শুক্রবার ২১ মে ২০১০
Online Edition

পুলিশ পাহারায় রাস্তার কাজ

দুর্নীতি এখন সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। সেটি বড় বড় দুর্নীতির ক্ষেত্রে যেমন সত্য তেমনি ছোট ছোট দুর্নীতির ক্ষেত্রেও সত্য। বিনা টেন্ডারে কাজ দেয়া যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এর আগে এই সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম বড় দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয় গত ১৭ই ডিসেম্বর আমার দেশ পত্রিকায়। তাতে বলা হয় মার্কিন তেল কোম্পানি শেভ্রনকে ৩৭০ কোটি টাকায় বিনা টেন্ডারে পাইয়ে দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রী ৫৩ লাখ ডলার উৎকোচ গ্রহণ করেছে। পত্রিকা নিজে থেকে এ ধরনের কোনো অভিযোগ উত্থাপন করেনি। অভিযোগটি উত্থাপন করেছিল পেট্রোবাংলা কর্মককর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে আবু বকর সিদ্দিক। এ নিয়ে তদন্তেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু গত ১৭ই ডিসেম্বর খবরটি যখন প্রকাশিত হয় তখন ঘটনার সত্যতা কেউ অস্বীকার করতে পারেনি। গ্যাসের চাপ বাড়ানোর জন্য যে স্থানে কম্প্রেসারটি বসানো হচ্ছে পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা তাকে অপ্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেছিলেন। কারণ যে মাত্রায় চাপ সৃষ্টির জন্য ঐ এলাকায় কম্প্রেসারটি বসানো হচ্ছে সেখানে গ্যাসের চাপ যথাযথই ছিল। এই খবরটি প্রকাশের পর খবরের সত্যাসত্য নিশ্চিত করার চাইতে বরং আমার দেশের সম্পাদক, প্রকাশক ও রিপোর্টারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী মামলা-হামলা শুরু হয়। পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকেও বদলী করে দেয়া হয়। সত্য অপ্রকাশিত থাকায় দুর্নীতির বিষয়টি জনমনে প্রতিষ্ঠা পায়। তারপর আরো অনেক ঘটনা ঘটেছে। অতি সম্প্রতি এমনি হাজার হাজার কোটি টাকা ঘুষ দুর্নীতির আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ভাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ কেনা নিয়ে। সরকার বিনা টেন্ডারে ৮০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করেছে। তাতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে উচ্চ মূল্যে (ইউনিট প্রতি ১৩-১৪ টাকা) বিদ্যুৎ কিনে কম মূল্যে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এত বড় কাজ বিনা টেন্ডারে কেন, সে প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। বিদ্যুৎ ঘাটতি একটি ওজুহাত বটে। কিন্তু বিদ্যুৎ ঘাটতি আজকের নয়। বিগত ১৬ মাস সরকার এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগই নেয়নি। তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি বলেছে, বিদ্যুতের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে এ ধরনের ক্ষতিকর চুক্তির পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে। এভাবে উচ্চ পর্যায়ে বড় বড় দুর্নীতির অর্থাৎ টাকা বানানোর প্রতিযোগিতা দেখে নিম্ন পর্যায়েও দুর্নীতি উৎসাহিত হচ্ছে। ছাত্রলীগের যে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি তারও মূল কারণ টাকা বানানোই। অর্থাৎ সরকার-সংশ্লিষ্ট যে যেখানে আছে সেই দুর্নীতির কোনো না কোনো পথ এখন অনুসন্ধান করছে। রাজনীতির উচ্চ পর্যায়েই যদি এটা ঘটে তাহলে নিম্ন পর্যায়ে বাধা দেয়ার কোনো নৈতিক বল থাকে না। গত মঙ্গলবার এক সহযোগী এমনি একটি খবর দিয়েছে। খবরে বলা হয়েছে চাঁদাবাজির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া রাজধানীর দয়াগঞ্জে একটি সড়কের সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে পুলিশ পাহারায়। ঠিকাদারের অভিযোগ সরকার দলের স্থানীয় সংসদ সদস্য সানজিদা খানমের লোকজন চাঁদা না পেয়ে সড়ক মেরামতের কাজটি বন্ধ করে দেয়। এর আগে সানজিদা খানম কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে কার্যাদেশ বাতিল করতে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রধান কৌশুলীকে চিঠি দেন। ঠিকাদার জানিয়েছেন, তার কাছে ঐ সংসদ সদস্য ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। ঠিকাদার তাকে জানান যে, কাজ শেষ করার আগে তিনি এ সম্পর্কে কিছু বলতে পারবেন না। এতে সংসদ সদস্য ক্ষুব্ধ হয়ে দলবল নিয়ে গিয়ে শ্রমিকদের বকাঝকা করে কাজ বন্ধ করে দেন। ঠিকাদার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের অবহিত করেন। পরে তিনি থানায় জিডি করেন। সংসদ সদস্যের অভিযোগ অতি ঠুনকো। তার বক্তব্য কাজ হচ্ছে তার এলাকায় পাশের এমপির ডিও লেটারে কাজটি হচ্ছে। তাকে কিছু জানানো হয়নি তাই তিনি কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। শেষে ঠিকাদার হাতে-পায়ে ধরলে তিনি ২৫ শতাংশ কাজ করার অনুমতি দিয়েছেন বলে জানিয়ে বাকি কাজ তার তত্ত্বাবধানেই হবে। এতে বুঝতে বাকি থাকে না যে, ঠিকাদারের অভিযোগ সত্য। কাজটি যাতে আবারও বন্ধ না হয়ে যায় সে জন্যে পুলিশ পাহারার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। ধারণা করা যায়, এখানে সকল পক্ষই সরকার সমর্থক। বিরোধের সূত্রটা ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে। পাশের আসনের সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগেরই হাবিবুর রহমান মোল্লা। বোঝা যায় যে, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের প্রতি হাবিবুর রহমান মোল্লার আনুকূল্য আছে। ফলে এক্ষেত্রে সংঘাতের প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ন্যায়বিচার হবে যদি ঠিকাদারের অভিযোগটি তদন্ত করা হতো এবং সংসদ সদস্য সানজিদা খানমের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হতো। ধারণা করি সে রকম কখনোই নেয়া হবে না ফলে অন্য সংসদ সদস্যরাও এই পথে যে অগ্রসর হবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অথচ এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পাপের এ বিস্তার সমাজকে ধ্বংস করে দেবে। সেই অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য সম্মিলিত প্রতিরোধের বিকল্প নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ