ঢাকা, শুক্রবার 22 December 2017, ৮ পৌষ ১৪২৪, ৩ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা মুহাজির ও বাংলাদেশী আনসারদের দায়িত্ব ও কর্তব্য

মাওলানা এইচ এম গোলাম কিবরিয়া রাকিব : বর্তমানে আমরা আনসারদের ভূমিকায় : প্রিয় পাঠক! বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা বাংলাদেশের মুসলমানরা আনসার। আর প্রতিবেশী মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমানরা মুহাজির। তারা হিজরত করে আমাদের দেশে আসছেন ও নদীতে ভাসছেন। এ অবস্থায় তাদের সাহায্য করা আমাদের জন্য ফরয। অনেকে বলতে পারেন, আমাদের কি বা করার আছে, আমরা কিই বা করতে পারি? এ প্রশ্নের উত্তর হলো, আমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। ইসলামে মুহাজির ও আনসারের গুরুত্ব অনেক। কেন না রাসূল (সা.) নিজে মুহাজির হয়েছেন। মদিনার লোকেরা উদারহস্তে রাসূল (সা:) ও তাঁর সঙ্গীদের বরণ করে নিয়েছেন। আশ্রয় দিয়েছেন সঙ্গত কারণে রাসূল (সা.) বুঝেছিলেন মুহাজির হওয়া দুঃখ। তাই তো তিনি আনসারদের জন্য প্রাণ খুলে দু’আ করেছেন এই বলে-

“হে আল্লাহ আখিরাতের শান্তিই প্রকৃত শান্তি। আপনি আনসার ও মুহাজিরদের ক্ষমা করে দিন”।

 (বুখারী: ৩৭৯৭) 

রাসূল (সা.) মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হবে তা জানিয়ে বলেন-

 “এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য প্রাচীরস্বরূপ। যার একাংশ অপর অংশকে শক্তি যোগায়”। তিরমিযি: ১৯২৮ রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন 

“ মুমিনগণ তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, ভালোবাসা ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে একটি দেহের ন্যায়, দেহের একটি অঙ্গ যখন আঘাতপ্রাপ্ত হয় তখন তা অনিদ্রা ও জ্বরের মতো গোটা শরীরে  ছড়িয়ে পড়ে”। (বুখারী: ৫৬৬৫)

মুসলিম জাতি একটি দেহ বা আত্মার মত। এ দেহের কোথাও আঘাত লাগলে যে সমগ্র শরীরেই সে আগাত অনুভূত হয়। আজ মুসলিম জাতি চরম নির্যাতিত, নিষ্পেষিত, অবহেলিত ও মানবীয় ন্যূনতম অধিকার থেকেও বঞ্চিত। এর একটিই কারণ তারা প্রকৃতপক্ষে মানবতার মহাসংবিধান কুরআন মাজিদ ও তারই ব্যাখ্যা হাদিসে নববীর আলো থেকে বিচ্ছিন্ন। শয়তানি শক্তিগুলো এতোই মজবুতির সাথে যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে যে, মুসলিমরা তাদের নিজ ভূমিতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হচ্ছে। 

 ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা: ঈমান এনে  মুসলিম বলে ঘোষণা করার অপরাধে নির্যাতন-নিপীড়ন ও অত্যাচারের শিকার হওয়া নতুন কিছু নয়। যুগ যুগ ধরে যারাই আল্লাহ তা’আলার কালিমার রঙে রঙিন হয়েছেন, তাদেরকে নির্যাতন-নিপীড়নের মোকাবিলা করতে হয়েছে। কেউ কেউ তো শাহাদাতের নজরানা পেশ করার মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে অমর হয়েছেন। এর কারণ হলো, আল্লাহ তা’আলা দেখতে চান ঈমানের ঘোষণার আলোকে কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী। আল্লাহা তা’আলা সূরা আনকাবুত এর ২-৩ নং আয়াতে ইরশাদ করেন- 

 “মানুষ কি মনে করে নিয়েছে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ এ কথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে  দেয়া হবে তথা জান্নাত দিয়ে দেয়া হবে। অথচ তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আমি তাদের পূর্বের জাতিদেরও এভাবে পরীক্ষা করেছি। আল্লাহ  তা’আলা অবশ্যই পরীক্ষার মাধ্যমে জেনে নেবেন কারা ঈমানের দাবিতে সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী”। ঈমানের দাবিতে সত্যবাদী প্রমাণ করার জন্য প্রতিটি মুুমিনকেই আল্লাহ তা’আলা পরীক্ষা করেন। প্রকৃত মুমিন বান্দাহ আল্লাহ তা’আলার দয়ায় সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। যেমন হয়েছিলেন রাসূল (সা.) এর প্রিয় সাহাবায়ে কেরামগণ। পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবী (সা.) এর সাহাবিদের দু’টি দলে বিভক্ত করেছেন। একদল মুহাজির, আরেকদল আনসার। ইসলামের প্রথম শহীদ সুমাইয়া (রা.) এর লজ্জাস্থানে বল্লমের আঘাতে নির্মমভাবে শহীদ করার করুণ দৃশ্য আমি দেখিনি, বেলাল (রা.) কে মরুভূমির তপ্ত বালির উপর পাথর চাপা দেয়ার ঘৃণ্য দৃশ্য আমি দেখিনি, আমি দেখিনি খাব্বাব (রা) কে জ¦লন্ত কয়লার উপর শুইয়ে দেয়ার মত নিষ্ঠুর নির্যাতনের দৃশ্য, জাতির পিতা ইবরাহিম (আ:) কে জ¦লন্ত আগুনে নিক্ষেপ করার মত করুণ দৃশ্য আমি দেখিনি, আমি দেখিনি বদর, উহুদ, খন্দক ও তায়েফের যুদ্ধ, আমি সাহাবিদের জিহাদের ময়দানের টগবগে ঝরা রক্ত দেখিনি, নবী (সা.) এর দাঁত মোবারক শহীদের রক্ত মোবারক দেখিনি। 

আমি দেখেছি আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলিম ভাই-বোনের শাহাদাতের দৃশ্য।  দেখেছি তাদের মাথা কাটার অবর্ণনীয় চিত্র। দেখেছি মা-বোন ও ষোড়শী কন্যাদের ধর্ষণ, যুবক-যুবতীদের কাটাছেঁড়া শরীরের করুণ আর্তনাদের দৃশ্য। হে আল্লাহ তা’আলা আর সহ্য করতে পারছি না। মুক্তি দাও আমাদের রোহিঙ্গা ভাইদেরকে। তোমার অদৃশ্য শক্তি দিয়ে আমাদের মুসলিম ভাই-বোনদের রক্ষা কর।  তোমাকে ডাকার মত আরাকানের আর কেউ নেই, তোমার মহা শক্তিধর ও ন্যায় ফয়সালাকারী  

“হে চিরস্থায়ী ও চিরঞ্জীব!  তোমার রহমতের মাধ্যমে সাহায্য ও করুণা প্রার্থনা করছি” আমিন। 

 ইসলাম ও ঈমানের জন্য হিজরতঃ মক্কার জালিম মুশরিকদের অত্যাচারের প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা’আলার আদেশে রাসূল (সা:) সাড়ে ১৪শ বছর আগে তাঁর প্রিয় সাহাবিদের নিয়ে ৬২২ সালে মদিনায় হিজরত করেছিলেন, আর তাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন মদিনার আনসার সাহাবিগণ। কাফিরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নিজ ভূমি ত্যাগ করে যারা অন্য ভূমিতে আশ্রয় গ্রহণ করেন তাদের বলা হয় মুহাজির। ঈমান রক্ষাতে মক্কা থেকে আগত সাহাবি এবং রাসূল (সা:) কে যারা সাদরে গ্রহণ করছিলেন তথা মুহাজিরদের সাহায্যকারীদেরকে বলা হয় আনসার  বা মদিনার স্বার্থত্যাগী মুসলমান। 

আজ এত বছর পর আমাদের সামনে এসেছে আনসার (সাহায্যকারী) হওয়ার সুযোগ। আপনারা সবাই জানেন, রোহিঙ্গা ভাই-বোনেরা অত্যাচারিত হয়ে নিঃস্ব অবস্থায় বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। মক্কা থেকে রাসূল (সা:) সহ একদল সাহাবি যখন হিজরত করে মদিনায় এলেন তখন মদিনার মানুষ তাদের খুশিমনে বরণ করে নিলেন। রাসূল (সা:) দেখলেন হিজরতকারী সাহাবিরা একেবারেরই নিঃস্ব। এভাবে সহায়-সম্বলহীনভাবে পড়ে থাকা ব্যক্তির মানসিকতায় বিরাট নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এভাবে না আল্লাহ তা’আলার ইবাদাত করা যাবে আর না সুন্দর জীবনযাপন করা যাবে। তাই তিনি মুহাজিরদের সঙ্গে আনসারদের ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ করে দিলেন। সর্বপ্রথম আলী (রা) কে নিজের ভাই বলে স্বীকার করে নিলেন। কিন্তু এ ভ্রাতৃত্ব ছিল দ্বীনের জন্য হিজরত ও সাহায্যের ভিত্তিতে। তারপর নিজ চাচা আব্বাসের সঙ্গে জায়েদ ইবনে হারেসা, আবু বকর (রা:) এর সঙ্গে খারেজা (রা) এর ভ্রাতৃত্ব তৈরি করে দেন। ‘হায়াতে মুহাম্মদ’ গ্রন্থের ভাষায় এ ভ্রাতৃত্ব ছিল রক্ত সম্পর্কের মতোই। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ মদিনায় আগমনের পর রাসূল (সা:) আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা:) এবং সা’দ ইবনে রবি (রা:) এর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে দিয়েছিলেন। সা’দ ইবনে রবি (রা) আনসারদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর অর্ধেক সম্পদ গ্রহণ করতে এবং তাঁর স্ত্রীর যে জনকে পছন্দ হয় সেজনকে গ্রহণ করার স্বাধীনতা দেয়া বিশ্ব ইতিহাসে এর দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত বা নজির নেই। আনসাররা মুহাজিরদের সঙ্গে নিজেদের সম্পদ, ঘরবাড়ি, স্ত্রী সব ভাগ করে নিলেন। সব আনসারই  যে বিত্তশালী ছিলেন, এমন নয়। অনেক আনসার গরিবও ছিলেন। তবুও তারা মুহাজিরদের সঙ্গে নিজেদের স্বল্প সম্পদ ভাগ করে নিলেন। মুহাজিরদের সাহায্য করা আনসারদের জন্য ফরয। সূরা আনফালের ৭২ নং আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন-

  “তারা যদি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাহায্য চায়, সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য”। 

এ পর্যন্ত প্রায় ১০ লক্ষ মুহাজির রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে। আর জাতিসংঘের হিসেব মত প্রায় সাড়ে ছয় লক্ষের কাছাকাছি। তারা আমাদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। তাদের ভরণপোষণ করা বর্তমানে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে শামিল। এ ১০ লক্ষ মুহাজির রোহিঙ্গার জন্য যদি আমরা ১৬ কোটি আনসার তাদের খেদমত করি তাহলে আমাদের প্রতি ১৬০ জনের ভাগে একজন মুহাজির রোহিঙ্গা পড়ে। প্রতি ১৬০ জন আনসার ব্যক্তি একজন মুহাজিরের দায়িত্ব নিলে কষ্ট হবার কথা নয়। 

 রোহিঙ্গা আরাকানেরই মূল বাসিন্দা এ কথাটাকে আমাদের আগামী প্রজন্মকে ভালোভাবে অনুধাবন করাতে হবে। এ জাতীয় লেখা মানুষের বেশি বেশি পড়তে দিন। তাদের জানান, মিয়ানমারের মুসলমানদের যতটা পারা যায় সাহায্য করা নামায- রোযার মতোই ফরয। তারপর  এ সকল রোহিঙ্গার প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং তাদের আরাকানের পূর্ব পুরুষদের সঠিক ইতিহাস জানানোর মাধ্যমে শিক্ষিত করে গড়ে তুলুন। দেখা যাবে এরা পরিশ্রমের মাধ্যমে সোনালী দিন ফিরিয়ে আনবে। যেমন এনেছিলেন আবু বকর, ওমর ও আলী (রা:)। নিঃস্ব অবস্থায় এসে মুহাজিররা আনসার ভাইদের দানের প্রতি তাকিয়ে থাকেননি। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে মদিনার অর্থনৈতিক বিপ্লবের সহযোগী হয়েছেন যা আমাদের সোনালি ইতিহাসের অংশ হয়ে কিয়ামত অবধি বিদ্যমান থাকবে। 

লেখক :খতিব, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও উপস্থাপক, সদস্য: ইসলামিক মিডিয়া সোসাইটি। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ