ঢাকা, শুক্রবার 29 December 2017, ১৫ পৌষ ১৪২৪, ১০ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাহফুজুর রহমান আখন্দের কাব্যে প্রেম-প্রকৃতি ও জীবনবোধ

ড. শাহনাজ পারভীন ; কবিতা বিশ্বের সব সাহিত্যেরই একটি প্রধান শাখা। সেই শ্রেষ্ঠ জ্ঞানের ধারক যিনি তিনিই কবি। তাকে সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে কবিতার কাতারে সামিল হতে হয়। তাকে হতে হয় দায়িত্বশীল, কর্তব্যপরায়ণ এবং কাক্সিক্ষত লক্ষ্যপথে অবিচল। কবি এগুলো প্রকাশ করেন তার নিজস্ব অনুভূতি, উপলব্ধি এবং প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে। কবি মাহফুজুর রহমান আখন্দ এমন একজন কবি যিনি শুধুমাত্র একজন কবিই নন। তিনি একইসাথে একজন বহুমাত্রিক লেখক, গবেষক এবং সাহিত্যিক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রফেসর ড. আখন্দ পেশাগতভাবে ইতিহাস নিয়ে কাজ করলেও ইতোমধ্যেই কবি, ছড়াকার, গীতিকার, গবেষক এবং সাহিত্য সমালোচক হিসেবে সুনাম অর্জন করেছেন। সম্পাদনা করছেন মোহনা নামক সাহিত্য ও সংস্কৃতির ছোট কাগজ। কবিতার সাথে তার সখ্য নিবিড়। তার কবিতার সাথে মিশে আছে সমাজ, ধর্ম, প্রেম, মৃত্তিকা ও জলের মত মাধুরী। তার কলমে তৈরি হয় যে কবিতা তা একই সাথে কবির এবং পাঠকের। মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আস্থা-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য তার সাহিত্যে প্রতিফলিত হয় শৈল্পিক সৌন্দর্যে। 

সাহিত্যের আর এক নাম জীবন সমালোচনা। জীবন সত্যের বিশ্লেষণই এতে অঙ্গীকৃত। মানুষের আবেগ ও মননের মাধ্যমে জীবনের সত্য, জীবনাতীতের সত্য ভাষার সৌন্দর্যে ম-িত হয়ে সাহিত্যে উদ্ভাসিত হয়। সত্য যখন শব্দ শিল্পের পরশে সুন্দর হয়ে প্রকাশিত হয় তখন তা যুগ যুগ ধরে সংবেদনশীল বা সেনসেটিভ হয়ে মানুষের মনে রসাবেদন সৃষ্টি করে। মানব মনের এ ধরনের পবিত্র আনন্দ সৃষ্টি করা সাহিত্যের কাজ। এজন্য মানব মনে সাহিত্যের প্রভাব খুব প্রবল, তার শক্তি বিপুল। বিখ্যাত ইতালীয় রসতাত্ত্বিক ক্রোচে বলেছেন: সাহিত্য হল রূপায়ণ। তবে রূপায়ণ সার্থক হওয়া চাই। রূশীয় সাহিত্যিক টলস্টয়ের কথা হলÑ কোন ভাবানুভূতি যখন মনকে করে ভারাক্রান্ত, তখন সে প্রকাশের বেদনায় পীড়িত হয়। সেই ভাবানুভূতি অপরকে সাগ্রহে জানাবার তাগিদে মানুষ লেখে, গান গায় ও ছবি আঁকে। এ পথে মানুষ যখন কলার কারবারী, তখনই সে কবি ও সাহিত্যিক। টলস্টয়ের মতে, যখন মানুষ ভাবানুভূতির অভিজ্ঞতাকে ইচ্ছাপূর্বক অন্যকে জানাতে চায়, তখন তা হয় শিল্প। এটাই কথায় সাহিত্য, আন্দোলনে নাচ, সূরে হল গান ইত্যাদি। সাহিত্যিক যখন আত্মপ্রকাশ করেন, তখন তিনি হয়ত নিজের অন্তরপুরুষকে প্রকাশ করেন বা বাহ্য জগতের রূপরস-গন্ধ, স্পর্শ-শব্দকে আত্মগত অনুভূতির রসে স্নিগ্ধ করে প্রকাশ করেন। অথবা তার ব্যক্তি অনুভূতি নিরপেক্ষ বিশ্বজগতের বস্তুসত্তাকে প্রকাশ করেন। নিজের কথা, পরের কথা বা বাহ্য জগতের কথা সাহিত্যিকের মনোবীণায় যে সুরে ঝংকৃত হয়, তার শিল্প সংগত প্রকাশই সাহিত্য। কবি ও গবেষক ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ সে কাজটিই সফলভাবে করেছেন তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ জীবন নদীর কাব্য-এর কবিতাসমূহে।

নব্বই দশকের অন্যতম শক্তিমান কবি মাহফুজুর রহমান আখন্দ। গবেষণার ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফলের পাশাপাশি তিনি ছড়া-কবিতাতেও সফল বিচরণ করে যাচ্ছেন। তিনি তার লেখনির মাধ্যমে বিভিন্ন অনাচারের বিরুদ্ধে কাগজ-কলমে যুদ্ধ করে করে মুখর হয়েছেন, অদম্য তারুণ্যের জোয়ারে ভাসছেন। তার কবিতা পড়তে পড়তে মনের অজান্তেই গ্রীক প্রবাদের কথা মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। ‘The heart that loves is always young’ যে হৃদয় ভালবাসে তা সব সময়ই তরুণ। তাঁর লেখায় আছে তারুণ্যের সরলতা, যৌবনের উন্মত্ততা আর সময় দিয়েছে তাকে প্রাজ্ঞতা। তাই তো রাজনীতি, সমাজনীতি এবং মানবতাবোধের খোঁজে কবি নিশিদিন ব্যস্ত থাকেন, খুঁজে বেড়ান সামনে যাবার পথ। 

সামনে যাবার আশায় স্বপ্ন আঁকতে গেলেই 

ভেসে আসে ভুখা মানুষের মুখ, দাবী আদায়ের মিছিল

পুলিশের বুট লাঠির আঘাত এবং বন্দি জীবনের ঘানি

তাইতো কবিকে আজ মিছিলের সাথেই মানায়।

[এবং কবি সুকান্ত]

কবি তো এরকমই। তাদের চোখে সবকিছু ধরা দেয় এভাবে। স্বচ্ছ কাচের ঝিলিকের মত। অনায়াসে তারা লিখে যান অর্ন্তগত বাসনার ছায়াবাণী। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো কবি মাহফুজুর রহমান আখন্দ একজন রাজনীতি সচেতন কবি। সমাজের অসমতা দূর করতে তিনিও সুকান্তের মতোই গর্জে উঠতে চান, সুকান্তকে সঙ্গী তিনি সামাজিক বৈষম্য দূর করতে চান। কিন্তু পরিবেশ যেন সায় দেয় না তাতে। 

ভেজাপাতায়ও টুপ্টাপ শব্দে হেঁটে যায় ক্লান্ত সময়

বিচলিত মনে অপেক্ষার মিছিল; কাফনের সাজসজ্জা, বিরুদ্ধ বাতাস

বিদ্যুৎ নয়; 

মেঘের পাঁজরে ওড়ে রক্তের ফিনকি 

বক্ষদীর্ণ করে হেসে ওঠে মনন

উঠে আসে বিজয়ের সূর্য; মুক্তির হেমন্ত দিন।

[মুক্তির হেমন্ত দিন]

তাই কবি সুকান্তকে তিনি আবারো আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন-

সময়ের সাথে ডাক দিয়ে যাই

আবার আসুন কবি সুকান্ত, লিখে যান নতুন শব্দে

‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’

মুক্তির সুর পেলে ওগো, তোমার সাথেই আমাদেরও ছুটি।

[এবং কবি সুকান্ত]

কবিতা সম্পর্কে গ্রীক দার্শনিক প্লেটোর আদর্শ ও অভিমতের সূত্র ধরে কবিতার স্বরূপ, মানব সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিসরে তার অবস্থান বিচার করা যায়। প্লেটো দার্শনিক সত্যবোধের কৃষ্টি পাথরে কবিতার বিচার করতে চেয়েছিলেন। তার মতে, কাব্যে মিথ্যাচার ও কদর্যের প্রশ্রয় হয়। সেকালের গ্রীসের কবিরা মদমত্ত দেবতার ছবি এঁকেছেন, হোমার আ্যাকলিসের মত বীর চরিত্রকেও করুণরসে অভিসিক্ত করেছেন। হোমারের কাব্যে এই সুন্দর অসুন্দরের সমাবেশ থাকা সত্ত্বেও প্লেটোর মনকে তা স্পর্শ করেছিল। Davles and  Vaughan   গ্রন্থে  প্লেটোর উক্তি “I confess I am checked  by a kind of affectionate respect for Homer, of whice I have been conscious since I was a child.” কারণ সত্য মিথ্যাকে কবিমনের শিল্প সৌন্দর্যে অপরূপ করে পরিবেশন করার ক্ষমতা ছিল হোমারের। অর্থাৎ সত্যকে ভিত্তি করেই কবিতার অঙ্গ সৌষ্ঠব। তবে তা শুদ্ধ সংবাদপত্র কিংবা ধর্মপ্রচার নয়। কবি বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়- বাস্তবে আশ্রয় গ্রহণ এবং তাকে অতিক্রম করাই কবিতার অভিপ্রেত। কবি মাহফুজুর রহমান আখন্দ সে ক্ষেত্রে নিজেকে সফলভাবেই মেলে ধরেছেন।

সাজোয়া ভূতের বাসর কবিতার ঘরে; স্বপ্নেও মায়াবী রাক্ষস

শিশুদের রঙিন সকাল রান্নার ফুয়েল

সুস্বাদু খাবার ধর্ষিতার বিষণœ দেহ

আজ ভৌতিক পূর্ণিমা নয়; একটি বিশুদ্ধ কবিতা চাই

চাঁদনী আলোর বিশুদ্ধ কবিতা।

[বিশুদ্ধ কবিতা চাই]

একথা বলা বাহুল্য যে, সুস্থ সমাজ চিত্তই সাহিত্যের ঐশ্বর্যময় আধার। কিন্তু সমাজে তো আর সদাসত্য সুন্দরের বেসাতি চলে না। সমাজ অভিধায় মানবজীবনের ত্রুটি-বিচ্যুতি, হীনতা-কপটতা, ব্যথা-বঞ্জনা, সজীব-সত্যের পাশাপাশি বিরাজ করে। তাই দু’টি দিকই মহৎ সাহিত্যের অবলম্বন। কবিতা সাহিত্যের সবচেয়ে সুষমাময় অঙ্গ। এখানে মানুষের কঠোর শ্রমের জীবন ও সমাজের বিচিত্র ভাবধারায় পরিচালিত হয়ে বৈচিত্র্যময় রূপ-শব্দে অলঙ্কারের রসময় বাণীমূর্তি লাভ করে। সমাজকে সভ্যতার মোড়কে মুড়িয়ে দেয়, অথচ নিজেরা থেকে যায় সকলের অগোচোরে- গভীর অন্তরালে।  তাই তো  কবি লিখেছেন-

আগুন পিটিয়ে যেই কামারেরা নানা কসরত করে

সভ্যতা তোলে গড়ে

তাদের কপালে আলো আসেনাকো আঁধারেই থাকে পড়ে

[মুক্তিআলোর চাঁদ]

মাহফুজুর রহমান আখন্দ মূলত একজন রোমান্টিক কবি। তাই তো তার কবিতায় ঘুরে ফিরে প্রেমের অনুষঙ্গ দোলা দেয় শতত দ্যোতনায়। বিশুদ্ধ প্রেমের নিটোল পঙক্তিমালা রচনায় ভীষণ পারদর্শী তিনি। তাঁর প্রেমের কবিতায় কোন অযাচিত নোংরা শব্দের ব্যবহার নেই। উপমা ব্যবহারেও তিনি বেশ মার্জিত রুচির পরিচয় দিয়ে থাকেন। কবির প্রেমিকার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন-

তোমার হাসিতে চাঁদ ঝরে ঝরে পড়ে

জোসনার নূরে কমলা মাখানো ঠোঁট

পিয়ানোর সুরে চুম্বুক টেনে ধরে

মনটাতে লাগে মায়াবী আঘাতে চোট

[বারমুডা ছায়ারাণী]

তাঁর প্রেমিকার হৃদয়ব্যাসার্ধ এবং প্রেমময় চিত্রকল্প নির্মাণে তিনি উচ্চারণ করেন-

তোমার মনের ওই দীঘল আকাশ জানি শুধুই আমার

হৃদয়ের মাঠ জুড়ে তিলে তিলে বানিয়েছি প্রেমের খামার।

[প্রেমের খামার]

এ পৃথিবী, সৌরলোক, মহাকাশ তারকারাজিসহ আঠার হাজার মাখলুকের সবই মহান আল্লাহ্র রহস্যেভরা বিস্ময়কর সৃষ্টি। অপার রহস্যেভরা ভূম-ল, মহাকাশ, সাগর-অতল, গাছপালা পশুপক্ষী সবই অনুসন্ধিৎসু মানুষের গবেষণার ঋদ্ধ দৃষ্টি দাবি করে। সেখানে কবির দৃষ্টি হয় আরো অনুসন্ধিৎসু। কবি মাহফুজুর রহমান আখন্দ সে সব বিষয়ের উপমা টেনে সামাজিক অসঙ্গতিময় পরিবেশকে তুলে আনেন দক্ষতার সাথে। তিনি  লিখেছেনÑ

বালিহাঁস বলে দেয় উষ্ণ খবর

কানা বগি বাঁশঝাড়ে ঘুম

পথে পথে চোখে ভাসে অচেনা কবর

কবুতর ডাকছে বাকুম

আরশের ছায়াতলে স্বপ্ন হাজার

খুলে দাও সব দ্বার সকল বাজার।

[চিরায়ত সুখ]

বর্তমান বিশ্বে ইসলাম এবং মুসলিম দেশের উপর যে নিগ্রহ ও নির্যাতন চলছে তা যে কোন বিবেকবান হৃদয়কে কাঁপিয়ে তোলে। সোমালিয়া, বসনিয়া, কাশ্মীর, ইরাক, ফিলিস্তিন, আরাকান এবং আফগানিস্তানে সাধারণ মানুষের উপর যে সামরিক হস্তক্ষেপ চলছে তা কোনক্রমেই মেনে নেয়া যায় না। কবি মাহফুজুরর রহমান আখন্দ বিশ্বব্যাপী এ হত্যা, খুন এবং জবরদখলের বিরুদ্ধে রচনা করেন প্রতিবাদী কবিতা। ইসলামের সর্বশেষ নবীর উম্মত হওয়ার কারণেই যে মুসলমানদের উপর এই অত্যাচার তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি বলেন:

যখন গলিত লাশের শুকনো কান্নায় শকুনের পিছু ফেরা

সোমালিয়া বসনিয়া কাশ্মীর ইরাক কিংবা আফগানের মতো;

সম্ভ্রম হারানোর বেদনায় নির্বাক সুরুজ্জান আরাকানী 

ইয়োমা চুড়ায় পুলিশে খুবলে খায়

কিশোরী মদীনার নিষ্পাপ দেহ

তখন আর কিসের ঈদ করবো বলো!

[কিসের ঈদ করবো বল]

সমাজের সাথে মাটির সাথে সাহিত্যের সম্পর্ক নিগূঢ় না হলে মানবজীবনের জন্য তা কল্যাণকর হয় না। ফলে সাহিত্যের উদ্দেশ্য হয় ব্যাহত। কারণ মাটির অভ্যন্তর থেকে গাছ ও ফুলের মত সাহিত্যও সমাজ থেকে জীবনরস ধারণ করে। সমাজের সমতল ক্ষেত্র থেকে সাহিত্যের ফুল-গাছ রস-মায়া টেনে সৌন্দর্য সুষমায় ম-িত হয়। কবি সেই সাধনার শিল্পী। তিনি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেন গোটা সমাজের, দেশের, গাঁয়ের, মায়ের, স্নেহের নানা চিত্ররূপ। এ উপলব্ধি যত গভীর জীবন জগতের রহস্য উদঘাটনে ততো বেশি সার্থক। কবি মাহফুজুর রহমান আখন্দ  লিখেছেন-

মা’র চোখে মুখে কালো কালো ছায়া ভাসে

কবে যে উঠবে চন্দ্র সূর্য ভোর

কবে যে খুলবে সাহসের নয়া দোর

কবে যে আবার সাহসের নায়ে সত্যের জয় আসে!

[মায়ের কান্না]

অভিজ্ঞতা সঞ্চাত গভীর জীবনবোধ ও তীক্ষè অন্তর্দৃষ্টির সাথে আপন মনের মাধুর্য মিশিয়ে কঠিন বাস্তবের ভিত্তিতে কবি তাঁর কাব্যসৌধ নির্মাণ করেন। প্রাত্যহিক জীবনের শত সমস্যা, শত গ্লানি, অত্যাচার অবিচার, আঘাত স্ফূর্তি কবির শিল্পী মনকে প্রভাবিত করে। কবি তখন সমকালীন সমাজের সুখ-দুঃখের বিচিত্র-রূপ তাঁর সৃষ্টিতে তুলে না ধরে পারেন না। সমাজের সাথে সাহিত্যের সম্পর্ক তাই স্বাভাবিক নিয়মে দৃঢ়ভাবে বাঁধা। সমাজ নিষিক্ত আনন্দ বেদনার রস-রূপ নিয়েই সাহিত্যের কলেবর পুষ্টি লাভ করে। শিল্পের সাথে সমাজের এই সম্পর্ক যত নিবিড় ও আন্তরিক হয়, সাহিত্য ততো হৃদয়স্পর্শী হয়ে ওঠে। এ সম্পর্কে ইংরেজ সমালোচক ক্রিসটফার কডওয়েল তার Illusion and Reality  গ্রন্থে যথার্থই বলেছেন, ‘শুক্তির মাঝে মুক্তার মতো সমাজগর্ভেই সাহিত্যের জন্ম।’ সাহিত্য সমাজের প্রতিচ্ছবি কিন্তু প্রকৃতির আরশি নয় বলেই কবি তার মন মানসিকতা চিন্তা ভাবনার রূপ ধারণ করে সাহিত্যে উপস্থিত থাকেন কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে। হাতাশাকে ছুঁড়ে আশার স্বপ্নে বুক বাঁধেন কবিরা। তাই তো কবি মাহফুজুর রহমান আখন্দ লেখেনÑ

সহসা ডানা মেলে স্বপ্নিল প্রজাপতি

গর্ভবতী মেঘ প্রসব করে, হলদে ঘাসের চাহনিতে সবুজের ঘ্রাণ

ফেলে আসা দিন, নতুন তুলির টানে শিল্পিত মন হাঁটে

মিটিমিটি জলে ঝিরিশামুকের রঙিন মেলা

মলা ঢেলা দাড়ক্যা পুটির চঞ্চল প্রাণে শান্তিপরশ

দূর মঞ্জিলে হেঁটে হেঁটে চলে শামুক-কচুরিপানা

সহসা উঠে আসে যেন এক শান্তিসকাল।

 [অস্তিত্ব]

তিনি সবাইকে একতার সুরে জেগে উঠার আহ্বান জানিয়ে উল্লেখ করেন-

কলমের নিব হোক লাঙলের ক্ষুরধার ফলার সারি

শাওনের মেঘগুলো গলে গলে নেমে যাক অঝোর ধারায়

জীবনের মাঠে বুনি ঢেউ তোলা মনকাড়া সবুজ স্বপন

সাহসের রঙধনু খুশি হয়ে নেচে যেন হাতটা বাড়ায়

হতাশার পাতাগুলো উড়ে যাক এক গানে, একতার সুরে

আলোকিত হোক সবে, সবুজের উৎসবে সত্যের নূরে।

[বোশেখের হালখাতা]

জীবন নদীর কাব্য সত্যিই জীবনঘনিষ্ট একটি অনবদ্য কবিতাগ্রন্থ। প্রতিটি কবিতার মধ্যে জীবনের অনুসঙ্গের বহুমুখি প্রকাশ ঘটেছে। প্রেম, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, ধর্ম-রাজনীতি, সভ্যতার দ্বান্দ্বিক চরিত্র, হতাশা, কষ্ট, মানবিক বিপর্যয়সহ মানব জীবনের সামগ্রিক বিষয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায় এ কাব্যে। ছন্দের পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চোখে পড়ার মতো। তবে একজন সফল গীতিকার হিসেবে তাঁর কবিতায় গীতলতার মসৃন গন্ধটা যেন লেপ্টে আছে। কল্পনার আঙিনাটাও বেশ প্রশস্ত। অনেক সময় আবেগের সূত্রধরে এগিয়ে যেতে অলংকারের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন কবি। বাস্তবতার নিরিখে শব্দগাঁথুনি আরো একটু শক্ত হলে কবিতাগুলো আরো সবল হয়ে উঠবে। আশার দিক হচ্ছে নব্বই দশকের অন্যতম শক্তিশালী কাব্যশ্রমিক মাহফুজুর রহমান আখন্দ। তিনি ভাষাকে নিজের মধ্যে লালন করেন মায়া-মমতায়। সে কারণে তাঁর কবিতার ভাষা ঋজু, পরিমার্জিত এবং সমৃদ্ধ। সময়কে ধারণ করে তিনি সামনের দিনে আরো উন্নত কাব্যসাহিত্য উপহার দিবেন এ প্রত্যাশা ও বিশ্বাস আমরা রাখতেই পারি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ