ঢাকা, শনিবার 23 December 2017, ৯ পৌষ ১৪২৪, ৪ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

লোকসান দিয়ে মিলাররা চাল দিতে পারছে না সরকারকে

এইচ এম আকতার: বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও চালের বাজার এখনও লাগামহীন। চলতি সপ্তাহে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ২-৩ টাকা। জিটুজি পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে ভারত, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া এবং থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সরকার প্রায় ৩০ লাখ টন চাল আমদানির চুক্তি করলেও গত ছয় মাসে এসেছে ১৮ লাখ মেট্রিক টন। এ হিসেবে দেশে চালের কোন ঘাটতি নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বলছে, এখনও ৩৪ লাখ টন চাল মজুদ রয়েছে মিলারদের কাছে। অথচ চুক্তি করেও লোকসানের অজুহাতে চাল দিচ্ছে না সরকারকে। মিল মালিকরা বলছেন, ৩৯ টাকা দরে চাল দেয়া হলে প্রতি কেজিতে লোকসান গুণতে হবে ৫/৬ টাকা।

 লোকসানের অজুহাতে সরকার নির্ধারিত দামে চাল দিচ্ছে না মিল মালিকরা। তাদের আভিযোগ, বর্তমান দরে চাল দিলে কেজিতে অন্তত ৫/৬ টাকা লোকাসান হবে। ফলে এবারও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। চুক্তির পরও যেসব মিলার চাল দিচ্ছে না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন খাদ্য কর্মকর্তারা।

সরকারকে ৩৯ টাকা কেজি দরে চাল দেয়ার চুক্তি করেও লোকসানের ভয়ে চাল দিতে গড়িমসি করছেন মিল মালিকরা।

তিন ডিসেম্বর থেকে সরকারি চাল সংগ্রহ আভিযান শুরু হলেও লক্ষ্মীপুরে তেমন সাড়া দেয়নি মিল মালিকরা । তাদের আভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামে চাল দিলে কেজি প্রতি ৪/৫ টাকা লোকসান গুণতে হবে।

পাবনায় এবার সাড়ে ৪ হাজার মেট্রিকটন চাল সংগ্রহের লক্ষ ঠিক করেছে জেলা খাদ্য বিভাগ। ১৮ দিনে ৫৭৮ মেট্রিকটন চাল দিয়েছেন মিলাররা। তারা বলছেন, চুক্তির কারণে লোকসান দিয়ে হলেও চাল দিচ্ছেন তারা।

সবচেয়ে নাজুক অবস্থা বরিশালে। ৩২০ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ হলেও এখন পর্যন্ত কোনো চালই দেয়নি মিলাররা। খাদ্য কর্মকর্তারা বলছেন চুক্তির করেও চাল না দিলে নেয়া হবে ব্যবস্থা। গত বছর সরকার নির্ধারিত ৩৩ টাকা দরে চাল দেয়নি অধিকাংশ মিলার। এবার কেজিতে ৬ টাকা দাম বাড়ানোর পরও মিলছে না সাড়া।

 জানা গেছে, এবার আমন মওসুমে কুষ্টিয়ায় ৪শ' ১৬ জন মিলারকে বাইরে রেখে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়েও তৈরি হয়েছে সংশয়। যদিও জেলা প্রশাসক বলছেন, চুক্তিবদ্ধ মিলাররা চাল দিতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। গেল মওসুমে ৩৩টাকা দরে চাল সংগ্রহ হলেও এবারে, ছয় টাকা বেড়ে ৩৯ টাকা দরে চাল সংগ্রহ হবে। তবে চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের দাম নির্ধারণের পর থেকে বাজারে বেড়ে গেছে ধানের দাম। ফলে খুব একটা লাভের মুখ দেখছেন না তারা। এ দামে চাল সরকারকে দিতে হলে লোকসান হবে কেজিতে ৫/৬ টাকা।

 গেল বোরো মওসুমে জেলায় চাল সংগ্রহে ১৭ হাজার মেট্রিকটন লক্ষমাত্রা নির্ধারণ হলেও তা পূরণে ব্যর্থ হয় সরকার। এই যখন পরিস্থিতি, তখন চলতি আমন মওসুমে ১১ হাজার ৮শ মেট্রিকটন চাল সংগ্রহ করা যাবে কিনা তা নিয়ে রয়েছে শংসয়। বোরো মওসুমে চাল সরবরাহে ব্যর্থ হওয়ায়, এবারের আমন মওসুমে জেলার ৪১৬ মিলারকে বাইরে রেখে ছয়টি উপজেলা থেকে চাল সংগ্রহ হবে। আর তা চলবে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক গবেষণা বলছে উল্টো কথা। তাদের হিসেবে প্রায় ৯৭ লাখ টন মজুদ সক্ষমতা নিয়ে মিল মালিকরাই এখন চালের বাজারে প্রধান নিয়ন্ত্রক। দেশে কৃষক পর্যায়ে উৎপাদিত চালের কতটুকু তারা ভোগ করে, নিজস্ব প্রয়োজন মিটিয়ে কতটুকুই বা বিপণন করে ও মজুদের পরিমাণ কত এসব জানতে প্রথমবারের মতো মাঠপর্যায়ে এ গবেষণা পরিচালনা করেছে বিবিএস। দেশের ৬৪টি জেলার ১২০ মৌজায় গবেষণাটি চালানো হয়েছে। প্রায় আট হাজার পরিবারের ২০১৬ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে এতে।

‘অ্যানালিটিক্যাল রিপোর্ট অন মেথডোলজিস অব দ্য ক্রপ এস্টিমেশন এন্ড ফোরকাস্ট সার্ভে এন্ড প্রাইভেট স্টক অব ফুড গ্রেইন সার্ভে ২০১৬-১৭’ শিরোনামে চলতি বছর ওই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিএস।

চালকলগুলোকে ক্ষুদ্র, ছোট, মাঝারি থেকে বড় এ তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে তাদের সক্ষমতাকে পরিমাপ করা হয়েছে গবেষণায়। এতে দেখা গেছে, ক্ষুদ্র চালকলগুলোর মজুদক্ষমতা ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ১৭০ টন, ছোট চালকলগুলোর ৩৭ লাখ ৩৮ হাজার ৫৫১ টন ও মাঝারি থেকে বড় চালকলগুলোর ধারণক্ষমতা ৩০ লাখ ৭০ হাজার ৬৬৫ টন। এ তিনটি ক্যাটাগরির চালকলে সব মিলিয়ে ৯৬ লাখ ৬৬ হাজার ৩৮৬ টন চাল মজুদ করা সম্ভব। এ সক্ষমতার বিপরীতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৪ লাখ ১৫ হাজার টন চাল মজুদ করে চালকলগুলো।

অন্যদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন খাদ্যগুদামে প্রায় ২২ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ রাখা সম্ভব। এসব গুদামে চালের পাশাপাশি অন্যান্য খাদ্যশস্য ও বীজ রাখা হয়। আর কৃষক পর্যায়ে মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ মজুদ রাখা হয়, গত অর্থবছরের উৎপাদন হিসাবে নিলে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪২ লাখ টন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মজুদ সক্ষমতা যত বাড়বে, চালের বাজারের নিয়ন্ত্রণ ততই মিলারদের হাতে আরো কুক্ষিগত হবে। তাই চালের বাজারে ভারসাম্য আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, এরই মধ্যে চালের বাজারের পুরো নিয়ন্ত্রণ মিলাররা নিয়ে নিয়েছেন। এক দশক ধরেই দেশের অটো রাইস মিলগুলোর উৎপাদন ও মজুদক্ষমতা অনেক বেড়েছে। মিলারদের মজুদ সক্ষমতা যত বেড়েছে, ততই চালের বাজার অস্থিতিশীল হয়েছে।

তিনি বলেন, ধান উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোনো অংশগ্রহণ না থাকলেও চাল উৎপাদন ঠিক রাখতে প্রচুর ধান মজুদ করছে অটো রাইস মিলগুলো। এছাড়া ধান থেকে চাল করার পর অতিরিক্ত মুনাফার আশায় তাও মজুদ রাখছে তারা। ফলে বাজারে দাম ওঠানামা করানোর ক্ষেত্রে এক ধরনের সুযোগ নিচ্ছেন মিল মালিকরা। এ অবস্থায় চালের বাজারে ভারসাম্য আনার জন্য পরিকল্পনা নিতে হবে।

চালকলে ধান ও চালের মজুদ কী পরিমাণ ও কতদিন রাখা যাবে, সে বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, চালকলে ১৫ দিনের উৎপাদন সক্ষমতার পাঁচ গুণ ধান ও দ্বিগুণ চাল মজুদ রাখা যাবে। এর চেয়ে বেশি মজুদ রাখলে তা হবে বেআইনি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা না মেনে চাল মজুদ করেন মিলাররা। এর মধ্য দিয়ে তারা চালের বাজারে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অটো মেজর এন্ড হাসকিং মিল ওনার্স এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি সহিদুর রহমান পাটোয়ারী (মোহন) বলেন, চালের বাজারে আমরা মোটেও নিয়ন্ত্রক নই। আমরা সরকারের ও কৃষকের সহায়ক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা নিজেরা শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গেই কাজ করছি। আমাদের কোনো মিলে আইনবহির্ভূতভাবে এক চুল পরিমাণ বাড়তি মজুদ পাওয়া যায়নি কিংবা যাবেও না।

বাংলাদেশ অটো মেজর এন্ড হাসকিং মিল ওনার্স এসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চুক্তিযোগ্য চালকলের সংখ্যা ২২ হাজার ৬৫৪। বিবিএসের গবেষণায় এসব চালকলকে তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। তিন ধরনের চালকলের মাধ্যমে প্রতি বছর ২ কোটি ৭৯ লাখ ২৬ হাজার টন চাল উৎপাদন করা হচ্ছে। এ পরিমাণ চাল উৎপাদনে প্রায় ৪ কোটি ৪৬ লাখ টন ধান ভাঙানো হচ্ছে। অর্থাৎ দেশের সিংহভাগ ধান এখন চালকলগুলোতেই ভাঙানো হচ্ছে। ফলে চাল মজুদের বড় অংশই থাকছে এসব চালকলে।

প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অটো রাইসমিল ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম খোরশেদ আলম খান বলেন, সরকারি গুদামে চালের মজুদ কমে যাওয়ায় গত জুন থেকে চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়তে শুরু করে। আর এর পেছনে কাজ করেছে এক শ্রেণির অতি মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। তাদের সিন্ডিকেশনের ফলেই এক লাফে চালের দাম কয়েকগুণ বাড়ে। শুধু তাই নয়, এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমাণ বাজার মনিটরিংয়েরও অভাব রয়েছে। পাশাপাশি কনজ্যুমার এসোসিয়েশনকেও এ বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের পরামর্শ দেন তিনি।

চালের আমদানির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চালের দাম না কমার কারণ জানতে চাইলে কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, রেকর্ড পরিমাণ চাল আমদানি হলেও সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুদ নেই। যার ফলে বাজারে চালের দাম কমছে ধীরগতিতে। চালের মজুদ ৮-১০ লাখ টন না হওয়া পর্যন্ত এবং নতুন আমন চাল সংগ্রহ অভিযান সফল না হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থা থাকবে বলে মনে করেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ