ঢাকা, শনিবার 23 December 2017, ৯ পৌষ ১৪২৪, ৪ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

৩৩ হিমাগারে ১০০  কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা বগুড়ায় আলু চাষিদের সর্বনাশ

 

বগুড়া অফিস : সবজি চাষে বিখ্যাত বগুড়ার চাষিরা আলু মজুদ করে চরম বিপাকে পড়েছেন। লাভের আশায় হিমাগারে জমা করে রাখা হাজার হাজার বস্তা আলু এখন এই অঞ্চলের কৃষকের গলায় কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে নতুন আলুর আমদানি হওয়ায় হিমাগারে রাখা আলুর চাহিদা একবারেই কমে গেছে। সেই সাথে ধস নামে দামে। ফলে বগুড়ার ৩৩ হিমাগারে রাখা আলুতে প্রায় ১০০ কোটি  টাকা লোকসানের আশংকা করছেন ব্যবসায়ীরা।

জানাগেছে, ২০১৬-১৭ মৌসুমে বগুড়া অঞ্চলে আলুর বাম্পার ফলন হয়। ভালো দামের আশায় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ লাভের আশায় বিপুল পরিমাণ আলু কিনে হিমাগারে মজুদ করে। অনুসন্ধানে জানাগেছে, গত ৩ মৌসুমে এই উত্তরাঞ্চলে আলুর ভালো ফলনের পাশপাশি বছর জুড়েই ভালো দামও ছিলো। মৌসুমের শুরুতে তুলনামূলক কম দামে আলু কিনে পরবর্তীতে বেশি দামে বিক্রি করেছে ব্যবসায়ীরা। অধিক লাভের ধারাবাহিকতায় গত মৌসুমেও উৎপাদিত আলুর বেশির ভাগ জমা পড়ে হিমাগারে। এতে আগের মৌসুম শেষ হয়ে নতুন মৌসুম শুরুর আগেই সবাই একযোগে বাজারজাত করতে গিয়ে বিপাকে পড়ে যায়। হঠাৎ করেই আলুর দামে ধস নামে। কোন কোন এলাকায় কেজি প্রতি আলুর দাম এক থেকে দেড় টাকায় নেমে এসেছে। একারণে অনেক মৌসুমী ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ হিমাগার থেকে আলু উত্তোলনের সাহস পাচ্ছেনা। পাশাপাশি বাজারে নতুন আলুর আমদানি বাড়তে থাকায় দিন দিন হিমাগারের আলুর দাম বাড়ার কোন সম্ভাবনা দেখছেন না ব্যবসায়ীরা।

বগুড়া কৃষি আঞ্চলিক অফিসের তথ্যে জানা গেছে, ২০১৬-১৭ কৃষি মৌসুমে উত্তরের চার জেলা বগুড়া, জয়পুরহাট, পাবনা, সিরাজগঞ্জ আলুর চাষ হয়েছিলো ১লাখ ১৪ হাজার ১৬ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছিলো ২৩ লাখ ৫০ হাজার ২ মে.টন। অপর দিকে, চলতি মৌসুমে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে ১লাখ ১০হাজার ৪১০ হেক্টর জমি। ইতোমধ্যেই চাষ হয়েছে ৪৭হাজার ৩২৩ হেক্টর জমিতে। আগাম জাতের আলু উত্তোলন হয়েছে ১০০ হেক্টর। উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ১৪ মে.টন।      

গত মৌসুমে পর্যাপ্ত মজুদ এবং চলতি মৌসুমে নতুন আলু উত্তোলনের ফলে পুরাতন আলু হিমাগার থেকে আলু নিচ্ছে না কৃষকরা। দাম না থাকায় কৃষকদের বস্তাপ্রতি লোকসান গুণতে হচ্ছে সর্বোচ্চ ১,৩০০ টাকা। এক বস্তা লালশীল আলু মৌসুমে ক্রয় ও ভাড়াসহ খরচ হয়েছে ১৫৫০ টাকা অথচ এ বছর আলু বিক্রয় হয়েছে কখনও ৫০০-৪০০-২০০ টাকায়। সম্প্রতি ১ বস্তা আলু ১০০ টাকায়ও নিচ্ছেনা কৃষকরা। এই অবস্থাকে আলু চাষিরা দুর্যোগ হিসেবে দেখছেন। বগুড়া জেলায় মোট কোল্ডস্টোরেজ এর সংখ্যা ৩৩ টি। প্রতিটিতে ১ থেকে দুই লাখ বস্তা ধারণ ক্ষমতা। প্রতি বস্তায় ৮৪ কেজি আলু থাকে। উত্তরাঞ্চলের শস্য ভান্ডার খ্যাত বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় কোল্ডস্টোরেজ এর সংখ্যা ১৪টি। প্রতিটি কোল্ডস্টোরেজের ধারণ ক্ষমতা ১ লক্ষ থেকে ১ লক্ষ ৫০ হাজার বস্তা। গড়ে শিবগঞ্জে আলু মজুদের পরিমাণ ১৫ লক্ষ বস্তা যা ব্যবসায়ী ও কৃষক  মিলে সংরক্ষণ করেছে। অথচ এসব  কোল্ডস্টোরেজে প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ আলু এখনো মজুদ আছে। এগুলো নিতে কৃষক ও ব্যবসায়ী কেউ আসছে না।

শিবগঞ্জ সদরে অবস্থিত নিউ কাফেলা কোল্ড স্টোরেজ এর ক্যাসিয়ার আখতারুজ্জামান জানান, চলতি মৌসুমে ১ লক্ষ বস্তা আলু সংরক্ষণ করা আছে। এর মধ্যে ৭৪ হাজার বস্তা আলু কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মাঝে সরবরাহ করা হয়েছে বাকি ২৬ হাজার বস্তা আলু ব্যবসায়ী ও কৃষক কেউ নিতে আসছে না। মজুদকৃত মোট আলুর ৫০ ভাগের বিপরীতে ব্যবসায়ী ও কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণও দেয়া আছে অথচ এখন পর্যন্ত কোন কৃষক ও ব্যবসায়ী ঋণের টাকা পরিশোধ করছে না। প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ বস্তা আলু পচে গলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নারী শ্রমিকেরা এগুলো বাছাই করছে। দাম কম থাকায় স্টোরগুলোতে বিদ্যুত সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে।

কোল্ডস্টোরেজের মালিকদের দেয়া তথ্যে জানা গেছে, প্রায় ১০০ কোটি টাকার মত লোকসান হবে বগুড়ার এই সকল হিমাগারে। কৃষক ও কৃষির চাহিদা পূরণের জন্য ১৯৯০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত গড়ে উঠে এই সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান। এই সকল শিল্পের বিনিয়োগও কম নয়। এক একটি শিল্পের পিছনে জমি সহ নিমার্ণ ও যন্ত্রাংশ বাবদ ব্যয় হয়েছে ২০ থেকে ২৪ কোটি টাকা। এই মূলধনের ৯০ শতাংশ টাকা কোন না কোন ব্যাংক বা বীমা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। 

শিবগঞ্জে কৃষি বিভাগের কর্মী কামাল হোসেন জানান বিগত বছরে শিবগঞ্জে ১৮ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। কিন্তু এই অবস্থা চলতে থাকলে চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। 

বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক প্রতুল চন্দ্র সরকার বলেন, গত মৌসুমে বগুড়ায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১লাখ মে.টন আলু বেশি উৎপাদন হয়েছিলো। ফলে বর্তমানে পুরাতন আলুর দাম কমেছে। তিনি মনে করেন বর্তমানে নতুন মৌসুমে কৃষকরা আলু লাগাতে শুরু করেছে। হিমাগার থেকে কিছু আলু বীজ হিসেবে বের হয়ে আসবে। তখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে বলে তিনি মনে করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ