ঢাকা, রোববার 31 December 2017, ১৭ পৌষ ১৪২৪, ১২ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিতে প্রাণ সঞ্চার

মফিজ জোয়ার্দ্দার, চুয়াডাঙ্গা (সদর) সংবাদদাতা: আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে চুয়াডাঙ্গা-১ (তিতুদহ ও বেগমপুর ইউনিয়ন বাদে সদর উপজেলা ও আলমডাঙ্গা) আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। চলছে গণসংযোগ। ব্যানার প্লাকার্ড ফেস্টুন টাঙিয়েছেন অনেকে। কেউ কেউ তোরণও নির্মাণ করেছেন। এসব সম্ভাব্য প্রার্থীরা যোগ দিচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে। এমনকি পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতেও দেখা যাচ্ছে তাদের। নির্বাচনী এলাকার যেখানে মানুষের সমাগম বেশি সেখানে পৌছে যাচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। এখন থেকেই অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী এলাকাবাসির সমস্যা সমাধানেরও চেষ্টা করছেন।
দুটি ইউনিয়ন বাদে সদর ও আলমডাঙ্গা উপজেলা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ৭৯ নং আসনটি একসময় বিএনপির দখলে থাকলেও এখন তা আওয়ামী লীগের কবজায়। একসময় চুয়াডাঙ্গা-০১ নির্বাচনী এলাকায় বিএনপির অবস্থান ছিল খুবই শক্তিশালি। তারা ছিল সুশৃংখল। তার সাথে জামায়াত যোগ হয়ে বিএনপি হয়ে পড়েছিল অপ্রতিরোধ্য। ১৯৭৩ সালের পর থেকে ২০০৮ সালের আগে পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা-০১ আসনে আওয়ামী লীগ কখনো জিততে পারেনি। সেই হিসেবে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনটিকে বরাবরই বিএনপির আসন হিসেবে ভোটাররা হিসাব-নিকাশ করেছেন। আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি নেতাকর্মিদের আশা, তারা ফিরিয়ে আনবেন তাদের হারানো আসনটি। অন্যদিকে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ এ আসনটি তাদের দখলে রাখার ব্যাপারে আশাবাদী। আগের প্রায় সব নির্বাচনের মতো আগামি নির্বাচনেও এ আসনে লড়াই হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে।
দলীয় বেশিরভাগ নেতাকর্মি ও সাধারণ ভোটারদের হিসেবে এই আসনে আগামি নির্বাচনে লড়াই হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। সে কারণে এই দুটি দলে সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকাও বেশ দীর্ঘ। জাতীয় পার্টি ও জামায়াত তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করে ফেলেছে। ভোটের আগেই মনোনয়ন যুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির যোদ্ধারা।
এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বর্তমান এমপি ও জাতীয় সংসদের হুইপ সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন, কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ সামসুল আবেদীন খোকন, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সংসদ সদস্যের সহোদর সাবেক পৌর মেয়র রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার টোটন, জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক প্রফেসর ডা. মাহবুব হোসেন মেহেদী, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের দপ্তর সম্পাদক নাজমুল ইসলাম পানু, চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার বর্তমান মেয়র ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপু, আলমডাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও আলমডাঙ্গা পৌর মেয়র হাসান কাদির গনু ও ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের স্বত্বাধিকারী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এফবিসিসিআই এর পরিচালক ও বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগরওয়ালার নাম শোনা যাচ্ছে।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন, দলের ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক সংসদ সদস্য শামসুজ্জামান দুদু, জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস, বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সাবেক যুগ্মসচিব ড. মো: আব্দুস সবুর (এম এ সবুর), জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির নির্বাহী সদস্য লে. কর্ণেল (অব:) সৈয়দ কামরুজ্জামান, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির নির্বাহী সদস্য শরীফুজ্জামান শরীফ, আলমডাঙ্গা পৌরসভার সাবেক মেয়র মীর মহিউদ্দিন ও বিএনপি নেতা শহিদুল কাউনাইন টিলুর নাম আলোচনায় উঠে এসেছে।
জেলা জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে জেলা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন ও জাতীয় পার্টির নেতা এম শহিদুর রহমানের নাম শোনা যাচ্ছে। জামায়াতের প্রার্থী চুড়ান্ত করা হয়েছে। তিনি হলেন, জেলা জামায়াতের আমীর আনোয়ারুল হক মালিক।
আওয়ামী লীগ : চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে নৌকার পালে খুব সহজে বাতাস লাগেনি। অপেক্ষা করতে হয়েছে অনেক বছর। পেছনের সেই দিনগুলোতে বিএনপি আসনটিকে পুরেছে তাদের হাতের মুঠোয়। আওয়ামী লীগ চেষ্টা করেছে বারবার। প্রতিবারই আওয়ামী লীগকে ‘নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী’ হয়ে অখুশি থাকতে হয়েছে। ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী র‌্যারিস্টার বাদল রশিদ। তারপর দীর্ঘ বিরতি। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন জয়লাভ করেন। মাঝখানের সাতটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের মুখ দেখেনি আওয়ামী লীগ। ১৯৭৩ থেকে ২০০৮ এই ৩৫ বছরের দীর্ঘ সময়ে চুয়াডাঙ্গা-১ আসন বেশিরভাগ সময় থেকেছে বিএনপির হাতে। সঙ্গত কারণেই বিএনপির নেতাকর্মিতো বটেই সাধারণ মানুষকেও বলতে শোনা গেছে, চুয়াডাঙ্গা-১ আসন বিএনপির জন্য সিলগালা করা হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ এই আসনে কখনোই জিততে পারবে না। শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালে এসে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন জিতে প্রমাণ করেছিলেন ‘নৌকা’ জিতেছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে জয়লাভ করেন বিএনপি প্রার্থী মিয়া মোহাম্মদ মুনসুর আলী (ধানের শীষ), তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন (নৌকা)। ১৯৯৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে জয়লাভ করেন বিএনপি প্রার্থী শামসুজ্জামান দুদু (ধানের শীষ), নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মিয়া মোঃ মুনসুর আলী। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন বিএনপি প্রার্থী শামসুজ্জামান দুদু (ধানের শীষ), নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন  (নৌকা)। ২০০১ সালের ২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শহিদুল ইসলাম (ধানের শীষ), নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন  (নৌকা)। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন (নৌকা), তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস (ধানের শীষ)। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন  (নৌকা), নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাসদ মনোনীত প্রার্থী মো: সবেদ আলী (মশাল)।
পেছনের এই হিসাব অনুযায়ী এই আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন বারবার থেকেছে সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুনের হাতে।
সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য। আগের ৫টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি পেয়েছেন দলীয় মনোনয়ন। আগামি নির্বাচনের জন্যও তিনি দলীয় মনোনয়নের দাবিদার। আগে দলে তীব্র কোন্দল ছিল না। সেই অবস্থা এখন আর নেই। তীব্র কোন্দলে জেলা আওয়ামী লীগ দুভাগে ভাগ হয়ে পড়েছে। সঙ্গত কারণেই দলীয় মনোনয়ন চাওয়ার নেতাও বেড়েছে। মাঠে তৎপরও রয়েছেন বেশ কয়েকজন।
মনোনয়নের হিসেব সরিয়ে রেখে সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুনকে নিয়ে আলোচনা করলে যে কেউ স্বীকার করবেন, তিনি আপাদমস্তক একজন রাজনীতিবিদ। রাজনীতির বাইরে সারা জীবনে অন্য কোনো কিছু তিনি করেননি। এজন্য আওয়ামী লীগের মত বড় দল হওয়ার পরও পুরো নেতৃত্ব তাঁর হাতেই থেকেছে বছরের পর বছর। এখনও তিনি দলের কান্ডারি হয়েই আছেন।
আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে অনেকেই নির্বাচনী এলকার গ্রামে গঞ্জে ব্যানার প্লাকার্ড প্রদর্শন করেছেন। জনসংগযোগও করছেন বেশিরভাগ সম্ভাব্য প্রার্থী। কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের দপ্তর সম্পাদক নাজমুল ইসলাম পানু গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। ওইসময় সাক্ষাতকারের জন্য তিনি দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার মুখোমুখিও হয়েছিলেন। তিনি বলেন, গত বছর আমি দলীয় মনোনয়ন পাইনি। তবে, এবার আমি আশাবাদী। আমার পূর্বপুরুষদের অতীত কার্যকলাপ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান এবং আমার বর্তমান দলীয় এবং সামাজিক কাজ আমার দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পথ সুগম করবে বলে আমি মনে করি। আমি সুযোগ পেলে দূর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করবো। বনায়ন করবো। ভূমিহীনদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করবো।
চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ সামসুল আবেদীন খোকনের অবস্থান বর্তমান সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুনের বিপক্ষে। কয়েকমাস আগে অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুনের আশির্বাদপুস্ট প্রার্থী মাহফুজুর রহমান মঞ্জুকে হারিয়ে বিজয়ী হন। শেখ সামসুল আবেদীন খোকনের অনুসারিরা চান, এই আসনের মনোনয়ন এবার হাতবদল হোক। সামসুল আবেদীন নিজেও মনোনয়ন লাভের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। নেতাকর্মিদের সাথে যোগাযোগ ও গণসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। তিনি নিজের জন্য দলীয় হাইকমান্ডে মনোনয়ন চাইবেন। তিনি বলেন, আমি দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে চুয়াডাঙ্গাকে ঘিরে আমার অনেক পরিকল্পনা আছে। আমি রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, মাদক নির্মুল, আর্সেনিক ও শিক্ষার মান নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। বাল্য বিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কোনোভাবেই তা পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। এসব নিয়ে কাজ করব আমি। তিনি বলেন, ভাল মানুষের জন্য রাজনীতি। রাজনীতিতে ভাল মানুষকে জায়গা দিতে হবে। অনেক ভালমানুষ অভিমান করে দূরে সরে আছে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। রাজনীতির ভালর জন্য এসব নিয়েও আমি কাজ করবো। ইতিমধ্যেই আমি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে কিছু কিছু বিষয় নিয়ে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছি। 
চুয়াডাঙ্গার সন্তান সফল ব্যবসায়ী এফবিসিসিআই এর পরিচালক ও বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা হঠাৎ করে আলোচনায় এসেছেন। দিলীপ কুমার আগরওয়ালা ব্যবসায়িক কারণে ঢাকায় থাকেন। তবে, প্রায়ই চুয়াডাঙ্গায় আসেন। বেশ আগে থেকেই তিনি ব্যবসার পাশাপাশি সেবামূলক কাজ শুরু করেছেন। তিনি মনে করেন, ব্যবসা শুধু মুনাফার জন্য নয়, সেবা করার কাজও হয়। সেই চিন্তা-চেতনা থেকেই তিনি বেশ আগে থেকেই বিভিন্ন সেবামূলক কাজে হাত দিয়েছেন। শিক্ষা জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেজন্য স্কুল-কলেজের মেধাবি শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত বৃত্তি প্রদান করে থাকেন। চুয়াডাঙ্গা শহরে তিনি একটি এম্বুলেন্স সরবরাহ করেছেন। ওই এম্বুলেন্স দরিদ্র প্রসুতি মায়েদের সম্পূর্ণ বিনা খরচে আনা-নেওয়ার কাজে লিপ্ত থাকে। তিনি চুয়াডাঙ্গায় গঠন করেছেন তারা দেবী ফাউন্ডেশন। অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটি মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করছে। দিলীপ কুমার আগরওয়ালা জানান, সেবামূলক কাজের পরিধি তিনি আরো বাড়াবেন। 
দিলীপ কুমার আগরওয়ালার অনুসারিরা জানান, অতীতের নির্বাচনগুলোতে দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো বড় দলে সারাদেশে বেশ কিছু সফল ব্যবসায়ী মনোনয়ন পেয়েছেন। এবারও তেমন সম্ভাবনা আছে বলে মনে করছেন চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতারা। সেই সম্ভাবনা থেকেই দলীয় মনোনয়ন চাইবেন ঢাকার ডায়মন্ড ওয়াল্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা। দিলীপ কুমার আগরওয়ালা বলেন, আমি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। মনোনয়ন পাবো বলে আমি আশাবাদী। কারণ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের দেশের উন্নতির স্বার্থে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইতিমধ্যেই দেশের বেশ কিছু বড় ব্যবসায়ী রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন। তিনি চুয়াডাঙ্গার প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেন, চুয়াডাঙ্গার যা উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। চুয়াডাঙ্গার মানুষ হিসেবে আমি চাই চুয়াডাঙ্গার উন্নয়ন। আর সেই উন্নয়নে আমি যদি আমাকে সম্পৃক্ত করতে পারি তাহলে আমি নিজে ধন্য হব। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশে যত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আছে সেই অনুপাতে সংসদে প্রতিনিধিত্ব নেই। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, ব্যবসায়ী মহল ও যারা চুয়াডাঙ্গর উন্নয়ন চান তারা আছেন আমার পাশে। সব হিসেব মিলিয়ে আমি আশাবাদী, আমি দলীয় মনোনয়ন পাব।
জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার সাবেক মেয়র রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার টোটন দীর্ঘদিন ধরে মাঠে তৎপর। প্রতিনিয়ত তিনি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। এভাবে তিনি চুয়াডাঙ্গা-১ নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের সাথে নিজের যোগাযোগ ধরে রেখেছেন। তিনি দলীয় হাইকমান্ডের কাছে মনোনয়ন চাইবেন।
জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক প্রফেসর ডা. মাহবুব হোসেন মেহেদী পেশাগত কারণে ঢাকায় থাকলেও প্রায়ই আসেন চুয়াডাঙ্গায়। চিকিৎসক হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পাশাপাশি তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক কাজে। এসব কাজের মধ্য দিয়ে তিনি অনেকটায় পৌছে গেছেন মানুষের কাছাকাছি। তিনিও এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন।
চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার বর্তমান মেয়র ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপু তরুন প্রজন্মকে চম্বুকের মতো টেনে রেখেছেন নিজের দিকে। জীবনে প্রথমবারের চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার মেয়র পদের মত বড় নির্বাচনে দাড়িয়ে তিনি সফল হয়েছেন। বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। বিজয়ী হওয়ার পর থেকে পৌর এলাকার উন্নয়ন ও পৌরবাসীর বিভিন্ন সমস্যা সামনে নিয়ে নিরন্তন ছুটে চলেছেন। তিনিও দলীয় হাইকমান্ডের কাছে মনোনয়ন চাইবেন।
বিএনপি : আগে বলা হত চুয়াডাঙ্গা বিএনপির জন্য উর্বর ভূমি। এর যথাযথ প্রমাণ একাধিকবার তারা দিয়েছে ভোটের ফসল ঘরে তুলে। এভাবেই চলছিল। নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির হাতছাড়া হয় এ আসনটি। বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। আগামি নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ আসনটি তাদের হাতে ধরে রাখতে চাইবে। বিএনপির প্রত্যাশা হারানো আসন ফিরে পাবার। শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফল কোনদিকে যাবে তা দেখার অপেক্ষায় এই আসনের ভোটাররা।
একসময় বলা হয়েছে, ধানের শীষ প্রতীক মানেই নির্বাচনে জিতে যাওয়া। তখন সাধারণ ভোটাররা পর্যন্ত বলেছেন, সহজে ধানের শীষের হাতছাড়া হবে না এ আসন। সেই হিসেবও বদলে গেল নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসে।
বিএনপির অনেক নেতাকর্মি জানান, এই আসন ফিরে পাবার ব্যাপারে তারা আশাবাদী। মানুষ ভেতরে ভেতরে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় আছে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরিণ কোন্দল সেই সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। বিএনপিতে কোন্দল থাকলেও তা নির্বাচনে খুব বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করেন বিএনপির অনেক নেতাকর্মি।
বিএনপি থেকে যারা মনোনয়ন চাচ্ছেন তাদের মধ্যে দলের ভাইচ চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ১৯৯৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হন। একই বছর ১২ জুন অনুষ্ঠিত ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি আবারও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের ২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি দলীয় মনোনয়ন পাননি। দলীয় মনোনয়ন পান সেই সময়ের জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম। ওই নির্বাচনেও ধানের শীষ বিজয়ী হয়।
দলীয় মনোনয়ন চাওয়ার তালিকায় থাকা জেলা বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।
শামসুজ্জামান দুদু এবং অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস ছাড়া আরো যারা বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেতে আগ্রহী তাদের মধ্যে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শরীফুজ্জামান শরীফ বেশ আগে থেকেই দলীয় কাজে সরব রয়েছেন। দলের কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি তার নেতৃত্বে শরীফুজ্জামানের দলীয় অনুসারিরা পালন করে থাকেন। তরুণ নেতৃত্ব এবং দলের অনেক সিনিয়র নেতাকে তিনি পাশে পেয়েছেন। সাংগঠনিক তৎপরাতায় দক্ষ এই তরুন নেতা ক্লিন মেজাজের যুবক হিসেবে পরিচিত। তিনি জানান, তিনি চুয়াডাঙ্গার উন্নয়নে স্বপ্ন দেখছেন। দলীয় মনোনয়ন পেলে এলাকার সাধারণ ভোটাররাও তার পাশে থাকবেন বলে তিনি মনে করেন। তার অনুসারিরা জানান, দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হলে শরীফফুজ্জামানের নির্বাচনে জিতে আসা কঠিন হবে না। ভোটারদের মধ্যে তাকে নিয়ে রয়েছে বেশ সাড়া।
এছাড়াও দলের আহ্বায়ক অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস ও শামসুজ্জামান দুদুর ভাই ওয়াহেদুজ্জামান বুলার নেতৃত্বেও আলাদাভাবে দলীয় কর্মসূচি পালন হয়ে আসছে।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির আরেক সদস্য লে. কর্ণেল (অব:) সৈয়দ কামরুজ্জামান ধানের শীষের মনোনয়ন চাইবেন। একসময় সৈয়দ কামরুজ্জামান শহরের রূপছায়া সিনেমা হলের সামনে (বর্তমানে পান্না সিনেমা হল) নিজের অফিসকক্ষে বসে অনুসারিদের নিয়ে দলীয় কাজ করতেন। এখন সেই অফিস নেই। তার অনুসারিরা ভেতরে ভেতরে কাজ করছেন।
মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের সাবেক যুগ্ন সচিব ড. মো. আব্দুস সবুর (এম.এ সবুর) ধানের শীষের মনোনয়ন চাইবেন। তিনি রীতিমত সংবাদ সম্মেলন করে মনোনয়ন চাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তার আগে থেকেই তিনি গণসংযোগ শুরু করেছেন। দলীয় কর্মি ও ভোটারদের সাথে দেখা করছেন। লিফলেট বিতরণ করছেন। এখন থেকেই তিনি ভোটারদের ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বলেছেন, ২০১৬ সাল থেকে তিনি নিয়মিতভাবে চুয়াডাঙ্গায় অবস্থান করছেন। একটি ইংরেজি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, চুয়াডাঙ্গায় একটি কৃষি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন আছে তার। তিনি চুয়াডাঙ্গাকে দূর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত চুয়াডাঙ্গা হিসেবে দেখতে চান।
জাতীয় পার্টি : সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হন সাইফুল ইসলাম পিনু। কিন্তু তিনি নির্বাচনে খুব বেশি উঠে দাড়াতে পারেননি। পরে ১৯৯৯ সালে অ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন জেলা জাতীয় পার্টির সেক্রেটারী নির্বাচিত হওয়ার পর দলটি আরো বেশি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। অ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন ২০০৩ সাল পর্যন্ত দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০০৩ থেকে অদ্যাবধি তিনি দলের সভাপতি। দল এখন অনেকটাই সুগঠিত। অ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। তিনি মনে করেন, অতীতের চেয়ে অনেক ভাল অবস্থানে জাতীয় পার্টি। অন্যদিকে বড় দুদলে তীব্র কোন্দল। যার প্রভাব পড়বে নির্বাচনে। চুয়াডাঙ্গা-১ এ অবস্থায় এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী অবশ্যই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন। 
শেষ কথা : অতীত হিসেবে বলে দেয়, চুয়াডাঙ্গায় বড় কোনো নির্বাচন মানে আওয়ামী লীগ বিএনপির লড়াই। অনেক বছর আগে একসময় এখানে জাসদের প্রভাব থাকলেও দলটি তাদের সাংগঠনিক কাজ ধরে রাখতে পারেনি। এ অবস্থায় জাসদের অনেককে পরে অন্য দলে চলে যেতে দেখা গেছে। জাতীয় পার্টির জন্ম হওয়ার পর হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের ক্ষমতায় থাকা না থাকার সাথে তাল মিলিয়ে চলেছে চুয়াডাঙ্গা জাতীয় পার্টির কার্যক্রম। দলটির কমিটি আছে, মিটিং সিটিংও হয়। তবে, সাধারণ মানুষের মধ্যে দলটি নিজেদের আলো ছড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পরই চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ