ঢাকা, বৃহস্পতিবার 21 December 2017, ৭ পৌষ ১৪২৪, ২ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খুলনা শিশু ফাউন্ডেশনের নির্বাচনে ভোট গণনাকালে জেলা স্টেডিয়ামে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর

খুলনা অফিস : খুলনা শিশু ফাউন্ডেশনের নির্বাচনে ভোট গণনাকালে জেলা স্টেডিয়ামে হামলা ও ব্যাপক ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। এতে পুলিশসহ ১০/১৫ জন আহত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। এ ঘটনার পর ভোট গণনা স্থগিত করে দেয় প্রশাসন। স্টেডিয়াম ভবন ভাঙচুরে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন খুলনা জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা। সবমিলিয়ে নোংরা রাজনীতির আক্রোশের বলি হয়ে উদ্বোধনের আগেই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হলো স্টেডিয়ামটি। 

মঙ্গলবার সকাল থেকে জেলা স্টেডিয়ামে শিশু ফাউন্ডেশনের ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে বিকেল ৪টায় শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। এক হাজার ৮৮৭ জন ভোটার তাদের ভোট প্রদান করেন। নির্বাচনে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক  মুহাম্মদ মিজানুর রহমান মিজান ও খুলনা সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে দু’টি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এরপর ভোট গণনা শুরু হয়। এতে এডভোকেট সাইফুল ইসলামের প্যানেল এগিয়ে ছিল। রাত সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ করে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি সন্ত্রাসী দল জেলা স্টেডিয়ামের মূল ফটকে ঢুকে ভাংচুর শুরু করে। তারা স্টেডিয়ামের নিচতলার তিনটি কক্ষ ও দ্বিতীয় তলার চারটি কক্ষে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। চেয়ার, টেবিল, চারপাশের গ্লাস, দরজা, জানালা ভেঙে তছনছ করে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে ফাঁকা গুলী ছোঁড়ে। এসময় ভোট গোনা বাদ দিয়ে সকলেই দিকবিদিক ছোটাছুটি করে। অতিরিক্ত ফোর্স আসার আগেই সন্ত্রাসী বাহিনী স্টেডিয়াম ভবন থেকে বের হয়ে রাস্তায় অবস্থান নেয়। র‌্যাব-৬’র একটি টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে ব্যালট বাক্স ও নির্বাচনের অন্যান্য মালামাল তাদের হেফাজতে নেন।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, রাত ১০টার দিকে নব নির্মিত জেলা স্টেডিয়ামের মূল ভবনে ভোট গণনা চলছিল। প্রায় ১২শ’ ভোট গণনা সম্পন্ন হলে হঠাৎ অজ্ঞাত ব্যক্তিরা স্টেডিয়ামের জানালায় ইট মারতে শুরু করে। মুহূর্তেই মধ্যে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় বোমাবাজির ঘটনা ঘটে এবং গুলীর শব্দ শোনা যায়। কিছু ব্যালট ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে। ঘটনায় পুলিশসহ ১০/১৫ জন আহত হয়েছে। তবে আহতদের পরিচয় জানা যায়নি। 

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, পরাজয় রুখে দিতে প্রতিপক্ষের সমর্থকরা ওই হামলা চালায়। ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে। এগিয়ে থাকা পরিষদের প্রার্থী-সমর্থক ও পুলিশ বাধা দিলে সংঘর্ষ শুরু হয় । ক্ষতবিক্ষত হয় ষ্টেডিয়াম, রক্তাক্তও বটে, মাশুল দিতে হয় প্রায় কোটি টাকার সম্পদের। 

অপর সূত্রের দাবি, ভোট গণনার এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে তুমুল হট্টগোল শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই উভয় গ্রুপ একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় মারামারি। বিকট শব্দে বোমা বিস্ফোরণ হয়। ফলে উপস্থিত জনগণ দিক-বিদিক ছুটতে শুরু করে। পদদলিত হয়ে অনেকেই অহত হন।

নির্বাচন কমিশনার এডিএম নূর এ আলম ভোট গণনা স্থগিত করে দেন। তিনি বলেন, সারাদিন শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ভোট গণনাকালে দুর্বৃত্তরা স্টেডিয়াম ভবনে ঢুকে ভাংচুর চালায়। আমরা ব্যালট বাক্স ও অন্যান্য মালামাল আমাদের হেফাজতে ট্রেজারিতে রাখা হয়েছে। আপাতত ভোট গণনা স্থগিত করা হয়েছে।

খুলনা জেলা প্রশাসক আমিন উল আহসান বলেন, এটা একটা সেবামূলক সংস্থার নির্বাচন। এখানে একটি ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটানো হয়েছে। আমরা দোষিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তীতে ভোট গণনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

এদিকে জেলা স্টেডিয়ামে ব্যাপক ভাংচুর করায় প্রশাসনকে দুষলেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা। তারা অভিযোগ করে বলেন, জেলা প্রশাসন আমাদের মতামত না নিয়েই জেলা ক্রীড়া সংস্থার ভবন নির্বাচনে ব্যবহার করেছে। গ্লাস ও অন্যান্য মালামাল ভাংচুর করায় প্রায় দেড় কোটি টাকার উপরে ক্ষতি হয়েছে। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (দক্ষিণ) মো. আব্দুল্লাহ আরেফ বলেন, ভাংচুরের খবর শুনে আমরা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি। হামলাকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে গেছে।

উল্লেখ্য, খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ মিজানুর রহমান মিজান এমপি ও খুলনা সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে দু’টি প্যানেলের ২০ জন করে মোট ৪০ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেয়। 

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান মিজান এর নেতৃত্বাধীন প্যানেলের প্রার্থী ছিলেন-এমডিএ বাবুল রানা, চৌধুরী মো. রায়হান ফরিদ, এডভোকেট রজব আলী সরদার, শেখ মামুন আল হাসান নাজু, মফিজুল ইসলাম টুটুল, মনিরুল ইসলাম মাসুম, ডা. মো. বজলুল হক, হালিমা ইসলাম, মো. মুনীর আহমেদ, মুর্শিদা আক্তার রনি, ডা. একেএম কামরুল ইসলাম, মো. আলী আকবর টিপু, ডা. মো. মাহমুদ হাসান, ফেরদৌস আলম চাঁন ফরাজী, মোস্তফা কামাল খোকন, জোবায়ের আহমেদ খান জবা, আল জামাল ভূঁইয়া, সৈয়দ হাফিজুর রহমান, খান সাইফুল ইসলাম।

অপরদিকে এডভোকেট সাইফুল ইসলাম এর নেতৃত্বাধীন প্যানেলের প্রার্থীরা হলেন-অধ্যাপক শহিদুল হক মিন্টু, মো. জামাল হোসেন বাচ্চু, মো. রফিকুর রহমান রিপন, এডভোকেট কানিজ ফাতেমা আমিন, এডভোকেট সিকদার হাবিবুর রহমান, শাহ মো. জাকিউর রহমান, একেএম শাহজাহান কচি, জিএম রেজাউল ইসলাম, মো. তাহিদুল ইসলাম ঝান্টু, মিনা আজিজুর রহমান, মো. ফারুক আহমেদ, অচিন্ত কুমার ঘরামি, কেএম ইকবাল হোসেন, হুমায়ুন রেজা খান মিঠু, মো. ইউসুফ আলী, শফিকুল আলম তুহিন, খোকন রায়, এম এম মেহেদী বিল্লাহ, মো. আব্দুল গফ্ফার। এদিকে খুলনা শিশু হাসপাতাল সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রেসবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানান, গত ১৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত খুলনা শিশু ফাউন্ডেশনের নির্বাহী কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচনে ্এডভোকেট মো. সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন শিশু স্বাস্থ্য সেবা পরিষদের পক্ষে ২১-৪০ নং ব্যালট পর্যন্ত প্রার্থীদের বিপুল সংখ্যক ভোট প্রদান করায় খুলনা শিশু ফাউন্ডেশনের সকল শ্রেণীর সদস্যদের কাছে তারা কৃতজ্ঞ। শিশু স্বাস্থ্য সেবা পরিষদের অধিক সংখ্যক প্রার্থীর নিশ্চিত বিজয়ের পথে যখন ভোট গণনা চলছিল তখন অনাখাংকিত ঘটনায় ফলাফল ঘোষণা করতে না পারার জন্য খুলনাবাসীসহ শিশু ফাউন্ডেশনের সকল শ্রেণীর সদস্যরা দুঃখ পেয়েছে ও হতবাক হয়েছে। এডভোকেট মো. সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন শিশু স্বাস্থ্য সেবা পরিষদের সকল প্রার্থীরাও খুলনাবাসীসহ শিশু ফাউন্ডেশনের সকল শ্রেণীর সদস্যদের সাথে সম ব্যথীত হয়েছে।

উদ্বোধনের আগেই ধ্বংসস্তুপ খুলনা জেলা স্টেডিয়াম : পরিপাটি, সুন্দর আধুনিক স্টেডিয়াম। রং করা, গ্লাস ফিটিংস সবই শেষ। মাঠের কাজ শেষ আরও আগে। শুধু খেলোয়াড় নয়, গোটা খুলনাবাসীর কাছেই কাক্সিক্ষত ছিল খুলনা জেলা স্টেডিয়াম। সেই আকাক্সক্ষা যখন পূরণের পথে ঠিক সেই সময় পড়লো ছেদ। নোংরা রাজনীতির আক্রোশের বলি হয়ে উদ্বোধনের আগেই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হলো স্টেডিয়ামটি। 

খুলনা শিশু ফাউন্ডেশনের নির্বাহী কাউন্সিলের সদস্যদের ত্রি-বার্ষিক নির্বাচনের ভোট গণনা নিয়ে দ্বন্দ্বে জেলা স্টেডিয়াম ভবনে ব্যাপক ভাংচুর হয়। গোটা স্টেডিয়াম এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। গুলীবর্ষণ ও বোমাবাজির ঘটনাও ঘটে। মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা দফায় দফায় নবনির্মিত এ স্টেডিয়ামে নির্মমভাবে ভাংচুর চালায়। ঘটনার পর ভোট গণনা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ