ঢাকা, রোববার 24 December 2017, ১০ পৌষ ১৪২৪, ৫ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ধরাছোঁয়ার বাইরে কেসিসি’র অর্থ আত্মসাতের মূল হোতারা

খুলনা অফিস : খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) লাইসেন্স শাখায় অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে অডিট কমিটি। এতে ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ২৪ লাখ ২৫ হাজার ১৫৮ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্ত করা হয়েছে ওই বিভাগের ৫ পরিদর্শককে। এর মধ্যে হাবিবুর রহমান নামের এক পরিদর্শকের নামে আত্মসাত দেখানো হয়েছে ২৩ লাখ ৭ হাজার ৭৮ টাকা। তবে একজন পরিদর্শকের পক্ষে ২৩ লাখ টাকা একা একা আত্মসাত করা সম্ভব কিনা-তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ট্রেড লাইসেন্সের টাকা বুঝে নেন হিসাব বিভাগের একজন আদায়কারী। এটা তদারকির দায়িত্ব প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার। পরিদর্শকের ওপরে রয়েছে লাইসেন্স কর্মকর্তা ও সিনিয়র লাইসেন্স কর্মকর্তা। এছাড়া একটি লাইসেন্সের আবেদনের শুরু থেকে লাইসেন্স প্রদান পর্যন্ত মোট ৫ জনের স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়-সেক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে শুধু পরিদর্শকরা কেন অভিযুক্ত হবেন-তা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা। এর মাধ্যমে এবারও মূল হোতারা এবং এই অর্থের বড় অংশ পকেটে নেওয়া কেসিসির শীর্ষ কর্মকর্তারা আড়ালে থেকে যাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, লাইসেন্স ফি সহজেই যাতে আত্মসাত করা যায়-সেজন্য লাইসেন্স প্রদানের নিয়ম পাল্টে ফেলা হয়। দীর্ঘদিন এভাবে চললেও রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা বিষয়টি দেখেও চুপ ছিলেন। এখানে কোনো আর্থিক লেনদেন ছিলো কিনা তা তদন্ত করা হয়নি। আবার সর্বোচ্চ ২৩ লাখ টাকা আত্মসাতকারী হাবিবুর রহমানকে লাইসেন্স বিভাগের পরিদর্শক পদ থেকে সরিয়ে নিতে চলতি বছরের ২৮ জুন নোট দিয়েছিলেন সিনিয়র লাইসেন্স অফিসার এস কে তাছাদুজ্জামান। পরবর্তীতে তাকে শোকজও করা হয়। কিন্তু গত ৬ মাস ধরে সেই ফাইল একই স্থানে আটকে আছে। কাদের নির্দেশে তাকে ওই পদে বহাল রাখা হয়েছে- সেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। 

কর্মকর্তারা জানান, কেসিসির লাইসেন্স বিভাগের টাকা আত্মসাতের জন্য ইতোপূর্বে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবারই পরিদর্শককে অভিযুক্ত করা হয়। এর সঙ্গে জড়িত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা রয়ে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। মূলত মূল হোতাদের শাস্তি না হওয়ায় এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ হয় না। বরং তদন্ত রিপোর্ট বা শাস্তি প্রদানের ভয় দেখিয়ে অভিযুক্তদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন ওইসব কর্মকর্তা। 

কেসিসি থেকে জানা গেছে, লাইসেন্স শাখার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ বেশ পুরানো। এ নিয়ে একাধিকবার তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠনের একদিন পর একবার লাইসেন্স শাখায় আগুন ধরে গিয়েছিল। সেই রিপোর্টও আলোরমুখ দেখেনি। সর্বশেষ অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি তদন্ত করতে তিন সদস্যের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ১৪ ডিসেম্বর প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কমিটি। 

তদন্তে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে ২০৪টি মুড়ি বইয়ের মাধ্যমে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৩টি মুড়ি বই খুঁজে পাওয়া গেছে। এসব বইয়ের মাধ্যমে মোট ৪ কোটি ৬২ লাখ ৫৩ হাজার ৮১ টাকা আদায় করেছেন পরিদর্শকরা। কিন্তু জমা দিয়েছেন ৪ কোটি ৩৮ লাখ ২৭ হাজার ৯২৩ টাকা। বাকি ২৪ লাখ ২৫ হাজার ১৫৮ টাকা তারা কেসিসির তহবিলে জমা প্রদান না করে আত্মসাত করেছেন। এর মধ্যে লাইসেন্স পরিদর্শক হাবিবুর রহমান ২৩ লাখ ৭ হাজার ৭৮ টাকা, হুমায়ুন কবীর ২৪ হাজার ৪৫০ টাকা, শফিকুল ৯ হাজার ১০০ টাকা, খান শফিকুল ইসলাম ৩ হাজার ১৫০ টাকা, মোল্লা মোহাম্মদ আলী ২৯ হাজার ২০০ টাকা ও কাজী মনজুর উল আলম ৪ হাজার ৬৮০ টাকা জমা দেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বিভাগের সাবেক একাধিক কর্মকর্তা জানান, জাল মুড়ি বই তৈরি করে পুরো টাকাই আত্মসাত করা হয়েছে। জাল মুড়ি বই তৈরি করে লাখ লাখ টাকা কর্মকর্তারা পকেটে পুরেছেন। যেসব মুড়ি বই পাওয়া যায়নি সেগুলো বের করলে লাখ লাখ টাকার হিসাব পাওয়া যাবে। কেসিসির বিভিন্ন বিভাগের প্রধান ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নিয়মিত এসব টাকার অংশ পেয়েছেন। না হলে গত ৩/৪ বছর সবাই নিরব ছিলেন কেন? আর লাখ লাখ টাকার হিসাব বাদ দিয়ে ৫/১০ হাজার টাকার আত্মসাত নিয়ে টানাটানি হাস্যকর।

ট্রেড লাইসেন্স শাখায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠা লাইসেন্স পরিদর্শক হাবিবুর রহমান কেসিসির এক নির্বাহী প্রকৌশলীর শ্যালক। আর্থিক অস্বচ্ছতার কারণে চলতি বছরের ২৮ জুন তাকে বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়। দীর্ঘদিন ফাইল আটকে থাকার পর গত ৩ আগস্ট সচিব তাকে শোকজ করেন। ৭ আগস্ট তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে উত্তর দেন। দুই জন কাউন্সিলর তার উত্তরে সুপারিশ করেন। এরপর তার বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। 

অভিযুক্ত ৫ পরিদর্শক নির্দোষ দাবি করে বলেছেন, তারা প্রত্যেকে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা করে আদায় করেছেন। সেখানে ৮/১০ হাজার টাকার ভুল হতেই পারে। এসব বিষয়ে বেশি কিছু না বলতে কর্মকর্তারা নিষেধ করছেন। 

এ ব্যাপারে কেসিসির সিনিয়র লাইসেন্স অফিসার এস কে তাছাদুজ্জামান বলেন, তিনি গত জুন মাসে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ব্যাংকের মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স আদায় হচ্ছে। হাতে হাতে টাকা লেনদেন হতো আরও আগে। তদন্তের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

কেসিসির সচিব ইকবাল হোসেন বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। সবার সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ