ঢাকা, বুধবার 27 December 2017, ১৩ পৌষ ১৪২৪, ৮ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

১৫০ বছর পরও দৃষ্টিনন্দন প্রথম মুসলিম মহিলা কবি ফয়জুন্নেছার নবাববাড়ি

আজিম উল্যাহ হানিফ : উপমহাদেশ তথা এশিয়ার একমাত্র মহিলা নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর বাড়িটি অবহেলায় পড়ে থেকে স্বকীয়তা হারাচ্ছে। অথচ সরকারিভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলে মরণোত্তর একুশে পদক বিজয়ী এই মহীয়সী নারীর বাড়িটি হতে পারে আকর্ষণীয় একটি পর্যটনকেন্দ্র। প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় নিয়ে বাড়িটিকে ‘নবাব ফয়জুন্নেছা জাদুঘর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি এলাকাবাসীর।  
আধুনিক নির্মাণশৈলীতে গড়া বাড়িটিতে রয়েছে স্থাপত্যকলার সব অপূর্ব নিদর্শন। সিমেন্ট, রড, চুন ও সুড়কির সমন্বয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন বাড়িটি দেখার জন্য প্রতিদিন শত শত পর্যটকের সমাগম ঘটে। কালের বিবর্তনে নবাব ফয়জুন্নেছার স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি নবাববাড়ি হিসেবে দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। কুমিল্লার লাকসাম উপজেলা সদরের পশ্চিমগাঁও এলাকায় ডাকাতিয়া নদীর তীরে মনোরম পরিবেশে বড়িটি নির্মাণ করেন নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী। জনশ্রুতি আছে সাড়ে তিন একর জমিতে নিজের বিয়ের কাবিনের ১ লাখ ১ টাকা ব্যয়ে বাড়িটি নির্মাণ করেন তিনি। এর সঠিক নির্মাণ-সাল নিয়ে মতান্তর থাকলেও ধারণা করা হয়, বিয়ের ১৭ বছর পর ১৮৫১ সালে এ বাড়িটি নির্মাণকাজ শুরু করা হয়। এতে সময় লাগে প্রায় তিন বছর।
 নবাব ফয়জুন্নেছা নারী জাগরণের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বেগম রোকেয়ার জন্মের ৪৬ বছর আগে লাকসামের পশ্চিমগাঁও এলাকায় ১৮৩৪ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মহীয়সী নারী হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বেগম  রোকেয়ার জন্মের সাত বছর আগে ১৮৭৩ সালে নারী মুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত হিসেবে নবাব ফয়জুন্নেছা  চৌধুরানী নারীদের জন্য কুমিল্লা শহরের বাদুড়তলায় প্রতিষ্ঠা করেন ফয়জুন্নেছা উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়, যা বর্তমানে নবাব ফয়জুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিত। সমাজসেবার পাশাপাশি ‘রূপজালাল’ নামে কাব্যগ্রন্থ রচনা করে বাংলা সাহিত্যে ব্যপক সাড়া জাগান তিনি। ১৮৭৬ সালে ‘রূপজালাল’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়, যা কোনো বাঙালি লেখিকা কিংবা কবির প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ। সে কারণে তাকে বাঙালি নারী কবি ও লেখিকাদের অগ্রদূত বলা হয়ে থাকে। এ ছাড়া ‘সঙ্গীতসার’ ও ‘সঙ্গীত লহরী’ নামে ফয়জুন্নেছার আরও দুটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। ‘রূপজালাল’ গ্রন্থটি বেগম রোকেয়ার জন্মের সাত বছর আগে প্রকাশ হয়। ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায়, নবাব ফয়জুন্নেছা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সৌদি আরবে পবিত্র হজ্বে গিয়ে যাতে বাঙালি হাজিদের সমস্যা না হয়, সেজন্য মক্কা শরিফে মুসাফিরখানা ও মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন।
এ ছাড়া নিজের প্রজাস্বত্ব¡ এলাকায় ফয়জুন্নেছা রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট, মসজিদ-মাদ্রাসা, দুটি বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি এলাকার উন্নয়ন কর্মকান্ডে অবদান রাখেন তিনি। যে সময় পুরুষ জমিদারদের কেউ  কেউ রঙ্গশালা নিয়ে পড়ে থাকতেন আমোদ-ফুর্তিতে; আর প্রজা-শোষণের দৃষ্টান্ত দেখাতেন, সেই সময় নবাব ফয়জুন্নেছা নিজেকে উৎসর্গ করেন প্রজাহিতকর কাজে। ২০০৪ সালে এই মহীয়সী নারীকে যৌথভাবে দেওয়া হয় মরণোত্তর একুশে পদক। নারী জাগরণের উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে বাংলাদেশ তথা সমগ্র এশিয়ায় ফয়জুন্নেছার সুনাম ছড়িয়ে রয়েছে।
তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের রানি নবাব ফয়জুন্নেছাকে বেগম উপাধিতে ভূষিত করেন। মুসলিম নারী হিসেবে এমনিতেই বেগম উপাধি থাকায় তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরে প্রজাবান্ধব জমিদারির কারণে রানি তাকে নবাব উপাধি দেন। তৎকালীন সময়ে তিনিই ছিলেন এশিয়া তথা উপমহাদেশের একমাত্র মহিলা নবাব। নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর স্মৃতিবিজড়িত লাকসামের ঐতিহাসিক নবাববাড়িকে ঘিরে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কালের সাক্ষী এই বাড়িটি সংস্কার করা হলে এটি হয়ে উঠবে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অন্যতম দর্শনীয় স্থান।
এ বাড়িটিকে নবাব ফয়জুন্নেছা জাদুঘরে রূপ দিলে নতুন প্রজন্ম জানার সুযোগ পাবে এক প্রজাবান্ধব জমিদারের জনহিত কর্মযজ্ঞ। নবাব ফয়জুন্নেছা অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন। তিনি পর্দার আড়াল থেকে যাবতীয় জনকল্যাণমূলক কাজ পরিচালনা করতেন। বাড়ির পাশে রয়েছে তার নির্মিত দৃষ্টিনন্দন দশ গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ।
১৯০৩ সালের অক্টোবর মাসে ও ১৩১০ বঙ্গাব্দের ২০ আশ্বিন নবাব ফয়জুন্নেছা ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে বাড়িটি তিনি সরকারের কাছে ওয়াক্ফ করে যান। বর্তমানে বাড়িটিতে বসবাস করেন তার কয়েকজন উত্তরাধিকারী।
বাড়িটিতে নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর স্মৃতি সংরক্ষণ করে জাদুঘর করা হলে বাড়িটি হতে পারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ