ঢাকা, শনিবার 23 December 2017, ৯ পৌষ ১৪২৪, ৪ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দেশ ও জাতিধ্বংসের আয়োজন চলছে

 

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : আফ্রিকার সবচেয়ে বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকা। এর প্রধানফটকে লেখা আছে ‘কোনও জাতিকে ধ্বংস করতে পারমাণবিক হামলা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের প্রয়োজন নেই। বরং সে জাতির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় প্রতারণার সুযোগ দিলেই হবে। কারণ এভাবে পরীক্ষা দিয়ে তৈরি হওয়া ডাক্তারদের হাতে রোগী পটোল তুলবে। ইঞ্জিনিয়ারদের দ্বারা নির্মিত দালান-কোঠা, ইমারত ধসে পড়বে। অর্থনীতিবিদদের দ্বারা দেশের আর্থিক খাত দেউলে এবং বিচারকদের দ্বারা বিচারব্যবস্থার কবর রচনা হবে। সুতরাং শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়বার মানে হলো একটি জাতির অবলুপ্তি।’

শিক্ষায় প্রতারণা বলতে প্রধানত নকলবাজিকে মিন করা হয়। আজকাল নকলবাজি শিক্ষার সবখানে অনুপ্রবেশ করেছে। অনুপ্রবেশ বলা বোধ হয় ঠিক নয়। বলা চলে প্রবল প্রতাপের সঙ্গে নকল নামক দানব বিরাজ করছে। নকলের এ ‘সুকর্ম’টি অবশ্য নিজে নিজে চলে না। চালানো হয়। তাও সংঘবদ্ধ হয়ে। সি-িকেট করে। এতে যেন কারুর লজ্জাবোধ নেই। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক-অভিভাবিকা সবাই যেন নকলের দিকে ছুটছেন। সবাই হয়তো নয়। তবে অনেকেই। শিশুশ্রেণি থেকে মাস্টার্স ক্লাস অবধি চলছে নকলবাণিজ্য।

যে সব ছাত্র সারাবছর পড়ালেখা করে না, আড্ডাবাজি করে, রাজনীতির পেছনে ঘোরে, তাদের নকলবাজি করতেই হয়। তবে রাজনীতি করলেই সবছাত্র রেজাল্ট খারাপ করবে এমনও না। এছাড়া যারা ছাত্র হিসেবে খারাপ তারা নকলের প্রচেষ্টা করে এটা অনেকের জানা। কিন্তু একশ্রেণির শিক্ষক কেন নকল সরবরাহ করেন? নিজের ছাত্রদের অন্যায়ভাবে ভালো রেজাল্ট পাইয়ে দিয়ে বাহবা কুড়াবার জন্য? নাকি এতেও নগদ নারায়ণের অবদান কাজ করে? 

দ্বিতীয় শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হবার ফলে গত ১৭ ডিসেম্বর রোববার বরগুনার বেতাগিতে ১৪০টি সরকারি-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক বেতাগির সমস্যা-সম্ভাবনা নামের পাবলিক পাতায় ধূসর স্বপ্ন নামে এক ফেইক আইডি থেকে গত ১৫ ডিসেম্বর রাতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।

অস্পষ্ট ভাষায় ২০১৬ সাল লেখা সম্বলিত দ্বিতীয় শ্রেণির গণিত পরীক্ষার একটি প্রশ্নপত্র দেয়া হয়। প্রশ্নপত্রটি পেয়ে কর্তৃপক্ষ গণিত পরীক্ষা আসল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে হুবহু মিল দেখতে পায়। এর প্রেক্ষিতে ১৭ তারিখের সকল শ্রেণির গণিত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। ইত্তেফাক, দি নিউ নেশনসহ বিভিন্ন পত্রিকা এ প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর ফলাও করে ছাপে।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, কোনও কোনও শিক্ষক প্রশ্নপত্র ফাঁস করে দিচ্ছেন। গত ১৭ ডিসেম্বর সচিবালয়ে দুদক কমিশনারের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভাশেষে অভিযোগ করে এমন কথা বলেন তিনি। দুদক কমিশনার ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. নাসিরুদ্দিন আহমদ শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে গঠিত শিক্ষা সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিম একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পেশ করেন।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষকদের কেউ কেউ ক্লাসে না পড়িয়ে কোচিংয়ে বা বাড়িতে পড়ান। যিনি যতো নামি শিক্ষক তিনি ততো ক্লাসে কম পড়ান। নয়তো তাদের ব্যবসা নষ্ট হয়ে যাবে। —ইত্তেফাক, ১৮-১২-১৭।

ইংরেজি দৈনিক দি নিউ নেশন বেতাগির প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে হেডিং করেছে ‘আনবিলিভেবল !’ সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রীর মতবিনিময় সভা নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিন হেডিং করেছে ‘প্রশ্নফাঁস নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর অসহায়ত্ব’। অর্থাৎ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। তবে যারা শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট তাদের অর্থাৎ শিক্ষকদের তেমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই বললেই চলে। 

১৮ ডিসেম্বর একটি টিভি চ্যানেলের খবরে জানানো হয়, প্রথম শ্রেণির প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় নাটোরেও ১০২ টি সেন্টারের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে নকলবাজি গোড়া থেকেই শুরু হয়ে গেছে। মানে পচন শুরু গোড়াতেই। যে গাছের পচন শুরু গোড়াতে বা মূলে সে গাছ কখনও সুস্থ ও স্বাভাবিক না হবারই কথা। আমাদের জাতির গোড়াই পচতে শুরু করেছে।

আমাদের স্বাধীনতা, স্বাধিকার, সার্বভৌমত্বকে টার্গেট করে কারা যেন নিভৃত আড়ালে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা টের পাচ্ছিনে। হয়তো বুঝতে দেয়া হচ্ছে না। আর কিছুদিন পর হয়তো দাঁড়াবার শক্তি হারিয়ে যাবে আমাদের। তখন এমনিতেই শুয়ে পড়তে হবে।

পরীক্ষায় নকল লুকিয়ে ছাপিয়ে দুই-একজন আগেও করতো। তবে তারা তটস্থ থাকতো ধরা পড়বার ভয়ে। আর কেউ ধরা পড়লে লজ্জায় যেতো আড়ষ্ট হয়ে। কিন্তু আজকাল নকলবাজদের লাজশরম নেই। উল্টো ওদেরই সমীহ করে চলতে হয়। মাঝেমধ্যে ওরাই ধাতানি দেয় শিক্ষক-পরীক্ষকদের। লাঞ্ছিতও করে কখনও কখনও। এছাড়া শিক্ষকদেরও কেউ কেউ নকল সরবরাহ করেন, যা শিক্ষামন্ত্রী সাহেব নিজেও স্বীকার করেছেন।

নকল করে পাস করা যেন এখন অহঙ্কার ও গৌরবের ব্যাপার। ঘুষ দেয়া এবং নেয়া যেমন খারাপ কিছু মনে করে না অনেকেই। ঠিক তেমনই নকল করে পাস এবং জাল সার্টিফিকেট নিয়ে চাকরি পাওয়াও যেন এখন আর খারাপ কিছু নয়। আমরা যেন এমনই বিবেক-বোধহীন জাতিতে রূপান্তরিত।

প্রতিবছর হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করছে। কিন্তু ভার্সিটিতে ভর্তিপরীক্ষায় টিকতে পারছে না। কারণটা কী? বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয় কারুর। বাংলা মাতৃভাষা। প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে এসে অনেকেই নিজের ভাষা শুদ্ধ করে লেখতে পারে না। অন্যভাষায় কী করে তা সহজেই অনুমেয়। ফেসবুকে অনেকেই জিপিএ- ৫ পাওয়া আছেন। কিন্তু বাংলাভাষায় লেখা পোস্ট দেখে বোঝা যায় কার মাথার ঘিলুর ওজন কত?

যারা নকল করে পাস করে আবার চাকরিও পায় তারা দেশ ও জাতির জন্য কী করবে বলা সহজ। তবে যাই করুক, বারোটা যে বাজাবে তাতে সন্দেহ নেই। যারা সারাবছর পড়াশোনা না করেই পাস করতে চায়, তাদের নকলের প্রচেষ্টা থাকতে পারে। কিন্তু শিক্ষকরা কেন নকলের সহায়তা করেন? এমনকি নিজেরাও নকল সরবরাহের জন্য অভিযুক্ত হচ্ছেন। একর্ম কেবল প্রাইমারি স্কুল কিংবা গ্রামের সাধারণ শিক্ষকরাই নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও নকল-কেলেঙ্কারীতে জড়িয়ে পড়ছেন। নিশ্চয়ই সব শিক্ষক একর্ম করেন না। কিন্তু কতিপয় শিক্ষকতো অপকর্মটি করছেন? এতে কি শিক্ষকসমাজের নাক কাটা যাচ্ছে না? শিক্ষকরাই যদি দুই নম্বরি করেন তাহলে ছাত্ররা যাবে কোথায়? তাদেরইবা দোষ কী? 

ছাত্রসমাজ একটা দেশের সম্পদ। আগামিতে এরাই দেশ পরিচালনা করবে। সমাজ রক্ষাও করতে হবে এদের। আজকের শিক্ষার্থীদের কর্মনৈপুণ্যের ওপর নির্ভর করবে আমাদের দেশ ও জাতির ভবিষ্যত। এরা যদি ঠিকমতো গড়ে উঠতে না পারে কিংবা মেধাহীন হয়ে গড়ে ওঠে তাহলে জাতি হিসেবে টিকে থাকা বড় কঠিন হবে। তাই আফ্রিকার ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহদ্বারে যথার্থভাবেই লেখা আছে: কোনও জাতিকে সমূলে বিনাশ করতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের দরকার নেই। প্রতারণা বা নকলবাজি করে পরীক্ষা পাসের সুযোগ দিলেই কিল্লা ফতেহ। আর এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে আমাদের দেশে। এখানে প্রথম শ্রেণি থেকে মাস্টার্স ক্লাস পর্যন্ত নকলবাজি চলে। ছাত্রছাত্রীরাতো করেই। শিক্ষকদেরও অনেকে নকলের সুযোগ করে দেন। কেউ কেউ নিজেরাই নকল সরবরাহ করেন বলে অভিযোগ উঠছে। এখন ভাবুন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পচন কতটা ভয়ঙ্কর এবং বিনাশী। তাই নকলপ্রবণতা থেকে শিক্ষার্থী-শিক্ষক সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ