ঢাকা, সোমবার 25 December 2017, ১১ পৌষ ১৪২৪, ৬ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চলনবিলে লোকসান গুনে সর্বস্বান্ত হচ্ছে ধান-চাল ব্যবসায়ীরা

শাহজাহান তাড়াশ সিরাজগঞ্জ থেকে: শেষ হলো অগ্রহায়ন মাস। আজ পৌস মাসের ৬ দিন চলছে। চলনবিলে এ সময় পৌস পার্বণের ধুম পড়ে থাকতো। কৃষকের মনে আনন্দ নেই। ঘরে চাল নেই,গোয়াল ঘরে গরু নেই, গো খাদ্যের অভাবে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে কৃষক জমি থেকে আমন ধান, বীনা সেভেন, ব্রী-ধান উনচল্লিশ, স্বর্ণাসহ বিভিন্ন জাতের মৌসুমী ধান কেটে ঘরে তুলেছেন। তার পরও চলনবিল এলাকার হাট বাজারে ধানের সংকট চলছে। আমনসহ এ মৌসুমের অন্যান্য ধান পাকার পূর্বে চলনবিলাঞ্চলের চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া, তাড়াশসহ এর আশ পাশ এলাকার ধান চাল ব্যবসায়ীদের (মিল চাতাল) ব্যবসা প্রায় বন্ধ ছিল। ১০ শতাংশ ব্যবসায়ীর ব্যবসা সেসময় সচল ছিল।
৯০ শতাংশ বন্ধ ছিল। সচল ১০ শতাংশ ব্যবসায়ীর পাশাপাশি ধান ওঠার পর নতুন ৩০ শতাংশ ব্যবসায়ী ব্যবসা শুরু করে। ব্যবসায় ক্রমাগত লোকসান দেখে বাকি ৬০ শতাংশ ব্যবসায়ী এখনো তাদের ধানের মিল চাতালের ব্যবসা বন্ধ রেখেছেন। যে ৪০ শতাংশ ব্যবসায়ী ব্যবসা করছেন তারা প্রতিনিয়ত লোকসান গুনছেন। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার হামকুড়িয়া গ্রামের কৃষক ছোলেমান হোসেন জানান, ধান, চাউলের বাজার আগুন লেগে গেছে, চলতি মওসুমেও হাটবাজারে তেমন, ধান উঠতে দেখা যাচ্ছে না। এভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি হলে মানুষ না খেয়ে মরতে বসবে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমান চলনবিলাঞ্চলের চাটমোহরের অমৃতকু-া, মির্জাপুর, ভাঙ্গুড়ার শরৎনগর, ফরিদপুরের এরশাদ নগর, গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড়, নাজিরপুর, বড়াইগ্রামের জোনাইল, বনপাড়া, সিংড়ার সিংড়া সদর, রনবাঘাসহ চলনবিলাঞ্চলের অন্যান্য হাট বাজারে প্রতিমণ আমন ধান এক হাজার ত্রিশ টাকা, বিনা সেভেন এগারো’শ টাকা, উনচল্লিশ এগারোশ’ টাকা, উনত্রিশ ধান এগারোশ’ টাকার কাছাকাছি কিছু কম বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এ দামে ব্যাপারীদের নিকট থেকে ধান কিনে মিল চাতাল মালিকরা চাল তৈরী করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
চাটমোহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত মেসার্স ভাই ভাই রাইসমিলের স্বত্ত্বাধিকারী ও চাটমোহর মিলচাতাল মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ মোতালিব হোসেন জানান, “ব্যাপারীদের নিকট থেকে এক মন আমন ধান আমাদের কিনতে হচ্ছে ১০৩০ টাকায়। প্রতিমন ধানে লেবার বিল, ভাঙ্গানো খরচ ও বস্তার দাম মিলে খরচ পরছে ৮০ টাকা।
এক মন ধান থেকে চাল তৈরী করতে খরচ আসছে ১ হাজার ১শ ১০ টাকা। এক মন ধানে চাল হচ্ছে সাড়ে ২৬ থেকে ২৭ কেজি। প্রতি কেজি চালের দাম পরছে ৪১ টাকার উপরে। ৫০ কেজি আমন চালের বস্তায় খরচ পরছে ২ হাজার ৫৫ টাকার কাছাকাছি। ক্ষুদ গুঁড়া বাবদ ৫৫ টাকা বাদ দিলেও খরচ থাকছে ২ হাজার টাকা। সেখানে ৫০ কেজির প্রতি বস্তা আমন চাল বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮৪০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা। প্রতি বস্তা আমন চালে লোকসান যাচ্ছে দেড়শ টাকা। বিনা সেভেন, উনচল্লিশ, নতুন উনত্রিশ ধানের দাম প্রায় একই।
প্রতিমন ১ হাজার ১শ’ টাকা। এ ধান গুলো থেকে চাল তৈরী করতে প্রতি মনে ৮০ টাকা খরচ। এসকল প্রতিমণ ধানে চাল হচ্ছে ২৬ কেজি করে। প্রতি কেজি চালের দাম পড়ছে ৪৫ টাকার উপরে। ৫০ কেজি চালের বস্তায় খরচ আসছে ২ হাজার ২৬৯ টাকার মত। ক্ষুদ গুঁড়া বাবদ ১২০ টাকা বাদ দিলেও ৫০ কেজির বস্তায় খরচ থাকছে ২ হাজার ১৪৯ টাকা। সেখানে ৫০ কেজি চাল বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯৫০ টাকায়। বস্তা প্রতি লোকসান যাচ্ছে প্রায় ২শ টাকা। গত বোরো মৌসুমে বাজারে চালের দাম ৩৭ থেকে ৩৮ টাকা কেজি ছিল। সরকার সে সময় চাউলের দাম প্রতি কেজি ৩৪ টাকা নির্ধারণ করলে লোকসানের আশংকায় অধিকাংশ মিল মালিক গোডাউনে চাল দেয়নি। আমরা কয়েকজন গত বছর গোডাউনে চাল সরবরাহ করে লোকসান গুনেছি। এবারো চাটমোহরের প্রায় ৮৮ জন মিল মালিকের মধ্যে মাত্র কয়েকজন সরকারের সাথে চাল সরবরাহে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে এবং লোকসানের আশংকায় আছে”।
চলনবিল এলাকার উপজেলাগুলোর মধ্যে সর্বাধিক ধানের মিল চাতাল অধ্যুষিত এলাকা গুরুদাসপুর। এ উপজেলার চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ¦ শামসুল হক শেখ জানান, “গুরুদাস পুরে সমিতির আওতাভুক্ত ১৮৪ চাল কল মালিক সহ প্রায় ৩শ’ মিল চাতাল মালিক রয়েছেন। এ এলাকার ধান চাল ব্যবসায়ীরা (মিল চাতাল) এখন করুণ অবস্থায় উপনীত। আমন এবং অন্যান্য চালে প্রতি ৫০ কেজির বস্তায় একশ থেকে দেড়শ টাকার কাছাকাছি লোকসান হচ্ছে। ৬০ শতাংশ মিল চাতাল বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ব্যবসায়ীরা চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। গুরুদাসপুরে গত বোরো মৌসুমে যে সকল চাল কল মালিক সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে চাল সরবরাহ করেছিল এবার কেবল তাদেরই বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সরকার চলতি মৌসুমে আমন চালের মূল্য প্রতি কেজি ৩৯ টাকা নির্ধারণ করেছে। চালের মূল্য বৃদ্ধি না করলে বোরো মৌসুমের মতো আমন মৌসুমে ও ক্ষতিগ্রস্থ হব আমরা”। তিনি চালের মূল্য পূনঃনির্ধারণ করে কিছু বৃদ্ধি করলে তবেই মিল মালিকরা লাভ না করতে পারলেও অন্তত ক্ষতির হাত থেকে বাঁচবে বলে জানান।
অটো মিলে অপেক্ষাকৃত প্রসেস খরচ কম। বাজারে ধানের সংকট থাকায় চলনবিল এলাকার অটো মিল মালিকরা বেশী দাম হলেও মিল সচল রাখতে বাধ্য হয়ে ধান কিনছেন। ধানের বাজার উর্ধ্বমুখী হওয়ায় কৃষক ও বেশি দামের আশায় খুব প্রয়োজন ছাড়া ধান বিক্রি করছেন না। যোগান কম এবং অটো মিলারদের অধিক ধান ক্রয়ের ফলে হাকসিন মিলের মালিকরা ধান কিনতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে হাটে ধান ভ্যান বা অন্য যানবাহনের উপরে থাকতেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। খুচরা বাজারে এর চেয়ে কিছু বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে চাল।
জানা গেছে, গুরুদাস পুরে প্রায় ৩শ, চাটমোহরের প্রায় ৮৮, সিংড়ায় প্রায় ১শ টি, বড়াইগ্রামের দেড় শতাধিক মিলচাতালসহ চলনবিলাঞ্চলে প্রায় ৮ শতাধিক মিল চাতাল রয়েছে।
এক একটি মিল চাতালে গড়ে প্রায় ২২ জন নারী পুরুষ শ্রমিক কাজ করতো। এসব মিল চাতালে অন্যান্য সময় প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক কাজ করলেও বর্তমান ১০ থেকে ১১ হাজার শ্রমিক ইটের ভাটা, খেত খামারে কাজ করছেন। এদের কেউ কেউ রিক্সা ভ্যান চালাচ্ছেন অথবা অন্য পেশায় নিয়েজিত হয়েছেন। কেউ কেউ মিল চাতালে কাজের আশায় বেকার হয়ে সময় কাটাচ্ছেন।এব্যাপারে তাড়াশ উপজেলার কৃষি অফিসার কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম জানান, চলনবিলসহ দেশের ১৮টি জেলার ভয়াবহ বন্যায় যে ক্ষতি হয়েছে তা অপুরনীয়। এবছর ধানের ফলন ভাল হয়নি। যা হয়েছে কৃষকরা তা বিক্রি করছেনা। আশানুরুপ ফলন না হওয়াতে সবাই লোকসানের মধ্যে আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ