ঢাকা, শুক্রবার 29 December 2017, ১৫ পৌষ ১৪২৪, ১০ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিচারকের প্রতি ‘ওহী’ নাজিল না হলে  খালেদা জিয়া খালাস পাবেন

 

# রাষ্ট্রপক্ষ ভুয়া তথ্য প্রমাণ দাখিল করেছে 

# আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায় 

# খালেদা জিয়ার নামে মামলা ইতিহাসে প্রশ্ন হয়ে থাকবে 

# খালেদা জিয়ার বহর থেকে আটক অর্ধশতাধিক 

স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, বিচারকের প্রতি ওহী নাজিল না হলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ মামলায় খালাস পাবেন। গতকাল বৃহস্পতিবার পুরান ঢাকার বকশিবাজারে সরকারি আলীয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্কের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে তিনি একথা বলেন। রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলায় ভুয়া তথ্য প্রমাণ দাখিল করেছে বলে যুক্তিতর্কে মন্তব্য করেন খালেদার আরেক আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী।

সাংবাদিকদের খন্দকার মাহবুব বলেন, প্রতিপক্ষ আদালতে যে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন, তাতে বিএনপি চেয়ারপারসনের সম্পৃক্ততা তারা প্রমাণ করতে পারেননি। সবাই জানেন, এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা। আদালতের বিচারকের ওপর ওহী নাজিল না হলে মামলা থেকে খালেদা জিয়া খালাস পাবেন।

যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় খন্দকার মাহবুব হোসেন বিচারকের উদ্দেশে বলেন, আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনরা আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়। কিন্তু কিছু সৎ বিচারপতি রয়েছেন, যাঁরা রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ন্যায়বিচার করেন। এ মামলা ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে যুগে যুগে মানুষ বিচারককে মনে রাখবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে ইতিহাসের পাতায় মানুষ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে।

বিচারকের উদ্দেশে খন্দকার মাহবুব হোসেন আরও বলেন, আল্লাহতায়ালা বিচারকদের ক্ষমতা দিয়েছেন আল্লাহকে হাজির রেখে বিচার করবেন, এটাই প্রত্যাশা করি। তিনি জানান, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, তাঁর স্ত্রী ও ছেলের নামে এই ট্রাস্ট হয়েছিল। সেই ট্রাস্টেই টাকা জমা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া সেই টাকা উত্তোলন এবং ব্যয় করেননি, বরং ট্রাস্টের চার কোটি টাকা এখন লাভে পরিণত হয়েছে।

আইনজীবী আরো বলেন, সরাসরি কোনো নথিপত্র ছাড়াই খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। স্বাক্ষরবিহীন ঘষামাজা ছায়ানথি দিয়ে কাউকে সাজা দেয়া যায় না। যদি বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে, তাহলে আসামীপক্ষ এর সুবিধা পেয়ে থাকে। যদি ছায়ানথি দিয়ে সাজা দেয়া হয়, তাহলে সমস্ত দ-বিধি, আইন পরিবর্তন হয়ে যাবে।

এর আগে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, আমরা ৩২ জন সাক্ষী ও তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পেরেছি। আশা করছি, আদালতে আসামীরা সর্বোচ্চ শাস্তি পাবেন। তিনি আরো বলেন, খালেদা জিয়া টাকা বণ্টন করে দিয়েছেন ট্রাস্টের নামে। তারা স্বীকার করেছেন ট্রাস্টের নামে টাকা জমা আছে। এতে করে এটাই প্রমাণ হয়, তারা আত্মসাৎ করেছেন।

খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে যুক্তিতর্কের সময় শুনানিতে যুক্তিতর্কে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, এই মামলা রাজনৈতিক কালিমালিপ্ত। দুপুরের পর এ জে মোহাম্মদ আলীর যুক্তি উপস্থাপনের সময় দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে বাদানুবাদ শুরু হলে এক পর্যায়ে শুনানি মুলতবি করে ৩ ও ৪ জানুয়ারি পরবর্তী তারিখ রাখেন বিচারক মো. আখতারুজ্জামান।

এর আগে বেলা সাড়ে ১১টায় মামলা দুটিতে হাজিরা দিতে পুরান ঢাকার বকশীবাজার আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী বিশেষ আদালতে পৌঁছান খালেদা জিয়া। পরে বেলা ১১টা ৩৬ মিনিটে পঞ্চম দিনের মতো খালেদা জিয়ার পক্ষে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় যুক্তিতর্ক স্থাপন করেন আইনজীবী খন্দকার মাহাবুব হোসেন। এ মামলায় খালেদার জিয়ার পক্ষে আইনজীবী আবদুর রেজাক খান মোট চার দিন যুক্তি উপস্থাপন করার পর বুধবার খন্দকার মাহবুব তার যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন।

যুক্তিতর্কে আইনজীবী খন্দকার মাহবুব বলেন, এক যাত্রায় পৃথক ফল কেন হল? এটা তো হয় না। এ মামলায় রাজনৈতিক গন্ধ আছে এবং মামলাটি রাজনৈতিক কালিমালিপ্ত। তিনি দাবি করেন, সাক্ষ্য প্রমাণে এ মামলায় কোনো অর্থ আত্মসাতের বিষয় প্রমাণিত হয়নি।

এ সময় তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা করার জন্য এ মামলাটি করা হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মামলা দিয়ে ধাওয়া করা হচ্ছে। তিনি নিঃশ্বাস ফেলার সময় পাচ্ছেন না। তারপরও মাথা ঠা-া রেখে তিনি এই মামলা লড়ছেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া একটি স¤্রান্ত পরিবার থেকে এসেছেন। তিনি তিন মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী। তিনি কখনও রাজপ্রাসাদে বসবাস করেননি। তিনি মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন। সেই খালেদা জিয়ার নামে কেন এই মামলা দায়ের করা হয়েছে, তা ইতিহাসের কাছে প্রশ্ন হয়ে থাকবে। জনগণ এই মামলার বিচার করবে।

তিনি বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে বলেছেন, বিদেশ থেকে টাকাটি এসে দুইটি ট্রাস্টে দুই ভাগ হয়েছে। এর মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমানের টাকা হালাল দেখানো হয়েছে এবং খালেদা জিয়ার টাকা হারাম দেখানো হয়েছে। মাননীয় আদালত, এটি সব রাজনৈতিক।

প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ৮ আগস্ট খালেদা জিয়াসহ চার জনের বিরুদ্ধে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাটি দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ মামলায় ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক।

মামলায় বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী এবং তার তৎকালীন একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খানকে আসামী করা হয়।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে নেতাকর্মীর ঢল :

খালেদা জিয়া গুলশানের বাসা থেকে পুরান ঢাকার আদালতে যাওয়ার সময় দুই পাশে শত শত নেতাকর্মী রাস্তার দুই পাশে ভিড় করে। বিশেষ করে মৎস্যভবন হাইকোর্টের মাযার গেইট এবং চানখার পুল এলাকায় নেতাকর্মীদের সারি সারি দাড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আদালত থেকে ফেরার সময় তার গাড়ির আশপাশে শত শত নেতাকর্মী নানা স্লোগানে মুখরিত করে রাখে। দেখা গেছে খালেদা জিয়ার গাড়ির সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীর মিছিলটি সুপ্রিম কোর্ট অতিক্রম করে মৎস্য ভবনের সামনে এসে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়ায়। এসময় নেতাকর্মীরা সেলফি এবং ছবি তুলেন। থেমে থেমে মিছিলটি কাকরাইল মোড় পার হয়ে মিন্টো রোড ধরে রূপসী বাংলা হোটেলের দিকে গিয়ে শেষ হয়। এসময় নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে।

রূপসী বাংলা হোটেলের মোড়ে পৌঁছানোর পর খালেদা জিয়ার গাড়ির বহর দ্রুত টান দিয়ে চলে গেলে নেতাকর্মীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে এক পর্যায়ে মিছিলও শেষ হয়ে যায়। 

খালেদা জিয়ার বহর থেকে আটক অর্ধশতাধিক : 

এদিকে আদালতে হাজিরা দিয়ে বাসায় যাওয়া সময় বহর থেকে বেশ কিছু নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। এই সংখ্যা অর্ধশতাধিক। গতকাল সকাল থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত হাইকোর্ট, প্রেস ক্লাব, মৎস্য ভবন এলাকা থেকে তাদের আটক করে রমনা ও শাহবাগ থানায় নেয়া হয়।

পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার বলেন, খালেদা জিয়ার মুভমেন্টকে কেন্দ্র করে সন্দেহজনকভাবে অনেককেই থানায় আনা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে নাম পরিচয় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা বিঘেœর কাজে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ