ঢাকা, মঙ্গলবার 26 December 2017, ১২ পৌষ ১৪২৪, ৭ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মন্ত্রীর আশ্বাসে শর্ত সাপেক্ষে আন্দোলন স্থগিত করলেন অনশনরত শিক্ষকদের একাংশ

বেতন বৈষম্যসহ বিভিন্ন দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রাথমিক শিক্ষকদের অনশনের তৃতীয় দিনে গতকাল সোমবার অনেক শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েন সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজারের আশ্বাসে শর্ত সাপেক্ষে আন্দোলন স্থগিত করেছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় সাড়ে ৫টার দিকে শহীদ মিনারে শরবত পান করিয়ে আন্দোলনরত কয়েকজন শিক্ষকের অনশন ভাঙান মন্ত্রী। এরপরও কিছু শিক্ষক এর এতে আপত্তি করেন এবং মন্ত্রীর কাছ থেকে তাৎক্ষণিক দাবি পুরণের অঙ্গিকার চান। এসময় প্রায় ১৫ মিনিট মন্ত্রী ও শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষকদের কথা কাটাকাটি হয়। মন্ত্রীর হাত থেকে বিভক্ত শিক্ষকদের একটি সংগঠনের এক নেত্রী জুস পান করেন। এরপর শহীদ মিনার ত্যাগ করেন মন্ত্রী। তবে গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টা পর্যন্ত কিছু শিক্ষক শহীদ মিনারে অবস্থান করার খবর পাওয়া গেছে। শাহবাগ থানার কর্তব্যরত ডিউটি অফিসার দাবি করেন সাড়ে ৭টার আগেই সব শিক্ষক শহীদ মিনার এলাকা ত্যাগ করেছেন।
এদিকে মন্ত্রীর উপস্থিতিতে একজন শিক্ষক মাইক হাতে নিয়ে বলেন, আমরা অনশন ভাঙ্গি নাই। আরেকজন বলেন, ভুয়া নেতা মানি না। আন্দোলন চলছে, চলবেই বলে অনেকে স্লোগান দিতে থাকেন। এর আগে একাধিক শিক্ষক নেতা মাইকে বার বার বলছিলেন, আমাদের উপর আস্থা রাখুন। আমরা দালালি করব না। আর কেউ যদি না মানেন ৫ মিনিট সময় দিলাম, কমিটি করে সমস্যার সমাধান করেন।
শহীদ মিনারে আন্দোলনরত শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী বলেন, দাবি যৌক্তিক হলে সর্বোচ্চ মহলে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মন্ত্রীর এমন ঘোষণার পর উপস্থিত আন্দোলনরত শিক্ষকরা বলতে থাকেন মানি না মানবো না। এ সময় শিক্ষকদের মধ্যে টানটান উত্তেজনা চলে। অনশন চলছে চলবে বলে স্লোগান দেওয়া হয়।
হাতিয়া থেকে আসা শিক্ষক নূর ইসলাম বলেন, মন্ত্রী বলেছেন- আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বৈঠকের মাধ্যমে বিবেচনা করা হবে শিক্ষকদের দাবি যৌক্তিক কি-না? তিন বছর আগেও একই কথা বলেছেন। এবারও একই কথা। এটা মানা যায় না।
সিরাজদিখান থেকে আসা শিক্ষক মোবারক হোসেন বলেন, এখান থেকে সরাসরি ঘোষণা আশা করেছিলাম। কিন্তু এখনো মন্ত্রী বলেন- যৌক্তিক কি-না তা বিবেচনা করবেন। তাদের কাছে যদি এখনো যৌক্তিক না মনে হয়, তাহলে কী আলোচনা করবেন?
আশুগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা মাঠ ছাড়ব না। পলাশীর প্রান্তে জেভাবে সিরাজ উদ্দৌলা পরাজিত হয়েছেন, ঠিক সেই ভাবেই আমরা আজকে কিছু দালাল নেতাদের কাছে পরাজিত করেছি। শিক্ষক নেতারা দালালি করছে। তারা সকল শিক্ষকের সাথে বেইমানি করেছেন। তারা সরকারের দালালি করে আমাদের একা ফেলে রেখে চলে গেছেন। তারা স্রেফ দালাল।
এর মধ্যেই শিক্ষক প্রতিনিধি দলের সদস্য শাহীনুর আক্তার শিক্ষকদের আন্দোলন স্থগিত করার ঘোষণা দেন। এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষকরা বলেন, মন্ত্রীকে এখানে দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা দিতে হবে। তা না হলে আমরা ঘরে ফিরে যাবো না। আন্দোলন চালিয়ে যাব। মন্ত্রী অনশন ভাঙানোর পর অনেক শিক্ষক স্থান ত্যাগ করেন। তবে অল্প কিছু সংখ্যক শিক্ষক রয়ে যান। সোমবার সন্ধ্যায় শিক্ষকদের অনশন ভাঙানোর সময় উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব এবং প্রাথমিক অধিদফতরের মহাপরিচালক।
যে সব শর্তে আন্দোলন স্থাগিত :
শর্ত দিয়ে আন্দোলন স্থগিত করেছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। প্রাথমিকের শিক্ষক প্রতিনিধি দলের সদস্য তপন কুমার মন্ডল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। যেসব শর্তে প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে। তা হলো:
১. প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড স্থগিত। ২. নতুনভাবে একসঙ্গে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড নির্ধারণ করা হবে। ৩. প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের গ্রেডের মধ্যে যে বৈষম্য ছিল তা দূরীকরণ করা হবে। ৪. প্রাথমিকের শিক্ষক প্রতিনিধি দলের একটি কমিটি প্রাথমিক ও গণ শিক্ষামন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব ও প্রাথমিক অধিদফতরের মহাপরিচালকের দফতরে গিয়ে সমস্যাগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা করবেন।
বৈঠক শেষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকরা আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। আমি তাদের আস্থার প্রতিদান  দেবো। তিনি আরও বলেন, এই সরকারের মেয়াদকালীন সময়ের মধ্যে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেডে সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।
প্রসঙ্গত, বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবিতে গত শনিবার থেকে কে›ন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আমরণ অনশন শুরু করেন প্রাথমিকের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া অর্ধশতাধিক শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এদিকে নবগঠিত যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ.কিউ.এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রাথমিক শিক্ষকদের দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিক্ষকদের ন্যায়সংগত আন্দোলনকে খাটো করে দেখবেন না। তিনি গতকাল সোমবার বিকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আমরণ অনশনরত প্রাথমিক শিক্ষকদের দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে এ কথা বলেন।
অন্যন্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন যুক্তফ্রন্ট নেতা জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন। এ সময় যুক্তফ্রন্টের শরীক দলের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
বি. চৌধুরী সরকারের সমালোচনা করে বলেন.এ দেশে কোনো দায়বদ্ধ সরকার নেই। কারণ তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়।তিনি বলেন, এর আগে ব্যাংক থেকে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করা হয়েছে, কিন্তু অর্থ্মন্ত্রী পদত্যাগ করলেন না। শিক্ষামন্ত্রী সব মন্ত্রী এবং নিজেকে চোর বলে স্বীকারোক্তি করা সত্বেও পদত্যাগ করলেন না। আর বঙ্গবন্ধু কন্যাও তাদের কাউকে পদচ্যুত করেন না।
আসম রব শিক্ষকেদের দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে করে বলেন, যুক্তফ্রন্ট আপনাদের সঙ্গে আছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরণ অনশনরত শিক্ষকদের কারো মৃত্যু হলে সারা দেশে আগুন জ্বলবে।
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এই সরকার কয়েক বছর ধরে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি করছে। তিনি বলেন, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য সরকার চাই। যুক্তফ্রন্ট আপনাদের দাবির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করছে।আপনারা যতোদিন লড়াই করবেন আমরা ততোদিন আপনাদের সঙ্গে আছি।
এর আগে গতকাল সকাল থেকে তৃতীয় দিনের মতো শুরু হয় সহকারী শিক্ষকদের আমরণ অনশন কর্মসূচি। শিক্ষকরা ঘোষণা দেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরবেন না। এমনকি আগামী ১ জানুয়ারি বিনামূল্যের নতুন বই বিতরণ উৎসবেও তারা যোগ দেবেন না।
জাতীয় বেতন স্কেলের ১১তম গ্রেডে বেতনের দাবির এই কর্মসূচিতে বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক মহাজোটের অধীনে সহকারী শিক্ষকদের ১০টি সংগঠনের হাজার হাজার শিক্ষক দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে এ অনশনে যোগ দেন। শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে পাটি, পত্রিকা, পলিথিন বিছিয়ে পৌষের শীতের দুই রাত পার করেন মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকরা।
গত তিন দিনের টানা অনশনে অর্ধশতাধিক শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর মধ্যে বেশ কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পার্শবর্তী কয়েকটি মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ৬০ জনের মধ্যে অন্তত ২০ জন নারী শিক্ষক।
অনশনকারী শিক্ষকরা জানান, ১৯৭৩ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের এক ধাপ নিচে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা বেতন পেতেন। কিন্তু ২০০৬ সালের বেতন কাঠামোতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের সঙ্গে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের ব্যবধান বেড়ে যায় ধাপ। পরে ২০১৪ সালে এই ধাপ আরও বেড়ে যায় তিনটি। প্রধান শিক্ষকদের গ্রেড উন্নয়ন করলেও সহাকারী শিক্ষকদের গ্রেড এক ধাপও বাড়ানো হয়নি।
 বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবিতে গত শনিবার থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করছেন সহকারী শিক্ষকরা। বর্তমানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা ১৪তম গ্রেড ((মূল বেতন ১০ হাজার ২০০ টাকা) পান। অন্যদিকে, প্রধান শিক্ষকরা পান ১০ম গ্রেড (মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা)।আন্দোলনকারী শিক্ষকরা তাদের বেতন গ্রেড প্রধান শিক্ষকদের এক ধাপ নিচে ১১তম গ্রেড (১২ হাজার ৫০০ টাকা) নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক মহাজোটের উদ্যোগে এই অনশন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এতে মহাজোটের অধীনে থাকা ১০টি সংগঠনের শিক্ষকরা অংশ নিচ্ছেন। বেতন বৈষম্য নিরসনের জন্য ২০১৪ সাল থেকে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষকরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ