ঢাকা, সোমবার 25 December 2017, ১১ পৌষ ১৪২৪, ৬ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

প্রাথমিক শিক্ষকদের আমরণ অনশনের দ্বিতীয় দিনে অর্ধশতাধিক হাসপাতালে

বেতন বৈষম্যসহ বিভিন্ন দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের অনশন চলছে। গতকাল রোববার তোলা ছবি -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : শিক্ষকদের টানা দুদিনের আমরণ অনশনে অর্ধশতাধিক শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার মধ্যে ৮ জন শিক্ষকের অবস্থা গুরুতর। বর্তমানে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। অসুস্থ শিক্ষকরা হলেন- ময়মনসিংহ ঈশ্বরগঞ্জের মো. জাহাঙ্গীর আলম ও একই স্কুলের সহকারী শিক্ষক আজমল হোসেন, নোয়াখালীর ছাটখিলের সহকারী শিক্ষক আব্দুল মান্নান, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের দক্ষিণ মুছাপুরের শিক্ষক মো. হক মিয়া, একই উপজেলার আল মোবারক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম, বরগুনার মো. সানাউল্লাহ হক, মাগুরার শিক্ষক মো. আবু আজিম, ময়মনসিংহের সিরাজ-উদ-দৌলা, মানিকগঞ্জের শিক্ষক রফিকুল ইসলাম, নোয়াখালীর এইচএম আলাউদ্দিন, সাতক্ষীরার আব্দুল হামিদ, সিরাজগঞ্জের শিক্ষক এস এম সানাউল্লাহসহ ৩৩ জন শিক্ষক অনশন চালাকালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ অন্যান্য চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হয়। সেখানে শিক্ষকদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
এছাড়াও টানা দুদিন অনশন করায় অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়লে পার্শ্ববর্তী হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে শরীরে স্যালাইন লাগানো অবস্থায় আবারও অনশনে যোগ দিচ্ছেন।
আন্দোলনকারী শিক্ষকরা বলেন, নিজেদের অধিকার আদায় করতে এসে এখন শিক্ষকরা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কি অন্যায় করেছি আমরা? স্যারেরা আমাদের দিকে মুখ ফিরে দেখছেন না। তাদের মধ্যে কয়েকজন শিক্ষকের অবস্থা অনেক বেশি আশঙ্কাজনক।
তারা আরও বলেন, নিজেদের অধিকার আদায়ে আজ রাস্তায় নেমেছি। বাড়ি ও পরিবার ছেড়ে আমরা দুদিন ধরে আন্দোলন করছি। অধিকার আদায় ছাড়া আমরা বাড়ি ফিরে যাব না এমন শপথ করেই ঘর থেকে বেরিয়েছি। আন্দোলনে যদি কোনো শিক্ষক প্রাণ হারায় তবে তার দায়ভার সরকারকে নিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন শিক্ষকরা।
 প্রসঙ্গত, বেতন বৈষম্য কমানেরা দাবিতে অনশনরত শিক্ষকরা দ্বিতীয় দিনের মত তাদের আমরণ অনশন অব্যাহত রেখেছেন। এজন্য অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শিক্ষকদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীকে তাদের দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল রোববার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাদের এই আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু হয়। এর আগে প্রথম দিনের মতো একই স্থানে শনিবার সকাল ১০টায় তারা এ অনশন কর্মসূচি শুরু করেন।
মহাজোটের অধীনে সহকারী শিক্ষকদের ১০টি সংগঠনের দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার শিক্ষক এক দফা দাবি আদায়ের এ অনশন কর্মসূচি পালন করছেন। এ সময় তাদের হাতে বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার দেখা গেছে। দাবি আদায়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ থানার হাসানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সামসুল আলম তার প্ল্যাকার্ডে লিখেছেন, 'মাগো তোমার ছেলের কান্না থামাও'।
শিক্ষকরা বলেন, একমাত্র প্রধানমন্ত্রীই পারেন আমাদের কান্না থামাতে। তার একটি ঘোষণাই পারে আমাদেরকে এই শহীদ মিনারে খোলা জায়গা থেকে ঘরে ফেরাতে। আমরা ক্লাসে ফিরতে চাই। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত ঘোষণা না আসবে ততক্ষণ আমরা শহীদ মিনার থেকে এক চুলও সরবোনা।
এদিকে অনশনে থাকা কয়েক হাজার শিক্ষকে মধ্যে সকাল থেকে প্রায় অর্ধশত শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষক মহাজোটের সভপতি মোহাম্মদ শামসুদ্দিন। তিনি বলেন, আটজনকে অসুস্থ অবস্থায় ইতোমধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজন মহিলা শিক্ষক রয়েছেন। বাকিদের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণেই স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে।
এদিকে গতকাল রোববার বেতন বৈষম্য নিরসনে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের আমরণ অনশন কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনে একাত্মতা প্রকাশ করে শিক্ষকদের দাবি মেনে নিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী।
কর্মসূচিতে বাধা দেয়ার অভিযোগ 
এদিকে শিক্ষক নেতারা অভিযোগ করে বলেন, শনিবার দিনগত রাতে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষক শহীদ মিনারে অবস্থান করেন। বাকিরা রাত যাপনে বিভিন্ন গন্তব্যে চলে যান। তারা রোববার সকালে শহীদ মিনারে আসার পথে বাধার সম্মুখীন হন।
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি সামসুদ্দিন মাসুদসহ কয়েকজন নেতাকে শহীদ মিনারের আশেপাশের রাস্তার মোড়ে আটকে দেয়া হয়েছে বলেও জানান শিক্ষকরা। অনশন কর্মসূচি স্থলের মাইকেও কয়েক দফা জানানো হয়, শিক্ষকদের আসতে বাধা দেয়া হচ্ছে।
শাহবাগ থানার পেট্রল ইন্সপেক্টর পিআই শেখ আবুল বাশার বলেন, শিক্ষকরা তাদের কথা রাখেনি। শনিবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত শহীদ মিনারে অবস্থানে জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছে। কিন্তু তারা রোববারও অবস্থান করছে। আমরা শিক্ষকদের বুঝিয়ে উঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি।
অন্যদিকে শিক্ষকদের ক্লাসে ফেরাতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এক জরুরি বৈঠক করেছেন বলে জানিয়েছেন মোহাম্মদ শামসুদ্দিন।
এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এফ এম মঞ্জুর কাদির বলেন, শিক্ষকদের আন্দোলন ছেড়ে ক্লাসে ফেরাতে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তারা তো আমাদেরই লোক। শিক্ষকরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করবে আর আমরা চুপচাপ থাকব তা তো হতে পারে না।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বলেন, শিক্ষকদের দাবি পূরণের বিষয়টি অনেক উপর পর্যায়ের বিষয়। তবে তাদের দাবির যৌক্তিকতা রয়েছে। এ কারণে বিষয়টি আমলে নিয়ে আমরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। শিক্ষকদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে।
প্রাথমিকের ফল আটকে দেয়ার হুমকি 
আন্দোলনরত শিক্ষকরা হুশিয়ারি দিয়ে বলছেন, দাবি আদায় না হলে প্রাথমিকের সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল আটকে দেয়া হবে। পাশাপাশি ১ জানুয়ারি বই উৎসব পালন করা হবে না বলেও ঘোষণা দেন তারা। অনশন চলাকালে সহকারী শিক্ষক নেতৃবৃন্দ বলেন, ১৯৭৩ সালে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল একই ছিল। তারপর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পরের ধাপে ছিল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের বেতন। ২০০৬ সালের পর থেকে বেতন স্কেলের ব্যবধান বাড়তে থাকে।
সর্বশেষ ২০১৪ সালের ঘোষণা অনুযায়ী ব্যবধান দাঁড়ায় তিন ধাপে। একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেও প্রধান শিক্ষক থেকে তিন ধাপ নিচে বেতন পাচ্ছেন সহকারী শিক্ষকরা। এই বৈষম্যের নিরসন হওয়া জরুরি।
তারা বলছেন, বেতন বৈষম্য দূরীকরণের এমন কোনো কাজ নেই যা আমরা করিনি। প্রধানমন্ত্রী ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বরাবর স্মারকলিপি, খোলাচিঠি প্রদানসহ বিভিন্ন সভা-সেমিনার করেছি। অবশেষে আজ আমরা অনশন কর্মসূচি পালন করতে বাধ্য হয়েছি।
শিক্ষক নেতারা বলেন, আমাদের এ দাবিকে সবাই যৌক্তিক দাবি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তবুও এ দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে কী কারণ রয়েছে- তা আমরা জানি না। আমাদের বিশ্বাস শিক্ষকদের এ যৌক্তিক দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছেনি। তাই প্রধানমন্ত্রীকে জানানো এবং আমাদের দাবি আদায় করার জন্য এ অনশন।
দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে জানান- জাতীয় প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী রবিউল।
তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত আমরা এখান থেকে কোথাও যাব না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এ অনশন অব্যাহত থাকবে।
অনশন চলাকালে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ প্রাথমকি সহকারী শিক্ষক সমাজের সভাপতি তপন কুমার মন্ডল, সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদুর রহমান, জাতীয় প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক ফাউন্ডেশনের সভাপতি মোসা. শাহীনুর আক্তার, সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক ভূইয়া, প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মুহাম্মদ শামসুদ্দীন মাসুদ, সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল হক প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ