত্রে পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটেনি। এত বেশি রক্তদান, ত্যাগ স্বীকার করেনি। তার পরে আবার জনসাধারণের অংশগ্রহণ। স্বাধীনতা যে কোন জাতির স্বাভাবিক আকাক্সক্ষা। কিন্তু আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের দিকে খেয়াল করলে দেখা যায় সেখানে এধরনের কোন আকাক্সক্ষা বা ইচ্ছা মানুষের মাঝে কাজ করে না। আমরা সবাই জানি যে বাঙালি জাতি ভাষার জন্য যুদ্ধ করেছিল। অথচ পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ভাষাও তো বাংলা, তবে তাদের মাঝে কেন স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা জাগ্রত হল না? এমনকি তারা বাংলাদেশের সাথে যুক্ত হল না। এর পেছনে কারন রয়েছে  তা হচ্ছে - এদেশের শতকরা ভাগ মানুষ মুসলমান। আর এখানে কাজ করেছে পরিবেশ প্রকৃতি সংস্কৃতি সর্বোপরি ধর্ম বিশ্বাস। সে কারণেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ প্রবল জাতিসত্ত্বাবোধ থেকেই স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
সত্য বলতে প্রাপ্তির হিসাব মেলাতে গেলে এত বছর পর প্রাপ্যটা খুবই কম। কারণ বারবার ক্ষমতাসীনদের স্বার্থেই স্বাধীনতাকে ব্যবহৃত হতে দেখা গেছে। স্বাধীনতার শুরুতেই জনগণ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল এমন একটি রাষ্ট্র,যে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র ই হবে মূলমন্ত্র। মানবিক মূল্যবোধ সমুন্নত থাকা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যতা এবং আত্মপরিচয় দেয়ার অধিকার সমুন্নত থাকা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা অটুট থাকবে ৷ কিন্তু বাস্তবে আমরা পেয়েছি-
“ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না
বলা যাবে না কথা,
রক্ত দিয়ে পেলাম মোরা
এমন স্বাধীনতা।।”
এক সময় যে জনপদ পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল, তা আজ আওয়ামী শাসকরা ভারতীয় শোষণের এক লীলাভূমিতে পরিণত করেছে।
১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভাগ হয়ে যখন ভারত পাকিস্তান ভাগ হল, তখন বাংলাদেশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত থাকায় ভারত সুবিধা করতে পারছিল না অন্য দিকে ভারতের পাশের অন্যান্য দেশ যেমন- নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভূটান, মায়ানমার সবগুলোতেই ভারতের আধিপত্য একচ্ছত্র। তারা চাইছিল বাংলাদেশ থাকবে তাদের তাবেদারি রাষ্ট্র হয়ে, আর অর্থনীতিতে হবে ভারত নির্ভরশীল। আর সেখানে এমন একটি ছায়া সরকার থাকবে যারা ভারতের স্বার্থকে রক্ষা করবে। আর দেশের জনগণের প্রত্যাশার কোন মূল্যায়ন বা প্রতিফলনের কোন সুযোগই অবশিষ্ট থাকবে না। অনন্তকাল ক্ষমতাসীন থাকার লোভে স্বাধীনতা লাভের পর আওয়ামী লীগ সরকার ভারতীয় এ উদ্দেশ্য হাসিলের পথেই অগ্রসর হল৷ যার সূত্রপাত হয়েছিল স্বাধীনতার ১ম বছর থেকেই আর পূর্ণতা পায় বর্তমান শাসনামলে। কোনো কোনো শাসনামলে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হলেও তা স্থায়ীত্ব লাভ করতে পারেনি। আর ভারতের কৌশলের কাছে বাংলাদেশ হল ধরাশায়ী। স্বাধীনতা লাভের অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণরূপে ভারতের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লো, বিশ্বের বলয় থেকে কূটনৈতিকভাবেও একা হয়ে পড়ল। অর্থনীতিতে পূর্বে ছিল প্রতিযোগী এখন পরিপূরক।
 স্বাধীনতার পরের শাসনামলে, বাকশাল কায়েমের মধ্যে দিয়ে পরাধীনতার জিঞ্জিরে আবদ্ধ হতে থাকে জাতি, সেই সময়ে রাষ্ট্র কেড়ে নেয় মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বাহিনী গোপনে-প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষের উপর চালায় নির্যাতন, সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যায় মদদপুষ্ট বাকি রেখে সবগুলি। লেখার, বলার স্বাধীনতা হরণের পর নিষিদ্ধ করা হয় রাজনৈতিক সংগঠন। বাকশাল শাসকদের সীমাহীন দুর্নীতি, দু:শাসন, লুটপাটের কারণে সব ক্ষেত্রে অরাজকতা সৃষ্টি হয়। সৃষ্টি হয় ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ৷ লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। আওয়ামী নেতাকর্মীরা লুটে নেয় লঙ্গরখানার খাদ্যসামগ্রী। কিছু বছর অতিক্রমের পর আবার জাতির ঘাড়ে আবার সওয়ার হল বিভীষিকাময় রাত্রি। প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা ও তার উপর নৃত্য করার মধ্য দিয়ে জন্ম হল বাংলাদেশের কলঙ্কজনক অধ্যায়ের। আশির দশকে রাজনীতির শুরুতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিবিসির প্রখ্যাত সাংবাদিক সিরাজুর রহমানকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন- “তিনি রাজনীতিকে  বরাবর ঘৃণা করেন৷ তাহলে কেন তিনি রাজনীতিতে এলেন? সাংবাদিকের এ প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন “তিনি রাজনীতিতে এসেছেন তার বাবার রক্তের প্রতিশোধ নিতে।”
তার পুরো চিত্র এখন জাতির কাছে বর্তমান।  স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ সৃষ্টি করে উদ্দেশ্য হাসিল ঠিকই হয়েছে। স্বৈরতান্ত্রিকতায় বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে নব্য বাকশাল কায়েমের মধ্য দিয়ে বিনা বিচারে হত্যা, গুম, খুন, ধর্ষণ সহ আইন শৃঙ্খলার বিপর্যয়, দূর্নীতি, সুদ-ঘুষ, চোরাকারবারি, ছিনতাই, ডাকাতি, রাহাজানি মহামারি আকারে বেড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কবলে জাতিসত্ত্বা বিলীন, টেন্ডারবাজী, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে মেধাহীন জাতি তৈরি, ভূমি দখল, সংখ্যালঘু নিপীড়ণ, ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের পীড়ণ, ব্যাংক লুটপাট, শেয়ার বাজার ধ্বংস, পিলখানা হত্যাকান্ড, রুট লেভেল থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত দলীয় করণ এমন কোন খারাপের সেক্টর নেই যা করতে বাকি আছে ! বিবিসির সংবাদ অনুযায়ী বিগত ৫ বছরে নিখোঁজের সংখ্যা ৩৬৭ জন।
প্রকৃত হিসাব অন্তরালে। নৈতিকতাহীন, মেরুদন্ডহীন, আত্মনিয়ন্ত্রণহীন এক পঙ্গু দেশের নাম বাংলাদেশ। দেশকে কিভাবে স্বাধীন বলা যায়, তা ভেবে দেখা  দরকার। দেশটা অঘোষিত ভারতের অঙ্গরাজ্য বললে অত্যুক্তি হবে না। তেল, গ্যাস, বিনামূল্যে ট্রানজিট সুবিধা, সমুদ্রসীমা অবাধে ব্যবহার, সীমান্তে হত্যা, বিনাশুল্কে পণ্য আমদানির সুবিধা, অভ্যন্তরীণ সার্বিক ব্যাপারে হস্তক্ষেপ, অবাধ চ্যানেল প্রবেশ, সর্বোপরি সব কিছুই এখন ভারতের অনুকূলে। আজকের বাংলাদেশের রাজনীতির রুঢ় বাস্তবতা বিশিষ্ট সাহিত্যিক, সাংবাদিক সর্বজন শ্রদ্ধেয় আবুল মনসুর আহমেদের বইয়ের নামকরণ থেকে বুঝা যায়- “বেশি দামে কেনা কমদামে বেচা” আমাদের এই স্বাধীনতা”।
স্বাধীনতা লাভ করার পর পরই ভারতীয় লুটপাট দেখে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর এম জলিল তার বইয়ে লিখেছিলেন-“অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা।” পরাধীনতার এই পরাশৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়োজন দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ, ঐক্যবদ্ধ জাতি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ