ঢাকা, শনিবার 23 December 2017, ৯ পৌষ ১৪২৪, ৪ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

 পৌষ মেলার প্রথম দিনেই মুখর বাংলা একাডেমি  কৃত্রিম হলেও বর্ণিল আয়োজন জুড়ে মুগ্ধতা

 

সাদেকুর রহমান : “শীতের দিনে নামল বাদল,/ বসল তবু  মেলা।/ বিকেল বেলায় ভিড় জমেছে,/ ভাঙল সকাল বেলা।/ পথে দেখি দু’-তিন-টুক্রো/ কাঁচের চুড়ি রাঙা,/ তারি সঙ্গে চিত্র-করা/ মাটির পাত্র ভাঙা।”-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বর্ণনার মতোই যেন জমে ওঠেছে নগরীর পৌষ মেলা। আয়োজনটা কৃত্রিম হলেও এর গ্রামবাংলার শাশ্বত উৎসবের বর্ণময়তা ধরা পড়েছে তাতে। অধুনা শহুরে নাগরিকদের স্মৃতিপটে ভাসা কিংবা রবি কবির বর্ণিত পৌষ- মেলার আনন্দ রেশ ছড়িয়ে দেয় পৌষ মেলা উদযাপন পরিষদের উনিশতম উদ্যোগ।  

গতকাল শুক্রবার ছিল পৌষের অষ্টম দিবস। এদিন দেশের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ছিল পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া ও চুয়াডাঙ্গায়, ১১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর ঢাকায় দিনের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বেলা খনিকটা বাড়লেও প্রকৃতিতে সূর্যের দেখা তখনো মেলেনি। কুয়াশা আর গাছের ছায়ায় সূর্যের আলো ছিল ¤্রয়িমাণ। কুয়াশাচ্ছন্ন এমনি প্রকৃতিতে সকালে আবহমান বাংলার হাজার বছরের লোকজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করে উগ্রবাদ রুখে দেয়ার প্রত্যয়ে শুরু হয়েছে তিন দিনের পৌষ মেলা।

বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে আয়োজিত পৌষ মেলা শুরু হয় সকাল আটটায়। তবে মেলার রীতি অনুযায়ী,  সাড়ে আটটায় বরেণ্য সাংবাদিক ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক কামাল লোহানী প্রধান অতিথি থেকে আইল্যা জ্বালিয়ে মেলার শুভ সূচনা করেন। এ মেলাতে পিঠার স্টলই বেশি। বাংলা একাডেমির মাঠের চারদিকে সুসজ্জিতভাবে নির্মিত ৫০টি স্টলের ৪৬টি স্টল পিঠা ও খাবারের। বাকি চারটি কারুপণ্যের জন্য।

নতুন জামাই বা অতিথি এলে হাজির করা হয় ‘তক্তি’ পিঠা। পিঠার সঙ্গে জামাই আদরের সম্পর্কটা বেশ। একটু বড় আকারের চাপ্টির নাম নাকি ‘ঝালজামাই’। নামের কারণেই হোক বা স্বাদের কারণেই হোক, মানুষের আগ্রহও কম নয়। মেলার বেশ কিছু স্টলে চুলা-হাঁড়ি-কড়াই আছে। এখানে বানানো গরম গরম পিঠার স্বাদ মনে করিয়ে দেয় পল্লী-গাঁয়ে মায়ের হাতের পিঠা খাওয়ার স্মৃতি। দর্শনার্থীরাও দেখতে পাচ্ছেন পিঠা তৈরির কৌশল, উপকরণ ইত্যাদি। সঙ্গে ঝাল-মিষ্টি ঘ্রাণ ফ্রি। গান, কবিতা আর নাচের সঙ্গে নকশাদার পিঠার স্বাদ নিতে প্রথম দিনেই সকাল থেকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ছিল নগরবাসীর পদচারণায় মুখর। 

 গোপালগঞ্জ পিঠাঘরের সোহেল মাহমুদ মওসুমি পিঠা বিক্রেতা। শীতকাল এলে নিজ এলাকা গোপালগঞ্জ জেলার বিভিন্ন পিঠার স্বাদ দেন রাজধানীবাসীকে। ফার্মগেটে তার অস্থায়ী পিঠার দোকান আছে। তবে সেখানে শুধু ভাপা-চিতই চলে। সোহেল বলেন, একেক দেশে পিঠার একেক নাম। আমরা যেই পিঠারে ‘চাপ্টি’ বলি, তা ঢাকায় আইসা হইছে ‘ঝাল জামাই’। একটি পাত্রে কয়েকটি পিঠা দু’ টুকরা করা। টুকরাগুলোর মাঝে ডিম। দেখতে বেশ লোভনীয়। নাম তার ‘কুসুমকলি’। এখানে পিঠার দাম ২০ থেকে ৫০ টাকা।

শাকিরা পিঠাঘরের তাসলিমা বেগমের স্টলেও ‘মালপোয়া’, ‘ঝিনুক’, ‘চিকেন পুলি’, ‘মিষ্টি পুলি’সহ নানান স্বাদের পিঠা আছে। রান্না তার পেশা। রান্নাবিষয়ক মেলা হলেই ছুটে চলেন। বরিশাল ঐতিহ্যবাহী পিঠাঘরের স্টলে গুড় আর সুজির পাটিসাপটা দূর থেকেই নজর কাড়ছে। একটু ভিন্ন রকম পিঠা দেখা গেল। দেখতে কিছুটা কেকের মতো। এদের নাম ‘ছানা পিঠা’।

শওকত হোসেন ছেলেমেয়েকে নিয়ে এসেছেন। একাডেমির আমতলায় বসে দুধ চিতই খাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, প্রতিবারই চেষ্টা করি বাচ্চাদের নিয়ে আসার। বাসায় তো আর সব পিঠা বানানো সম্ভব হয় না। এ রকম জায়গায় এলে বিভিন্ন অঞ্চলের পিঠার স্বাদ নেয়া যায় এবং পিঠা চেনাও হয়।

 মেলার উদ্বোধন করে কামাল লোহানী বলেন, হাজারো বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বারেবারে বাংলায় প্রতিরোধের হাতিয়ার হয়েছে, এ পৌষ মেলা তারই অংশ। চারপাশে যখন জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে গেছে, তখন এই পৌষ মেলার  মাধ্যমে আমরা সংঘবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাই। বিদেশি অপসংস্কৃতি আর মানুষ হত্যাকারী পশুদের বিরদ্ধে লড়াই করতে হলে আমাদের বঙ্গ সংস্কৃতির উৎসবগুলোর চর্চা বাড়াতে হবে।

 পৌষমেলা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের গোলাম কুদ্দুছ বলেন, নগরে বেড়ে ওঠা তরুণটি যখন ভুলে যায় তার শেকড়ের কথা, যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন বাঙালির সংস্কৃতির এই উপাদানগুলোকে আমরা এমন মেলার মাধ্যমে তাদের সামনে তুলে ধরতে চাই।

 মেলার সহ-আয়োজক বাংলা একাডেমির ফোকলোর বিভাগের পরিচালক শাহিদা খাতুন বলেন, আমরা এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এ মুহূর্তে হাজারো বছরের বাংলা ঐতিহ্য আর ইতিহাসে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে। পৌষ মেলার মতো সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলো অব্যাহত রাখতে হবে।

অনুষ্ঠানের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন পৌষমেলা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায়। তার আগে সকাল ৮টা থেকেই শুরু হয় উৎসবের সাংস্কৃতিক পর্ব। সেখানে নাচে, গান, কবিতায় চলে পৌষ বন্দনা।

বাঁশিতে লোকজ গানের সুরে সাংস্কৃতিক পর্বের সূচনার পর নিবেদন শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্যরা সম্মেলক কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘ পৌষ এলো গো’। তারপর রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী বুলবুল ইসলাম গেয়ে শোনান ‘এলো যে শীতের বেলা’। আবৃত্তি সংগঠন প্রকাশ মঞ্চে আসে তাদের দলীয় প্রযোজনা নিয়ে। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যজন।

একক গান পর্বে ফকির আলমগীর শোনান ‘বন্ধু যেদিন আসবে আমার ঘরে’, আকরামুল ইসলাম পরিবেশন করেন হাসন রাজার গান ‘আগুন লাগাইয়া দিলো বনে’, ও ‘নিশা লাগিলো রে’। তারপর খগেন্দ্রনাথ সরকার ‘মনে ভাবনা পাতার কষ লেগেছে’, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী ‘এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায়’ এবং সঞ্জয় কবিরাজ ‘সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনাতে নজরুল’ গেয়ে শোনান।

স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শব্দসৈনিক আশরাফুল আলম আবৃত্তি করেন চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী রচিত একটি কবিতা। আইলা প্রজ্বলনের সময় আবৃত্তিশিল্পী রফিকুল ইসলাম আবৃত্তি করেন সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘প্রার্থী’ কবিতাটি। অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করেন স্পন্দন, ধৃতি নর্তনালয়। ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী, স্বভূমি লেখক শিল্পীকেন্দ্র, বহ্নিশিখা দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে; কণ্ঠশীলন শোনায় দলীয় আবৃত্তি।

উদ্বোধনী দিনে মেলায় বিকেলের পর্বে ছিল ঋষিজ ও ভিন্নধারার দলীয় সংগীত; বেনুকা ললিতকলা একাডেমি, জাগো আর্ট সেন্টার, নান্দনিক, নৃত্যাক্ষের দলীয় নৃত্য; শিশির রহমান, মহিউজ্জামান চৌধুরী,  সুমা রাণী রায়, আরিফ রহমানসহ আরও অনেকের একক সঙ্গীত পরিবেশনা; রণজিৎ বাউল, মমতা দাসীর পালা গান; রেজিনা ওয়ালী লীনা, মাশকুর-এ-সাত্তার কল্লোলের একক আবৃত্তি; অভিনেতা আব্দুল আজিজের পুঁথি পাঠ এবং মুকুল নৃত্যনাট্য সংগঠনের নৃত্যনাট্য।

আয়োজকরা জানান, পৌষমেলা শেষ আগামীকাল রোববার পর্যন্ত চলবে। মেলা উপলক্ষে বাংলা  একাডেমির নজরুল মঞ্চে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে ১০টা এবং বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। মেলার দ্বিতীয় দিন আজ শনিবার বিকেলে গান, আবৃত্তি  ও নাচের পাশাপাশি থাকবে মহাদেব সংযাত্রা ও তার দলের সংযাত্রা পরিবেশনা। কালকে উৎসবের সমাপনী দিনের আয়োজনে যাত্রাপালা পরিবেশন করবে ময়মনসিংহের দল রূপবান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ