ঢাকা, রোববার 24 December 2017, ১০ পৌষ ১৪২৪, ৫ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিয়ের সক্ষমতা অর্জন ও সঙ্গী নির্বাচন

 

এইচএম জোবায়ের : প্রতিটি প্রাণীকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষের জন্য রয়েছে তার বিপরীত লিঙ্গের জোড়া। সে তার নিকট থেকে প্রশান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করে। পৃথিবীতে মানব সভ্যতার বিকাশ ও স্থায়ী করে রাখার জন্য ইসলাম পুরুষ-নারীর বন্ধনকে স্বীকার করে নিয়েছে। এক অনুপম ও উৎকৃষ্ঠ পদ্ধতিতে নারী-পুরুষ একে অন্যের থেকে আনন্দ লাভ করবে, সুখে-দুঃখে অংশীদার হবে। বিয়ে হচ্ছে সেই উত্তম পদ্ধতি। রাসূল (সা:) বিয়ের ব্যাপারে তাগিদ করেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে করীম (সা:) আমাদেরকে সম্বোধন করে বলেছেনঃ ‘হে যুবক দল! তোমাদের মধ্যে যে লোক স্ত্রী গ্রহণে সামর্থ্যবান, তার অবশ্যই বিবাহ করা কর্তব্য। কেননা বিবাহ দৃষ্টিকে নীচ ও নিয়ন্ত্রিত করতে এবং লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করতে অধিক সক্ষম। আর যে লোক তাতে সামর্থ্যবান নয়, তার উচিত রোযা রাখা। কেননা রোযা তাহার জন্য যৌন উত্তেজনা নিবারণকারী।’ (বুখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ, মুসনামে আহমদ)। ইসলামী সভ্যতা বিনির্মাণ করা এবং সামাজিক অশান্তি-অনাচার-বেহায়াপনা দূর করে শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপন করাই বিয়ের উদ্দেশ্য। পাশাপাশি স্বামী-স্ত্রীর মিল-মহব্বতের সাথে একত্রে জীবন-যাপনের মধ্য দিয়ে ইহকাল ও পরকালের উন্নতি সাধন করাও বিয়ের উদ্দেশ্য। আল্লাহ্ তা’য়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা জুড়িহীন, তাদের বিয়ে করিয়ে দাও এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা উপযুক্ত তাদেরও।’ (সূরা নূর-৩২)।

দাম্পত্য জীবনের শুরু ও শেষ দিনগুলোর আবেদন ও চাহিদা একরকম হয়না। বয়স ও অভিজ্ঞতা মানুষের আবেদন ও চাহিদাকে ভিন্নরূপে উপস্থাপন করে। এজন্য দাম্পত্য জীবনের প্রথম কয়েক বছর যেমন অতি উপভোগ্য ও আনন্দময় হয় তেমনি এ সময়টা ক্ষেত্র বিশেষ রিস্কি ও স্পর্শকাতর হতে পারে। এ সময়ের আচার-আচরণ, প্রেম-ভালবাসা, ভাবের আদান-প্রদান, পারস্পরিক সহযোগিতা-সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ পরবর্তী জীবনের জন্য সুখের বা দু:খের কারণ হয়ে উঠতে পারে। এই বছরগুলোকে আরো আনন্দময় এবং এই আনন্দকে বাকী জীবনে ছড়িয়ে দিতে কিছু বিষয় মেনে চলা ও সদা খেয়াল রাখা একান্ত জরুরী। এসবের বেখেয়ালে তিক্ত হতে পারে দাম্পত্য সুখের সকল আয়োজন। সম্পর্ক যদি স্বাভাবিক ও প্রীতিপূর্ণ হয় তবে সংসার জীবনে নেমে আসে চক্ষু শীতলকারী স্বর্গের সুখ-শান্তি। পক্ষান্তরে দাম্পত্য সম্পর্ক যদি অসুন্দর, অস্বাভাবিক ও সন্দেহের আবর্তে ঘুরপাক খেতে থাকে তবে জাহান্নামের আগুন যেন সংসার জীবনকে জ¦ালিয়ে ছারখার করে দেয়। সুখের নীড়টি দুঃখের কারাগারে পরিণত হয়। তাই জীবনের অন্যতম সার্থকতা হলো পারিবারিক জীবনকে ইসলামের সীমার মধ্যে রেখে সুখময় করে তোলা। বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করে জীবনসঙ্গী নির্বাচনের উপর। সঠিক ও ‘কুফু’ মিলিয়ে জীবন সঙ্গী নির্বাচন পারিবারিক জীবনকে সার্থক ও সুন্দর করে। 

একজন সৎ, চরিত্রবান, আমানতদার জীবন সঙ্গী/সঙ্গীনি যেন এক জান্নাতের টুকরা। জীবনের প্রতিটি বাঁকে যিনি পাশে থেকে খুব কাছ থেকে আমাকে পরিচালিত করবেন, সহযোগিতা করবেন, সুখের ও দুঃখের সাথী হবেন তাকে নির্বাচনে ভুল করলে গোড়ায় গলদ হয়ে যাবে। সময় হলে বিয়ে করার ব্যাপারে মহান রাসূলের (সাঃ) বাণী আছে। সময় হওয়া বলতে সাবলম্বী হওয়া, মানে স্ত্রীকে ভরণ-পোষণ দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করা। এ সক্ষমতা অর্জনে অক্ষম অথচ বিয়ে করাটা জরুরী (এটা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপর) সেক্ষেত্রেও বিকল্প বলে দিয়েছেন নবীজি। মূল কথায় আসি, অনেক সময় আবেগ বা চোখের ভাল লাগার ভিত্তিতে অনেকেই হুটহাট সিদ্ধান্ত নিয়ে স্ত্রীকে ভরণ-পোষণ দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করার পূর্বেই বিয়ের মত একটা জটিল ও লাইফ লং ডিসিশন নিয়ে ফেলেন। যা তাকে বেশ কয়েক বছরের জন্য অনটনের মধ্যে ফেলে দেয়। তিনি মানসিক ভাবে সমাজ ও পরিবারে ছোট হয়ে থাকেন। অন্যদিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহিত জীবনে বিশেষত স্ত্রী’কে সম্পূর্ণ নতুন একটি পরিবেশ ফেইস করতে হয়। এই সময়টি মেয়েদের জন্য খুব জটিল ও স্পর্শকাতর। এ সময়ের ছোটখাটো কথাবার্তা ও ঘটনাও সারা জীবনের জন্য মনে স্থান করে নেয়। নববধূকে প্রশংসা ও আদর তার হৃদয়কে বসন্তের রঙে রাঙিয়ে দেয়।

 আবার এ সময়ের মৃদু ধমক, তিরস্কার ও নিন্দা তার ফুলেল মনকে আহত করে, ভেঙে ফেলে। তেমনি বিয়ের সূত্র ধরে মেয়েটি যাকে তার জীবনসঙ্গী হিসেবে পেলো শুরুতে ঐ ব্যক্তির আর্থিক সচ্ছলতা ও দুর্বলতা তাকে আনন্দিত ও ব্যথিত করে। অল্প দিনের ব্যবধানে সে মনোবল হারিয়ে চিন্তাক্লীষ্ট হয়ে পড়ে। আশপাশ থেকেও এ ব্যাপারে নানা কথা তার কানে আসে। তাই আর্থিকভাবে মোটামুটি একটা পর্যায়ে আসার পরই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া সমীচীন। তাই ইসলামে- আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হওয়া এবং শারিরিকভাবে সুস্থ হওয়াকে বিয়ে করার ক্ষেত্রে শর্ত ধরা হয়েছে। 

বিয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্রী খোঁজে পাওয়া সহজ বিষয় নয়। অনেকে পাত্র-পাত্রী সন্ধান করে করে হয়রান হয়ে যান। ছেলেরা একের পর এক পাত্রী দেখতেই থাকেন, পছন্দ হয়না। এতে অনেকে হতাশ হয়ে পড়েন, অনেকে নিকটজনের কাছে হাসির পাত্রে পরিণত হন। বিষয়টির সহজ সমাধান দিয়েছেন মানবতার বন্ধু রাসূল (সাঃ)। তিনি বলেন, ‘চারটি গুণ দেখে মহিলাকে বিবাহ করা হয়; তার ধন-সম্পদ, তার বংশ মর্যাদা, তার রূপ-সৌন্দর্য এবং তার দ্বীন-ধর্ম দেখে। তুমি দ্বীনদার পাত্রী লাভ করে সফলকাম হও। (অন্যথায় তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।)’ (বুখারী)। দ্বীনদারীকে বিশেষভাবে সফলতার মানদ- হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ দ্বীনদারীকে প্রাধান্য না দিলে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিছুদিন পূর্বেও বংশ মর্যাদার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বলতে গেলে এক নম্বরে দেখা হত। কিন্তু বর্তমান সমাজের পুঁজিবাদী মনোবৃাত্তি আমাদের অভিভাবক সমাজ এবং পাত্র-পাত্রীদেরকে রূপ-সৌন্দর্য ও ধন-সম্পদকে এক নম্বরে স্থান করে দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে দ্বীনদারীর বিষয়টি গৌণ এবং গুরুত্বহীন হতে বসেছে। দ্বীনের অনুশীলন করা অনেক ভাই দ্বীনহীন অপ্সরা সুন্দরী পাত্রী দেখে ভুলে যাচ্ছেন সারা জীবনের শিক্ষা। আবার অনেক দ্বীনী বোন দ্বীনদারীর বোঝাকে (!) হালকা করতে তথাকথিত আধুনিক-স্মার্ট-হ্যা-সাম ছেলেকে চোখ বন্ধ করে বেছে নিচ্ছেন। ফলে ‘কুফু’ (সমতা) না মিলার কারণে সংসার জীবনে অশান্তি নেমে আসছে। তাই পারিবারিক শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাসূল (সা:) নির্দেশিত দ্বীনদারীর দিকেই ফিরে আসতে হবে।

‘দ্বীনদারী’র বিষয়টি অনেক বড় একটি বিষয়। এটি ব্যক্তির ঈমান ও কর্মের সাথে নিবীড়ভাবে জড়িত। বিয়ের ক্ষেত্রে ঈমানের আবশ্যকতা আছে কুরআনে পাকে। আল্লাহ তায়া’লা বলেন, “আর তোমরা মুশরেক নারীদেরকে বিয়ে করোনা, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা ঈমান গ্রহণ করে। নিশ্চয়ই একজন মুসলমান ক্রীতদাসী, মুশরেক স্বাধীনা নারী অপেক্ষা উত্তম, যদিও (দুনিয়ার চাকচিক্য, সৌন্দর্য অথবা সম্পদের কারণে) তাদেরকে তোমাদের কাছে ভালো লাগে। এবং তোমরা (নারীরা) কোন মুশরেক পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ো না, যে পর্যন্ত না সে ঈমান আনে। একজন মুসলমান ক্রীতদাস একজন স্বাধীন মুশরেকের তুলনায় অনেক ভাল, যদিও তোমরা তাদের দেখে মোহিত হও। তারা (কাফের/মুশরেক) তোমাদেরকে জাহান্নামের দিকে আহবান করে, আর আল্লাহ তাঁর আদেশের মাধ্যমে তোমাদেরকে জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন। 

আর তিনি মানুষকে নিজের নির্দেশ বাতলে দেন, যাতে করে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।” (সুরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত ২২১)। ঈমানের পর আসে তার কর্ম। আমলের জন্য দরকার জ্ঞানের। দুনিয়া-আখেরাত, পুরস্কার-শাস্তি, হালাল-হারাম, শিকর ইত্যাদি সম্পর্কে ইসলামের জরুরী বিধানগুলো জানা আছে কি-না সে ব্যাপারে প্রশ্ন করে জেনে নেয়া যেতে পারে। এরপর পর্দানশীল হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। বেপর্দা নারীর পরকালীন সফলতা সুদূর পরাহত। “একবার এক সফরে রাসূল (সা:) সাহাবাদেরকে নিয়ে একটা পাহাড়ে উঠলেন। সেখানে হঠাৎ তারা একটি কাক দেখতে পেলেন, যার পা ও ঠোঁট ছিলো লাল। এ ধরনের কাক খুবই বিরল, দেখতে পাওয়া যায়না বললেই চলে। সাহাবারা এতো বিরল একটা জিনিস দেখে আশ্চর্য হয়ে বলাবলি করতে লাগলেন। রাসুল (সা) তখন বললেন, কাকের মাঝে লাল পা ও লাল ঠোঁটওয়ালা কাক যেমন অত্যন্ত বিরল, বেপর্দা নারীদের জান্নাতে প্রবেশও তেমনি বিরল।” তাই নারীদের পর্দা একটি অত্যাবশ্যক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চতুর্থত- অধিক সন্তান জন্মদানকারী। রাসুল (সা) পুরুষদেরকে অধিক সন্তান জন্মদানকারী নারীদেরকে বিয়ে করতে উৎসাহিত করেছেন। এর দ্বারা উম্মতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে যা নিয়ে কেয়ামতের দিন রাসূল (সা:) গর্ব করবেন। বিষয়টি মেয়ের ভাই-বোনের সংখ্যা, খালাদের সন্তানাদি ও মেয়ের বড় বোনদের সন্তানাদির সংখ্যার দিকে খেয়াল করলে সহজেই ধারণা করা যাবে। সর্বশেষ আসে কুমারী কন্যার কথা। কুমারী মেয়েদের মাঝে সচ্চরিত্রতা, লজ্জাশীলতা, বিনয়াবনত চিত্ত, সহজাত কমণীয়তা, রূপ-লাবণ্যতা ইত্যাদি বেশী থাকে। জান্নাতী নারীরা কুমরী হবে। রাসুল (সা) বলেছেন, “তোমরা কুমারী মেয়েদেরকে বিয়ে করো, কারণ তারা মিষ্টভাষী, অধিক সন্তান জন্মদানকারী এবং অল্পে তুষ্ট হয়ে থাকে।” (তাবারানি, হাদীসটি হাসান সহীহ)। 

ইসলাম মানুষের সার্বিক কল্যাণ, সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তা এবং পারিবারিক জীবনের প্রীতিপূর্ণ বন্ধনকে সুদৃঢ় করার জন্য সুস্পষ্টভাবে তার বিধান বর্ণনা করেছে। মানা না মানা মানুষের এখতিয়ারাধীন করে দিয়েছে। বর্তমান হানাহানি ও যুদ্ধ বিক্ষুব্ধ দুনিয়াতে মানবতা-মনুষ্যত্বের অহর্নিশি পদদলন ঘটছে। এমতাবস্থায় হিংসা-বিদ্বেষ, জুলুম-নির্যাতন, হত্যা-ধর্ষণ-উচ্ছেদ-দখলসহ অনৈতিকতা আজ জয়জয়কার অবস্থানে। এই অবস্থা থেকে নিজেকে এবং সমাজকে বাঁচাতে একটি শক্তিশালী আদর্শিক পরিবারের কোন বিকল্প নাই। আর সেই পরিবারের ভিত্তি রচনা হবে ইসলামের আলোকে জীবন সঙ্গী-সঙ্গীনি বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে। সঠিক সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত এনে দেবে অনাবিল সুখ-শান্তির অমীয় সুধা। 

লেখক : সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ