ঢাকা, রোববার 24 December 2017, ১০ পৌষ ১৪২৪, ৫ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ঈমান অপরিহার্য  উপাদান

মনসুর আহমদ : “মানব হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত বিভিন্ন আবেগ ও অনুভূতি, স্পৃহা ও প্রেরণার মধ্যে যেটা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য, সেটি হ’ল কোন উচ্চতর শক্তির কাছে স্বতঃস্ফুর্ত আত্মসমর্পণের সহজাত প্রেরণা। নিজেকে একান্ত করে সঁপে দিয়ে ভক্তি - আপ্লুত হৃদয়ে সিজদাবনত হয়ে সে পেতে চায় এক আত্মিক তৃপ্তি। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে এবং মানবতার ক্রম-বিকাশের সকল স্তরে এ সহজাত প্রেরণা তার সহচর ছিল। একটি মুহূর্তের জন্যও সে তা থেকে মুক্ত হতে পারেনি কোন দিন।”(১) যে কারণে মানুষ কখনো পূজা করেছে প্রজ্জ্বলিত আগুনের, উজ্জ্বল সূর্যের, জ্যোৎস্না বিকিরণকারী চন্দ্রের কিংবা সৃষ্টি জগতের বিরাট বিরাট বস্তুর ও প্রকৃতির শক্তির। যে জিনিসকে সে জ্ঞান বুদ্ধির ঊর্ধ্বের ও রহস্যময় বলে মনে করেছে, তার সামনে সে ঝুঁকিয়ে দিয়েছে আপন মাথা - যে মাথা শুধু আল্লাহর সামনে নত হওয়ার জন্য সৃষ্টি হয়েছিল। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে এ ভাবেই সে তার সহজাত ভাব ও আবেগ তৃপ্ত করার চেষ্টা করেছে। আর এই সহজাত আবেগ তৃপ্ত করতে গিয়ে বার বার ভুল করেছে, নিজের মর্যাদাকে হেয় করেছে, ভূলুন্ঠিত করেছে। কিন্তু এক ও একক মহান পরিপূর্ণ আদর্শ সত্তা, যিনি সকল সৌন্দর্য ও পূর্ণতার, সকল শক্তি ও ক্ষমতার উৎস, তিনি মানুষের আত্মসমর্পণের সহজাত প্রবণতাকে সঠিক ধারায় পরিচালনার জন্য নবী রসুলদের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় প্রদান ও তাঁর প্রতি বিশ্বাস ও ঈমানের প্রয়োজনীয়তা এবং পবিত্র ও বিশুদ্ধতম ঈমানের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে মানুষকে তার প্রতিনিধিত্বের মর্যাদা প্রদান করেছেন। 

নবী রসুলদের দেখানো পথ ব্যতিরেকে মহাসত্যের পরিচয় লাভের ব্যাকুলতা তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে। পক্ষান্তরে নবী রসুলদের বাহিত মহাসত্যের সন্ধান ও অধীর অনুসন্ধিৎসার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে মানুষের জন্য আল্লাহর খেলাফত অর্জন করে প্রতিনিধির মহাসম্মানে ভূষিত হওয়ার প্রকৃত পথ। যে কারণে রসুলের ব্যাখ্যাত ঈমানই হল মানুষের সঠিক মূল্যমানের মাপকাঠি। অন্য সব ঈমান হল ভ্রান্ত ও জাহেলিয়াত মাত্র। এ ব্যাপারে আল্লাহর ঘোষণা - “এ ভাবে আমি তোমার (মুহম্মদ সঃ) প্রতি নাজিল করেছি কিতাব তথা আমার নির্দেশ। তুমিতো জানতে না কিতাব কী এবং বিশ্বাস কী? পক্ষান্তরে আমিইতো একে উজ্জ্বল আলোকে পরিণত করেছি -যার দ্বারা আমি আমার দাস দিগের মধ্যে যাকে ইচ্ছা করি পথ নির্দেশ করি। তুমিতো কেবল সরল পথই প্রদর্শন কর- আল্লাহর পথ। আকাশম-লী ও পৃথিবীর যা কিছু আছে তা তাঁরই। সকল বিষয়ের পরিণাম আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে। (৪২ ঃ ৫২-৫৩)  

ঈমান কী?

কোরআনের উপরোক্ত আয়াত থেকে সুস্পষ্ট যে, রসুল (স:) কর্তৃক ঈমানের যে পরিচয় মানব জাতির কাছে উপস্থাপিত, তা স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক শিখানো ঈমানের পরিচয়। বিখ্যাত হাদিসে জিবরীলে হজরত জিবরাইল (আ:)কে রসুল (স:) ঈমানের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তাই হল ইসলামের মূল ভিত্তি- ঈমানের প্রকৃত সংজ্ঞা। হজরত জিবরাইল (আ:) রসুল (স:)কে বল্লেন, “ফাখবিরণী আনেল ঈমান।” আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলে দিন। হুজুর (স:) উত্তর দিলেন, “ঈমানের অর্থ হল এই যে তুমি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, কিতাব সমূহ, পয়গম্বরগণ ও পরকালের উপর দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করবে। আর তাকদীরের ভাল মন্দ যা কিছু হচ্ছে সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে হচ্ছে তা জানা ও মানাই হচ্ছে ঈমান। (মুসলিম)  

রসুলুল্লাহ (স:) ঈমানের পরিচয় দিতে গিয়ে ঈমান সম্পর্কে আল্লাহর কথাকেই সহজ ভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন। ঈমান সম্পর্কে কোরআনের বহুত যায়গায় বিভিন্ন ভাবে আলোচনা এসেছে। বলা হয়েছে, “রসুল তাঁর প্রভুর কাছ থেকে তাঁর কাছে যা নাজিল হয়েছে তাতে ঈমান এনছেন এবং বিশ্বাসীরাও। তারা সকলে আল্লাহে, তাঁর ফেরেস্তাগণ, তাঁর প্রেরিত কিতাব সমূহে এবং তার প্রেরিত পুরুষগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছেন।”(বাকারা -২৮৫)

বিশ্বাস সম্পর্কের্ কোরআনের অন্যত্র ঘোষিত হয়েছে- “পূর্ব বা পশ্চিম দিকে মুখ ফিরাবার মধ্যে কোন পুণ্য নেই। বরং প্রকৃত পুণ্য হলো তারা যে বিশ্বাস করেছে আল্লাহে, শেষ বিচার দিনে, ফেরেস্তাগণে, কিতাব সমূহে এবং প্রেরিত পুরুষ দিগের উপর অকপট বিশ্বাস রাখে। এবং ধন সম্পদের প্রতি মনের টান থাকা সত্ত্বেও আত্মীয় স্বজন...” (বাকারা - ১৭৭)

ঈমানের চূড়ান্ত ফল : আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসই ইসলামের মূলনীতি। ঈমানের অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিশ্বাসগুলি গুলোও এই বিশ্বাস থেকে যৌক্তিক ভাবে উদ্ভূত হয়। যদি একজন মঙ্গলময় আল্লাহর যিনি ‘রব’ তাঁর অস্তিত্ব থেকে থাকে, তাহলে  নৈতিক শৃঙ্খলাও অবশ্যই সত্য। যদি নৈতিক শৃঙ্খলা সত্য হয়, তাহলে শুভ ও অশুভ অবশ্যই তাদের ফল উৎপাদন করবে, যাকে আমরা বলি পুরস্কার ও শাস্তি। নৈতিক শৃঙ্খলা সত্য হতো না, যদি জীবন শরীরের সংগে ধ্বংস হয়ে যেত। তাই পুনরুত্থান ও পরকাল থাকতেই হবে। শুভের জন্য আল্লাহর প্রতিনিধিও অবশ্যই থাকবে যাদেরকে ফিরিশতা বলা হয় এবং যারা আমাদের স্বাভাবিক দৈহিক ইন্দ্রিয়ের পক্ষে অদৃশ্য, কিন্তু যাদের কাজ উচ্চ আধ্যাত্মিক দৃষ্টি সম্পন্ন লোকদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যক্ষণের অন্তর্গত। আল্লাহকে অবশ্যই  নবী বলে কথিত আদর্শ মানুষ সৃষ্টি করতে হবে  যারা মানব জাতিকে নীতিকথা ও দৃষ্টান্ত দ্বারা তাঁর দিকে পরিচালনা করবেন। এই সব নবীদের শিক্ষায় কোন মৌলিক অসামঞ্জস্য থাকবে না, কেননা তাঁদের সকলকেই অনুপ্রাণিত করেছেন সেই একই আল্লাহ, যিনি মানব জাতির কাছে একই মৌলিক সত্য জানাতে চান। এই দান অবশ্যই সমগ্র মানবজাতির প্রতি বর্ষিত হবে।(২) এগুলিই হল ইসলামের মৌলিক বিষয় বস্তু, প্রশস্ততম ও সর্বজনীন বিশ্বাস।

মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম করার উদ্দেশ্যেই সমস্ত নবী রসুলদের মাধ্যমে এক আল্লাহর এবাদত করতে আদেশ দেয়া হয়েছে। এ কারণে ইসলাম যুগে যুগে মানব জাতির পথ প্রদর্শক হিসেবে যে সকল তত্ত্ববাহক মহাপুরুষ আবির্ভুত হয়েছেন তাঁরা সকলেই আল্লাহর নবী, সকলেই শান্তির বার্তাবহ হিসেবে বিশ্বাস করতে আদেশ ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। এরশাদ হয়েছেঃ “তোমরা বলো, আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহর প্রতি এবং যা আমাদের প্রতি নাজিল হয়েছে এবং যা ইবরাহীম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাদের বংশধরদের প্রতি নাজিল হয়েছিল এবং যা মুসা ও ঈসার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল এবং যা খোদার প্রেরিত সকল নবীর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল। আমরা তাঁদের মধ্যে পার্থক্য করি না। (বাকারা -১৩৬) 

আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও তার আনুষঙ্গিক বিশ্বাস মানুষকে উন্নতির এমন এক ¯তরে পৌঁছে দেয় যেখানে পৌঁছে সঠিক ও মজবুত মানব প্রকৃতি তার পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হয়। আর যখন ঈমানের এই রশি ছিন্ন হয়, আর নিভে যায় এই উজ্জ্বল বাতি তখন তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি এই হয় যে, সে দ্রুত গতিতে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায় এবং পরিশেষে সে পৌঁছে যায় অবনতির সকল নিচু থেকে চূড়ান্ত ও শেষ নিচু স্তরে। আর এই শেষ অবস্থা হচ্ছে মনুষ্যত্বের সামগ্রিক ও চূড়ান্ত বিপর্যয়।(৩)

কোরআন এ ব্যাপারটিকে বিশ্লেষণ করতে ঘোষণা দেয়, “অবশ্যই আমি মানুষ জাতিকে পয়দা করেছি সুন্দরতম অবয়বে। তার পর আমি তাকে নিম্নতম পর্যায়ে নামিয়ে দিয়েছি(তবে হ্যাঁ, এই) মানুষদের ভেতরে যারা আমার ওপর ঈমান এনেছে, এবং ঈমানের দাবি মোতাবেক ভাল কাজ করেছে তাদের আসন সে উঁচু পর্যায়েই থেকে যাবে। (তীন- ৪-৫)

নবী রসুল প্রেরণের উদ্দেশ্য তো ছিল এই যে, সমগ্র মানবজাতি আল্লাহর প্রতি ঈমান ওআনুগত্য প্রকাশ করে স্রষ্টার সৃষ্টির উদ্দেশ্য চরিতার্থ করবে। কিন্তু সত্য ও অসত্যের দ্বন্দ্বে পতিত হয়ে আল্লাহর রসুলগণের তিরোভাবের পর পরই মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান ও ইবাদতের কথা ভুলে গিয়ে তৌহিদী জীবন বোধ বিস্মৃত হয়ে গোমরাহীর মধ্যে নিপতিত হতে থাকে। এ ভাবেই রসুল(সঃ )পূর্ব যুগে মহান আল্লাহ তা’আলার প্রতি শুদ্ধ ঈমানের পরিবর্তে আল্লাহ সম্পর্কে ভ্রান্ত প্রত্যয় পোষণ ও শিরকে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে ছিল মানব সমাজ। মানব সমাজ পৌত্তলিকতায় নিমজ্জিত হয়ে পাথর, মাটির মূর্তি গড়ে তাদের সামনে মাথা নত করে ছিল। প্রচ- ক্ষমতাবান সূর্য চন্দ্র বা নক্ষত্র কিংবা বিশাল পর্বত ও বৃক্ষাদিতেই নয়, মানুষের মাঝেও অসীম ও অলৌকিক ক্ষমতা দর্শনে অবনত মস্তকে তার মুর্তি গড়ে তার পূজা করতে কসুর করেনি। এক শ্রেণীর লোক পূর্ব পুরুষদেরকে দেবতার আসনে বসিয়ে নানা ভাবে তাদের আরাধনা করে, পার্থিব অপার্থিব মঙ্গলামঙ্গলের জন্য তাদের কাছে ধর্ণা দেয়, আত্ম নিবেদন করে।

আবার আহলে কিতাবীদের মধ্যে ইহুদী সম্প্রদায় বাছুর পূজা শুরু করে দিয়েছিল। ঈসায়ীরা একক আল্লাহর প্রতি ঈমান পরিত্যাগ করে ট্রিনিটি বা ত্রি তত্ববাদে বিশ্বাসী হয়ে পড়ে তাদের কেউ কেউ ঈসা (আ:)কে আল্লাহর পুত্র আল মসীহুবনুল্লাহ এবং God the father, God the son এবং God the holy ghost এ তিন সত্তার স্বীকৃতি দিল।(৪) 

এমনি ভাবে মানুষ যুগে যুগে শয়তানের প্ররোচনায় পরম প্রভু মহান স্রষ্টা ও আখিরাতের মালিক সত্যিকার ইলাহ মহান আল্লাহর সমগুণ সম্পন্ন সমতুল্য ও সমকক্ষ মনে করে অসংখ্য কল্পিত দেব দেবীর পূজা অর্চনা করছে। এ ভাবে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব গায়রুল্লাহর পদতলে লুটিয়ে দিয়ে মানবতার অবমাননা করছে, কলঙ্কিত করছে মানুষের অন্তর, লাঞ্ছিত করছে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের, মর্যাদা বিকৃত করছে মানুষের বিবেক বুদ্ধির। 

বিশ্বমানবতার জন্য একটি অতীব দুঃখের ও চরম সত্য ঘটনা এই যে, রসুল (স:)-এর তিরোধানের পর কয়েক শতাব্দী ধরে যারা মুসলমানদের সামাজিক ও সামগ্রিক দায়িত্বভার প্রাপ্ত হয়েছিলেন তারা অধিকাংশই ইসলাম প্রচার ব্রতী মহান ব্যক্তিদের সাথে বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করেননি। ফলে ইসলামের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের প্রবল আকর্ষণে কোটি কোটি মানুষ মুসলমান হয়েছিল বটে কিন্তু ইসলাম দুর্গের রক্ষক ও তত্ত্বাবধায়কগণ খোদার এ বান্দাহদের শিক্ষা দীক্ষা ও অভ্যন্তরীন সংস্কার ও তাদের বাস্তব কর্মজীবন পরিশুদ্ধির কোন ব্যবস্থা করেননি। ফলে সামান্য মতবিরোধের ভিত্তিতে মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন দল উপদল সৃষ্টি হতে লাগল এবং কোরআন হাদিস অধ্যয়ন ও গবেষণা বাদ দিয়ে গ্রীক দর্শন পড়ে জীবন অতিবাহিত করার দিকে তারা ঝুঁকে পড়তে লাগল। তারা প্রকৃত তৌহিদের শিক্ষা ও ঈমানের ব্যাপারে দুর্বলতা আমদানি করতে লাগল। 

রেনেসাঁ অন্দোলন ঈমানের প্রতি এক চরম আঘাত : এভাবে মুসলমান সমাজ যখন দ্রুত অধঃপতনের দিকে ছুটে চলছে ঠিক সে সময়েই ইউরোপ এক রেনেসাঁ আন্দোলনের ভিতর দিয়ে পুনরুত্থান লাভ করেছিল। এ আন্দোলনের শুরুতেই মধ্যযুগীয় খ্রিষ্ট ধর্মের সাথে রেনেসাঁ আন্দোলনের প্রচ- সংঘর্ষ বাধে। খ্রিষ্টান ধর্মজ্ঞানীরা তাদের ধর্ম বিশ্বাস এবং বিশ্বনিখিল ও মানুষ সম্পর্কে বাইবেলের উপস্থাপিত ধারণার ভিত্তি গ্রীক দর্শন ও বিজ্ঞানের মত যুক্তি প্রমাণ ও তথ্যের উপর স্থাপিত করেছিল। তারা নতুন কোন ভিত্তিতে অভিনব কোন দার্শনিক চিন্তাকেও বরদাশত করত না। বিশ্ব জগৎ ও মানুষ সম্পর্কে বাইবেলের ধারণা এবং সে সম্বন্ধে শাস্ত্রকারদের স্বীকৃত চিত্রের কোন অংশ ভুল প্রমাণ করতে পারে এমন কোন বৈজ্ঞানিক গবেষণাও চিন্তানুশীলনের বিন্দু মাত্র প্রশ্রয় দেয়া হত না। অন্য দিকে যারা রেনেসাঁ আন্দোলন চালাচ্ছিল এবং এর কার্যকরণ ভাবধারার প্রভাবাধীনে সমালোচনা, গবেষণা ও আবিষ্কারের কাজ করে চলছিল তাদেরকে প্রতিটি পদে এহেন দর্শন ও বিজ্ঞানের অন্তর্নিহিত দুর্বলতার কারণে প্রাচীন পন্থীদের সম্মুখীন হতে হত। ফলে প্রাচীন ও নব্য পন্থীদের পারস্পরিক দ্বন্দের পরিমান অত্যন্ত সাংঘাতিক হল। এর প্রথম ফল দাঁড়াল এই যে, নতুন বৈজ্ঞানিক জাগরণের সুচনাতেই শিক্ষিত জনগণের মনে ধর্মও ধর্মবাদীদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিহিংসার মনোভাব সৃষ্টি হল। চুড়ান্ত ভাবে নতুন জ্ঞান বিজ্ঞান ও সভ্যতার নেতৃবৃন্দ ধর্মকে অন্তঃসারশূন্য বাহ্যিক অনুষ্ঠান মাত্র মনে করতে লাগল। তারা এ বিশ্বাস করল যে, ধর্ম কোন বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক (Rational) পরীক্ষার আঘাত সহ্য করতে পারে না, তারা আরও বিশ্বাস করল যে মৌলিক বিশ্বাসের গোড়ায় কোন যুক্তি প্রমাণের ভিত্তি নেই। নিছক অন্ধ বিশ্বাসের উপরই এর বুনিয়াদ স্থাপিত।(৫) 

নতুন বৈজ্ঞানিক জাগরণের প্রারম্ভে ধর্ম এবং ধর্ম সংক্রান্ত প্রত্যেকটি বিষয়ের বিরুদ্ধে যে হিংসা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছে, পরবর্তী যুগে জ্ঞান বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পে যত উন্নতি এবং ক্রমবিকাশ ঘটিয়েছে তার মূলে এই বিষের মারাত্মক প্রভাব বিদ্যমান। 

রসুল পূর্ব যুগের ঈমানের ত্রুটি ও বিচ্যুতি মানুষের মর্যদাকেই ভূলুন্ঠিত করে ক্ষান্ত হয়নি, বরং মানব সভ্যতাকে ধ্বংসোন্মুখ আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ধর্মের বিরুদ্ধাচারণের মধ্য দিয়ে বিগত অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে যে দার্শনিক মতবাদ উত্থান লাভ করেছে তা বিশ্ব মানবতাকে নৈতিক, রাজনৈতিক তথা জীবনের সামগ্রিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে মানবতাকে ধ্বংসযজ্ঞে লিপ্ত করেছে। 

দার্শনিকগণ জীবনের বিভিন্ন দিক, স্বরূপ, বৈশিষ্ট্য এবং সম্ভাবনাকে যুক্তির আলোকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভাবে পর্যালোচনা করার দাবি করেন। আধুনিক দর্শন অর্ন্ত দৃষ্টি, দৃষ্টিভঙ্গির অভ্রান্ততা, বিচার বিশ্লেষণের ভারসাম্য ও সামঞ্জস্য দার্শনিক মানসিকতার পূর্বশর্ত হিসেবে মনে করেন। যথার্র্থ দার্শনিকরা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মনের অধিকারী হন, জ্ঞান ও সত্যের সন্ধানে সমাজ সংস্কার এ গুলোর কোনটির দ্বারা পরিচালিত না হয়ে পরিচালিত হন যুক্তি বিচার ও মুক্ত বুদ্ধির দ্বারা। যুক্তি, বিচার ও মুক্ত বুদ্ধি যদি ঐশী ঈমানের উপরে নির্ভর না করে তখন তা আর মানুষকে আলোকিত না করে বরং নিরেট জাহেলিয়াতে নিমজ্জিত করে। 

প্রকৃত পক্ষে ঈমান হল জীবনের প্রধান শিকড় ও উৎসমূল। সততা ও কল্যাণ সকল শাখা প্রশাখার স্ফুরণ ঘটে এখান থেকেই। এর প্রত্যেক ফলমূল এর সাথেই সংযুক্ত। এর সাথে যে শাখার সংযোগ থাকে না তা গাছ থেকে বিচ্ছিন্ন। সে শাখা অনিবার্য ভাবে শুকিয়ে মরে যাবে। শিকড়ের সাথে যে ফলের সংযোগ নেই, তা শয়তানী ফল, তা কখনো স্থায়ী হয় না।(৬) যে কারণে আজ ঐশী জ্ঞানের বদলে অনুমান ও যুক্তির উপরে ভিত্তি করে জড় দর্শন- হেগেলের ইতিহাস দর্শন, ডারউইনের ক্রমবিকাশবাদ দর্শন, মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও ফ্রয়েডের মনস্তত্ব দর্শন ইত্যাদির উদ্ভব হয়েছে। তা মানবিক মর্যাদা ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করে মানুষকে পশুর স্তরের চেয়েও হীন স্তরে উপনীত করেছে। এ সব জড়বাদী দর্শন ঐশী আলোকোজ্জ্বল ঈমানকে অন্ধতা এবং ধর্মকে নিতান্ত অন্ধ বিশ্বাসের ফসল হিসেবে ব্যাখ্যা করে। অন্য দিকে তাদের দর্শনকে বিশুদ্ধ চিন্তা ও মননশীলতার ব্যাপার, এমন ব্যাপার যার যোগাযোগ বুদ্ধিবৃত্তিক বিচার ও বিশ্লেষণের সঙ্গে জড়িত। অন্যান্য প্রচলিত ধর্মের ব্যাপারে দর্শনের দাবি সত্য হলেও ইসলামের ব্যাপারে ধর্ম থেকে দর্শনের ব্যাখ্যাকে আলাদা করার কোন অবকাশ নেই। কারণ ইসলাম ধর্মের মূলভিত্তি ঈমানকে গ্রহণ করার পূর্বে আবেগকে প্রধান্য না দিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক বিচার বিশ্লেষণও বিশুদ্ধ চিন্তার উপরই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। 

যা ঈমানের পথ দেখায় : হজরত ইবরাহিম (আ:) কী ভাবে আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করছিলেন তা ই আমাদেরকে ঈমান গ্রহণের পথ দেখায়। শুধু আবেগ নয়, অভিজ্ঞতা, যুক্তি ও বুদ্ধির প্রয়োগ দ্বারা তিনি তারকারাজি চন্দ্র ও সূর্যের মধ্যে এক অনন্ত সীমাহীন ও বুদ্ধি দীপ্ত শক্তি ও গৌরবের প্রকাশ অনুভব করেছিলেন।(৭) প্রকৃতির এই নিখুঁত বিন্যাস লক্ষ্য করে তিনি খুঁজে পান আল্লাহর পরিচয়। তার এই বুদ্ধি প্রয়োগের জন্যই ঐশী প্রেরণা ও পথ নির্দেশ তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসে।

 গোটা কোরআন ইসলামকে ‘নূর’ বা আলোকোজ্জ্বল পথ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এক আল্লাহর প্রতি ঈমান স্থাপনের জন্য আবেগ বা অন্ধতাকে প্রত্যাখ্যান করে যুক্তি বিচার পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে আল্লাহ তা’আলা কোরআনে বার বার নির্দেশ দিয়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে সুরা রূমের কয়েকটি আয়াত। যেমন এরশাদ হয়েছে- “অতএব, তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা স্মরণ কর সন্ধ্যায় ও সকালে। এবং অপরাহ্নে ও মধ্যাহ্নে। নভোম-ল ও ভূম-লে তারই প্রশংসা। তিনি মৃত থেকে জীবিতকে বহির্গত করেন, জীবিত থেকে মৃত কে বহির্গত করেন, এবং ভূমির মৃত্যুর পর তাকে পুনরুজ্জীবিত করেন। এ ভাবে তোমরা উত্থিত হবে। তাঁর নির্দেশনাবলীর একটি নিদর্শন এই যে, তিনি মৃত্তিকা থেকে তোমাদের কে সৃষ্টি করেছেন। এখন তোমরা মানুষ, পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছ। আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে। তাঁর আরও এক নিদর্শন হচ্ছে নভোম-ল ও ভূম-লের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে। তাঁর আরও নিদর্শন ঃ রাতে ও দিনে তোমাদের নিদ্রা এবং তাঁর কৃপা অন্বেষণ। নিশ্চয় এতে মনোযোগী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে। তাঁর আরও নিদর্শন -তিনি তোমাদেরকে দেখান বিদ্যুৎ, ভয় ও ভরসার জন্যে এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর তদ্বারা ভূমির মৃত্যুর পর তাকে পুনরুজ্জীবিত করেন। নিশ্চয় এতে বুদ্ধিমান লোকদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে। তাঁর অন্যতম নিদর্শন এই যে, তাঁরই আদেশে আকাশ ও পৃথিবী প্রতিষ্ঠিত আছে। অতঃপর যখন তিনি মৃত্তিকা থেকে উঠার জন্য তোমাদেরকে ডাক দেবেন, তখন তোমরা উঠে আসবে। নভোম-লেও ভুম-লে যা কিছু আছে, সব তারই। সবাই তাঁর আজ্ঞাবহ। তিনিই প্রথমবার সৃষ্টিকে অস্তিত্বে আনয়ন করেন, অতঃপর পুনর্বার তিনি সৃষ্টি করবেন। এটা তাঁর জন্য সহজ। আকাশ ও পৃথিবীতে সর্বোচ্চ মর্যাদা তাঁরই এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।.. .. .. এমনিভাবে আমি সমঝদার সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলী বিস্তারিত বর্ণনা করি। .. .. তুমি একনিষ্ঠ ভাবে নিজেকে ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখ। এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যার উপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই সরল ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। ”( রূম-১৭-৩০)

উপরোক্ত আয়াত সমূহ গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণ ভাবে মনে করা হয়ে থাকে যে ধর্ম একটি নিতান্তই অন্ধ বিশ্বাসের ব্যাপার এবং সেই বিশ্বাস অনুসারে আচরণ করার ব্যাপার - তা আদৌ সত্য নয়। বরং আয়াতগুলো জগত ও জীবন নিয়ে ভাবনা করার, এদের পরিণতি উৎপত্তি ও প্রকৃতি নিয়ে অনুসন্ধান করার জন্য বার বার জোর দিয়েছে। তাই ইসলাম বুদ্ধিবৃত্তিক দর্শনের উপর প্রাথমিক ভাবে জোর দিয়েছে ঈমান প্রতিষ্ঠার পূর্বেই। একমাত্র ইসলামই বিশ্বাস ও বুদ্ধির সার্থক সংযোগ ও সমন্বয় সাধন করে মানব সংস্কৃতির যথার্থ বিকাশের সুযোগ করে দিয়েছে।

 মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভিত্তি ও উৎস ছিল কোরআন ও হাদিস। কোরআন ও হাদিসের যুক্তি গ্রাহ্য ব্যাখ্যা সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে জগৎ ও জীবন বিষয়ে নতুন নতু প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে বিচারমূলক তত্ত্বাবধানে অগ্রসর না হয়ে ইউরোপীয় রেনেসাঁ উদ্ভুত দর্শনের উপর ভিত্তি করে জীবনের মৌল সমস্যাবলী সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে। মানব কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করতে। 

পশ্চিমা দর্শন ঈমানের পথে অন্তরায় : ফরাসী দার্শনিক আগষ্ট কোঁতে August comte  - এর মতানুসারে মানুষের চিন্তার বর্তমান স্তর নিশ্চিত জ্ঞানের স্তরে Positive stage অবস্থান করছে। অর্থাৎ এখন ঘটনারাজির ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এমন কার্যকরণের বরাত দেয়া হয়, যা পরীক্ষা নীরিক্ষা ও পর্যবেক্ষণের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী জানা ও বুঝা যায়;এখানে আত্মা, আল্লাহ কিংবা অন্য কোন নিরঙ্কুশ শক্তির নাম নেয়া হয় না। এই চিন্তাধারা দর্শন শাস্ত্রে যে নাম ধারণ করেছে তা হলো ন্যায় শাস্ত্রীয় নিসর্গবাদ (Logical positivism)।(৮)

ঈমান বিবর্জিত নিসর্গবাদই শুধু নয়, ভাববাদী দর্শনও মানুষের মর্যাদাকে নষ্ট করেছে। “ভাববাদীদের মতে, এ পরিদৃশ্যমান বস্তুজগতের কোন অস্তিত্ব নেই, আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বাইরে আরেকটি অশরীরী ভাব জগত বিদ্যমান, বস্তুজগত তার রূপান্তর মাত্র। বাইরে বস্তু জগতে আমরা যা কিছু দেখি, যা কিছু ঘটে তা আগেই আমাদর মনের গভীরে ঘটে থাকে। আমাদের মনের গভীরে যা ঘটে বাইরে তা’ই রূপ পায় মাত্র। সমস্ত ঘটনারই মূল কারণ ও উৎস আমাদের মন। অর্থাৎ মনের ভাব ধারণাই সত্য, বাহ্য বস্তু বা ঘটনা তার প্রতিকৃতি মাত্র। 

আমাদের ইন্দ্রিয় জ্ঞানের অতীতে রয়েছে ধ্রুবলোক; সে ধ্যানজগতই সত্য, আর বস্তু জগত মায়ামাত্র।”(৯)

 বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক কান্ট এ মতের পোষক। হেগেল কা›টের মতকে আরও একটু এগিয়ে নিয়ে বলেন, আমাদের এ জ্ঞানের জন্ম দ্বন্দ্বমূলক ধারণা থেকে। প্রতিটি ধারণায় দ্বন্দ্ব মূলক বিরোধী ধারণাটি বিদ্যমান থাকে। কোন ধারণাই পরস্পর বিচ্ছিন্ন থাকে না। ধারণা সমূহ এ উপায়েই পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয় এবং ঘাত প্রতিঘাতের ফলে বস্তু জগতে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। এ দর্শনের মূল কথাতো এটাই যে, কোন একটি সভ্যতা যখন পরিপক্কতা লাভ করে তখন উহার অভ্যন্তরীণ ত্রুটি -বিচ্যুতি ও দুর্বলতা আত্মপ্রকাশ করতে এবং উহার সাথে দ্বন্দ্ব সংগ্রাম করতে শুরু করে। এই দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামের ফলে অন্য একটি নতুন সভ্যতা জন্ম নেয়। যার মাঝে অতীত সভ্যতার কল্যাণকর অংশ থেকে যায়।

এ থেকে সমাজ এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায় যে, অতীতের যুগ ও অধ্যায় সমূহে মানুষের কল্যাণ পথের সন্ধান, জীবন ব্যবস্থা পথ নির্দেশ লাভের কোন উৎস বর্তমান নেই। মানব সভ্যতার ইতিহাস সম্পর্কে এ দার্শনিক মতবাদ আমাদের মানসপটে এ ধারণা বদ্ধমূল করে তুলবে যে, বিগত কালের যে সব অধ্যায়ে ইবরাহিম, মুসা ও হজরত মুহম্মদ (স:) স্মরণীয় ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তার কোন মূল্য ও গুরুত্ব নেই। আর এ ধারণা প্রকৃত পক্ষে রেসালতের প্রতি ঈমানের পথে বাধা ও সন্দেহ সৃষ্টি করে।

উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য মতবাদ হল ডারউইনের ক্রম বিকাশবাদ। এ মতবাদের মূল কথা হল, এই বিশ্ব জগত একটি সংগ্রাম ক্ষেত্র। জীবন স্থিতির জন্য এখানে প্রতি মুহূর্তে এক চিরস্থায়ী যুদ্ধ চলছে। টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম, দ্বন্দ্ব ও প্রতিরোধ করতেই হবে। এাঁই বিশ্ব প্রকৃতির সনাতন নিয়ম।

এ জীবন দর্শনে সহানুভূতি, প্রেম, ভালবাসা, দয়া দাক্ষিণ্য আত্মত্যাগের মতো মহান মানবীয় ভাবধারার কোন কোন স্থান নেই। এ দর্শন অনুসারে ন্যায় বিচার, ইনসাফ, বিশ্বস্ততা, সততা সত্যবাদিতা এবং সত্যানুসন্ধান প্রভৃতি কোন গুণাবলীর অস্তিত্বের প্রয়োজন নেই। ফলে বিভিন্ন ধর্মে যাকে জুলুম নামে অভিহিত করা হতো তা শক্তিমানের জন্মগত অধিকারে পরিণত হয়েছে। এভাবেই এ মতবাদটি মানুষের সম্পর্কের ব্যাপারে তাকে হিংস্র শ্বাপদে পরিণত করেছে।

এমন একটি সত্যবিদ্বেষী দর্শনকে কেন এক দল বিজ্ঞানীরা আঁকড়িয়ে রাখতে চান তার কারণ বলতে গিয়ে অর্থার কীথ (Keith)  বলেছিলেন : Evolution is the unproved and unprovable. We belive it only because the only alternative is special creation and that is unthinkable.

ক্রমবিকাশবাদ অপ্রমাণিত এবং এটাকে কখনো প্রমাণও করা যাবে না।আমরা এটাকে বিশ্বাস করি শুধু এ জন্য যে, এর একমাত্র বিকল্প হচ্ছে সৃষ্টির ধারণা যা অবোধগম্য। 

 ডারউইনের ক্রমবিকাশবাদের অনুরূপ অর এ টি সমকালীন দর্শন কার্লমার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। হেগেল ও ডারউইন মানব মনে পার্থিব জীবন সম্পর্কে যে ধারণা সৃষ্টি করেছিলেন মার্কসের দর্শন সেই ধারণারই পুনঃপ্রবর্তন করেছে। হেগেল চিন্তার জগতকে সংগ্রাম ক্ষেত্র বলে প্রমাণ করেছিলেন। অর ডারউইন বিশ্বজগত এবং প্রাকৃতিক নিয়মকে এক সংগ্রাম ক্ষেত্র বলে প্রমান করেছিলেন। সবশেষে মার্কস গোটা মানব সমাজের এক চিত্র অংকিত করে গেছেন যাতে মানুষ জাতিকে এক আদিম হিংস্র শ্বাপদ ও অবিরাম পরস্পর যুদ্ধমান জীবরূপে দেখান হয়েছে। (মুসলমানদের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচী)

মার্কসবাদের ইতিহাস দর্শনের কল্পিত মতবাদ অনুযায়ী অর্থনৈতিক অবস্থাই হচ্ছে মূল চালিকা শক্তি যা মানুষকে আবর্তিত ও সংঘঠিত করে। এ মতবাদ মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে এবং একে শুধুমাত্র অবস্থার সৃষ্টি বলে ঘেষণা করে। সমাজতান্ত্রিক দর্শনে ধর্ম একটি ঐতিহাসিক ধাপ্পাবাজী ব্যতিত আর কিছুই নয়। সমাজতন্ত্র যেহেতু শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে ইতিহাস পর্যালোচনা করে থাকে, তাইতো যাবতীয় ঐতিহাসিক কার্যকরণকে অর্থনৈতিক কার্যকরণর মধ্যে কেন্দ্রিভূত করে দিয়েছে। মার্কসীয় দর্শন মানব ইতিহাসকে চিত্রিত করেছে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস রূপে। যেখানে ক্ষমতাশীলরা ক্ষমতাহীনদেরকে শোষণ চালিয়ে আসছে। এ দর্শন অনুযায়ী ধর্ম ও নীতিদর্শন শুধুমাত্র এ জন্য উদ্ভব হয়েছে যাতে তা ক্ষমতাশীল শ্রেণীর স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য একটি দার্শনিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

এছাড়া মার্কসীয় দর্শন মানুষকে জড়বস্তুর ঊর্ধ্বে মর্যাদা দিতে নারাজ। এ দর্শন পরাবিদ্যার স্তরকে অতিক্রম করে আর একটি চরম জাহেলী জড়বাদী দর্শনের মাধ্যমে মানুষকে ধূলিকণার বেশি মর্যাদা দিতে পারেনি। Engels বলেছেন With irrestable force Feurbach is finally forced to the realisation that the Hegelian pre-mundane existance of the absolute idea, that the pre –existance of the catagories before the World existed, is nothing more thn the fantastic survival of the belief in the existance of an extra –mundane creator;that the material, sensuously perceptible world to which we ourselves belong is the only reality; and that our consciousness and thinking, however super sensuous they may seen, are the product of a material, bodily organ the brain, matter is not a product of mind, but mind itself is merely the highest product of matter, (Historical materialism and Islam) 

এ ভাবে জড়বাদী দর্শনের ভ্রান্তি মানুষকে উচ্চ স্তর থেকে টেনে নিম্নস্তরে একেবারে জড় স্তরে পৌঁছে দেয়।

ফ্রয়ডীয় দর্শন মার্কসীয় বা ডারউইনের ক্রম বিকাশবাদ তত্ত্বের চেয়ে আরও জঘন্য। অবচেতন মন ফ্রয়ডীয় মতাদর্শের ভিত্তিগত প্রকল্প। ফ্রয়ডের গোটা আন্দোলন চলছে এর উপর ভিত্তি করে।

ফ্রয়ডীয় মনস্তাত্বিক মতবাদের সার কথা হচ্ছে-unconscious বা অবচেতন হচ্ছে মনের সব চেয়ে বড় বিভাগ। ফ্রয়েডের মতে শিশুকালে মানুষের অবচেতন মনে এমন কিছু ধারণা প্রতিষ্ঠা লাভ করে, যা পরবর্তী কালে তার বুদ্ধি- বহির্ভুত বিশ্বাস বা আচরণে পরিণত হয়। এর নাম ধর্মীয় আকায়েদ বা বিশ্বাস। যেমন পরকাল, বেশেত, দোযখ প্রভৃতির ধারণা মূলতঃ ঐ সমস্ত বাসনারই প্রতিধ্বনি, যা বাল্যাবস্থায় মানুষের মনে সৃষ্টি হয়েছিল। (আধুনিক চিন্তাধারা বনাম ধর্ম : ড.ওয়াহীদুদ্দীন) 

 ফ্রয়ডীয় মতবাদের দ্বিতীয় সার হল-“প্রেম-ভালবাসা, ঘৃণা -বিদ্বেষ, ক্রোধ, সাহস -হিম্মত, ভয়-ভীতি দুঃখ- বেদনা, যৌনস্পৃহা -উত্তেজনা প্রভৃতি মানবীয় হৃদয়াবেগের রূপ বিভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও এই সবের মূল উৎস হচ্ছে একটি মৌলিক আবেগ। আর তা হচ্ছে যৌনস্পৃহা- কামনা- লালসা। এই মৌল আবেগটি মানুষের শুক্রকীটের মধ্যে বিদ্যমান। তা ভ্রুণের সাথেই লালিত হয় এবং শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশমান হওয়ার জন্য তৎপরতা শুরু করে দেয়। জন্মের পর শিশুর ক্রম বৃদ্ধি প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে যৌনস্পৃহা ও কামনার মধ্য থেকেই সমস্ত মানবীয় আবেগ ও ভাবধারা আত্মপ্রকাশ করে। এমনকি উচ্চতর ধর্মীয় চিন্তা -কল্পনা- বিশ্বাস ও উন্নতমানের আধ্যাত্মিক আবেগ সমূহও এই নিম্নস্তরের হৃদয়াবেগের বিভিন্ন রূপ। আশা -আকাঙ্খা ও স্বার্থ লাভের যে সব আবেগ মানবীয় কর্মের মৌলিক প্রেরণাদায়ক ও চালিকা শক্তি বলে মনে করা হয়, তা-ও এই যৌন-কামনা- লালসার আবেগ থেকেই উৎসারিত।” (ফ্রয়েডের মনস্তত্ত্ব- মুহম্মদ আবদুর রহীম)

চলছে সবে ঈমানের পথে : এ কালের জ্ঞান বিজ্ঞান জগত মনস্তাত্বিক মতবাদ সমূহের নিগুঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে পুরাপুরি অবহিত। গোটা বিশ্ব আজ হেগেল, ডারউইন, মার্কস ও ফ্রয়েডের প্রতি নিরাশ হয়ে জীবন ও মনস্তত্বের জটিল রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য প্রাথমিককালের পিপাসাদীর্ণ হৃদয় অনুসন্ধানের সীমাহীন মরু প্রান্তরে বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে মরছে।

একমাত্র ইসলাম প্রদর্শিত ঈমানই তাদের ও নির্বিশেষে সকল মানুষকে নির্ভুল সত্যের সঙ্গে পরিচিত এবং সর্ব প্রকার ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। ঈমান পারে মনুষের হারান মর্যাদাকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করতে।

এ সামান্য আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ডারউইনবাদ, ফ্রয়েডবাদ ও মার্কসবািদ ইত্যাদি মানবজাতির ওপর আপতিত জঘন্যতম আপদ। এই সব মতবাদ মানুষকে এ ধারণা দেয় যে, প্রত্যেক নীচতা, হীনতা, নোংরামীও দুস্কৃতি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত জিনিস। এতে অস্বাভাবিক ও নতুনত্ব কিছুই নেই। এতে লজ্জারও কিছু নেই। অথচ এ গুলো মানবতার জন্য নিন্দনীয় অপরাধ।

পক্ষান্তরে ঈমান হল সেই কেন্দ্রীয় শক্তি, যার সাথে জীবনের সকল ঊর্ধ্বগামী সূত্র সমূহ আবদ্ধ। ঈমান না থাকলে জীবনের সকল তৎপরতা, সকল ন্যায় ও কল্যাণ সম্বন্ধ সূত্র জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য। 

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে মানুষের মর্যাদার অধিকারী হওয়ার আসল উপাদান হল ঈমান। ঈমানের কারণে মানুষ নিজেকে নিজের বিবেচনায় উন্নত রাখে। আর আল্লাহ তাকে যে উচ্চ মর্যাদায় অসীন করেছেন, তা থেকে সে নিজকে নিচে নামায় না। ঈমানের কারণে তার বিবেকে পর্যাপ্ত লজ্জা ও শালীনতাবোধ জন্মে। বস্তুত মানুষ ঈমানের কারণে নিজের ব্যাপারে যত উচ্চ গুণাবলী অর্জন করে এটি সে সবের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। সে হয় আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান। ইসলাম ব্যতিত অন্য সকল ধর্ম বা মতাদর্শ মানুষকে তার নিজের দৃষ্টিতেই হীনও তুচ্ছ বানিয়ে দেয়। নিজেকে অত্যন্ত তুচ্ছ উৎস থেকে জাত বলে মনে করে এবং তার মধ্যে ও ফেরেশতার মধ্যে মর্যাদার দিক দিয়ে বিরাট পার্থক্য সৃষ্টি করে।

আল্লাহমুখী গতিশীলতা, তৎপরতা গঠন ও নির্মাণের পথে অন্তরায় মগজে ও বিবেকে লুকানো নেতিবাচক চিন্তা ধারার নাম ঈমান নয়। শুধুমাত্র এমন মহৎ উদ্দেশ্য, মনোবাসনা ও পবিত্র নিয়তকে ঈমান বলা চলে না যা কখনো কাজে পরিণত হয় না। ঈমান হচ্ছে ইসলামের অন্যতম স্বভাব বা প্রকৃতি। ইসলামের এই স্বভাব প্রকৃতি থেকে উৎপত্তি হয় জীবনের সর্ব বৃহৎ নির্মাণ ক্ষমতার।

ঈমানকে যতক্ষণ আল্লাহর নাজিলকৃত জীবন বিধানের সাথে সংযোগকে বুঝাবে ততক্ষণ উপরোক্ত তত্ত্ব বোধগম্য থাকবে। আর আল্লাহর এই বিধান হচেছ সৃষ্টিজগতের অভ্যন্তরে সক্রিয় একটি চিরস্থায়ী সুসমা ম-িত আন্দোলন ও তৎপরতা। এ তৎপরতা একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে পরিচালিত। এর একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। মানব জাতিকে ঈমানের দিকে পরিচালিত করা মূলতঃ বিশ্বপ্রকৃতির স্বভাবসুলভ গতি ও তৎপরতার নিয়ম বিধানকেই বাস্তবায়ন করার পথ প্রদর্শনের নামান্তর।সৃষ্টি জগতের সেই স্বাভাবিক গতি ও তৎপরতা হচ্ছে কল্যাণ মূলক, গঠন মূলক ও পরিচ্ছন্ন তৎপরতা। কিন্তু ঈমান ব্যতিরেকে মানব সত্তায় এমন এক বৈকল্যের উপস্থিতি নির্দেশ করে যার পরিনাম জীবনের ব্যর্থতা ও সর্বনাশা ব্যতিত আর কিছুই নয়। আর সেই বৈকল্য ও ত্রুটি সহকারে কোন কাজই শুদ্ধ হতে পারে না -তা যতই তার বহিরাবরণে বিশুদ্ধতার প্রলেপ থাক না কেন। (ফি যিলালিল কোরআন) 

যে সব জড়বাদী ও ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা ইসলামের বিশ্বাসকে অন্ধ বিশ্বাস, যুক্তিহীন বিশ্বাস বলে ধর্মকেই অস্বীকার করে তাদের এটা উপলব্ধির প্রয়োজন যে, ইসলামের বিশ্বাস কোন অন্ধ বিশ্বাস নয়, দৃশ্যমান বাস্তবতা থেকে কোন পৃথক বিষয় নয়। বরং ইসলামের বিশ্বাস ঐ প্রত্যক্ষ বাস্তবতার সঠিকতম বিশ্লেষণ। “আমাদের ধর্ম সম্পর্কিত বিশ্বাসের উৎস ঠিক সেই বস্তু যা কোন বৈজ্ঞানিক থিওরীর ক্ষেত্রে উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। আমরা পর্যাবেক্ষণাধীন বস্তু সমূহের অধ্যয়ন থেকেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, ধর্মের ব্যাখ্যাও সঠিক বাস্তব ও পরম সত্য এবং এই পর্যায়ের বাস্তব সত্য যে, হাজার হাজার বছর অতিক্রম হওয়া সত্ত্বেও এর সত্যতায় কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি।” 

ইসলামের ঈমান মানুষকে জীবের আদর্শ, সৃষ্টির সেরা ও পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধির মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। যত দিন পর্যন্ত সে বাস্তব ও প্রাকৃতিক কাল্পনিক শক্তির দ্বারা শাসিত ও ভীত ছিল তত দিন সে ছিল পশুর অধম।

অন্য দিকে যখন মানুষ ঈমানকে বাদ দিয়ে জীবনের জড়বাদী ব্যাখ্যা সত্য বলে গ্রহণ করল, তখনও সে সু ও কু, ভাল মন্দের মাপকাঠিকে অস্বীকার করে মানবতার প্রতি পশুত্বের চেয়েও জঘন্যতম অচরণ করে বসতে দ্বিধা করল না। এরাই আনবিক বোমা নিক্ষেপ করে মানুষ হত্যাকে দূষণীয় বলে মনে করল না। এরাই ঈমানদারদেরকে জগত থেকে নিশ্চিহ্ন করতে ব্যস্ত।

ইসলাম অদৃশ্য আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণের মাধ্যমে মানুষকে তার দৈহিক, জৈবিক অস্তিত্বের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিয়ে তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ মানসিক ও দৈহিক প্রকৃতিতে ভূষিত করে। একমাত্র অদৃশ্য আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেই মানবতা অর্জন করবে শান্তি, “সমস্ত ভয়ভীতি ও দুঃখ কষ্টের কবল থেকে হবে মুক্ত।” 

তথ্য সূত্র :

১. আরাকানে আরবা’আ- সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী 

২. ইসলামী ভাব ধারা - ড. খলিফা আবদুল হাকীম 

৩. ফী যিলালিল কোরআন- সাইয়েদ কুতুব শহীদ 

৪. নাস্তিকতা ও আস্তিকতা- ড. কাজী দীন মুহম্মদ

৫. মুসলমানদের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচী 

৬. ফী যিলালিল কোরআন - সাইয়েদ কুতুব শহীদ

৭. মহানবী (স:)-এর শাশ্বত পয়গাম।

৮. আধুনিক চিন্তাধারা বনাম ধর্ম- ড. ওয়াহীদুদ্দীন খান 

৯. নাস্তিকতা ও আস্তিকতা - ড. কাজী দীন মুহম্মদ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ