ঢাকা, শুক্রবার 29 December 2017, ১৫ পৌষ ১৪২৪, ১০ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চিত্রা এক্সপ্রেস

মোহাম্মদ অয়েজুল হক : ট্রেনে চড়তে খারাপ লাগে না হাসানের। ঝকর মকর ছন্দের তালে তালে এগিয়ে যাওয়া ট্রেনের জ্বানালায় ঠেস দিয়ে বসে বিগত দু’বছরের কথা ভাবে। গোটা জীবন   যেখানে বৈচিত্র্যময় সেখানে জীবনের কিছু অধ্যায় আরও  বেশি অদ্ভুত, বৈচিত্র্যময়। জীবন কি! জীবন হলো অনুভূতির বিলাসিতা, আর অনুভূতি হলো মরুভূমির মরীচিকা।

-কই যাবেন?

পাশের লোকের কথায় চিন্তায় ছেদ পড়ে। পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের যুবক, চেহারায় কিছুটা রুক্ষতার ছোঁয়া। নেতা টাহপের কিছু হতে পারে। হাসানের মেজাজ খারাপ হয়। আজকাল মানুষের ভাল কথাও ভাল ভাবে গ্রহণ করতে পারছে না। মেজাজটা খিটখিটে হয়ে গেছে।

-বুধে যাবো।

-মানে! লোকটা ভ্রু কুঁচকায়।

- মানে আর কি, সব মানুষ তো মঙ্গলে যায়, বুধকে নিয়ে কারও  আগ্রহ আছে! কারও কোনো মাথা ব্যথা নেই। আমার আছে। আমি বুধে যাচ্ছি। বুধ গ্রহ।

যুবকটা ফ্যালফ্যাল করে তাকায়।হাসানের আগামাথা, ওপর থেকে নিচ ভাল করে তাকিয়ে দেখে। একটু সময় পরই বলে ওঠে, স্যার, এ ট্রেন তো ঢাকার ট্রেন।

-হ্যা, ঢাকার ট্রেন।

- বুধে যাবেন কিভাবে?

- ঢাকা থেকে ইন্ডিয়া যাবো।ইন্ডিয়া স্যাটেলাইট পাঠাবে মহাকাশে, সেই স্যাটেলাইটে ঝুলে যতদূর যাওয়া যায় যাবো,তারপর বুধ গ্রহের কোন যান পেলে সেখান থেকে চলে যাব সরাসরি বুধে। বুঝলেন।

- জ্বি, বুঝেছি। ঘাড় নাড়ে যুবক ছেলেটা।

কথা শেষ হয় না একজন ভদ্রলোক বেশ ভিড় ঠেলে হাসানের পাশে এসে দাঁড়ায়। মাঝারি গড়ন। হালকা শরীরের চল্লিশোর্ধ মানুষ। ট্রেনে সাধারণত এতো ভিড় হয়না, আজ কেন জানি অনেক ভিড়। অনেক মানুষ।

-দেখি টিকিট দেখান? হাসান টিকিট খোঁজে। পকেটেই ছিল। নাহ পকেটে টিকিট নেই। 

-স্যার, টিকিটটা হয়তো পড়ে গেছে।

- মানে! 

- বাথরুমে পড়ে যেতে পারে।

- ফাজলামি বাদ দিন, টিকিট দেখান নাহলে টাকা দিন।

এদের সাথে কথা বলে কোন লাভ হবে না। হাসান পকেট থেকে টাকা বের করে দেয়। কিন্তু টিকিট টা যাবে কোথায়। বাথরুমে খোঁজা দরকার। যদি টিকিট দেখিয়ে টাকাটা ফেরত নেয় যায়।নিজের আসন ছেড়ে বাথরুমের দিকে ছোটে। বাথরুমের সামনে যেতেই হাসান ভড়কে যায়। ভুল দেখছে না তো সে! চোখ কচলায়, আবার তাকায় আবার, হ্যাঁ, তাপসীই। ঠিক চার বছর আগে বাসস্ট্যান্ডে দেখা, আজ চার বছর পর দেখা ট্রেনের ভেতর। মাঝখানে চারটা বছর। বছর কি! কে বানিয়েছে? হয়তো মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে সময়ের স্তপ কে সাজিয়েছে বছর, মাস, সপ্তাহ দিন দিয়ে। সেগুলো কখনো সুখের, কখনো দুঃখের তিক্ত অভিজ্ঞতায় ভরা।  সময় কি? হাসানের মাথাটা ঘুরে ওঠে। এতোসব আজেবাজে প্রশ্ন আজকাল মাথায় আসে, কেন আসে!

হাসানের জীবনটা তো ভালই চলছিল। একটা ছোট চাকরি। বাবা-মা, ভাই-বোনের সংসারে অনেক কিছু প্রাপ্তির অভাব থাকলেও সেগুলো নিয়ে ভুগতে হয়নি। বুকের ভেতর ক্ষত হয়নি। জীবনটা  ওলট-পালট হয়নি।তাপসী একটা মেয়ে, কেন এসেছিল? প্রথম দেখাতেই বা কেন ভাল লেগেছিল ঠিক ওরকম।হাসান তো জানতো না তার বাবার অনেক ক্ষমতা, অনেক ধনী। 

-ম্যাডাম। পেছনের ডাক শুনে ভড়কে পেছনে ফেরে মেয়েটা।

হাসান হাসে। - আমি হাসান।

-জ্বি, আপনি হাসান। কিছু বলবেন।

বাসস্ট্যান্ডে অনেক মানুষের আনাগোনা।সবাই ছুটছে, ভিন্ন ভিন্ন, মানুষ প্রতিটি মানুষের ভিন্ন ভিন্ন কাজ।

-আপনি না অনেক সুন্দর।

তাপসী কেন যেন রাগ করেনা। মুখে হাসি টেনে বলে, তাই নাকি?

-জ্বি।

- তা একথাটা এ পযর্ন্ত কতোজনকে বলেছেন?

হাসান শব্দ করে হাসে। হা হা হা। আশেপাশের চলন্ত মানুষ গুলো চলার ফাঁকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখে। 

- আমার বন্ধুরা আমাকে হিজরা বলে। কেন বলে জানেন?

- কেন? প্রশ্ন করে তাপসী।

- প্রেম করি না তাই।

- আমার সাথে প্রেম করবেন? তাপসীর প্রশ্নে অবাক হয় হাসান। 

বুকের ভেতর মোচড় দেয়। কিছু ব্যথা, কিছু আনন্দ একসাথে মিশে হঠাৎ হাসানকে শান্ত আর নির্জীব করে দেয়।– হ্যাঁ, করবো। ঘাড় নাড়ে হাসান।

-বিয়ে করবেন?

-হ্যাঁ।

-তাহলে চলুন।

সত্যি সত্যিই হাসান আর তাপসীর বিয়ে হয়! বিষয়টা মাস খানেক গোপন থাকেনি।তাপসীর ধনী বাবা হাসানের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানকে কিভাবে জামাই হিসাবে মেনে নেন? তাপসীকে আর দেখা যায় না, ফোন বন্ধ।হাসান দিকবিদিক পাগলের মতো ঘুরে বেড়ায়। রাতের বেলা রাস্তা ধরে হাঁটে, যেন এক নিশাচর উন্মাদ। জ্যোৎস্না রাতে সেদিন খোলা মাঠে বসেছিল হাসান, চাঁদের ভেতর কি তাপসী বসা! আবছা কালো কালো!একটা গাড়ির কড়া ব্রেকের ক্যাচ ক্যাচ শব্দে হাসান রাস্তার দিকে ফিরে তাকায়। কায়েক জন লোক তার দিকে জোর পায়ে হেঁটে আসে।

আপনি হাসান? সব ক’জন পুলিশ। 

-জ্বি।

- তাপসীকে বিয়ে করেছেন?

- হ্যাঁ। হাসান ঘাড় নাড়ে। কথা শেষ হতেই কয়েকজন হাসানকে শক্ত করে ধরে। যেন একটা চোর ধরছে। চোর পেয়েছে।

হাসানকে থানা পুলিশ থেকে জেল-হাজত, আদালত সব মাড়াতে হয়। তার অপরাধ তাপসীপ্রাপ্ত বয়স্ক নয়। সার্টিফিকেটের বয়স ষোল বছর। কিছুদিন পর পর হাজিরা দিতে হয় আদালতে। টাকা দিতে গিয়ে বাবার রোজগারের চারকাঠা জমিও বিক্রি করতে হয়েছে। দু’বছর পর আজ জামিনে ছাড়া পেয়ে যখন নতুন কিছু করার সন্ধানে ছুটছে সেখানে তাপসী! মনের অজান্তেই বুকের ভেতর থেকে বের হয় একটা ডাক, আতর্নাদ- তাপসী।

তাপসী তাকায়।

-আমার তাপসী, তুমি কিভাবে পারলে এমন...?

-প্রলাপ বকবেন না প্লিজ। অনেকটা ধমকের সুর তাপসীর কণ্ঠে।

- না তাপসী না, তুমি এমন বলতে পরো না। হাজার চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজ যখন তোমায় পেয়েছি ঠিক সে সময় তুমি বলছো...!

- এটা নতুন কিছু নয়, আমি কোনকালে আর কোনদিন আপনাকে ভালোবাসিনি।

-বাহ! যাক আমি তো বেসেছিলাম।

- সেটা আপনার ব্যাপার। আমার স্বামী আছে।

- আমি তো তোমাকে তালাক দেয়নি, আমিই তো তোমার স্বামী।

তাপসী হনহন করে হেঁটে যায়। একবারের জন্যও পেছন ফেরেনা। এই মেয়েটাই একদিন বলেছিল, আমি শুধু তোমার। সারা জীবনের জন্য তোমার। জীবনের সঙ্গা কিরে! সারা জীবনের? হাসানের মাথাটা ঘুরে ওঠে। সাথে সাথে কেউ পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। চলন্ত গাড়ি থেকে ছিটকে পড়ে হাসান। রাতের 

অন্ধকারটা শেষবারের মতো দেখে নেয়। মাথায় প্রচ- একটা আঘাত, হাত-পা, গোটা শরীর কাটাছেঁড়ার অনুভূতি। রক্তের কনিকাগুলো কাঁপে, তীর তীর করে। লাফায়, দাপায়।  চোখ দু’টো বুজে আসে। হাসান অবচেতন মনেই বলে, জীবন কিরে!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ