ঢাকা, রোববার 31 December 2017, ১৭ পৌষ ১৪২৪, ১২ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বন বিধ্বংসী উন্নয়ন ও শিল্পায়ন সুন্দরবনের জন্য মারাত্মক নেতিবাচক হয়ে দাঁড়িয়েছে

স্টাফ রিপোর্টার : “সুন্দরবন ও রামপাল তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা ও করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, ‘বন বিধ্বংসী উন্নয়ন ও শিল্পায়ন’ সুন্দরবনের জন্য মারাত্মক নেতিবাচক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ সংকট নিরসনের নামে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে সুন্দরবনের বাফার জোনের মাত্র ৪ কিলোমিটারের মধ্যে অর্থ্যাৎ বনের পাশ ঘেঁষে রামপালে নির্মিত হচ্ছে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন  রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র। 
সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির উদ্যোগে গতকাল শনিবার, সকাল ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি গোলটেবিল মিলনায়তনে বিষয়ে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক এডভোকেট সুলতানা কামাল এতে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমাম, বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন)-এর গ্লোবাল সমন্বয়কারী ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. নজরুল ইসলাম, সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির কোর গ্রুপ সদস্য শরীফ জামিল । বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল আজিজ ও বাপা’র সহ-সভাপতি স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন। এছাড়াও জাকির হোসেন, শামসুল হুদা-সহ সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন অনুষ্ঠানটির সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন।
 এডভোকেট সুলতানা কামাল সার্বিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, আমাদের জাতীয় সম্পদ সুন্দরবন এখন ধ্বংসের সর্বোচ্চ হুমকির সম্মুখীন। তার নানাবিধ কারণের মধ্যে রয়েছেঃ ফারাক্কা ব্যারেজ ও অন্যান্য কারণে বনের নদীপ্রবাহ বিনষ্টকরণ, ফলে নি¤œমুখী পানি প্রবাহ হ্রাস, তাতে বনের পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, জলোচ্ছাস ও ঘূর্ণিঝড়, চিংড়ি চাষ ও স্থায়ী জলাবদ্ধতা, সুন্দরবনের চ্যানেলে পোল্ডার স্থাপন ও আবাদী জমিতে লবণ-পানি আটকে রেখে চিংড়ি চাষ, তার ফলে কৃত্রিম ও স্থায়ী জলাবদ্ধতা, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাটি, পানি, কৃষি, পরিবেশ ও অবশ্যই সুন্দরবন, পশু শিকার, গাছকাটা, প্রাণী বিলুপ্তি, চোরা শিকারীদের তৎপরতায় বাঘ ও হরিণের সংখ্যা হ্রাস।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে দেশীয় ও বিদেশী সঠিক, বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ, নিরপেক্ষ বিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদগণ কর্তৃক রামপাল প্রকল্পের কারণে সংশ্লিষ্ট পানি-মাটি-ফসল-বন-মৎস-বনের গাছপালা-জনস্বাস্থ্য-অর্থনৈতিক প্রভাব ও মানবাধিকার ব্যত্যয় প্রভৃতি বিষয়ে মোট ১৪টি প্রতিবেদন প্রস্তুত ও প্রকাশ করা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সরকারের দেয়া এতদ্বিষয়ক তথ্য ও যুক্তি ৩০ বছরের পুরাতন ও যথেষ্ঠ সেকেলে। সরকারি পরামর্শকগণ পুরাতন ও ভুল তথ্য ভিত্তিক প্রচারণায় ব্যাপৃত রয়েছেন, অতি সংবেদনশীল এই অতি গূরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের অনেক তথ্য হাস্যকর আর তাদের উপর সরকারি নির্ভরশীলতা অতি উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ড. নজরুল ইসলাম বলেন, রামপাল প্রকল্প নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশীরাও খুবই উদ্বিগ্ন। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নিশ্চিত সুন্দরবন ধ্বংস হবে। বাংলাদেশে সৌরজ্বালানীর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে, তাই কয়লাভিত্তিক প্রকল্প থেকে সরে এসে সৌর জ্বালানীর ওপর গুরুত্ব দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সারা বিশ্ব কয়লাভিত্তিক প্রকল্প থেকে সরে এসেছে, এমনকি ভারত ও চীন কয়লাভিত্তিক প্রকল্প থেকে সরে আসার জন্য একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। দেশ, পরিবেশ ও জনস্বার্থে রামপাল প্রকল্প বিষয়ে অনমনীয়তা থেকে সরে আসার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, শুরু থেকেই রামপাল প্রকল্প বিষয়ে সরকার জনগণকে ভুল তথ্য দিচ্ছে, এমনকি ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তকেও তারা ভুলভাবে প্রচার করেছে, যা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেন, আমরা চাই সরকার বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করবেন। এতে দেশবাসী অবশ্যই সঠিক তথ্যটি জানবে। তিনি বলেন, ইউনেস্কো, আর্ন্তজাতিক সংস্থা ও দেশের জনগণের বিরোধীতা সত্ত্বেও রামপাল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এটা বর্তমান সরকারের জন্য একটি নিন্দনীয় উদাহরণ হিসেবে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন বলেন, আমরা আশা করছি সরকারের পক্ষ থেকে উন্মুক্ত আলোচনার জন্য যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সে বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
শরীফ জামিল, দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে বলেন এ সকল প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেছে এটি অর্থনৈতিক, পরিবেশ-প্রকৃতি, মানবাধিকার সবকিছুর জন্যই হুমকী। তাই এতকিছু অগ্রাহ্য করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা বর্তমান সরকারের নিকট জনগণ কখনই আশা করে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ