ঢাকা, শনিবার 30 December 2017, ১৬ পৌষ ১৪২৪, ১১ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ সময়ের দাবি

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ : শিক্ষকরাই হচ্ছেন জাতি গড়ার কারিগর। মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক সমাজ আজ বঞ্চনার শিকার। এমপিওভুক্ত সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীদের তাঁদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের লক্ষ্যে বারবার রাস্তায় নামতে হচ্ছে বা আন্দোলন করতে হচ্ছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীগণ মূল বেতন স্কেলের সাথে ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধিসহ সুযোগ-সুবিধার আশ্বাসে টাইমস্কেল বন্ধ করে দেয়া হয়। এখন শিক্ষকরা না পাচ্ছেন ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, না পাচ্ছেন টাইম স্কেল। বাড়ি ভাতা ১০০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা, উৎসব ভাতা সরকারি চাকরিজীবীদের চারভাগের একভাগ।
বৈশাখী ভাতা প্রদানের আশ্বাস দিলেও শিক্ষকদের রাস্তায় নেমে মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ করে ও কোন সুফল আসেনি উল্টো গত ১৫ ও ২০ জুন পৃথক দুইটি গেজেটের মাধ্যমে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের বিদ্যমান চাঁদার হার ৬% এর পরিবর্তে মূল বেতনের ১০% উন্নীত করেন। চাঁদার হার বাড়ালেও শিক্ষকদের অবসর সুবিধা থাকবে আগের মতোই। এরপর থেকেই অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যার প্রতিফলন ঘটে দেশের শীর্ষ স্থানীয় দৈনিক সংবাদপত্র সমূহে। অবশেষে গত ২০/০৭/২০১৭ মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় এক বিবৃতির মাধ্যমে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে অতিরিক্ত কর্তনের গেজেট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন ।
উল্লেখ্য, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, মূল বেতনের ৪৫% বাড়ি ভাতা, ১৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা, ১০০% উৎসব ভাতা, ২০% বৈশাখী ভাতা, যাতায়াত ভাতা,  শ্রান্তি বিনোদন ভাতা, ভ্রমণভাতা, স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ, আবাসন সুবিধা, পেনশনসহ সরকারের দেয়া সকল সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন।
অথচ এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরা প্রারম্ভিক বেতনের সাথে বাড়ি ভাড়া ১০০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা, উৎসব ভাতা সরকারি চাকরিজীবীদের চারভাগের একভাগ। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষকদের সর্বোচ্চ সম্মানী প্রদান করা হয়। শিক্ষার যাবতীয় দায়িত্ব রাষ্ট্রের যেখানে সরকারি- বেসরকারি বিভাজন নেই।
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সরকারি ও বেসরকারি ছাড়া ও বহুধা বিভক্ত। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী সরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার সংখ্যা হচ্ছে মাত্র ২% এবং বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার সংখ্যা হলো ৯৮%। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ শুধুমাত্র মূল বেতন ও নামমাত্র সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।
২০১০ সালের শিক্ষানীতি অনুযায়ী শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রদানের অঙ্গীকার রয়েছে। যা আজও আলোর মুখ দেখেনি।
উল্লেখ্য, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই সিলেবাস ও একই যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকরা শিক্ষা দিয়ে থাকেন। সঙ্গত কারণে কেন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা আজ এই বৈষম্যের শিকার? কেন শিক্ষকগণ তাঁদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত? মূল বেতন স্কেল প্রদান করা স্বত্ত্বেও কেন তাঁরা আনুসাঙ্গিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত? কেন বেসরকারি শিক্ষকরা বৈশাখীভাতা, পূর্ণাঙ্গ বাড়িভাতা, পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাভাতা, পূর্ণাঙ্গ উৎসবভাতা ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট থেকে বঞ্চিত? কেন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহকে জাতীয়করণ করা হচ্ছে না? কেন আংশিকভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হচ্ছে? কেন বেসরকারি শিক্ষকদের অবহেলায় চোখে দেখা হচ্ছে? দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৈশাখী ভাতা, ইনক্রিমেন্ট এবং পূর্ণাঙ্গ উৎসব বোনাস, বাড়িভাতা ও চিকিৎসা ভাতাসহ বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ জাতীয়করণের দাবিতে মানববন্ধন, মিছিল, সভা-সমাবেশ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্ঠি আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। জাতির জনকের কন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ন্যায্য দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরতে পারলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি শিক্ষকদের চাকুরি জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়ে সরকারি বেসরকারি বৈষম্য দূরীকরণে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
যেমনিভাবে ১৯৭২-৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন দেশের ৩৬,০০০ এর অধিক সংখ্যক প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করে বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন দিগন্তের সূচনা করছিলেন। একবিংশ শতাব্দীর বাঙালি জাতির আইকন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে ২৬০০০ এর অধিক সংখ্যক রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করে প্রাথমিক শিক্ষাকে পূর্ণতা দান করেছিলেন। সেইদিন আর বেশি দূরে নয়, যে দিন বঙ্গবন্ধু কন্যা সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করে এদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উন্নত দেশগুলোর কাতারে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন। তাই এদেশের পাঁচ লক্ষাধিক বেসরকারি শিক্ষকদের বিশ্বাস, যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে শিক্ষক নেতৃবৃন্দ বোঝাতে সক্ষম হন তাহলে প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদরাসাকে জাতীয়করণ করে ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ
বিগত ৩০ নভেম্বর ২০১৫ সোমবার সাবেক শিক্ষা সচিব মো: নজরুল ইসলাম খান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাতে গেলে বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা জাতীয়করণে সরকারের ব্যয় কত হবে? সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাইরে মোট কতটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে তা জানতে চেয়েছিলেন? প্রধানমন্ত্রী জানতে চান, দেশের সব স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা জাতীয়করণে সরকারের অতিরিক্ত কত খরচ হতে পারে, মোট কয়টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে? প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে সাবেক শিক্ষা সচিব মোঃ নজরুল ইসলাম খান জানিয়েছিলেন, সারাদেশে প্রায় ৩০ হাজারের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বাইরে রয়েছে। এগুলো জাতীয়করণ করতে সরকারের প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। সব শুনে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ঠিক আছে, জাতীয়করণের লক্ষ্যে কাজ শুরু করতে হবে। শিক্ষক ও শিক্ষার মানোন্নয়নে কষ্ট করে হলেও এ টাকা খরচ করতে হবে।
পরিশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ দেশের পাঁচ লক্ষাধিক বেসরকারি শিক্ষকদের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি নিবেদন সরকারি বেসরকারি বিভাজন আর নয়, এখনই সময় বৈষম্য দূর করে শিক্ষাব্যবস্থায় সমতা ফিরিয়ে আনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করে সময়ের দাবি পূরণের মাধ্যমে স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণ নিশ্চিত করুন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ