ঢাকা, বুধবার 27 December 2017, ১৩ পৌষ ১৪২৪, ৮ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিবর্তনের ধারায় বাংলার সংস্কৃতি

সুহৃদ আকবর : মানুষ পরিবর্তনশীল। মরণশীল। তেমনি প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্যও পরিবর্তন হয়। এই ধরুন অনেকদিন পর শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে গেলে আপনি দেখবেন অনেক পরিবর্তনের ছোঁয়া। যে পুকুর ঘাটে আপনি আপনার বন্ধুদের সাথে হৈ হুল্লোড় করে গোসল করতেন তার পাড়ের কদম গাছটি এখন আর নেই। কাল বৈশাখীর ঝড়ে ভেঙে পড়েছে। নানার বাড়িতে গিয়ে দেখবেন ঘরের সামনের কাঁঠাল গাছটি কেটে ফেলা হয়েছে। স্কুলে পড়ুয়া বন্ধু চটপটে রতন, যে সারাক্ষণ সবাইকে হাসাতো। তার মুখে দেখবেন দুশ্চিন্তার ছাপ। সবকিছু বোধহয় এভাবে পরিবর্তন হয়ে যায়। পরিবর্তন হওয়াটাই মানুষ আর প্রকৃতির নিয়ম। এমন করে প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশের পরিবেশ প্রতিবেশ পরিবর্তন হয়ে যায়। সংস্কৃতিতেও তার ব্যতিক্রম ঘটে না। বর্তমানে প্রযুক্তির উন্নতির ফলে পরিবর্তনটা একটু তাড়াতাড়ি হচ্ছে। পুরনোর স্থান দখল করেছে নতুন নতুন মাধ্যম। কলেরগান, পালাগান ও পুঁথি প্রসঙ্গ স্মরণ করা যেতে পারে।
আমায় এত রাতে কেন ডাক দিলি
আমার গলার হার খুইলা নে ওগো ললিতে
এ হার পরে আর লাভ কি হবে সখী বন্ধু নাই মোর ব্রজেতে।
আমায় এত রাতে কেন ডাক দিলি, প্রাণ কোকিলারে...
নিভিয়াছিলো মনের আগুন জ্বালাইয়া দিলি, প্রাণ কোকিলারে।

এক সময়, যখন এত ধরনের সংস্কৃতির প্রচলন হয়নি; তখন মানুষরা কোন এক পূর্ণিমা রাতে, কনকনে শীতের রাতে গ্রামের ধানকাটা জমিতে, অথবা কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে কলের গানের আয়োজন করতো। তখন আমাদের বাপ-চাচারা মোহিত হয়ে গান শুনতো। আঙুর বালা, আব্বাস উদ্দিন, কে মল্লিক, আব্দুল আলিমসহ বিখ্যাত শিল্পিদের গান মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতো। তাদের দরদ ভরা কন্ঠ, সবার মনে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দিত। আবার কখনো বা অশ্রুপাত ও ঘটতো। এখানেই কলের গানের সার্থকতা নিহিত।
এক সময় কলের গান শুধু উপমহাদেশে নয় সমগ্র বিশ্বে এর প্রচলন ছিল। সঙ্গীত অঙ্গনে কলের গানের অবদান অপরিসীম। বর্তমানে সঙ্গীত শিল্পের উৎকর্ষতার যুগে ও কলের গানের অবদানকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। কলের গানকে গান সভ্যতার আদি অনুষঙ্গ বলা হয়। তবে ১৮৭৮ সালের পূর্ব পর্যন্ত একে ধরে রাখা বা স্থানান্তরের উপায় ছিল না। ১৮৮৭ সাল কলের গানের মূল সূত্রটি আবিষ্কার করেন বিখ্যাত মার্কিন বিজ্ঞানী থমাস আলভা এডিসন।  ১৯২৭ সালে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম যিনি রেকর্ড চালু করেন তিনি হলেন, কোম্পানি মাস্টার্স ভয়েস। এরপর ১৯৫৪ সাল পাকিস্তানে এটি চালু হয়। এরপর কালের পথ পরিক্রমায় ১৯৭০ সাল বাংলাদেশে। ১৯৭০ সালে গ্রামোফোন  কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম রেকর্ড বেরোয় শিল্পী আব্দুল আলীমের গানের।
কলের গান চালু করার সময় বাস ট্রাকের মতো হ্যান্ডেল দিয়ে চাবি দিতে হত। রেকর্ড কিনতে হতো আলাদা ২ থেকে ৩ টাকা দিয়ে। এমন এমন কলের গান আছে যা শুনে  হৃদয় বিগলিত হয় চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়। যেমন-

শুনো মুমিন মুসলমান করি আমি নিবেদন
এ দুনিয়া ফানা হবে জেনে জেনো না।

পালাগান আবহমান বাংলার আর এক সংস্কৃতির নাম। এটি পুরোপুরি এখনো বিলুপ্ত হয়নি। এখনো গ্রাম-গঞ্জ, শহরে পালাগানের আসর বসতে দেখা যায়। পালাগান কাহিনী নির্ভর। এটাকে আধুনিক উপন্যাসের পদ্যবন্ধ বলা যেতে পারে। পালাগানে নায়ক-নায়িকা থাকে। এটি অধিকাংশ সময়ে রূপকথার আজগুবি উপাখ্যানে ভরা থাকে। কিন্তু এটি ইতিহাস নির্ভর। পালাগানের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গবেষক আব্দুল কাদির মন্তব্য করেন- যে সমাজ ব্যবস্থায় এ সকল গাঁথার উদ্ভব বা সর্বত্রই সামন্ত্রতান্ত্রিক। সামন্ত্র যুগের লোক সংস্কার ও সামাজ শাসন, বিষয়বুদ্ধি ও নীতিবোধ, দেশাচার ও ধর্মভয় এ সকল লোকপ্রিয় সৃষ্টিশীল শিল্পে সুরময় বাণী রূপ লাভ করেছে। সংসারের সুখ-দুঃখ, হে-বঞ্চনা, ত্যাগ-ক্ষোভ, সমাজের বিধি-নিষেধ ও নিগ্রহ, প্রবলের পীড়ন ও শোষণ এ সবের সরল ও সহজ স্বভাবিক ছবি গাঁথাগুলিতে রেখায়িত হয়েছে।”
পালাগান যেমনি ভাবে বাংলাদেশে জনপ্রিয় ঠিক তেমনি ভাবে বিশ্বের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ও এর ব্যাপক কদর রয়েছে। ইংরেজী সাহিত্যে যাকে (Ballad) বলে। সে সব দেশে এক সময় বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে এটি গীত হত। প্রাচীন রাশিয়ায় পালাগানের কথকদেরকে বলা হত বয়াতী। আমাদের বাংলাদেশে ও গাঁথা গানের রচয়িতাদেরকে বয়াতী বলা হয়ে থাকে।  যেমন, দেওয়ান মদিনা পালার রচয়িতা মনসুর বয়াতী। দেওয়াত ঈশা খাঁ পালার রচয়িতা আব্দুল করিম বয়াতী। তবে অধিকাংশ পালার রচয়িতার নাম জানা এখনো পর্যন্ত সম্ভব হয়নি।
দীনেশ চন্দ্র সেন মৈমনসিং গীতিকা প্রকাশ করেছেন। যা বাংলা সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ। আর সিলেট অঞ্চলের লোকগাঁথার সংগ্রহে মোহাম্মদ আশরাফ হোসেনের অবদান অপরিসীম। তিনিই প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন। আর চৌধুরী গোলাম আকবর সংগ্রহ করেন অনেকগুলো পালা।
১৯৬৮ সালে সিলেট গীতিকা প্রকাশিত হয়। মোট ৪৬২ পৃষ্ঠার দশটি গীতিকা এতে মুদ্রিত ছিল। চান্দররাজা, তিলাইরাজা, কাল দুলাই, মনি বিবি, রঙ্গমালা, সুরতজান বিবি, আলীপজান সুন্দরী, সোনামতি কন্যা, জমির সদাগর ও পাঁচ হাতনো। সুন্দরী নায়িকাদের রূপ বর্ণনায় অসাধারণ পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছেন পালাকাররা। একটি নমুনা তুলে ধরা হল আলীপজান সুন্দরী থেকে।

আচানক সুন্দর কন্যার দুই চখুর তেরা
চখুর দুই ভুরু যেমন ধনুকর ধরা।
এক এক ঠোঁট যেমন হপরী কদুর বাঁক
ধনেশ পাখির ঠোঁট যেন আলীপজানর নাক।

পুঁথি সাহিত্য বাংলা সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র। গ্রাম বাংলার এমন পরিবার পাওয়া যাবে না যেখানে বা যে ঘরে দুই বা তিনটা পুঁথি পাওয়া যাবে না। পুঁথি সাহিত্যের প্রচলন সেই ১৬৫০ সাল থেকে। গবেষকরা এর আগের পুঁথির ও সন্ধান পেয়েছেন। কিন্তু ১৬৫০ সালে এটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। শাহ গরীবুল্লাহ এই সময় রচনা করলেন তাঁর বিখ্যাত আমীর হামজা, ইউসুফ জুলেখা এবং জঙ্গনামা পুঁথি। সৈয়দ হামজার জৈগুন বিবি, হাতিম তাই। মালে মুহাম্মদ এর সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামান।
সিলেট অঞ্চলের কবি সাদেক আলী পুঁথি সাহিত্যের সর্বাধিক পরিচিত ও জনপ্রিয় ব্যাক্তিত্ব। তাঁর রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, হালতুন্নবী, মহব্বত নামা ও হাশর মিছিলসহ আরো অনেক পুঁথি তিনি রচনা করে পুঁথি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।
জোলেখা বসিয়া কান্দে   কেশ বেশ নাহি বান্ধে
                নাহি দেয় মাথার বসন।
এসেছিল কোন জনা      রূপ যেন কাঁচা সোনা
                 দেখে রূপ মন উচাটন।
হায়রে দারুণ নিধি       হারাইনু প্রাণ নিধি
             হারাইনু রূপুর মুনিয়া।
জঙ্গনামা কাব্যে বলা হয়েছে-
আসমান জমিন আদি পাহাড় বাগান
কান্দিয়া অস্থির হইল কারবালার ময়দান।
পুঁথির ভাষা মিশেল -দো ভাষী । সকল ভাষার শব্দ  এতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে না। না হয় পুঁথি জমে না। মানে হৃদয়গ্রাহী হয় না। দর্শক মোহিত হয় না। তাই পুঁথির ভাষার একাধারে বাংলা ছাড়া ও উর্দু, আরবি, ফারসি ও আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ যথার্থই বলেছেন যে, ’পলাশীর বিপর্যয় ১৭৫৭ সালে না ঘটলে পুঁথির এ ভাষাই হতো আমাদের সহিত্যের ভাষা’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ