ঢাকা, মঙ্গলবার 26 December 2017, ১২ পৌষ ১৪২৪, ৭ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সুশিক্ষিত কামিনী হওয়ার আহবান নিয়ে বেগম রোকেয়া

মানসুরা রহমান পুন্নু : “মেয়েদের এমন শিক্ষায় শিক্ষিত করিয়া তুলিতে হইবে,যাহাতে তাহারা ভবিষ্যৎ জীবনে আর্দশ গৃহিণী, আদর্শ জননী এবং আদর্শ নারী রূপে পরিচিত হইতে পারে”।
নারীদের স্বাতন্ত্র্য অনুকরণীয় পরিচিত প্রতিষ্ঠার জন্য যিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন তিনি মুসলিম নারী আন্দোলনে পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া। তিনি শুধু সমাজ সংস্কারকই ছিলেন না একাধারে সাহিত্য রচনায় তার ছিলো দক্ষ দখল। ক্ষন জন্মা এ মহিয়সী  বাঙ্গালী সাহিত্যিক বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালের ৯  ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবান্দা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তার বাবা জহিরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের সম্ভ্রান্ত ভুস্বামী ছিলেন। তার মাতা রাহাতুন্নেসা সাবের চৌধুরানী। রোকেয়ার দুই বোন কুরিমুন্নেসা ও হুমায়রা। আর তিন ভাই যার একজন শৈশবে মারা যায়।তৎকালীন মুসলিম সমাজব্যবস্থা অনুসারে রোকেয়া ও তার বোনদের বাইরে পড়াশুনা করতে পাঠানো হয়নি।ঘরেই আরবী আর উর্দু শিখানো হতো।রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহীম সাবের আধুনিক মনস্কা লোক ছিলেন। তিনি গোপনে রোকেয়া এবং করিমুনকে ঘরে বসেই ইংরেজী ও বাংলা শিখাতেন।
১৮৯৬ সালে ১৬ বছর বয়সে ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট উর্দুভাষী ও বিপতœীক সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন বেগম রোকেয়া। বেগম রোকেয়ার স্বামী মুক্তমনা মানুষ ছিলেন।তিনি রোকেয়াকে লেখালেখি করতে উৎসাহিত করেন। এতে করে বেগম রোকেয়া বাংলা ও ইংরেজী আরো ভালো করে আয়ত্ত করে নেন।তখন থেকেই স্কুল তৈরীর জন্য অর্থ জমাতে থাকেন।বিয়ের মাত্র ১৩ বছর পরে ১৯০৯ সালে স্বামী সাখাওয়াত হোসেন মারা যান।বেগম রোকেয়া হয়ে গেলেন   নিঃসঙ্গ।এসময় তিনি সমাজসেবা ও সমাজে নারী শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন।
স্বামীর মৃত্যুর পাঁচ মাস পরে স্বামীর জন্মস্থান ভাগলপুরে “সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল” নামে একটি মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন বেগম রোকেয়া।১৯১০ সালে সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলা হওয়ার কারণে তিনি কলকাতা চলে যান। ১৯১১ সালে ১৫ই মার্চ তিনি কলকাতায় স্কুলটি পুনরায় চালু করেন। বর্তমানে স্কুলটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার কর্তৃক পরিচালিত। ৮জন ছাএী নিয়ে যাত্রা শুরু করে স্কুল।৪ বছরের মধ্যে যার ছাত্রী সংখ্যা দাড়ায় ৮৪ তে। ১৯৩০ সালে পরিনত হয় হাইস্কুলে।১৯১৬ সালে তিনি মুসলিম বাঙ্গালি নারীদের সংগঠন “আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম” প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯০২ সালে পিপাসা নামে একটি বাংলা গল্পের মধ্য দিয়ে তিনি সাহিত্য জগতে পদার্পন  করেন।কী সাহস ছিল এই নারীর! সমাজের কঠিন কঠিন শৃঙ্খল কতইনা কঠিন যুদ্ধ করে ভেঙ্গেছেন। কত সহনশীলতা, সহ্যশক্তি দেখিয়েছেন নারী জাগরণের এই অগ্রদূত।
বেগম রোকেয়া তার নিরীহ বাঙ্গালি প্রবন্ধে লিখেছেন,কুসুমের সৌকুমার্য, চন্দ্রের চন্দ্রিকা, মধুর মাধুরী, যূথিকার সৌরভ, সুপ্তির নীরবতা, ভূধরের অচলতা, নবনীর কোমলতা, সলিলের তরলতা এক কথায় বিশ্বজগতের সমুদয় সৌন্দর্য ও স্নিগ্ধতা লইয়া বাঙ্গালি গঠিত হইয়াছে।এখানে বাঙ্গালি বলতে নারীদেরকে বুঝিয়েছেন এই মহিয়সী।এই অনুপম উপমাই প্রমান করে তিনি বাঙ্গালি নারীদের নিয়ে কতটা স্বপ্নময়ী এবং চিন্তিত ছিলেন।
বিশ শতকের নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া বাঙ্গালি নারী সমাজকে জাগিয়ে তোলার ব্রত নিয়েই সাহিত্যচর্চায় যুক্ত হয়েছিলেন।সমাজের প্রচলিত কুসংস্কারকে সবার কাছে পৌছানোর দায়িত্ব নেন তিনি।তিনি মনে করতেন সামাজিক এবং জাতিগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারী বা পুরুষের একক শক্তি যথেষ্ট নয় উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব।বাঙ্গালি নারী সমাজের স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য তিনি সর্বাগ্রে শিক্ষার্জনের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। স্ত্রী শিক্ষা বলতে বেগম রোকেয়া বুঝিয়েছেন মানুষের স্বাভাবিক  জ্ঞান বা ক্ষমতাকে অনুশীলন দ্বারা বৃদ্ধি করা। তিনি শিক্ষা অর্থে কোনো সম্প্রদায় বা জাতি বিশেষের অন্ধ অনুকরণ কে বুঝাননি।বরং সে  শিক্ষা নারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা বোধ জাগ্রত করবে।বেগম রোকেয়া জানান “শিক্ষা অর্থে আমি প্রকৃত সুশিক্ষার কথাই বলি। গোটা কতক পুস্তক পাঠ করিতে বা দু’দত্র  কবিতা লিখতে পারা শিক্ষা নয়। আমি চাই সেই শিক্ষা যাহা তাহাদিগকে নাগরিক অধিকার লাভে ক্ষমা করিবে”
বেগম রোকেয়া মনে করেন নারী সমাজকে যে পর্দায় আবদ্ধ রেখেছে তা যতটা নৈতিকতার চেয়ে বেশি বন্দীত্ব। তার মতে পর্দা প্রথা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য তবে বন্দীত্ব নয়।
“বোরকা” প্রবন্ধে তিনি পর্দার বিরোধিতা করেননি। কারণ পর্দার সাথে উন্নতির কোন বিরোধিতা নেই। উন্নতির জন্য প্রয়োজন উচ্চশিক্ষা। রোকেয়া বলেন- “আমরা অন্যায় পর্দা ছাড়িয়া আবশ্যকীয় পর্দা রাখিব”
রোকেয়া মেয়েদের জন্য স্বতান্ত্র স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং নারীদের স্বতন্ত্র স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য জোরালো বক্তব্য প্রদান করেন।
‘অর্ধাঙ্গী’ প্রবন্ধে বেগম রোকেয়া নারীর প্রকৃত অবস্থার উন্নতির জন্য মানসিক দাসত্ব মুক্তির উপর জোর দিয়েছেন। যে সমাজে স্ত্রী লোক তার আপন ইচ্ছা শক্তি প্রয়োগের অধিকারী নয়। পর্দাপ্রথা থাক বা নাই থাক নারী সেখানে আসলে পুরুষেরই অধীন।এ প্রসঙ্গে তিনি পার্সি মহিলাদের অবস্থার কথা উল্লেখ করে বলেন-এখন পার্সি মহিলাদের পর্দামোচন হইয়াছে কি? অবশ্যই হয় নাই।নারী মুক্তির জন্য তিনি মানসিক মুক্তিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।
বেগম রোকেয়া তার স্ত্রী জাতির অবনতি, সুবেহ সাদেক,নারীস্থান নামক প্রবন্ধে নারীদের উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নির্ণয় করেন। মতিচুব, অবরোধবাসিনী, তার গ্রন্থ। ১৯০৫ সালে তিনি “Sultan’s Dream’’ লেখা শেষ করেন। পরবর্তী তে এটি সুলতানার স্বপ্ন নামে  বাংলায় প্রকাশিত হয়।এটি তার বিখ্যাত গ্রন্থ। এছাড়াও তিনি অসংখ্য রচনা ও প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।
আমরা সমাজেরই অর্ধ অঙ্গ আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কি রূপে? বেগম রোকেয়ার দুশ্চিন্তা এমনই ছিলো।সেসময়ে কুরআন শিক্ষা ছাড়া সব ধরনের শিক্ষা নিষিদ্ধ ছিল। নারীদেরকে অন্য নারীর সাথে পর্দা করতে হতো।নিজেকে দিয়ে সব নারীকে উপলব্ধি করেছেন তিনি।নারীরা সব রকম জ্ঞান থেকে ছিলো বঞ্চিত।
রোকেয়ার মনে সর্বদা এই প্রশ্ন ঘুরতে থাকতো যে, নারী - পুরুষের লৈঙ্গিক ভিন্নতা থাকলেও সৃষ্টির উদ্দেশ্য তো এক।তবে কেনো এতো বিভেদ!!!
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় প্রান্তেই নারীর অধিকার ও নারী মুক্তির কথা শোনা যায়।কিন্তু বেগম রোকেয়ার নারী মুক্তি আর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মুক্তির ডাকে বিস্তর ফারাক লক্ষণীয়। তার ভাবনা ছিলো একজন নারীকে পূর্ণাঙ্গ রুপে গড়ে তোলা।
তার সম্পর্কে বাংলা পিডিয়াতে বলা হয়েছে-
“She spoke against the abuse of religious regulations that arrested the physical mental and phsy-chological graeth of women in all most all her writing.”
অন্য দিকে পাশ্চাত্য নারী মুক্তি সম্পর্কে Oxford Dictionary তে বলা হয়েছে “The freedom of women to have the same social and economic rights as men’’
রোকেয়া বুঝতে পেরেছেন নারী জাতির অবনতির মুলে রয়েছে অজ্ঞাত। শিক্ষাই এ অবনতি ও সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি দিতে পারে,এই শিক্ষা অর্জনের জন্য দরকার বৈষয়িক শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয়। কচু পাতায় যতই পানি রাখুক তা যেমন কখনো ভিজবে না।তেমনি নৈতিক  শিক্ষা ছাড়া আধুনিক শিক্ষা কোন কাজেই আসবে না। তাই মুসলিম বালিকাদের প্রাথমিক শিক্ষার সাথে অর্থসহ কুরআন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও তিনি অনুধাবন করেছেন। বেগম রোকেয়া নারীদেরকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন।
আমরা জোড়া অলংকার রুপে লোহার সিন্ধুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই। সকলে সমস্বরে বলো আমরামানুষ। (সুবহে সাদেক)
জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে জানা যায়, পিতা- মাতার বৈশিষ্ট্যই সন্তান বেশি পায়। নেপোলিয়ান সেটাই বলেছেন- “Give me an educated mother, I will give you a good nation’’
রোকেয়া “সুগৃহিণী” প্রবন্ধে বলেছেন- সন্তান পালনের নিমিত্ত বিদ্যা বুদ্ধি চাই, যেহেতু মাতাই আমাদের প্রথম, প্রধান ও প্রকৃত শিক্ষায়িত্রী।
তিনি আরো বলেন-“প্রতি ফোঁটা দুগ্ধের সহিত মাতার মনোগত ভাব শিশুর মনে প্রবেশ করে”।
তাই তিনি নারী জাতিকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে সমাজকে আলোকিত করতে চেয়েছিলেন। নারী শিক্ষা, নারী সমিতি এবং নারীদের জেগে ওঠার জন্য সহজ সরল ভাষায় সাহিত্য ও রচনা করেছেন।
পাশ্চাত্য নারী জাগরণের অগ্রদূত মেরী ওলস্টোন ক্রাফ্ট (১৭৫৭-১৭৯৭) এর সঙ্গে রোকেয়ার নারীদের দর্শন কে তুলনা করা হয়।এ মহিয়সী নারী ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর দুনিয়া ত্যাগ করেন।মৃত্যু পর্যন্ত তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করে যান।আজকের সময়ে এসে আমরা বেগম রোকেয়ার মানসিকতাকে ভুল ভাবে প্রভাবিত করছি।ইসলাম নারীকে যেভাবে সম্মানিত করেছে তা পৃথিবীতে সমস্ত ধর্মের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়ার মতো।
খ্রিষ্টান ধর্ম বলে - নারীরা নরকের দ্বার,
বৌদ্ধরা বলে - সকল পাপের মূলে নারী,
হিন্দু ধর্ম - নারীদের কোন উত্তরাধিকার নেই,
গ্রিক ধর্ম - নারীরা শয়তানের প্রতিভূ। আর ইসলাম সেখানে পৃথিবীকে আশ্চর্য করে দিয়ে ঘোষণা দেয় মায়ের পায়ের নিচে বেহেশত/স্বর্গ। তোমরা তোমাদের নারীদের গালি দিয়োনা।কারণ আমি মোহাম্মদ কন্যা সন্তানের পিতা। শুধু একবার নয় তিন তিন বার মায়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে চতুর্থ বার বাবার কথা বলেছে ইসলাম। দিয়েছে সম্পত্তির উত্তরধিকার এবং মোহরানার মতো সম্মানীয় মর্যাদা। ইসলামে নারীরা জিহাদে অংশগ্রহণ করে যেমন সফল হয়েছে, তেমনি গৃহের মধ্যেও তারা সমানভাবে সফলতা হাসিল করেছেন। যার স্বরূপ তারা পরকালীন জীবনে উত্তম প্রতিদান অর্জন করতে সক্ষম হবেন।
“একা কখনো হয় না কে জয়ী পুরুষের তরবারি, শক্তি দিয়েছে প্রেরণা দিয়েছে বিজয়িনী লক্ষী নারী”
“সংসার সুখের হয় রমণীর গুনে,
গুনবান পতি যদি থাকে তার সনে”
এভাবেই তাবত পৃথিবীর ইতিহাসে নারীর মর্যাদা উদ্ভাষিত হয়েছে,প্রমাণিত হয়েছে নারীর গুরুত্ব।
বেগম রোকেয়া যে স্বপ্নের বীজ বুনে গেছেন,সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি আজো। এখনো নারীরা তাদের নিজস্ব অংগনে আদর্শের ছাপ ফেলতে পারেন নি। দিকভ্রান্ত হয়ে তারা ছুটছে দিকবিদিক, ভ্রষ্ট হচ্ছে তাদের লক্ষ-উদ্দেশ্য। এ চলতে থাকার ধারা অব্যাহত থাকলে নারী হারাবে তার যোগ্য সম্মান, ভূলুন্ঠিত হবে তার আত্মমর্যাদা। অপমানিত হবে তার মাতৃত্ব। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে গোটা নারী জাতিকে।
সচেতনভাবে নিজেদের আত্মসম্মান প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
চাঁদ-সূর্যের পালাবদলের মাধ্যমেই
প্রত্যেক নারী স্ব-স্ব গৃহে আপাদমস্তক আদর্শ নারী হিসাবে আবির্ভাব ঘটাবে সেই প্রত্যাশায়.......

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ