ঢাকা, বৃহস্পতিবার 21 December 2017, ৭ পৌষ ১৪২৪, ২ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তাপ শুরু

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : মাঠে খেলা গড়াতে এখনো প্রায় ৬ মাস বাকি। তবে এখনি উত্তাপ শুরু হয়ে গেছে। বলা হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল এর কথা। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ক্রীড়া উৎসব ‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’- ক্রীড়াপ্রেমীদের দোরগোড়ায়। অর্থাৎ বিশ্ব এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ক্রীড়া আসরের ডামাডোলে শামিল হওয়ার অপেক্ষায়। ২০১৮ সালের ১৪ জুন শুরু হবে বিশ্বকাপ ফুটবলের ২১তম আসর। বিশ্ববাসীর জন্য সবচেয়ে মর্যাদার ও আকাংখিত এই ক্রীড়ামেলার এবারের আয়োজক রাশিয়া।
সিডিউল অনুযায়ী মস্কোয় স্বাগতিক রাশিয়া ও এশিয়ার প্রতিনিধি সৌদি আরবের ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু হবে। গত ১ ডিসেম্বর জমকালো ড্র অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ইতোমধ্যে গ্রুপিংও নির্ধারণ করা হয়েছে। রঙিন ও বর্ণাঢ্য মহাসম্মেলনে নিজেদের স্থান করে নিতে দুই শতাধিক দেশ নেমেছিল বাছাইপর্বের লড়াইয়ে। সেখান থেকে ৩১টি দেশ পেয়েছে চূড়ান্ত পর্বের টিকেট। স্বাগতিক হিসেব খেলবে রাশিয়া। ২০১০ সালের ২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নিলামের পর রাশিয়ার স্বাগতিক হওয়া নিশ্চিত হয়। এবারই প্রথম বিশ্বকাপ পূর্ব ইউরোপে এবং ২০০৬ বিশ্বকাপের পর প্রথমবারের মতো ইউরোপে অনুষ্ঠিত হবে। রাশিয়া বিশ্বকাপের খেলা ১১ শহরের ১২টি স্টেডিয়ামে হবে। সবমিলিয়ে হবে ৬৪টি ম্যাচ। ১৫ জুলাই মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে হবে ফাইনাল মহারণ।
একথা বলতে কারো দ্বিধা নেই যে, বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বর্ণিল, আকর্ষণীয়, ও জনপ্রিয় আসর বিশ্বকাপ ফুটবল। একমাত্র এই মিলনমেলা দেশ, মহাদেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে এক কাতারে শামিল করতে সক্ষম। বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু বিশ্ববৃহৎ ক্রীড়া উৎসবই নয়, এ হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম সর্ববৃহৎ মিলনমেলা। বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে তাবৎ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেয় এ আয়োজনে। বিচিত্র ভাষা, বিচিত্র পোশাক, আচার-আচরণ সবকিছুকে ছাপিয়ে এখানে উত্থিত হয় মিলনের সুর, ভালবাসা, ভাললাগার জয়গান। বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের এই জয়গানে এবার মুখরিত হবে রাশিয়া। ইউরোপের এই দেমশি স্মরণকালের সেরা আয়োজনের মাধ্যমে সবাইকে এক সুতোয় গাঁথতে বদ্ধপরিকর। শুধু তাই নয়, বড় স্বপ্নও বুনছে রাশানরা! মূল লড়াইয়ের আগে সবার চোখ ছিল ড্রতে। সুপারস্টার লিওনেল মেসি চেয়েছিলেন স্পেনকে এড়াতে।
তার এ মনোবাসনা পূরণ হলেও বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে কঠিন চ্যালেঞ্জ পাড়ি দিতে হবে গ্রুপ পর্বেই। কেননা ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের তথাকথিত ডেথ গ্রুপে পড়েছে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ও বর্তমান রানার্সআপরা। রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর স্টেট ক্রেমলিন প্যালেস কনসার্ট হলে ২১তম ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ড্র অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ‘ডি’ গ্রুপে আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে চমক দেখানো ক্রোয়েশিয়া, আফ্রিকার সুপার ঈগল নাইজিরিয়া ও ইউরোপ অঞ্চলে বাছাইপর্বে বড় বড় শক্তিদের হারিয়ে প্রথমবারের মতো খেলতে আসা আইসল্যান্ডকে। গ্রুপ পর্বেই তাই বড় ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে বাছাইপর্বে সংগ্রাম করা মেসি, ডি মারিয়াদের।
আর্জেন্টিনা কঠিন গ্রুপে পড়লেও তাদের চিরপ্রতিদ্বন্ধী ব্রাজিল তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ পেয়েছে। ‘ই’ গ্রুপে রেকর্ড সর্বোচ্চ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড, কোস্টারিকা ও সার্বিয়া। হেক্সা অর্থাৎ ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে শুরুতে তাই অনেকটা নির্ভার হয়েই করতে পারবেন নেইমার, মার্সেলো, ফিরমিনো, পাউলিনহো, কুটিনহো, কাসেমিরোরা। মেসি স্পেনকে এড়াতে পারলেও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো পারেননি। কেননা তার দেশ পর্তুগালকে ‘বি’ গ্রুপে খেলতে হবে স্পেন, মরক্কো ও ইরানের বিরুদ্ধে। এই গ্রুপে রোনাল্ডোর পর্তুগাল ও রামোস, ইনিয়েস্তাদের স্পেনই পরিষ্কার ফেবারিট। রাশিয়া বিশ্বকাপে অন্যতম ফেবারিটের তকমা থাকছে ফ্রান্সের গায়ে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নরা গ্রুপ পর্বে পেয়েছে তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ। ‘সি’ গ্রুপে ফরাসীদের সঙ্গী অস্ট্রেলিয়া, পেরু ও ডেনমার্ক।
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিও অনেকটা কঠিন গ্রুপে পড়েছে। ইউরোপের পাওয়ার হাউসদের চ্যালেঞ্জ জানাতে ‘এফ’ গ্রুপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে সবসময়ের সমীহ জাগানো দল মেক্সিকো, বাছাইপর্বে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকে বিদায় করা সুইডেন ও এশিয়ার সুপার পাওয়ার দক্ষিণ কোরিয়া। ফুটবলের জনক ইংল্যান্ডকেও হয়ত গ্রুপ পর্বে খুব একটা বেগ পেতে হবে না। কেননা ‘জি’ গ্রুপে ইংলিশদের প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম, পানামা ও তিউনিসিয়া। এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে সহজ গ্রুপ হয়েছে ‘এ’ ও ‘এইচ’। ‘এ’ গ্রুপে স্বাগতিক রাশিয়ার সঙ্গে আছে সৌদি আরব, মিসর ও প্রথম বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে। আর ‘এইচ’ গ্রুপে লড়বে কলম্বিয়া, পোল্যান্ড, সেনেগাল ও জাপান। স্বাগতিক রাশিয়া ও বাছাইপর্ব পেরিয়ে আসা ৩১টি দলসহ মোট ৩২টি দল নিয়ে গ্রুপিং হয়। আটটি গ্রুপে চারটি করে দল রাখা হয়েছে। গ্রুপ পর্বে প্রতিটি দল একে অপরের বিরুদ্ধে খেলবে। প্রতি গ্রুপের সেরা দুটি দল প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল অর্থাৎ শেষ ষোলোতে উঠে আসবে। এখান থেকে শুরু হবে নকআউট পর্ব। মানে হারলেই বাদ। শেষ ষোলো থেকে শেষ আট, এরপর সেমিফাইনাল হয়ে ফাইনাল।
অক্টোবরের ফিফা র‌্যাঙ্কিং অনুযায়ী ড্র’র জন্য চারটি পট এ আটটি করে দল রাখা হয়। স্বাগতিক রাশিয়ার সঙ্গে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ সাতটি দল ছিল এক নম্বর পটে। র‌্যাঙ্কিংয়ের পরের আটটি দল ছিল পট ২ এ। এভাবে র‌্যাঙ্কিং অনুযায়ী পরের দুটি পটেও আটটি করে দল রাখা হয়। ইউরোপ ছাড়া অন্য কোন মহাদেশ থেকে একটির বেশি দল এক গ্রুপে পড়বে না। এই নিয়মেই ড্র অনুষ্ঠিত হয়।
ড্র অনুষ্ঠান আলোকিত করেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার, ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে, আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর দিয়াগো ম্যারাডোনা, ফ্রান্সের লরা ব্লা, ইংল্যান্ডের গর্ডন ব্যাঙ্কস, ব্রাজিলের কাফু, ইতালির ফ্যাবিও ক্যানাভারো, উরুগুয়ের দিয়াগো ফোরলান ও স্পেনের কার্লোস পুওল। ড্র’র আগে ধারণা করা হচ্ছিল, বেশ কয়েকটা ডেথ গ্রুপ হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। এবার অন্তত গ্রুপপর্বে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না পরাশক্তিদের। তবে কিছুটা কঠিন গ্রুপে পড়েছে গত বিশ্বকাপের দুই ফাইনালিস্ট জার্মানি ও আর্জেন্টিনা। এরপরও দল দু’টির নকআউট পর্বে খেলতে ঘাম ঝরাতে হবে না বলেই মনে করছে ফুটবল সংশ্লিষ্টরা।
ড্র’র পর পর্যালোচনা, ব্যাখ্যাও শুরু হয়ে গেছে। কেমন হলো গ্রুপিং, কেমন হবে পরবর্তী পর্বের লড়াই। নকআউট স্টেজে কে কার মুখোমুখি হতে পারে সেটা নিয়েও আলোচনা তুঙ্গে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত কথা বলেছেন আর্জেন্টাইন কোচ জর্জ সাম্পাওলি। তিনি জানিয়েছেন, আসছে বিশ্বকাপের ফাইনালে লিওনেল মেসি ও নেইমারকে মুখোমুখি দেখতে চান। এটা সম্ভব যদি নিজ নিজ গ্রুপে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয় এবং শেস পর্যন্ত ফাইনালে যেতে পারে। তবে দল দু’টি যদি নিজেদের গ্রুপে হোঁচট খায়, অর্থাৎ কোনভাবে গ্রুপের দ্বিতীয় হয় তাহলে আবার প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল মানে শেষ ষোলোতেই অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। সেক্ষেত্রে শেষ ষোলোতেই ব্রাজিল-জার্মানি কিংবা আর্জেন্টিনা-ফ্রান্স লড়াই হতে পারে।
এবারের ড্র তে গত বিশ্বকাপের রানার্সআপ আর্জেন্টিনার সঙ্গে ‘ডি’ গ্রুপে আছে ক্রোয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও ফুটবলের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতায় অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা আইসল্যান্ড। আর ‘ই’ গ্রুপে ব্রাজিলের সঙ্গে আছে সার্বিয়া, সুইজারল্যান্ড ও কোস্টারিকা। আর্জেন্টিনা গ্রুপ সেরা হয়ে এগুতে থাকলে কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হতে পারে পর্তুগাল ও স্পেনের মতো দল। আর সেমিফাইনালে উঠলে গতবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানির সঙ্গে দেখা হতে পারে মেসিদের। একইভাবে ব্রাজিল গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে এগিয়ে যেতে থাকলে কোয়ার্টার ফাইনালে সম্ভাবনা আছে বেলজিয়াম বা ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার। আর সেমিফাইনালে রেকর্ড সর্বোচ্চ পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হতে পারে ফ্রান্স, পর্তুগাল কিংবা স্পেন। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার মধ্যে যে কোন একটি দল গ্রুপে রানার্সআপ হওয়ার পর দুই দলই নকআউট পর্বে জিততে থাকলে সেমিফাইনালে দেখা হবে তাদের। শেষ ষোলোতে মুখোমুখি হবে ‘সি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ও ‘ডি’ গ্রুপের রানার্সআপ। তেমনি মুখোমুখি হবে ‘ই’ ও ‘এফ’ গ্রুপের দল। এক্ষেত্রে সি, ডি, ই বা এফ গ্রুপে যদি ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও জার্মানির কোন দল দ্বিতীয় হয় তাহলে শেষ ষোলোতে মুখোমুখি হয়ে যাবে আর্জেন্টিনাÑফ্রান্স ও ব্রাজিল-জার্মানি। তবে দলগুলো নিজ নিজ গ্রুপে সেরা হলে মুখোমুখি হতে হবে না। তবে সব কিছু ঠিক থাকলে মস্কোতে আগামী বছরের ১৫ জুলাইয়ের অল-সাউথ আমেরিকান বিশ্বকাপ ফাইনালে দেখা হতে পারে মেসির আর্জেন্টিনা ও নেইমারের ব্রাজিলের মধ্যে। এ প্রসঙ্গে ড্র’র পর আর্জেন্টিনা কোচ সাম্পাওলি বলেন, আমি নেইমার বনাম মেসির ফাইনালের স্বপ্ন দেখি। এটা সত্যিই অসাধারণ একটি ম্যাচ হবে। আশা করছি আমার এই স্বপ্ন সত্যি হবে।
১৯৭৮ ও ১৯৮৬ সালে দুইবারের বিশ্বকাপ জয়ী আর্জেন্টিনা এবার তৃতীয়বারের মতো ফুটবলের বিশ্ব আসরে শিরোপা জয়ে পাঁচবারের ফিফা সেরা তারকা মেসির দিকে তাকিয়ে। ক্লাব ফুটবলে মেসি ২৯টি শিরোপা জিতলেও এ পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে তেমন কিছুই জিততে পারেননি। অবশ্য মেসির হ্যাটট্রিকেই আঞ্চলিক বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপে খেলা চূড়ান্ত হয়। মেসির ফর্মই সাম্পাওলিকে জাতীয় দল নিয়ে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে। এ প্রসঙ্গে আর্জেন্টাইন বস বলেন, আমি মেসির মধ্যে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাস, পরিণত মনোভাব লক্ষ্য করেছি। আমি তাকে খুব ভালভাবেই চিনি। আরও একবার নিজের যোগ্যতা দিয়েই সে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ